জীবনের শেষদিন পর্যন্ত চূড়ান্ত অপমান ও ব্যক্তি-আক্রমণ সহ্য করেছিলেন শরৎচন্দ্র

বুদ্ধদেব হালদার

শুধু ভারতবর্ষ নয়, তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সব চাইতে জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত একজন লেখক। তাঁর সমসাময়িক সময়ে এমন বিপুল জনপ্রিয়তা অন্য আর কোনও সাহিত্যিকের ভাগ্যে জোটেনি। তিনি ভারতবর্ষের বিপুল বাঙালি ও অবাঙালি পাঠকের কাছ থেকে যেমন পেয়েছেন প্রচুর প্রশংসা ও সম্মান, ঠিক তেমনই অপর এক শ্রেণির লোকের কাছে পেয়েছেন তীব্র সমালোচনা ও আক্রমণ। তবে শুধু যে তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য সমালোচিত হয়েছে তা নয়। জীবিতাবস্থায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে বিকৃত করে বহু সমালোচক একাধিকবার আক্রমণ করেছেন তাঁকে। বিভিন্ন পণ্ডিত, অধ্যাপক ও সমালোচকদের সেইসব আক্রমণ শুধু যে লিখিতভাবে পত্রিকায় ছাপা হত তাই নয়। বরং প্রকাশ্য সভা করেও তাঁর সাহিত্য ও জীবনকে কুৎসিতভাবে অপমান করার একটা প্রবণতা সেই সময় নির্দিষ্ট শ্রেণির কিছু মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন- “আমার মনে পড়ে বয়স যখন আমার অল্প ছিল, এ ব্রতে যখন নতুন ব্রতী, তখন আমন্ত্রণ পেয়েও কত সাহিত্যসভায় দ্বিধায় সঙ্কোচে উপস্থিত হতে পারিনি। নিশ্চিত জানতাম, সভাপতির সুদীর্ঘ অভিভাষণের একটা অংশ আমার জন্য নির্দিষ্ট আছেই। কখনও নাম দিয়ে, কখনও নাম না দিয়ে। বক্তব্য অতি সরল। আমার লেখায় দেশ দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ হয়ে এল এবং সনাতন হিন্দু সমাজ জাহান্নামে গেল বলে।” প্রথমে আসা যাক তাঁর প্রতি বিভিন্ন মানুষের করা ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রসঙ্গে। তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে লোকেরা সামান্য খুঁত পেলেই তাঁকে নিয়ে বানিয়ে মিথ্যে গল্প প্রচার করতে সচেষ্ট হতেন। এবং সেই মিথ্যে রটনা সেই সময়ের পত্রিকাগুলিও দেদার ছাপতে পছন্দ করত। কারণ শুধু সাহিত্য নয়, শরৎবাবু সম্পর্কে যেকোনও ঘটনাই সেই সময়ের শিক্ষিত সমাজের কাছে হটকেকের মতো বিক্রি হত। পাঁচুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের একটি লেখা থেকে এরকমই এক ঘটনার কথা জানা যায়। তিনি লিখেছেন, শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের যেসকল সমালোচনা সেই সময় প্রকাশ পেত, তাতে গালাগাল আর বিষোদ্‌গারের আধিক্য থাকত বেশি। লেখকের অতীত জীবন নিয়ে কতই না আজগুবি গবেষণা করতেন সেই সকল সমালোচকেরা। একদিন শরৎ চাটুজ্যে নামে কোথাকার কোন এক লোক টাকা চুরির দায়ে ধরা পড়ল। খবরটা কাগজে ছাপা হতেই সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের নামে কুৎসিত আক্রমণ গেল আরও বেড়ে। একের পর এক চিঠি আসতে লাগল তাঁর কাছে।
১৩৩১ বঙ্গাব্দের আরেকটি ঘটনা। একদিন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ শরৎচন্দ্রকে একটি রাধাকৃষ্ণের মূর্তি দিলেন। হাওড়ার বাজে শিবপুরে ট্যাক্সি করে ফেরার সময় মূর্তিটা শরৎচন্দ্র বাড়ি নিয়ে এলেন। বাড়ির কাছে এসে প্রতিবেশী অমরেন্দ্রনাথ মজুমদারকে ডেকে নিয়ে মূর্তিটি ট্যাক্সি থেকে দুজনে মিলে নামালেন। পরের দিন সকালে রটে গেল- ‘শরৎচন্দ্র গতকাল রাতে এতটাই মদ পান করে বাড়ি ফিরেছিলেন যে তাঁকে ধরে ট্যাক্সি থেকে নামাতে হয়েছে।’এইসব মিথ্যা গুজব ও প্রচারের দ্বারা তাঁকে বিভিন্নভাবে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হত। ১৩৬০ বঙ্গাব্দের ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকায় একজন লিখেছেন- ‘একদিন তিন-চারজন যুবক শরৎচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। তাদের হাতে রয়েছে ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস। যুবকেরা গিয়ে বেশ বিরক্তির সঙ্গে বলল, এসব লিখলে আপনার এই পাড়ায় থাকা চলবে না। এখানে ভদ্রলোকের বাস। লোকে ছেলে-বউ নিয়ে ঘর করে। এরপর সেই যুবকেরা লেখকের সামনেই ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটিকে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুনে জ্বালিয়ে দেন।’ পত্রিকায় এমন খবর ছাপা হল বটে। কিন্তু এইসব ঘটনার কোনও সত্যতা ছিল না। সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিগত জীবনকে বিকৃত করে সেই সময়ের বহু পত্রপত্রিকাই নিজেদের পেট চালাত।‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসে বিধবা মেয়ে রমা তার বাল্যবন্ধু রমেশকে ভালবেসেছিল বলে শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে সনাতন হিন্দুসমাজ ক্ষেপে উঠেছিল। আবার ‘বামুনের মেয়ে’ প্রকাশিত হওয়ার পর কুলীন ব্রাহ্মণেরা শরৎচন্দ্রের প্রতি তীব্র বিষবাক্য-বর্ষণ শুরু করেছিলেন। ‘মহেশ’ গল্প পড়ে হিন্দু জমিদারেরাও তাঁর উপর ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। এর সঙ্গে শিক্ষিত মুসলমান সমাজও তাঁর প্রতি রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে শাসাতে লাগলেন। এসবের ভয়ানক ফল যে লেখককে ভুগতে হয়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় শরৎচন্দ্রের লেখা বহু চিঠিপত্রে। প্রকাশক হরিদাস চট্টোপাধ্যায়কে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন- “…জানেন বোধ হয় আমার ভাগ্নির বিয়ে এই শুক্রবারের পরের শুক্রবার। তাতে আমারই সমস্ত দায়।…এতদিন কথাটা আপনাকে বলিনি যে দেশে আমি ‘একঘরে’, আমার কাজকর্মের বাড়িতে যাওয়া ঠিক নয়। যাক সেজন্যও ভাবিনি কিন্তু টাকা দেওয়া চাই, অথচ আমি না যাই, -এই তাঁদের গোপন ইচ্ছা।” (২৯-০৬-১৯১৬)
যে ব্রাহ্ম সমাজের অধিপতি ও সম্পাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, ‘গৃহদাহ’ উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পর সেই ব্রাহ্মসমাজও শরৎচন্দ্রের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনকী তাঁর মৃত্যুর পরেও ব্রাহ্মরা ‘গৃহদাহ’ উপন্যাস লেখার জন্য শরৎচন্দ্রকে নানাভাবে আক্রমণ করতে ছাড়তেন না। এ বই নিয়ে ব্রাহ্মসমাজের এক পণ্ডিত বলেছিলেন- ‘আরে ছিঃ ছিঃ, ও আবার একটা বই! ও বই কি ভদ্রলোকে পড়ে?’ কলকাতার কোনও ব্রাহ্ম লাইব্রেরিতে শরৎচন্দ্রের কোনও বইকেই কখনও জায়গা দেওয়া হয়নি।
‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর শরৎচন্দ্রের একটি চিঠি থেকে জানা যায়- “প্রথম যখন চরিত্রহীন লিখি, তখন পাঁচ-ছ বছর ধরে গালাগালির অন্ত ছিল না। তবে মনের মধ্যে আমার এই ভরসা ছিল যে, সত্যি জিনিসটা আমি ধরেছিলুম।”
এমনকী যে বই সেই সময়ের বিপ্লবীদের কাছে ‘গীতা’-র সমতুল্য ছিল, সেই ‘পথের দাবি’রও তীব্র সমালোচনা করেছিলেন অনেকেই। এ সম্পর্কে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজে লিখেছেন-“পথের দাবি লিখিয়া সেদিন মানসী পত্রিকার মারফতে এক রায়সাহেব সাব-ডেপুটির ধমক খাইয়াছি। বই-এর মধ্যে কোথায় নাকি সোনাগাছির ইয়ারকি ছিল, অভিজ্ঞ ব্যক্তির চোখে তাহা ধরা পড়িয়া গিয়াছিল।”এত আক্রমণ ও অপমানের মধ্যে পড়েও তিনি কখনও নিজের অবস্থান ত্যাগ করেননি। এসব আক্রমণের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে তিনি চুপ করে থাকাকেই অধিক গুরুত্ব দিতেন। এমনকী তাঁর ভক্ত পাঠককুল ওইসব নোংরা সমালোচনা পড়ে রেগে গিয়ে প্রতিবাদ জানাতে চাইলে, তিনি তাদেরকেও নিশ্চুপ থাকার পরামর্শ দিতেন।
তাঁর ‘শেষপ্রশ্ন’ উপন্যাসটি নিয়ে রীতিমতো তীব্র সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল সেই সময়ের প্রত্যেকটি প্রথম শ্রেণির সাহিত্য পত্রিকায়। এমনকী দল বেঁধে শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণে নেমেছিল সেই সময়ের পণ্ডিত সমাজ। তাতেও তিনি বরাবরের মতোই মৌনব্রত পালন করেন। এ ব্যাপারে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী তথা ‘শেষপ্রশ্ন’ উপন্যাসটির প্রকাশক হরিদাস চট্টোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন- “গালিগালাজের বহর দেখে হয়ত আপনি ভয় পেয়েও থাকতে পারেন, কিন্তু এমনিই একটা পণ্ডিত সমাজ বইটাকে নির্বিচারে ভালো বলে যেমন, ওরাও নির্বিচারে মন্দ বলে। ভারতবর্ষে প্রকাশিত হয়েছিল বলে, আপনি কিছুমাত্র লজ্জিত হবেন না, এই অনুরোধ। সকল ব্যাপারেই দুপক্ষ থাকে। তারাই যে প্রবল পক্ষ, এ নাও হতে পারে। এবং কালের বিচারে তারাই যে সত্য, এ-ও না হতে পারে।”
বিখ্যাত পত্রিকা ‘শনিবারের চিঠি’-তে প্রায়শই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কার্টুন এঁকে লেখককে তীব্র আক্রমণ করা হত। অকারণে তাঁকে নিয়ে নানা কুরুচিপূর্ণ আর্টিকেল ছাপার ধুম লেগে গিয়েছিল একসময় এইসব পত্রিকায়।
এমনকী তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তাঁকে কুৎসিত আক্রমণ করতে ছাড়েননি সাহিত্যিক প্রবোধকুমার সান্যাল। কোনও সাহিত্য সমালোচনা নয়, তিনি সরাসরি শরৎচন্দ্রকে তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিলেন। এই সমস্ত লেখা ঈর্ষা প্রণোদিত হয়ে রচিত হয়েছিল তা পড়লেই বোঝা যায়। প্রবোধকুমার সান্যালের দুটি প্রবন্ধ সেই সময় ‘শ্রীহর্ষ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তখন শরৎচন্দ্র অসুস্থ ছিলেন। একর পর এক আক্রমণ ও সমালোচনা মৃত্যুশয্যায় শুয়েও তাঁর কানে ঠিক পৌঁছে গিয়েছিল। সব শুনেও তিনি নীরব ছিলেন। এই ঘটনার কিছুদিন পরই তাঁর মৃত্যু হয়।তাঁর এক ভক্ত পাঠিকাকে তিনি বলেছিলেন- “শক্ত কথা বলতে পারাটাই সংসারে শক্ত কাজ নয়। মানুষকে অপমান করায় নিজের মর্যাদাই আহত হয় সবচেয়ে বেশি। জীবনে এ যারা ভোলে তারা একটা বড়ো কথাই ভুলে থাকে। …পৃথিবীতে সব বই সকলের জন্য নয়,-সকলেরই ভালো লাগবে এবং প্রশংসা করতে হবে, এমন তো কোনও বাঁধা নিয়ম নেই। তবে, সেই কথাটা প্রকাশ করার ভঙ্গিটা ভালো হয়নি, এ আমি জানি। ভাষা অহেতুক রূঢ় এবং হিংস্র হয়ে উঠেছে। …মনের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনার যথেষ্ট কারণ থাকা সত্ত্বেও যে, ভদ্র ব্যক্তির অসংযত ভাষা ব্যবহার করা চলে না, এই কথাটি অনেক দিনে অনেক দুঃখে আয়ত্ত করতে হয়। …জানতে চেয়েছ আমি এ সকলের জবাব দিই না কেন? এর উত্তর- আমার ইচ্ছে করে না, কারণ ও আমার কাজ নয়-আত্মরক্ষার ছলেও মানুষের অসম্মান করা আমার ধাতে পোষায় না।”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More