হাড়ের বাঁশি (একচত্বারিংশ পর্ব)

0

গত তিনবছরে হৈমবতী রায় কোনও কাগজ বা টিভি চ্যানেলে একটিও ইন্টারভিউ দেননি। সেখানে ইরাদের কাগজে শনিবারের পাতায় সাক্ষাৎকারের জন্য রাজি হয়েছেন, অফিসে এটিই সবথেকে বড় খবর। এমনকি সম্পাদক অভিজিৎ চক্রবর্তী ঘরে ডেকে পাঠিয়ে গতকাল বলেছেন, ‘গুড জব ইরা। নেক্সট মান্থ থেকে সহ-সম্পাদিকা হিসাবে শনিবারের পাতা তুমিই দেখো।’

ঘর থেকে বেরিয়ে সামান্য হেসেছিল ইরা। কাগজের আপিসে শুধু একটি সাক্ষাৎকারের কারণে এই প্রমোশন হয় না! অনেকগুলো শনিবারের সন্ধ্যা এবং রাত্রি রয়েছে এর অন্তরালে। রায়চক টাকির গেস্টহাউস, মন্দারমণি বা শান্তিনিকেতন- ইরার ছুৎমার্গ নেই বললেই চলে। বর্ধমানের গ্রাম থেকে কলকাতার জনপ্রিয় দৈনিকের সহ-সম্পাদিকা- পথটি যথেষ্ট লম্বা। লোকে বলে নাগকেশরের ফুলের মতো তন্বী ইরা সেনগুপ্তর আহ্বানে সাড়া দেয়নি এমন পুরুষ নাকি ইহজগতে বিরল। ওইরকম প্রবাদ কতই থাকে, সেসব নিয়ে মাথা ঘামালে জীবনে বেঁচে থাকাই মুশকিল।

রবিবার সকালে স্নানান্তে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথাই ভাবছিল ইরা। সকাল এগারোটায় সময় দিয়েছেন হৈমবতী। দমদম থেকে কেয়াতলা অনেকটা পথ। এখন প্রায় ন’টা বাজে, আপিসের গাড়ি নীচে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাড়ে ন’টায় বেরোলে আশা করা যায় এগারোটার আগেই পৌঁছে যেতে পারবে। অমলের সঙ্গ যে এভাবে কাজে লেগে যাবে তা কল্পনাও করেনি ইরা। খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই ফোন করেছিল। বৃদ্ধা হৈমবতী দশ মিনিট পর ফোন ধরলে প্রথমেই বলেছিল, ‘আমাকে হয়তো আপনার মনে নেই! আমি ইরা, অমলের বিশেষ বন্ধু, একবার আলাপ হয়েছিল।’ মৃদু হেসে হৈমবতী জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোমার একটা ইন্টারভিউ চাই, তাই তো?’
–আমাকে আধঘণ্টা দিলেই হবে দিদি!
–এসো, আগামী রবিবার এসো।

এত সহজে রাজি হবেন কল্পনাও করেনি ইরা। উত্তেজনা সামলে কোনওক্রমে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কখন যাব দিদি?’
–সকালের দিকেই এসো, এগারোটা নাগাদ।
‘দিদি, আরেকটা কথা…’ বাক্য শেষ করার আগেই হৈমবতী বলেছিলেন, ‘সঙ্গে ফটোগ্রাফার আনবে তো? নিয়ে এস। কিন্তু দুজনের বেশি আর যেন কেউ না আসে।’
–না না
, দিদি, আমি আর অনিমেষদা, পুরনো ফটোগ্রাফার, আমরা দুজনেই শুধু যাব।

অনিমেষদা উঠবে বেলেঘাটা থেকে। গাড়ি থেকে একবার ফোন করে নিলেই হবে। একটি ফলসারঙা সুতির শাড়ি পরার সময় মনে পড়ল, অভিজিৎদা বারবার করে বলে দিয়েছে ফুল যেন সঙ্গে নেয়, হৈমবতী নাকি ফুল ভালোবাসেন। খোঁপা করতে গিয়েও কী মনে হওয়ায় চুল খোলাই রাখল। ঘন কাজলে সযতনে সাজাল দুটি পদ্ম আঁখি। জংলা ঘাসের সুবাস মাখল অঙ্গে- এই মহার্ঘ সুগন্ধী গতবছর প্যারিস থেকে অভিজিৎদা এনে দিয়েছিল।

যাওয়ার পথে একটা বড়ো ফুলের দোকান থেকে বিদেশি অর্কিড কিনল একগোছা। ভারি নরম রং, বর্ষণক্ষান্ত শরতের আকাশের মতো মায়াচ্ছন্ন নীল। একটি কৃষ্ণকায় বাক্সে সাজানো। চলার পথে মনে মনে কুসুমদলের নাম দিল- স্মৃতিকথা! মাঝে মাঝেই ফুল, গাছ, আকাশ, অচেনা নদীর নাম দেয় ইরা। একবার রায়চক যাওয়ার পথে একটি গহিন বিলের নাম দিয়েছিল নীলাঞ্জন! দমদমে ফ্ল্যাটের বারান্দায় রাখা কাঁটামুকুট ফুলগাছের নাম রেখেছে আঙুরলতা! গলির মুখ আগলে দাঁড়িয়ে থাকা ছাতিমগাছ ইরার কাছে নয়নমণি! অমলেরও নাম দিয়েছিল একটি, যদিও বলেনি কখনও, ‘রাজা’। মৃদু শিশিরের মতো হাসি ছিল রাজার। প্রেম প্রস্তাব দেওয়ার সময় একটি হাতে তৈরি খসখসে কাগজে একাকী নদীর ছবি এঁকে তলায় লিখে দিয়েছিল দুটো লাইন- তুমি আমার চিরকালীন কাব্য অভিসার! তার নীচে লেখা ছিল, ইরা, এই নদীর মতো একা থেকো না, আমার সঙ্গে থেকো, আজীবন।
নরম ছেলেটিকে
 কষ্ট দিতে ইচ্ছে হয়নি বলেই ইরা ফোনে বলেছিল, আমি তোমাকে বন্ধু হিসাবে ভেবেছি অমল! একইসঙ্গে মনে মনে বলেছিল, আমাকে এত সুন্দর করে কেউ কখনও ভালোবাসবে বলেনি অমল, তাই তোমার সঙ্গে এইবার থাকা হবে না। অনেকদূর যেতে হবে, সে-পথ বড়ো রুক্ষ, কঠিন, তোমার মতো নয়।

কেয়াতলায় হৈমবতীর নির্জন দোতলা বাড়ির সামনে নেমে অবাক হয়ে ইরা দেখল কাগজ-ফুলে সাজানো আধখানা চাঁদের মতো গেটের পাশে শ্বেতপাথরের ফলকে বাড়ির নাম লেখা রয়েছে, ‘অমল’! সহসা ক্ষণিকের জন্য অমলের নরম শ্মশ্রুগুম্ফে ঘেরা নিঃসঙ্গ মুখটি মনে পড়ল। কেমন আছে কে জানে! অনেকদিন কোনও কথা হয়নি।

বাগানের মাঝে কুমারীর সিঁথির মতো পথ চলে গেছে ভদ্রাসনের দুয়ারে। দুপাশে জোনাক ফোটা ঘাসফুল, বামদিকে একটি কুয়ো দেখে ইরার গ্রামের বাড়ির স্মৃতি মনে ভেসে উঠল। ফুল থইথই ছাতিম গাছের হাত ধরে একটি বকুল দাঁড়িয়ে রয়েছে। কৃষ্ণবর্ণ ভারী কাঠের দরজায় নাম লেখা হৈমবতী রায়। ঘণ্টি বাজতেই দরজা খুলে হৈমবতী হাসিমুখে বললেন, ‘এসো।’

অবাক হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল ইরা। এমন শ্বেতবসনা শুভ্রা বহুদিন চোখে পড়েনি। একাকিনী দিঘির গহিন জলের মতো রূপ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সাদা তাঁতের শাড়ির স্পর্শে। কেশবর্জিতা এই নারীর অলঙ্কার যেন চোখদুটি, তীক্ষ্ণ অথচ প্রচ্ছন্ন কৌতুকে ঝিলমিল। সর্বাঙ্গ থেকে খুব মৃদু রৌদ্রচাঁপার সুবাস ভেসে আসছে। এমন রমণীকেই কি পূর্বে যোজনগন্ধা বলা হত? ইরা নিজের মনে প্রখ্যাত চিত্রকর হৈমবতীর নাম দিল কমলা!

বসার ঘরটি ভারি সুন্দর। নিরাভরণ অথচ সূক্ষ্ম রুচির ছাপ সুস্পষ্ট। কতগুলি চেয়ার, একটি কাঠের সোফাসেট, দেওয়ালে পুরাতন কালের গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ির পাশে হৈমবতীর আঁকা অতি পরিচিত ছবি বাঁধানো রয়েছে। বড়ো বড়ো খড়খড়ির জানলা বেয়ে বাগান স্পর্শ করে আসা সবুজ রৌদ্রে উজ্জ্বল কক্ষ। অনিমেষ আর ইরাকে হাতের ইশারায় সোফা দেখিয়ে টেবিলের ওপারে দোল-খাওয়া কেদারায় বসে হৈম বললেন, ‘ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে!’
সুন্দর দেখাচ্ছে-
কথাটি বহুজনের মুখে শুনেছে ইরা কিন্তু এমন মালিন্যহীন স্বরে কখনও শোনেনি। এই মৃদু অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বরে মনে হয় সামনের মানুষটি যেন কোনও ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে বাক্যটি বললেন। ইরা সলজ্জ হেসে বলল, ‘আপনার পাশে আকাশের চাঁদকেও ম্লান দেখাবে দিদি!’
অস্ফুট কুসুমের মতো হেসে উঠলেন হৈম, ‘বলো কী গো মেয়ে! সাতকাল কাটিয়ে ঘাটে যাওয়ার সময় হল, আর এখন তুমি রূপ দেখছ!’
–না দিদি, সত্যি বলছি, কতজনকে তো দেখি, রূপসি, বিদূষী, কিন্তু আপনি আজ দরজা খুলে দাঁড়াতেই মনে হল অনেকদিন পর মায়ের কাছে এসেছি!

এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর হৈম আলতো স্বরে শুধোলেন, ‘অনেকদিন বাড়ি যাওনি বুঝি? মায়ের কাছে যাওয়া হয়নি পুজোয়?’
তার বাড়ি যে
কলকাতায় নয় এই কথা হৈমবতীর জানলেন কী করে- প্রশ্নটি মাথায় এল না ইরার। মুহূর্তে তার দুটি কাজলে সাজানো চোখ অশ্রু টলোমলো হয়ে উঠেছে তখন। মায়ের কাছে আর কোনওদিনই যাওয়া হবে না। মা-বাবা থেকেও সে অনাথের মতো এই দূর অনাত্মীয় শহরে পড়ে রয়েছে, এই বোধহয় নির্বাসন… অশ্রু সামলে ক্ষীণ কণ্ঠে বেজে উঠল ইরা, ‘কাজের খুব চাপ তো!’
–আহা রে! এইটুকু মেয়ে! মায়ের কাছে না থাকলে হয়! তোমার যখনই মনখারাপ করবে আমার কাছে চলে এসো, কেমন?

বিস্মিত ইরা কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল, ইনিই হৈমবতী রায়? যাঁর একটি রেখাচিত্রের জন্য তামাম ভারতের আর্ট ডিলাররা হাপিত্যেশ করে বসে থাকে। একবার কথা বলার জন্য দেশি বিদেশি মিডিয়া হাউস অপেক্ষা করে বছরের পর বছর, ইনিই সেই জাদুকরী চিত্রকর? তবে যে শুনেছিল ভীষণ অহংকারী! অথচ পড়ন্ত আশ্বিন মাসের রৌদ্রোজ্জ্বল চরাচরে সেই মানুষ তার মতো দু-পয়সার সাংবাদিককে বলছেন ইচ্ছে হলেই চলে আসার কথা!

সহসা এই প্রগাঢ় মাধুর্যের সামনে ইরার নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হল। সামান্য কিছু টাকা আর পদোন্নতির জন্য কত সহজে সে নিজের অমলিন প্রেম বিসর্জন দিয়েছে। কী হবে সে-সব নিয়ে? জীবনের শেষপ্রান্তে এসে এই রমণীকুলকামিনী কেমন নির্লিপ্ত স্বরে স্নেহ আর ভালোবাসার কথা উচ্চারণ করতে পারছেন, মুহূর্তে প্রায় অপরিচিতা ইরাকে আচ্ছন্ন করলেন মায়ায়, তেমন কখনও হতে পারবে না সে। বিশ্বাস ভালোবাসার পরেও আদর্শ নষ্ট হলে আর কী অবশিষ্ট থাকে মানুষের? কিছুই থাকে না। আদর্শ এখনও অটুট, তাই ওঁর ছবির আলোছায়ায় বোধহয় বারবার প্রেম ফিরে আসে! ক্ষণিকের জন্য ইরার মনে হল শ্বেতবসনা হৈমবতী যেন নিজেই প্রেম। কাছে এসে প্রণামের জন্য নীচু হতেই হাতদুটি জড়িয়ে ধরলেন হৈম, ‘আমি প্রণাম নেওয়ার যোগ্য নই মা। তুমি বসো, বেলা হয়েছে, একটু কিছু মুখে দাও, তারপর বরং ইন্টারভিউ নিও!’

পাকা রাস্তার দুদিকে যতদূর চোখ যায় ধানখেত, মাঝে মাঝে যতিচিহ্নের মতো দু-চারটি খোড়ো চালের ঘর। ছোট দিঘি, বাবলা গাছের জটলা বা আম-কাঁঠালে ঘেরা ছায়াচ্ছন্ন গ্রামের নির্জন ধুলাপথ আর মাথার উপর সাদা মেঘের আলপনায় সাজানো নীলকান্তমণি আকাশ, বাতাসে ঝিমঝিম সুরে বাজছে আসন্ন হেমন্ত ঋতুর সুবাস। গাড়ির জানলা থেকে এই অপরূপা শ্যামলা বঙ্গদেশের দিকে মুগ্ধচোখে তাকিয়ে হৈমবতী আপনমনেই বললেন, ‘সহস্রবার দেখলাম জীবনে, অথচ এখনও কী নতুন!’
অমলের চোখেও মায়ারূপের ঝিলিমিলি, আবদারের সুরে বলল, ‘এখানে একটু থামলে হত না?’
–হ্যাঁ দাঁড়াব, সামান্য দূরে একটি বিল রয়েছে, তার পাশেই দাঁড়াব।

বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। কুসুম বিছানো রৌদ্রে আলোর নৌকো পাল তুলে কোন্‌ দূর দেশে ভেসে চলেছে। পথঘাটে লোকজন নাই বললেই চলে, মাঝে মাঝে দু-একটি মালবোঝাই ট্রাক শুধু চোখে পড়ে। দুপাশে বাবলা গাছের সারি- তাদের পাতা বেয়ে গড়িয়ে আসা আলোছায়ার চৌখুপি নকশা পিচ ঢালা মসৃণ পথের উপর বাঘবন্দি খেলার আসন পেতেছে। বুনো ঝোপের মাথায় একগোছা হলদে রঙা ফুল পথভ্রষ্ট প্রজাপতির মতো এখনই যেন বাতাসে পাখা মেলে উড়ে যাবে। এই শ্রীমতীর অভিসারের মতো পথটি বেয়ে হৈমবতীর নীলরঙা গাড়ি তাঁর দেশের ভিটা পাঁচথুপির দিকে ছুটে চলেছে। প্রতিবছরই পুজোর পরে কার্তিক মাসের গোড়ায় তিনি গ্রামের বাড়িতে দিন-কয়েক থাকেন। পনেরো ষোলো কাঠা জমির উপর পুরাতনকালের চকমিলানো দালান, পদ্মদিঘি, বাগান, কুলদেবী সিংহবাহিনীর মন্দির- সব নিয়েই এই ভদ্রাসন। হৈমবতীর বৃদ্ধ-প্রপিতামহ শ্রী অম্বিকাচরণ রায় পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। তিনিই প্রায় একশো বিঘা ধানি জমি সহ এই গৃহ প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প কিছু জমি-জমা এখনও রয়েছে, ভিটা দেখাশোনা করে বৃদ্ধ মনোহর। ইদানীং বারবার বলে সম্পত্তি বিক্রি করে তাকে ছুটি দেওয়ার কথা, কিন্তু কলকাতা থেকে বছরে একবার মাত্র এলেও হৈমবতী প্রাণে ধরে এই ভদ্রাসন বিক্রি করতে পারেননি। বিক্রির কথা উঠলেই মনে হয়, থাক, একটি স্মৃতিকথার মতো বেঁচে থাকুক অতীত কাল। তিনি অবশ্য জানেন শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়তো করতেই হবে। নিঃসন্তান হৈমবতীর এই বিপুল সম্পত্তির কোনও দাবীদার কোথাও নেই।

পাঁচথুপী গ্রামে ঢোকার মুখে ভুবনডাঙায় অপরাহ্ণ নেমে এল। দূরে বাঁশবনের পেছনের আকাশে অদৃশ্য কোন্‌ চিত্রশিল্পী তাঁর অলীক রঙের বাক্সখানি উপুড় করে দিয়েছেন। ছায়াময় ধুলাপথ, আঁধার হয়ে এসেছে গ্রামের বটতলা। ধানিমাঠের উপর সূক্ষ্ম রেশমি কাপড়ের মতো কুয়াশা বিছানো, কী একটি পাখি আপনমনে ডেকেই চলেছে! স্থির চিত্তে দেখলে মনে হয় একাকী কোনও কিশোরী দিনান্তে নির্জন দিঘির জলে স্নান শেষে যেন আলোর সুতোয় বোনা কাপড়ের আঁচল জগতপল্লীর উপর থেকে আলগোছে তুলে নিয়ে নিজ গৃহের পথে ফিরে চলেছে। কোথায় তার গৃহ কেউ জানে না। হয়তো নক্ষত্রলোকে বা আকাশগঙ্গার তীরে। তবে তার ফিরে যাওয়ার ক্ষণ সত্যই বড়ো মধুর।

গ্রামেগঞ্জে অমল বিশেষ একটা আসেনি, মুগ্ধ চোখে বিধুর হেমন্ত অপরাহ্নের পানে চেয়ে আনমনা স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘এই ছবিটি আঁকতে পারি না?’

ইদানিং দীর্ঘ পথ গাড়িতে বসে থাকলে কোমরে যন্ত্রণা শুরু হয়, পা দুটি ভাঁজ করে সিটের উপর তুলে হৈমবতী মৃদু হেসে বললেন, ‘নিশ্চয় পারো, তবে কেন আঁকবে সে-সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন।’

–সুন্দর তাই আঁকব, এই যে ধোঁয়া রঙা বিকেল, কেমন ধীর পায়ে কুয়াশা নেমে আসছে, ঝপ করে ফুরিয়ে গেল আলো, গাছ-গাছালির মাথায় মেঘের মতো আঁধার, এসব দেখলেই তো মন ভরে যায়! কিন্তু আঁকলে সবাই বলবে সেই ওল্ড মডেল!

–দেখো অমল, তুমি যা বললে সেসব কিন্তু খুব ভালো ক্যামেরায় বন্দি করা সম্ভব! এখন বলো তুমি ক্যামেরাম্যান না শিল্পী?এই রূপের ইন্টারপ্রিটিশন থাকবে তো ছবি জুড়ে? অর্থাৎ তুমি কেমন দেখছ, মনে রেখো, তোমার এই অপরাহ্ন আর আমার ছেলেবেলার গ্রামের বিকেল দুটিই কিন্তু ভিন্ন, সেই নিজস্ব বিকেল যদি আঁকতে পারো তাহলে অবশ্যই আঁকবে, কারোর কথা শুনবে না।

চুপ করে রইল অমল, একটি ছবি ভেসে উঠছে আবার হারিয়েও যাচ্ছে, কোনও অচেনা কিশোরীর মুখ, স্পষ্ট বুঝতে পারছে না, এই অস্ত হেমন্ত-অপরাহ্ন কি তবে সেই কিশোরী?

দু-এক মুহূর্ত পর হৈমবতী বললেন, ‘বাড়িটি তোমার খুব ভালো লাগবে, কয়েকটা দিন তো থাকব, নিজের কাজ শুরু করে দাও। প্রতিদিন ছবির নিয়ে বসা খুব দরকার।’

–হ্যাঁ, ফিরে গিয়েই একজিবিসনে চারটি ছবি জমা দিতে হবে।

–একজিবিসনের কথা মাথায় রেখো না, নিজের জন্য আঁকো! তোমার ভালো লাগে তাই ছবি নিয়ে বসো, ওটিই আসল কথা।

 

ঘরদোর মনোহর পরিষ্কার করেই রেখেছিল, দোতলার বড়ো ঘরখানি হৈমবতীর জন্য নির্দিষ্ট, পাশে আরেকটি ঘরে অমলের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, সন্ধ্যার মুখে বিজলিবাতি চলে যাওয়ায় পুরাতন দিনের একটি লম্বা বাতিদানে তিনটি মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে গেছে মনোহর, জানলার ওপারে জোনাকপোকা থইথই বাগানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে অমল, গহিন আঁধার চারপাশে, কী একটি পাখি তিন-চার বার ডেকে চুপ করে গেল, মাঝে মাঝে বাতাসের দোলায় সুপুরি গাছে সরসর শব্দ শোনা যাচ্ছে, কৃষ্ণপক্ষের নির্মেঘ আকাশ যেন রাত্রিদেবীর সহস্র চুমকি বসানো জরি-পাড় আঁচল, শঙ্খধ্বনি ভেসে এল সহসা, দুহাত কপালে ঠেকিয়ে হৈমবতী বললেন, ‘সিংহবাহিনী দেবীর সন্ধ্যারতি হচ্ছে, কাল স্নান করে তোমায় নিয়ে যাব।’

হিম বাতাস এর মধ্যেই পাল তুলে দিয়েছে, গায়ের চাদরটি ভালো করে জড়িয়ে অমল জিজ্ঞাসা করল, ‘ইনিই কি আপনাদের কুলদেবী?’

দেয়ালে টাঙানো একটি তৈলচিত্রের দিকে ইশারা করে হৈমবতী বললেন, ‘হ্যাঁ, ওই যে ছবিটি দেখছ, আমার বৃদ্ধ-প্রপিতামহ অম্বিকাচরণ রায়, ইনিই দেবী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চিকিৎসক কিন্তু তন্ত্র সাধনায় মতি ছিল, নিজে সাধনাও করতেন, দুর্দান্ত পুরুষ ছিলেন, শুনেছি নিজের উদ্যোগে পাঁচ-আনির জমিদারিও কিনেছিলেন।

–সে-সব জমিজমা আছে এখনও?

মৃদু হাসলেন হৈমবতী, ‘অল্প কিছু আছে, মনোহর জানে সব, আমি কিছুই প্রায় দেখি না। আর এই রাঢ়দেশে ফসলও তো তেমন হয় না, ওই দুবার ধান আর শীতকালে সর্ষে, আখ আর আলু। জমি খুব রুক্ষ, বৃষ্টিও অনেক কম তো এদিকে।’, এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর অন্যমনস্ক স্বরে বললেন, ‘তবে এবার এই জমি-জমা ভদ্রাসনের একটা বন্দোবস্ত করতে হবে, আমারও বয়স হল, বাড়িটি হয়তো মনোহরকেই লিখে দেব, এবার সুতো গোটানোর পালা অমল, ঘরে ফেরার সময় হল!’

অবাক হয়ে অমল শুধোল, ‘আর আসবেন না তাহলে এখানে?’

একখানি সাদা শাড়ি আটপৌরে করে পরেছেন হৈমবতী, মোমবাতির পীতবসনা আলোয় মুণ্ডিত মস্তক তপ্তকাঞ্চনবর্ণা বৃদ্ধাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন প্রাচীন কাল স্বয়ং এই নির্জন হেমন্ত সন্ধ্যায় পুরাতন ভদ্রাসনে আখ্যানমালা শোনাতে বসেছেন, ‘অনেকদিন তো হল! ছবি আঁকা, অর্ধ শতাব্দী পার করে বেঁচে থাকা, ভোগ-বিলাস…বাকি তো আর নাই কিছু, আর কতদিন এসব নিয়ে জড়িয়ে বসে থাকব বলো! এবার যে ফেরার কথা ভাবতে হবে বাবা!’

–ছবি?

–সেই জগত থেকেও অবসর নেওয়ার সময় হয়েছে, এবার তোমরা আঁকবে, আমি দেখব!

 

ঘরটি পুরাতন আসবাবপত্রে সাজানো, বড়ো মেহগিনি কাঠের পালঙ্কে বসে রয়েছেন হৈমবতী, কড়ি-বরগার ছাদ থেকে একটি ফ্যান ঝোলানো, বামদিকে লোহার ভারী সিন্দুক, শ্বেতপাথরের মেঝে মলিনও হলেও অতীতের আভিজাত্য আজও বহন করে চলেছে, বাগানের দিকে দুটি জানলা খোলা, দীঘি হতে ভেসে আসা উত্তরগামী বাতাস যেন নিচু স্বরে সেই কোলাহল পূর্ণ বৃহৎ ভদ্রাসনের যৌবনবেলার কথা কইছে, যদিও এখন জনশূন্য এই গৃহ ভগ্নপ্রায় নির্জন তবুও কান পাতলে শোনা যায় পুরাতন জমিদার বাড়ির অন্তরমহলের কত অশ্রুত আখ্যান, লোভ কামনা বাসনার এক বিচিত্র কাহিনী। অদূরে আরাম কেদারায় বসে রয়েছে অমল, পরনে একখানি পাতলা সুতির প্যান্ট আর জামা, গায়ে ছাইরঙা চাদর, হৈমবতীর মুখে নির্বাসনার কথা শুনে মৃদু স্বরে বলল, ‘গতকাল মোবাইলে দেখছিলাম এই গ্রামটিও তো অনেক পুরোনো!’–হ্যাঁ, পঞ্চস্তূপ থেকে পাঁচথুপি, পাল যুগ মানে ধরো অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে এখানে পাঁচটি বৌদ্ধ স্তূপ নির্মাণ করা হয়েছিল, সম্ভবত নবম শতাব্দী নাগাদ, এখনও সেই বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসস্তূপ পড়ে রয়েছে। চারপাশে ধূ ধূ মাঠ আর লাল ধুলাপথের পাশে সেই প্রাচীন স্তূপের উপর একটি প্রকাণ্ড জামগাছ ছায়া দেয়, একটি নির্জন শিবমন্দিরও আছে, কী আশ্চর্য ভাবো অমল, কয়েক শত বৎসর পূর্বে ওই স্থানে আসতেন কত বৌদ্ধ শ্রমণ শ্রমণা, অমিতাভ বুদ্ধের উপাসনা, ধর্ম সঙ্ঘকে কেন্দ্র করে কত প্রবজ্যা, ত্যাগ ও করুণার বাণী, ত্রিশরণ, কাষায় চীবর, সন্ধ্যায় দীপ-ধূপের সুবাস কেমন মহাকালের স্রোতের দোলায় শূন্যে মিলিয়ে গেল, কেউ যায় না আর সেখানে, একাকিনী সন্ধ্যা নূপুর বাজিয়ে আসেন, দিনমণির উজ্জ্বল স্পর্শে নূতন দিন শুরু হয়, আষাঢ়ের ঝুম বর্ষায় নিঃসঙ্গ পড়ে থাকে ভগ্ন স্তূপ…এমনই হয় জানো, এই বাড়ি, আমি, আমার আঁকা ছবি কিছুই কোথাও থাকবে না, সব হারিয়ে যাবে, অনিত্য বস্তু এভাবেই মহাকালের ফুৎকারে বিনষ্ট হয়! এই ভাব মনে দৃঢ় করে ছবি আঁকো, দেখবে কত সহজ নির্ভার হয়ে উঠেছে তোমার রঙ-রেখা-চিত্র! মনে রেখো, কিছুই থাকবে না, এই মায়া জগত একটি স্বপ্ন বৈ আর কিছু নয়।

মন্ত্রাবিষ্টের মতো অমল অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিছুই যদি না থাকে তাহলে এই ছবি এঁকেই বা কী লাভ?’

হাসলেন হৈমবতী, ‘লাভ-ক্ষতির কিছু নাই বাবা! প্রকৃত শিল্পসৃষ্টি তোমাকে এই অনিত্য বস্তু চিনতে শেখাবে, নির্বাসনার পথে টেনে নিয়ে যাবে, তখনই তো মানুষ হিসাবে তোমার যাত্রা শুরু হবে! আর এই আদর্শই তো শ্রেষ্ঠ আদর্শ যা তোমাকে সত্যে প্রতিষ্ঠিত করবে! আমার মাস্টারমশাই কী বলতেন জানো, তুমি শিল্পী হয়েই আছ, সেটিকে খুঁজে পাওয়ার নামই কলাচর্চা!’

 

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর অমল অন্যমনস্ক স্বরে নিজেকে শুনিয়েই যেন বলল, ‘কাল একবার ওই বৌদ্ধস্তূপ দেখতে যাব!’

–নিশ্চয় যাবে, শুধু স্তূপ কেন, শ্যামসুন্দর মন্দির তারপর ঘোষ-হাজরা পরিবারের পঞ্চায়তন শিবমন্দির সবই দেখবে, মনোহরের থেকে একটা সাইকেল নিয়ে সকালে বেরিয়ে একা একা সব ঘুরে দেখো। একা থাকবে, নিঃসঙ্গ অনাড়ম্বর জীবনই মধুর! ঘোষ-হাজরাদের শিবমন্দির লোকে নবরত্ন মন্দির বললেও গঠনের দিক থেকে এইটি কিন্তু পঞ্চায়তন, রথ-পগযুক্ত রেখদেউল রীতির মন্দির, তুমি বাংলার মন্দিরের গঠন সম্পর্কে কিছু জানো?

দুপাশে মাথা নাড়ল অমল।

–একটা বই আছে, দেব, পড়ো বইটি। কতরকমের রীতির যে মন্দির রয়েছে, জোড়-বাংলা, চারচালা, আটচালা, একচালা, আমাদের সিংহবাহিনী চারচালা মন্দির। পড়ো, পড়ো আর দেখো, এই তো বয়স, নাহলে নিজের দেশ, মাটি, রঙ, সেখানকার মানুষ চিনবে কী করে! একজন শিল্পীর সবথেকে বড়ো সম্পদ হল তার দুটি চোখ, সব শুষে নাও, তারপর মনে ছবি তৈরি করো আর অপ্রয়োজনীয় দেখা-শোনা পরিত্যাগ করো, এভাবেই হয়।

একটানা কথা বলে পালঙ্কের পাশে রাখা পাথরের জলের গেলাস থেকে দু-চুমুক জল খেয়ে আঁচলে মুখ মুছে হৈমবতী বললেন, ‘কাল বিকেলের দিকে ইরা আসবে, ওকে সঙ্গে নিয়ে ক’দিন ঘুরে দেখো সবকিছু!’

অত্যন্ত অবাক হয়ে অমল শুধোল, ‘ইরা?’

চপলা কিশোরীর মতো ওষ্ঠ চেপে হাসলেন হৈমবতী, ‘কেন, ইরা এলে তোমার অসুবিধা হবে?’

–না, না, কিন্তু ইরা আমাকে দেখলে বিরক্ত হতে পারে!

–তুমি কিছুই জানো না ছেলে, ইরা জানে তুমি আমার সঙ্গে এসেছ!

অদূরে বাগানে একটি হুতোম প্যাঁচা ডেকে উঠল, রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শিবাদল উচৈঃস্বরে জানান দিয়েই নিশ্চুপ হতেই থমথম নির্জনতা নেমে এল চরাচরে, নির্মেঘ আকাশ এখন সহস্র নক্ষত্রে পরিপূর্ণ, আলতো স্বরে থেমে থেমে অমল বলল, ‘ইরা জানে, তাও আসতে রাজি হল! আশ্চর্য!

‘ইরা খুব দুঃখী মেয়ে অমল, চাপা কষ্ট রয়েছে অন্তরে, ওকে কেউ বোঝে না। সেই কষ্টই খাঁটি মানুষ করবে ইরাকে’, কথার মাঝেই জানলার ওপারে একফালি নক্ষত্র সজ্জিত হেমন্তের আকাশের দিকে ইশারা করে হৈমবতী বললেন, ‘দেখো, জানলা দিয়ে যেটুকু আকাশ দেখা যায় তাই কিন্তু সত্য নয়! প্রকৃত আকাশ কী বিশাল, কী গম্ভীর, কী শূন্য! মানুষও তেমনই অমল, যেটুকু তুমি দেখছ তার বাইরেই পড়ে রয়েছে তার অনন্ত সম্ভাবনা, কোনও মানুষকে কখনও নিজের বুদ্ধির সীমায় বেঁধে ফেলো না, তার থেকে বড়ো ভুল আর কিছুই নাই!’

বিস্মিত অমল জিজ্ঞাসা করল, ‘আর আপনি কী করবেন?’

–আমি? তোমরা দুটি প্রজাপতির মতো বেড়াবে আর আমি সাক্ষী হয়ে তোমাদের দেখব, আঁকব!

–আঁকবেন? কী আঁকবেন?

রহস্যময়ীর মৃদু হাস্যে ভরে উঠল হৈমবতীর মুখমণ্ডল, তিনি যেন এখন বৃদ্ধা নন, পূর্ণা যুবতির মতো পদ্মকুসুম আঁখির ইশারায় হিল্লোল তুলে বললেন, ‘দুটি ফুল, নীল দুটি ফুল, তারা এই জগতের কেউ নয়, ঠিক যেন অমল আর ইরা-দুই শাপভ্রষ্ট গন্ধর্ব-গান্ধর্বী, আমি তাদের মানুষ জন্ম মুছে নীল ফুলের রেণুর স্পর্শে তৈরি করব চিত্র-আখ্যান, তোমরাই তো আমার চরিত্র! ইরা ও অমল! রাজা এবং কমলা!’

            চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (চত্বারিংশ পর্ব)

 

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.