হাড়ের বাঁশি (চত্বারিংশ পর্ব)

0

রানি কমলার আখ্যান তুমি শুনেছ?’
বৃদ্ধা হৈমবতীর মুখের দিকে তাকিয়ে সাত্যকি বলল, ‘ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছিলাম, এখন আর মনে নেই।’
–সেই যে রাজা জানকীনাথ একটি বড়ো দিঘি কাটালেন কিন্তু সেখানে জল আর ওঠে না। তারপর এক রাত্রে রাজা স্বপ্নে দেখলেন রানি কমলা সেই শুকনো দিঘির বুকে দাঁড়ানোমাত্র মেদিনী ভেদ করে ঝর্নার মতো জল উঠে আসছে, মনে পড়ছে?
কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে সাত্যকি হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়ার আনন্দে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তারপর কমলা সত্যিই নামলেন আর দিঘি জলে ভরে ওঠায় স্রোতে ভেসে গেলেন।’
হৈমবতীর পরনে একখানি শরতের আকাশ মোছা জলরঙের শাড়ি, মুণ্ডিত মাথা নরম ঘাসের মতো পেলব কেশদামে আচ্ছন্ন, বৃদ্ধ বয়সে এখনও চোখদুটি ভারি ঝিকিমিকি আলো দেয়, কানে হিরের অলংকার, কী এক্টা বাতাসি মেঘের সুবাস মেখেছেন অঙ্গে! খোলা জানলার পানে চেয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘একটু ভুল হল। কমলা সোমেশ্বরী নদীর জল স্বর্ণ কলসে ভরে সেই শুকনো দিঘির বুকে নেমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। জল ছড়িয়ে যাচ্ছেন অথচ কলস আর নিঃশেষিত হয় না। শেষে দিঘির তলদেশে সহসা জলস্রোত ফোয়ায়ার মতো জেগে উঠল। ধীরে ধীরে রানির সর্বাঙ্গ গ্রাস করল সেই চঞ্চলা স্রোত। কমলাও নির্ভার কুসুমদলের মতো কোথায় যেন ভেসে গেলেন! সকলে বিলাপ করে বলতে থাকলেন, কীসের দিঘি, কীসের স্বপন, নাই সে উঠুক পানি। এই গহিন পুকুরে যেন না যাউন মা রানি!’
সামান্য বিস্মিত হয়ে সাত্যকি জিজ্ঞাসা করল, ‘হঠাৎ এই পুরোনো গল্প?’
–দেখো সাত্যকি, তুমি চিত্রকর, রং-রেখা নিয়ে তোমার জগৎ। এইসব পুরাতন লোককথা তোমাদের শোনা ভীষণ দরকার। মঙ্গলকাব্য, গাঁ-গঞ্জের ব্রতকথা, পালাগান, সবই খুব ভালো করে জানতে হবে, তবে না তুমি খাঁটি দেশের জিনিস আঁকতে পারবে। শুধু পশ্চিমের দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকলে তো চলবে না ভাই। সে-সব দেখা, পড়াও দরকার, কিন্তু তার আগে আমাদের প্রাচীন ধারাটি আত্মস্থ কর।
–তাহলেও আমি কখনও আপনার মতো ক্যানভাসে মায়া তৈরি করতে পারব না! সেই স্কিলও নেই, আর আত্মস্থ হওয়ার মতো মনের ক্ষমতাও তৈরি হয়নি!
সামনের টেবিলে রাখা চায়ের কাপ তুলে একটি চুমুক দিয়ে সাত্যকির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালেন হৈমবতী, ‘মায়া আর মায়া, এই এক শব্দ শিখেছ তোমরা! সব ছবিই মায়াময়। মায়া মানে কী বল তো? পেলব নরম কিছু বস্তুকে তোমরা মায়া বল?

শেষ আশ্বিনের সকাল। পুজো শেষ হয়েছে কয়েকদিন আগে অথচ চরাচরে সে-সংবাদ এখনও প্রকাশিত হয়নি। যুবতির উজ্জ্বল হাসির মতো রৌদ্রে পাখা মেলেছে দু-চারটি উন্মনা শুভ্রবসন মেঘখণ্ড, বাতাসে কয়েকদিন আগের মতোই শাকম্ভরীর নূপুরধ্বনি সুস্পষ্ট, হৈমবতীর কেয়াতলার পুরাতন ভদ্রাসনের উঠানে ঝরে পড়ছে শিউলি। দোতলার বারান্দায় কৌতুক হাস্যে চঞ্চল অপরাজিতা লতা। পাড়ার মণ্ডপ নির্জন হলেও কান পাতলে বোঝা যায় কোন্‌ দূর অন্তরীক্ষ থেকে ভেসে আসছে আনন্দগান, উৎসবলগ্ন ফুরিয়ে গেছে অথচ মধুর স্মৃতিপটচিত্র হয়ে তার রূপ এখনও অমলিন।
হৈমবতীর তীক্ষ্ণ প্রশ্নের সামনে ইতস্তত স্বরে সাত্যকি বলল, ‘ওই যে গতবছর একজিবিশনে আপনার একটি ছবি, দ্য লোটাস, পদ্ম কিন্তু পাপড়ির উপর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একজন নারীর আদল! কী নরম! কী সূক্ষ্ম! অবিকল জলের প্রতিমা যেন, হাত দিলেই ভেঙে যাবে। এই তো মায়া! দেখলেই মন উদাস হয়ে যায়!’
–সেই পদ্মাবতী কে এখন বুঝতে পারলে?
–কমলা? রানি কমলা?
সাত্যকির কথায় মৃদু হাসলেন হৈমবতী। ‘তোমার মন খুব পরিষ্কার, সেজন্যই তোমাকে ডাকি! তবে দেখো বাবা, এ কিন্তু মায়া নয়, তোমরা নরম ভাবকে মায়া ভেবে ভুল কর!’
অবাক হয়ে সাত্যকি শুধোল, ‘তবে মায়া আসলে কী?’
–অঘটনঘটনপটিয়সী মায়া প্রকৃতপক্ষে জীব আর জগদীশের মধ্যে ভেদ সৃষ্টি করেন। মায়া যেন সেই গাধার মুখোশ যা পরে সিংহশাবক নিজেকে গর্দভ ভেবে বসে থাকে! এখন ছবি বল, সাহিত্য, সঙ্গীত- যে কোনও সৃষ্টিশীল কাজই সেই অজ্ঞানতার আঁধার ভেদ করে জীবকে স্বরূপে উন্নীত করে, অন্তত পথটি তৈরি করে। এখন কোনও ছবি যদি সত্যিই সৎ শিল্প হয় তাহলে কি তাকে মায়া বলা যায়? একদিক থেকে হয়তো থেকে যায় কারণ শেষ অবধি শিল্পকলা জ্ঞানচক্ষুর বিকাশ ঘটায় কিনা তা জানি না, তবে ইদানীং মনে হয় সে পারে। আন্তরিক শিল্পীও সত্য অনুভব করতে পারেন।
বৃদ্ধা চিত্রশিল্পীর চিন্তাস্রোতে আচ্ছন্ন সাত্যকি অভিভূত স্বরে বলল, ‘আপনার কাছে বসে থাকলেই কত কী যে শেখা যায়। এই মায়া নিয়ে একদিন একটু বিশদে বলবেন তো, শুনব।’
–সে হবে’খন! তুমি আগে চা খাও, তারপর গত সপ্তাহে কী কাজ করলে সেগুলি দেখাও।

কথার মাঝেই মাঝবয়সী রমা ঘরে এসে হৈমবতীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মা, আজ কী রান্না হবে?’
চায়ের কাপ টেবিলে রেখে হৈমবতী রমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শোন মা, সাত্যকি দুপুরে খেয়ে যাবে। তুই একটু পাতলা মুসুর ডাল, বেগুন ভাজা আর মোচার তরকারি কর। রুই মাছ ভেজে রাখিস, আমি বড়ি-ফুলকপি-আলু দিয়ে ঝোল করব।’
–আর তুমার রান্না?
–আমি আজ অল্প খই-দুধ খাব, কলা না থাকলে সনাতনকে একবার বাজারে পাঠা, কলা আর দই নিয়ে আসবে।
ঝোলা ব্যাগ থেকে ছবির রোল বের করে সাত্যকি শুধোল, ‘আপনি ভাত খাবেন না?’
–আমি দুপুরে প্রায়ই ভাত খায় না গো। খই-দুধে শরীর ঝরঝরে লাগে, কাজ করতে পারি। বুড়ো বয়সে হাল্কা খাবারই ভালো!
–তাহলে আমার জন্যও আর মাছ রান্না করতে হবে না আপনাকে, নিরামিষ তরকারিই ভালো।
পিতামহীর স্নেহে হাসলেন হৈমবতী, ‘তাই বললে কী হয়! ভালোমন্দ রান্না না করে খাওয়ালে স্বাদ জানবে কী করে! শুধুই তো বাইরের হাবিজাবি খাবারে তোমাদের মন পড়ে রয়েছে!’

মনে মনে ভারি আশ্চর্য হল সাত্যকি, এমন মানুষ সে আর দেখেনি বললেই চলে, আর্ট কলেজে পড়ার সুযোগে অনেক প্রতিভাবান চিত্রশিল্পীর সঙ্গে এই ক’বছরে আলাপ হয়েছে কিন্তু তাঁরা কেউই এই বৃদ্ধার মতো নন। হৈমবতী রায় প্রখ্যাত শিল্পী, দেশজোড়া তাঁর সুনাম, ইদানিং খুব কম কাজ করেন কিন্তু সেই নতুন একেকটি ক্যানভাস বহুমূল্যে বিক্রি হয় অথচ অল্প কয়েকদিনের আলাপে সাত্যকি দেখেছে নিভৃতবাসিনী এই নারী প্রকৃতার্থেই একজন হৃদয়বতী, অতি সাধারণ জীবনযাত্রা, কোনও সভা সমিতি অনুষ্ঠানে কখনও তাঁকে দেখা যায়, কেয়াতলার নিজ গৃহে পড়াশোনা নিয়েই সারাদিন থাকেন, সত্তর বছর বয়সেও পরিশ্রম করার ক্ষমতাও বিস্ময়কর, সারাদিন মাত্র তিনঘণ্টা বিশ্রাম নেন বাকি সময় এক অপরূপ ভাবজগতে বসবাস, এমন মানুষের সঙ্গ বর্তমান উড়নচণ্ডী সময়ে সত্যই বড়ো দুর্লভ।
প্রায় দশটি ছবি বের করল সাত্যকি, হৈমবতী ঘরের দেয়ালে একটি লম্বা স্ট্যান্ড দেখিয়ে বললেন, ‘পরপর ওখানে মাউন্ট করতে থাকো, দূর থেকে দেখলেই ভালো বোঝা যাবে।’

প্রথম ছবিটি কয়েকদিন আগে আঁকা, একটি মেঘাচ্ছন্ন আকাশের তলায় একজন নারী হেঁটে চলেছে, দুপাশে বহুতল, ঝলমলে দোকানপাট, বাজার অথচ কোথাও কোনও মানুষ নাই, শুধু রমণীকে পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে, সম্পূর্ণ নগ্না, এলোকেশী, হাঁটার ভঙ্গি ভারি অলস-জলরঙের আকাশ গর্ভবতী, মেঘভারে প্রায় রমণীর আলুলায়িত কেশরাজির উপর নেমে এসেছে, একটি ক্ষীণ বিদ্যুতরেখাও দৃশ্যমান, সাত্যকি ছবিটির নাম দিয়েছে একাকিনী।
বিপরীত দিকের জানলা দিয়ে ভেসে আসা কবোষ্ণ রৌদ্র আর বাতাসে ক্যানভাসটি পাখির মতো ডানা মেলে দিয়েছে, বাগানে কোথাও একটি পাখি ডাকছে-মৃদু ছায়াচ্ছন্ন কণ্ঠস্বর, উষ্ণতা নাই বলেই ঘরের পাখা বন্ধ, প্রায় নির্জন কক্ষে টিকটিক শব্দে একটি ঘড়ি শুধু চলমান, পাতলা সোনালি ফ্রেমের চশমা চোখ থেকে নামিয়ে হৈমবতী সাত্যকির দিকে তাকালেন, ‘তুমি তো মেয়েটিকে আঁকতে চাওনি, শুধু মেঘই চেয়েছিলে তাহলে এই নারী এল কেন?’
সাত্যকি খেয়াল করে দেখেছে প্রতিবার এই বিদূষী কী করে যেন ছবির শুরুর মুহূর্তটি অবলীলায় বুঝতে পারেন, ধরা পড়ে যাওয়ার অপ্রস্তুত হাসি মুখে ফুটে উঠল, ‘মনে হল, ছবিতে একটা গল্পের সুতো থাকলে ভালো হয়, তাই মেয়েটিকে আঁকলাম।’
–কিন্তু তুমি এই গল্পটি সম্ভবত দেখোনি! তাহলে ?
চুপ করে রইল সাত্যকি, পাখিটি এখনও ডেকেই চলেছে, সামনের বারান্দায় অপরাজিতা ফুলের উপর একটি ভ্রমর বসতে চাইছে কিন্তু যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে, সাত্যকির হঠাৎ মনে হল ভ্রমরটি কি তবে অন্ধ?

দু-এক মুহূর্ত পর মৃদু হেসে হৈমবতী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ন্যুড মডেল রাখলে প্রগতিশীল হওয়া যায়, তাই না?’
সাত্যকির মাথা আচ্ছন্ন করে রেখেছে ভ্রমরটি, কোনওক্রমে বলল, ‘না, তা ঠিক নয়।’
–তবে? সম্ভোগের বাসনা হয়েছিল? এই মডেল ফিগার তো তোমার বান্ধবীর, কী যেন নাম, হ্যাঁ, ইরা-যে তোমার প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছে।ছবিটি আঁকার সময় তার সঙ্গে কল্পনায় রমণ করেছ তো?
বৃদ্ধার মুখে এত স্পষ্ট কথা শুনে অবাক হল সাত্যকি, তাকিয়ে দেখল প্রতিফলিত আলোয় মুখখানি ঝলমল করছে, তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, আশ্চর্য, মহিলা কি মন পড়তে পারেন! সত্যিই মেয়েটিকে আঁকার সময় ইরার কথা ভেবে তীব্র কাম অনুভব করেছিল। বিস্মিত স্বরে শুধোল, ‘আপনি ইরাকে একবার মাত্র দেখেছেন, তাও পথে, মনে আছে আপনার?’
‘কোনও ফিগার আমি না চাইলে ভুলি না সাত্যকি, তোমরা রূপ দেখো কিন্তু আমার দুটি চোখ সবার আগে মাংস ত্বকের আড়ালে কাঠামোটি দেখতে পায়।’, এক মুহূর্ত নীরব থাকার পর কোমল স্বরে বললেন, ‘দেখো বাবা, শিল্প কোনও বাথরুমের নল নয়, তোমার মনের তলদেশে যে কাদা জমেছে তা বের করার পথও নয়, নিজে কামোত্তেজনায় ভুগলে আঁকবে কী করে? তুমি তো দ্রষ্টা, নিরপেক্ষ দ্রষ্টা মাত্র। কত ভালো ছবিটি নষ্ট হল বলো তো! ওই মেঘ কি নারীর আদলে তৈরি হতে পারতো না? নিশ্চয় পারতো, তোমার সে-ক্ষমতা রয়েছে বলেই বকাবকি করি, কিছু মনে করো না যেন।’

আবারও দরজায় রমাকে এসে দাঁড়াতে দেখে হৈমবতী চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিছু বলবি?’
–আপনাকে ফোন করচে মা!
–কে? জিজ্ঞাসা করিসনি?
–করচিলাম, বলল কোন কাগজ থিকি একানে আসবে, তাই ফোন করচে। কে এক বিটিছেলা, নাম শুদুলুম, বলল ইরা সেনগুপতো।
সাত্যকির দিকে একবার তাকালেন হৈমবতী, এক মুহূর্ত কী যেন চিন্তা করে রমাকে বললেন, ‘আমাকে কর্ডলেস ফোনটা দিয়ে যা।’

          চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (নবত্রিশ পর্ব)

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.