আত্মহত্যার ইচ্ছে জেগেছিল মধ্যবয়সী রবীন্দ্রনাথের, কিন্তু কেন?

0

“দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করেছে। মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না, আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ; — অন্যদের সকলের সম্বন্ধেই নৈরাশ্য এবং অনাস্থা। … এই জীবনে আমার ideal কে realise করতে পারলুম না তখন মরতে হবে, আবার নূতন জীবন নিয়ে নূতন সাধনায় প্রবৃত্ত হতে হবে।”‘মরবার কথা’ কে ভেবেছেন? কার ‘মরবার ইচ্ছা’ জেগেছে?  হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথের! ‘রবীন্দ্রনাথ’ শুনে অনেকেই হয় স্তব্ধ, নয় নিরুত্তর থাকবেন! খানিক পরে সেই স্তব্ধতা ভেঙে হয়তো পাল্টা প্রশ্ন করবেন, আমাদের প্রাণের ঠাকুরকে নিয়ে যা-তা আষাঢ়ে গল্প ফাঁদছেন কেন, মশায়!
এমন ভাবনার আড়ালেও
যুক্তিনিষ্ঠ কারণ আছে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মিথ্যে কথা লেখার, যুক্তিহীন বানানো গল্প তৈরির এখন তো মোচ্ছব বসেছে! ভালো বিকোয় বলে হাবিজাবি বই লিখে বড়ো মানুষকে ছোটো করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এমনতরো প্রেক্ষাপটে উদ্ধৃত পত্রাংশটিও মন-গড়া কেউ ভেবে নিতে পারেন! যে যাই ভাবুন না কেন, এখানে মন-গড়া মিথ্যাচারিতা বিন্দুমাত্র নেই। সত্যিই কবির ‘মরবার ইচ্ছা’ জেগেছিল। স্বেচ্ছামৃত্যুর কথাই বোধহয় ভেবেছিলেন। ওই চিঠিটি পড়ে অন্তত তেমনই মনে হয়। মনের অস্থিরতা কাটাতে রবীন্দ্রনাথ কতখানি সক্রিয় হয়েছিলেন, সেই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ কীভাবে খুঁজেছিলেন, তাও আছে এই চিঠিতে। রবীন্দ্রনাথের সেই বিভ্রান্ত মানসিক পরিস্থিতির কথা জানার জন্য বেশিদূর হাতড়াতে হবে না। বিশ্বভারতী থেকে ‌প্রকাশিত ‘চিঠিপত্র’‌-র দ্বিতীয় খণ্ডেই আছে ছেলে রথীন্দ্রনাথকে লেখা পিতৃদেবের সেই চিঠি।
রবীন্দ্রনাথ অন্য কাউকে
না-জানিয়ে, পুত্রকে জানিয়েছিলেন নিজের অস্থিরতা-বিপন্নতার কথা। আসলে ছেলের প্রতি একটা অন্যরকম ভরসা ছিল তাঁর। কেউ বুঝুক না বুঝুক, অন্তত ‘রথী’ বুঝবেন, অনুভব করবেন, এমনই ভেবেছিলেন তিনি। ঘোর সংকটে রথীন্দ্রনাথই হয়ে উঠেছিলেন তাঁর পরম আশ্রয়।

অবন ঠাকুরের আঁকা রবীন্দ্রনাথ

          ‘মরবার ইচ্ছা’ যতই পিছু নিক, হাতছানি দিক না কেন, অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাবেন না। নিজেকে সামলে নেবেন, ঘোর সংকটেও এমনটাই ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ওই চিঠিতেই পুত্রকে তিনি জানিয়েছেন, আমার জন্যে তোরা আর ভাবিস নে। আমি কিছুদিন সুরুলের ছাতে শান্ত হয়ে বসে আবার আমার চিরন্তন স্বভাবকে ফিরে পাব সন্দেহ নেই– মৃত্যুর যে গুহার দিকে নেবে যাচ্ছিলুম তার থেকে আবার আলোকে উঠে আসব কোনো সন্দেহ নেই।”

         সহসা সমস্যা তীব্র হয়ে ওঠে নি, ধীরে ধীরে বেড়েছে, ঘনীভূত হয়েছে মনের অসুখ। রবীন্দ্রনাথ লক্ষ করেছিলেন, “কিছুকাল থেকেই আমার একটা nervous breakdown হয়েছে…।” নার্ভাস ব্রেকডাউন হঠাৎ করে হয় না, কার্যকারণ সম্পর্ক থাকে। রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন, “মনের মধ্যে একটা গভীর বেদনা ও অশান্তি অকারণে লেগেই ছিল।”

     ‌  এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিলেন। তাই কালবিলম্ব না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রায়শই নিজের ডাক্তারি তিনি নিজে করতেন। একে-তাকে, চেনাজানা জনকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দিতেন। এক্ষেত্রে নিজের ডাক্তারিতে বোধহয় আস্থা রাখতে পারেননি। আবার এমনও হতে পারে, মৃত্যুর যে গুহার দিকে নেমে যাচ্ছিলেন, সেখান থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে চাইছিলেন। তাই শরণাপন্ন হয়েছিলেন চিকিৎসকের। চিকিৎসক যেসব ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছেন, তাতে রোগের উপশম যত না হয়েছে, তার থেকে ঢের বেশি হয়েছে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া।

     মন বড়ো জটিল। বাইরে থেকে মনে হতেই পারে, আহা, কী আনন্দ! প্রাপ্তির ভাঁড়ার বুঝি পরিপূর্ণ! অথচ ভেতরে ঘেঁটে, ভেঙেচুরে সব একাকার। এই সময় প্রিয়জনকে লেখা কবির একাধিক চিঠিতেই ধরা পড়েছে  অস্থিরতা। ভালো না থাকা। তাঁর পরম আস্থাভাজন, আবার ঠাকুরবাড়ির জামাতাও বটে, সেই প্রমথ চৌধুরীকে লিখেছিলেন, ‘ঠিক কবিতা লেখবার মত মনটা তাজা হয়নি। এখন ভাবের স্রোত ভাঁটার মুখে আছে– আবার যদি স্রোত ফেরে ত দেখা যাবে।’

       এই সময়ে অ্যাণ্ড্রুজকে লেখা একাধিক পত্রে কবির মনোযন্ত্রণা, মানসিক সংকট ও অস্থিরতা ধরা পড়েছে। তিনি কতখানি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, সংকটের তীব্রতা কতদূর প্রসারিত, সে ইঙ্গিত রয়েছে রথীন্দ্রনাথকে দেখা চিঠিতেও। মৃত্যুগুহার অন্ধকারে না হারিয়ে, মরবার ইচ্ছা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শান্তিনিকেতন-বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. কানাইলাল গুপ্তের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন। সে-আলোচনা আলো দেখায়নি। উদ্বিগ্নতা-সংকট কমেনি। খুঁজে পাননি মৃত্যু-গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পথ। শেষে বিপর্যস্ত রবীন্দ্রনাথ নিজেই ‘মেটেরিয়া মেডিকা’ নিয়ে বসেছেন। নিজের উপসর্গের সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করেছেন। মিলেও গেছে। পুত্রকে লিখেছেন, “মেটেরিয়া মেডিকা যা লিখেছে এর সব লক্ষণই আমার মধ্যে দেখা দিয়েছে।”

  ‌     নিজেকে নিয়ে অবান্তর ভাবনা মনের আনাচে কানাচে শুধু ছড়িয়ে পড়ে নি, এক অসহায়তাও কাজ করছিল। গভীর নৈরাশ্যও কুরে কুরে খাচ্ছিল। সেই অস্থিরতায়, অনিশ্চয়তায়, হতাশার প্রাবল্যে কবি তাঁর প্রিয়জনদের আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন। ‘অদ্ভুত ভীরুতা’ ক্রমেই গ্ৰাস করেছে। মনের জোর তলানিতে এসে ঠেকেছে। অবসাদে তখন তিনি জর্জরিত, জীবন সম্পর্কে উদাসীনতা তীব্র হয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে ‘দুঃস্বপ্নের ঘনজাল’। সেই ঘনঘোর হতাশায় পুত্রকেই বুঝি সব বলা যায় ! কবি তাঁকে লিখেছেন, মনের মধ্যে এই রকম সুগভীর অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে বলেই আমি যাদের খুব ভালবাসি, তাদের সম্বন্ধে যত রকম মন্দ ও অকল্যাণ আমার কল্পনায় বারম্বার তোলপাড় করেছে, কোনোমতেই তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে নি।”রবীন্দ্রনাথ যে চিঠিতে প্রথম নিজের অস্থিরতার কথা, মনোযন্ত্রণা ও মানসিক সংকটের কথা রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন, সেটি ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৪তে লেখা। হিসেব কষলে দেখা যাবে, তাঁর জীবনের চরম প্রাপ্তি, পৃথিবীর সেরা সাহিত্য-সম্মান‌ ‘নোবেল’ লাভ করেছিলেন তার ঠিক ১০ মাস ১০ দিন আগে। সব আনন্দ  নিস্তেজ ও নিষ্প্রভ হতে হতে শেষে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। অবসাদের গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিলেন কবি। প্রাপ্তির আনন্দের মাঝেও চারপাশের মানুষজনকে নতুন করে চিনেছিলেন। এই স্বীকৃতি লাভের আড়ালে যাঁর সবথেকে বড়ো ভূমিকা ছিল, সেই রোদেনস্টাইনকে কবি লিখেছিলেন, “গত কয়েকদিনের টেলিগ্রাম ও পত্রের চাপে আমার শ্বাস বন্ধ হইয়া আসিতেছে। যে সব লোকের আমার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নাই, বা যাহারা আমার রচনার একটি ছত্রও পড়ে নাই, তাহারাই তাহাদের আনন্দজ্ঞাপনে সর্বাপেক্ষা অধিক মুখর।”

        এই বানানো উচ্ছ্বাস, সীমাহীন ভণ্ডামি কবির মর্মযন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠেছিল। হৃদয়ের উত্তাপহীন  উচ্ছ্বাস বেদনাদীর্ণ করেছিল। শান্তিনিকেতনে আম্রকুঞ্জের সংবর্ধনা-সভাতে খানিক চাঁচাছোলা ভাষাতে বক্তব্য রেখেছিলেন। জানিয়েছিলেন কী মনে হয়েছে তাঁর, সম্মানের এক সুরাপাত্র সামনে ধরা হয়েছে, তা তিনি ওষ্ঠের কাছ পর্যন্ত ঠেকাবেন, মদিরা কিছুতেই অন্তরে গ্রহণ করবেন না। স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, “এর মত্ততা থেকে আমার চিত্তকে আমি দূরে রাখতে চাই।” কবির এই আন্তর্জাতিক সম্মানে ঈর্ষান্বিত হয়ে কেউ কেউ ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমেছিলেন। তাদের ঈর্ষাকাতরতা, কুৎসিত আক্রমণ রবীন্দ্রনাথকে এতই পীড়িত করেছিল যে, তিনি এমনও ভেবেছিলেন, ঢের হয়েছে, আর লিখবেন না, সাহিত্যচর্চা থেকে সরে দাঁড়াবেন! সে কথা তিনি প্রমথ চৌধুরীকে জানিয়েওছিলেন। ঘরে বাইরে তখন বিবিধ সমস্যা। বাইরে ঈর্ষাকাতরতা, ঘরে কলহ-বিবাদ। কন্যা মীরা ও নগেন্দ্রনাথের দাম্পত্য-সমস্যা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল, মেটানোর ভার নিরুপায় হয়েই অ্যাণ্ডুজকে দিতে হয়েছিল।

    রবীন্দ্রনাথের বয়েস তখন তিপান্ন। অবসাদ আরও তীব্র হলে, তাঁর ‘মনের মধ্যে’ যে ‘সুগভীর অন্ধকার’ ঘনিয়ে এসেছিল, সেই অন্ধকার আ-র-ও ছড়িয়ে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠলে কী হত, ভেবে আমরা শিহরিত হই! কবিই পারেন, হতাশা ধুয়েমুছে সাফ করে উত্তরণের পথে হেঁটে যেতে। রবীন্দ্রনাথও পেরেছিলেন। তিনি আরও ২৭ বছর সৃষ্টিমুখর ছিলেন। ফলিয়েছেন সোনার ফসল। আমাদের জীবন সেই সোনার ফসলে ভরে উঠেছে। আমাদের প্রাপ্তির ভাঁড়ার তখন কানায় কানায় পরিপূর্ণ। তারপরই এসেছে সেই চিরকান্নার বাইশে শ্রাবণ।শোকধ্বস্ত অবনীন্দ্রনাথ সেদিন একটুকরো কাগজে একটি ছবি এঁকেছিলেন। জনসমুদ্রের মাথায় প্রায় ভাসতে ভাসতে রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রা। নীচে লিখে দিয়েছিলেন, তাঁর ‘রবিকা’র গান থেকে দুটি ছত্র- ‘সমুখে শান্তি পারাবার / ভাসাও তরণী হে কর্ণধার ।’

 

           

 

লেখক পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও গবেষক, শতাধিক গদ্য ও আলোচনার বইয়ের লেখক।

                         

 

           

 

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.