হাড়ের বাঁশি (একবিংশ পর্ব)

‘আষাঢ় অপরাহ্ণে মেঘ ছিন্ন করিয়া অস্ত আলোয় ভরিয়া যাইবে উঠান। কেহ কোথাও নাই। জনশূন্য ভিটার দক্ষিণে পুরাতন ঘাটপানে বাস্তুসাপ বুকে হাঁটিয়া আপনমনে চলিয়া যাইতেছে। বিরজা হোমাগ্নির ন্যায় বাতাস বহিতেছে চরাচরে- এইরূপ দৃশ্য মাঝে আমার মনে পড়িতেছে এক ফকিরের আখ্যান।
তাঁহার বাস তরুতলে। ভিক্ষান্নে দিন কাটিয়া যায়,
 আর না পাইলে উপবাস। ওষ্ঠ সর্বদা মহাদেবের শিরোভূষণ চন্দ্রকলার ন্যায় স্মিত হাস্যে পরিপূর্ণ। সেই বৃক্ষের উপরিভাগের কোটরে এক বহুরূপী অনেককাল হইতে রহিয়াছে। বহুরূপীর প্রকৃত বর্ণ কেহ কখনও বুঝিতে পারে নাই। কখনও তাহার বর্ণ ধূসর, কখনও হরিদ্রাভ আবার কখনও শ্যামমেঘের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ। যাহারা ফকিরের সন্ধানে বৃক্ষতলে আসিয়া থাকে তাহারা বহুরূপীর গাত্রবর্ণ লইয়া নিজেদের মধ্যে কলহে জড়াইয়া পড়ে! তখন ফকির তাহাদের কলহ মিটাইয়া দেন, মধুর হাসিয়া কহেন, তোমরা যাহা দেখিতেছ তাহাই সত্য!

এক দর্শনার্থী একদিন কহিলেন, তাহা কী প্রকারে হইবে? আমি পীতবর্ণের বহুরূপী দেখিতেছি আবার আমার সঙ্গী দেখিতেছে উহার বর্ণ নীলাভ! দুই প্রকার কী করিয়া সত্য হইবে?

কেন হইবে না? তুমি যদি নীলাভ দেখিতে চাহ তাহা হইলে দেখিবে বহুরূপী নীলাভ হইয়াছে! তুমি রহিয়াছ বলিয়াই বহুরূপী রহিয়াছে!

ফকিরের আখ্যান চিন্তা করিতে করিতে দেখিলাম, পুরাতন ভিটাখানি ভুস করিয়া মনোবৃত্তিস্রোতে নিভিয়া যাইল। তাহার স্থলে ভাসিয়া উঠিল শ্মশানভূমি। দগ্ধ কাঠকয়লা, মৃতের বস্ত্রাদি, ভগ্ন মৃৎকলস, অদূরে লকলক চিতা হইতে মহাধূমের সুবাস ভাসিয়া আসিতেছে, উত্তরপথগামী বাতাসে চিতাভস্ম উড়িতেছে… ইহাও বহুরূপীর একটি ভিন্ন বর্ণ মাত্র! তাহা হইলে সত্য কী?

সুরধুনীর পৈঠায় যিনি বসিয়া রহিয়াছেন তিনিই একমাত্র ধ্রুব। নগ্নিকা অন্ধ বধির পিঙ্গলকেশী। কেশরাজি চিতাগ্নির ন্যায় উড়িতেছে। বিকট মুখব্যাদান করিয়া তিনি সকল বস্তু গিলিয়া খাইতেছেন। তাঁহার জঠরে সর্বদা দাউদাউ জ্বলিতেছে ক্ষুধাগ্নি। এক মুহূর্তে কাল গ্রাস করিয়া থাকেন, তিনিই স্বয়ং মৃত্যু। তাঁহার ন্যায় পরম করুণাময়ী আর কেহ নাই। সকল রূপ ও মায়া ছিন্ন করিয়া জীবকে বারবার তিনিই বন্ধনমুক্ত করিয়া থাকেন। প্রতি মুহূর্তে আমার এই দেহতরণী তাঁহার আসিবার সাক্ষ্য দিতেছে, তিনি আসিতেছেন।
তিনি আসিতেছেন
বলিয়াই তোমাকে পত্র লেখা হয় নাই বহুকাল। অবসরের আকাশখানি এত উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে যে তোমার স্মৃতি ভাসিয়া আসিল। অশ্বত্থ গাছটি মলিন বস্ত্র ত্যাগ করিয়া নূতন নূতন পাতায় ভরিয়া উঠিয়াছে। আকাশের শরীরে কেমন শিশুর মতো তাহারা খেলা করিতেছে। উহাদের মৃত্যুভয় নাই। পুনরায় হেমন্তবাতাসে আবার তাহারা খসিয়া পড়িবে। ওইরূপ ঝরিয়া পড়িবার ক্ষণটুকু মনে রাখিলে বাসনা ক্ষয় হয়, ক্রমশ ভয়শূন্য হয় অন্তর। তুমি কি এখন স্নান শেষে পূজায় বসিয়াছ? এই বন্ধ সংসারে কুসুম কি তোমার ফুটিয়াছে?আমি ইদানীং খুব ভোরে উঠিতেছি। প্রত্যুষ চার ঘটিকা। তখন চরাচরে হিম হিম বাতাস বহিয়া যায়। ওইরূপ বাতাসের কথা তোমাকে একদিন কহিয়াছিলাম। তুমি অবিশ্বাসের মতো বলিয়াছিলে, কোথায় বাতাস, এখানে কী গরম!
তোমার মতো
সকল অবিশ্বাসীদের বিশ্বাস ফিরাইবার জন্যই হয়তো এই আয়োজন, বুঝিতে পারি না!
একটি হরিয়াল আসিয়াছে।
অশ্বত্থ গাছের উঁচু ডালে বসিয়া আমার দিকে চাহিয়া রহিয়াছে। ওই পক্ষী আমাকে বিশ্বাস করিয়াছে! তবে তাহার এই জগতে পাখিজন্ম, তোমার ন্যায় মানুষ নহে! কখনও কখনও তোমাকেও আমার পাখি বলিয়া ভ্রম হয়।

গতকাল স্বপ্নে এক সন্ন্যাসী বন্ধু আসিয়াছিলেন। আমরা অচেনা ছাদে বসিয়া রহিয়াছি, পাশে দুইখানি কদম গাছ। কী ফুল কী ফুল! আর প্রায় দিবালোক রচনা করিয়া চন্দ্রদেব জোড়া কদম্ব বৃক্ষের মাঝের আকাশে বসিয়াছিলেন। বড় বড় কদম কুসুমের সুবাসে আমার মাথা ভারী হইয়া আসিয়াছিল। এখন কদমের ফুটিবার  সময়। স্বপ্নেও কদম ফুটিয়াছিল, বহুদিন পূর্বে একবার কহিয়াছিলে, কদম তোমার প্রিয় কুসুম। 

সেই সন্ন্যাসী বলিতেছিলেন, তাঁহার তামাক ফুরিয়া গিয়াছে!
আমি একমুঠি তামাক তাঁহার হাতে তুলিয়া দিলাম, খুব খুশি হইয়া কহিলেন,
জানে ন কিঞ্চিৎ কৃপয়াহব মাং প্রভো
সংসারদুঃখক্ষতিমাতনুষ্ব।

বহুদিন পূর্বে কলিকাতা শহরের রাজপথে এক উন্মাদকে দেখিয়াছিলাম, মস্তক জটাভারে আচ্ছন্ন, শ্মশ্রুগুম্ফাবৃত মুখমণ্ডল। সম্পূর্ণ উলঙ্গ। কিন্তু কী হাসি তাহার মুখে! অহেতুক প্রসন্নতা দেখিয়া ভারি আনন্দ হইয়াছিল। কতদিন মানুষের মুখে হাসি দেখি নাই! আমি মনে মনে সন্ন্যাসব্রত আর বিরজাহোমের কথা স্মরণ করিলাম!
সেই গাঢ় চৈত্র দ্বিপ্রহরে তোমাদের কলিকাতা শহরটিকে
 একাকী যৌবনবতীর ন্যায় দেখিয়া সামান্য ভয় পাইয়াছিলাম।

আগামী বৎসর গাজনে তোমাকে লইয়া আসিব। শিব লীলাবতীর বিয়ার দিন, নীল পূজার দিন, সন্নিসিদের গাঁয়ে যাইব। সব একমাসের সন্নিসি। সারাদিন উপবাস আর রাত্রে ভিক্ষান্নে ক্ষুধানিবৃত্তি। পাশেই শ্মশান, ভূতনাথের থান। শালপাতায় লইয়া ওই অন্ন খাইব। ভিক্ষান্ন বাসনারহিত, তাই সুস্বাদু। 

দূরে শ্মশানে চিতা জ্বলিবে, সার সার লক্ষ লক্ষ চিতা। চিতাধূমের সুবাস ভাসিয়া আসিবে। ছাই উড়িবে বিবাগি চৈত্র বাতাসে। তুমি অবাক হইয়া দেখিবে কেমন কালপুরুষ উঠিয়াছে আকাশে, নীচে লুব্ধক।

তুমি আমার সঙ্গে শ্মশানে যাইবে না?
মড়া খেলা দেখাইব গাজনে! যাইবে?
তারপর অধিক রাত্রে চিতাধূমের পাশে বসিয়া একটি শালপাতা হইতেই দুজনে ভিক্ষান্ন খাইব।

মন স্থির হইলে পত্র দিও! ‘

প্রপিতামহের পুরাতন খাতাখানি খুলে লেখাটি পড়ছিল ঋষা। দু-চার পাতা উল্টে বুঝতে পারল আর কিছুই লেখা হয়নি। শেষের দিকে অনেক পরে কেউ একজন একটি কবিতা লিখে রেখেছেন। দেখে বিস্মিত হল ঋষা। কে এই মানুষটি যিনি এই কবিতাটি লিখেছেন?
এইটি যে শঙ্করনাথের লেখা নয়
তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যে-ভাষায় লেখা সেটি তখনকার লিখিত ভাষা নয়। লেখার কালিও অনেকটা নতুন। গাঢ় খয়েরি রঙের কালি দিয়ে সুন্দর গোল গোল অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে কবিতাটি, দুবার মন দিয়ে পড়ল ঋষা-

‘সন্ধ্যা যেন আকুল উঠানে কাজল বালিকা
শূন্য ঘাটে পথ চিনে ফিরে আসে নাই নৌকো
দূর নদীটির তীরে গাঁথা কদম মালিকা
কুসুম রেণুর অবকাশে আমাদের যত গল্প

তুমি চেন নাই মোরে আমিও বিস্মৃত চিহ্ন
জন্ম পার হয়ে আসি ফিরে যাই কোলাহলে
যদিও চরাচরে এখন অস্ত অপরাহ্ণ
দুটি হাত কবে ভেসে গেছে মারী ও প্লাবনে

চিবুকের ডৌলে প্রতীক্ষায় রয়েছে প্রহরী 
বিদ্যুৎ রেখায় মায়াকাজলের দূর দৃষ্টি
আজও প্রতীক্ষায় আকুল নয়না শর্বরী
থরথর কাঁপে বিষাদ জাতক রূপ সৃষ্টি

সন্ধ্যা যেন আকুল উঠানে কাজল বালিকা
শূন্য ঘাটে পথ চিনে ফিরে আসে নাই নৌকো
দূর নদীটির তীরে গাঁথা কদম মালিকা
কুসুম রেণুর অবকাশে আমাদের যত গল্প’

আরও কয়েকবার পড়ল ঋষা। চকিতে তার মনে ভেসে উঠল আরও কতগুলি শব্দ, অনেকদিন আগে পৃথ্বীশ তাকে শুনিয়েছিল। জিজ্ঞাসা করায় প্রথমে বলতে চায়নি কার লেখা। পরে জেদ করায় ইতস্তত কণ্ঠে সংক্ষিপ্ত বাক্যে বলেছিল, ‘আমার এক কোলিগের লেখা, তুমি চিনবে না।’
সহকর্মীর লেখা কতগুলি লাইন
মনে রাখার মতো ছেলে পৃথ্বীশ নয়- একথা খুব ভালো করেই জানে ঋষা। তবুও আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। কী লাভ! সব গোপন কথা মানুষের অন্তরমহলের বারদুয়ারে নিয়ে আসতে নেই, তাতে মায়ার মধুর খেলা ছিন্ন হয়! তবে লেখাটি মনে রয়ে গেছে। এতদিন পর আবারও চারটি লাইন পরিষ্কার মনোপটচিত্রে জলদান্তর্বর্তিনী সৌদামিনীর মতো ভেসে উঠল, অস্ফুটে শব্দগুলি উচ্চারণ করল ঋষা,

‘যখন তুমি এসেছিলে আষাঢ় মেঘের দিনে
একলা মেয়ে ফিরিতেছিল আকুল সাঁঝের পানে
নিঝুম পথে কেউ ছিল না বন্ধ দুয়ার বাতি
একাকিনী চোখ রেখেছিল বৃষ্টি কুসুম পাতি
শহর তোমার মন দেয়নি, হাত পাতেনি দ্বারে
জলের টানে আষাঢ় ফেরে চির বিরহীর ঘরে!’

 

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                   পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

হাড়ের বাঁশি (বিংশ পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More