চামুর্চি ও ‘মংপং’, মায়াবী ডুয়ার্সের অপরিচিত দুই রূপসী কন্যা

The Most Untapped Destinations in Dooars.

0

Dooars

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: শীতের ছুটি শেষ। নতুন বছর শুরু। উত্তরবঙ্গ ও সিকিমে ঘুরতে যাওয়া বাঙালি পর্যটকের দল ফিরে আসছেন ঘরে। এবার তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়বেন সংসার ও কর্মজীবনে। উত্তরবঙ্গের পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে যাবে নভেম্বর ডিসেম্বরের ভিড়। কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার এটাই কিন্তু আদর্শ সময়। আর প্রাণের আরাম ও নিবিড় প্রশান্তি ডুয়ার্স ছাড়া মিলবে কোথায়!

জানি আপনি ডুয়ার্সের প্রায় সব পরিচিত টুরিস্ট স্পট ইতিমধ্যেই ঘুরে ফেলেছেন। দেখেছেন তুষারমৌলি হিমালয়ের পাদদেশে শুয়ে থাকা ডুয়ার্সের ঘন অরণ্যের শ্যামলীমা। শুনেছেন ক্ষরস্রোতা নদী ও চপলমতি ঝরনার সিম্ফনি। ভোরে আপনার ঘুম ভাঙিয়েছে পাখিদের কলকাকলি। রাতের অন্ধকারে আপনাকে চমকে দিয়েছে, দূরের জঙ্গল থেকে ভেসে আসা হায়নার রক্তজল করা ডাক।

মায়াবী ডুয়ার্স

তবুও বলব আর একবার ডুয়ার্স চলুন। দেখে আসুন ডুয়ার্সের প্রায় অপরিচিত দুই কন্যা মংপং ও চামুর্চিকে। যারা কুয়াশা ও মিঠে রোদ্দুরের চাদর গায়ে বসে আছে আপনার অপেক্ষায়।  ডুয়ার্সের এই দুই কন্যা আজও বুঝে উঠতে পারেনি, পর্যটকদের কাছে তারা কেন ব্রাত্য। তারা কী সত্যিই সুন্দরী নয়!

আসলে ডুয়ার্সের এই দুই দুহিতা জানে না, তাদের সৌন্দর্য সবার জন্য নয়। তবে এটা ঠিক মংপং ও চামুর্চির চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য নেই। তাদের কাছে পাবেন না অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের মতো সুযোগ সুবিধা। তবে এটা নিশ্চিত, ডুয়ার্সের এই দুই রূপসী কন্যা আপনাকে দেবে শান্তি। এক নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি। যা জনবহুল পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে আপনি পাবেন না। তাহলে চলুন মনের পাখা মেলে দেখে আসি ডুয়ার্সের এই দুই মুখচোরা কন্যাকে!

রূপবতী চামুর্চি

ডুয়ার্সের এক গুরুত্বপূর্ণ শহর বানারহাট। জলপাইগুড়ি জেলার ধুপগুড়ি ব্লকে অবস্থিত বানারহাটের কাছাকাছি আছে প্রায় ২৩ টি চা বাগান। শহরের গা ঘেঁষে বইছে হাতিনালা। বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ১৭ নং জাতীয় সড়ক। এখান থেকে মাত্র সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে আছে একেবারে আনকোরা ট্যুরিস্ট স্পট ‘চামুর্চি’। জলপাইগুড়ি ও নিউ মাল জংশন থেকে চামুর্চির দূরত্ব যথাক্রমে ৬০ ও ৪২ কিলোমিটার। নয়নাভিরাম হ্যামলেট চামুর্চিতে এখনও সেভাবে পড়েনি পর্যটকদের পদচিহ্ন। তাই রূপসী চামুর্চির সৌন্দর্য আজও অনাঘ্রাত।

Dooars
চামুর্চি

প্রথম দর্শনেই আপনাকে মুগ্ধ করবে চামুর্চি (Chamurchi)। সবুজ কার্পেটের মতো চায়ের বাগান। রেতি, সুকৃতি ও ডায়না নদীর মায়াবী উপত্যকা। নীলাভ সবুজ ভুটান পাহাড়ের ঢেউ। মেঘমুক্ত দিনে নীল আকাশে মাথা তোলা অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘা। চোখ ফেরাতে দেবে না এক মুহূর্তের জন্যেও। যেদিকে দু’চোখ যায়, সেদিকে চলে যান নিশ্চিন্তে। প্রথমে পায়ে হেঁটে দেখে নিন চামুর্চি ইকো-পার্ক। ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা রেতি ও সুকৃতি নদীর মাঝের চরে, দু’কোটি টাকা খরচ করে ধূপগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতি তৈরি করেছে এই ইকো-পার্ক। পর্যটকদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে সেখানে।

চামুর্চি ইকো পার্ক

চামুর্চি থেকে তিন কিলোমিটার ট্রেক করে পৌঁছে যেতে পারেন এক রহস্যময় গুহায়। সঙ্গে অবশ্যই নেবেন স্থানীয় লোক বা গাইড। ডায়না নদীর তীর ছোঁয়া ঘন অরণ্য পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে আপনাকে। পাশেই গারুচিরা,কালাপানি ও রোহিতি অরণ্য। ভাগ্য ভালো থাকলে চোখে পড়তে পারে নদীতে জল খেতে আসা হরিণের পাল, হাতি, গাউর এমনকি চিতাবাঘও। সেগুন, বয়রা, অর্জুন, শাল, গামারে ঘেরা যাত্রা পথকে মিষ্টি সুরে ভরিয়ে রাখবে চেনা অচেনা পাখিদের দল।

আরও পড়ুন: কার্শিয়াংয়ের ‘ডাওহিল’, ঘন অরণ্য লুকিয়ে রেখেছে অজস্র গা ছমছমে কাহিনি

ঘণ্টা দেড়েক হাঁটার পর আপনি পৌঁছে যাবেন সেই প্রাগৈতিহাসিক গুহাটির সামনে। নাম মিউজিকাল কেভ। মাটি থেকে একটি ছোট পাথর কুড়িয়ে ছুড়ে দিন গুহার ভেতরে। কানে ভেসে আসবে অদ্ভুত সুরেলা এক ধ্বনি। যেন কেউ এইমাত্র পিয়ানোর কোনও রিডে চাপ দিয়েছে। ছুঁড়ুন আরও একটি পাথর। এবার গুহা আপনাকে শোনাবে তারসপ্তকের অন্য কোনও সুর।

এভাবেই গুহাটি আবহমান কাল ধরে তার অতিথিকে শুনিয়ে চলেছে প্রকৃতির রাগ রাগিনী। স্থানীয় মানুষেরা বিশ্বাস করেন, গুহাটিতে বিরাজ করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্বোচ্চ দেবতা, দেবাদিদেব মহাদেব। তাই প্রতি বছর শিবরাত্রির সময় গুহার সামনে নামে মানুষের ঢল।

চামুর্চি থেকেই ঘুরে আসতে পারেন অদূরে থাকা ভুটানের গ্রাম সামচি। ভুটান থেকে ভারতে প্রবেশের মোট আঠারোটি প্রবেশদ্বার আছে। তাদের মধ্যে একটি আছে সামচিতে। সামচি থেকে দেখতে পাবেন ডায়না নদীর অপরূপ বিস্তার ও তুষারমৌলি হিমালয়ের অংশবিশেষ। আছে এক দৃষ্টিনন্দন মনাস্ট্রি। ভুটানে না গিয়েও ভুটান ঘোরার আনন্দ পাবেন, হলফ করে বলতে পারি।

ভুটানের সামচি গ্রামের প্রবেশদ্বার

চামুর্চিতে থাকার জন্য আছে মুক্তি বন বাংলো, চামুর্চি ইকো রিসোর্ট ছাড়াও আরও অনেক হোটেল। অনলাইনে বুক করা যায় সব হোটেলই। ভাড়ার তুলনায় পরিষেবা যথেষ্ট ভাল। তাই, জীবনের দু’য়েকটা দিন শান্তিতে কাটাতে চাইলে, আপনার সেরা ঠিকানা হতে পারে ডুয়ার্স দুহিতা চামুর্চি।

মোহময়ী মংপং

শিলিগুড়ি থেকে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে এগিয়ে চলুন। মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি বুক চিরে এগিয়ে চলবে আপনার গাড়ি। ঘন্টা খানেক পর, আপনার গাড়ির দিকে এগিয়ে আসবে ডুয়ার্সের প্রবেশদ্বার মংপং(Mongpong)। চেকপোস্ট, অল্প কিছু বাড়ি ও দোকান নিয়ে মোহময়ী তিস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে শান্ত ও নির্জন হ্যামলেট মংপং। পর্যটকদের ওপর তার ভীষণ অভিমান। পর্যটকেরা মংপংয়ে থামেন, গাড়ি থেকে নামেন, তারপর চা-নাস্তা খেয়ে এগিয়ে যান ডুয়ার্স বা সিকিমের দিকে। কেউ বড় একটা থাকেন না। থাকলে তাঁদের কাছ থেকে একটু সমতলের গল্প শুনতো মংপং।

মংপং

মংপংয়ের প্রাণভোমরা হলো ‘তিস্তা’। সিকিম হিমালয়ের চিতামু হ্রদ (৭,২০০ মিটার) থেকে জন্ম নেওয়া তিস্তা, প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসে পৌঁছেছে মংপংয়ে। সারাটা পথ তিস্তাকে বেঁধে রেখেছিলো উতুঙ্গ পর্বতশ্রেণীর শিকল। মংপংয়ে এসে, বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিস্তা তাই হয়ে উঠেছে উচ্ছ্বল বালিকা। এখানে তার স্ফূর্তি দেখে কে!

ঘুমকুয়াশা জড়ানো মংপংকে ঘিরে রেখেছে সুপ্রাচীন অরণ্য। যার মধ্যে চেনা অচেনা হাজার হাজার পাখিদের বাস। এছাড়াও শীতে মধ্য এশিয়া ও লাদাখ থেকে, মংপংয়ে উড়ে আসে পরিযায়ী পাখিদের দল। তাদের হুটোপাটি দেখেই সময় কেটে যায় মংপংয়ের। বার্ড ওয়াচারদেরও স্বর্গরাজ্য এই মংপং।

মংপং থেকে তিস্তা

কুয়াশার হালকা আবরণ সরিয়ে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ান মংপংয়ের ঝরনা, গা ছমছমে অরণ্য ও পাহাড়ে। গাছেদের ফাঁকফোকর দিয়ে আপনার সঙ্গে লুকোচুরি খেলবে পান্না সবুজ তিস্তা। কেউ বিরক্ত করবে না আপনাকে। জীবনে প্রথমবার অনুভব করবেন নিস্তব্ধতারও এক ভাষা আছে। যা কানে শোনা যায় না। হৃদয় দিয়ে শুনে নিতে হয়।

মংপংয়ের কোনও কিশোর বা কিশোরীকে অনুরোধ করুন, সে আপনাকে নিয়ে যাবে পাহাড়ের ঢালে লুকিয়ে থাকা এক অজানা ভিউ পয়েন্টে। মেঘমুক্ত দিনে এখান থেকে আপনাকে স্বাগত জানাবে হিমালয়সুন্দরী কাঞ্চনজঙ্ঘা।

এই পথ দিয়ে এগিয়ে চলুন পাহাড়ের দিকে

যদি আপনি মৎস্যপ্রেমী হন ও মাছ ধরার নেশা থাকে। তাহলে মংপং হলো আপনার জন্য আদর্শ জায়গা। হোটেল বা চায়ের দোকানের কোনও কর্মীকে বলুন। যোগাড় হয়ে যাবে ছিপ ও কেঁচো। বিকেলের দিকে ঘণ্টা খানেক ছিপ নিয়ে বসে যান তিস্তার পাশে। মাছ মিলতেও পারে কিংবা নাও মিলতে পারে। তবে আনন্দ মিলবে ভরপুর। কারণ সুর্যাস্তের সময়, রূপসী তিস্তা ও উপত্যকার এরকম মায়াবী রূপ আগে কখনও দেখেননি।

মৎস্য ধরিব খাইব সুখে

মংপং থেকে দেখে নিতে পারেন বিখ্যাত করোনেশন ব্রিজ, সেবক কালি মন্দির ও কালিঝোরা বাংলো। দেখে আসতে পারেন সামান্য দূরে থাকা লিস ও ঘিস নদীকেও। আপাত শান্ত লিস নদী রুদ্ররূপ ধরে বর্ষাকালে। যাঁরা ট্রেক করেন, লিস নদীর তীর ধরে এক ঘন্টা হেঁটে তাঁরা দেখে আসতে পারেন গা ছমছমে পরিবেশে থাকা এক পরিত্যক্ত কয়লাখনি।

অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটকেরা মংপং থেকেই করে নিতে পারেন মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ সাফারি। মংপংয়ে এক রাত কাটিয়ে পরদিন চলে যেতে পারেন ৩২ কিলোমিটার দূরে থাকা তিস্তাবাজারে। তারখোলা নদীতে করে আসতে পারেন হোয়াইট ওয়াটার র‍্যাফটিং।

থাকার জন্য মংপংয়ে আছে কয়েকটি হোম-স্টে। পুলিশ চৌকির বিপরীতে আছে ওয়েস্ট-বেঙ্গল ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের রেস্ট-হাউস। বন-বাংলো বললেই দেখিয়ে দেবে যে কেউ। মংপংয়ে থাকার সেরা ঠিকানা। বন-বাংলোর মধ্যেই আছে নেচার রিক্রিয়েশন সেন্টার। যদি উৎসাহী হন, হিমালয় ও ডুয়ার্সের পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও গাছপালা সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন বিশদে।

মংপংয়ের ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের রেস্ট-হাউস

মংপংয়ের চাঁদনি রাত কিন্তু নেশা ধরানো। অরণ্য থেকে ভেসে আসবে রাতচরা পাখি ও ঝিঁঝিঁপোকাদের মায়াবী মুর্ছনা। তিস্তার ওপার থেকে ভেসে আসতে পারে বার্কিং ডিয়ারের ‘ব্বাক’ ‘ব্বাক’ ডাক। গেস্টহাউসের কাচের জানলা দিয়ে নজর ভাসালে চোখে পড়বে, প্রবল হাওয়ার দাপটে নুয়ে যাওয়া গাছেদের নিবিড় আলিঙ্গন। তাই বলি, একদিন কাটিয়ে আসুন না মংপংয়ে। ভীষণ, ভীষণ খুশি হবে মংপং।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.