মৃত্যুর পর বৃক্ষ হয়ে বেঁচে থাকবেন প্রিয়জনেরা, স্বপ্নে নয় বাস্তবের অরণ্যে

আগামী পৃথিবীতে নতুন এক রূপ নিতে চলেছে সমাধিক্ষেত্র। দুই বন্ধুর হাত ধরে।

The organic burial pod

 রূপাঞ্জন গোস্বামী

ইতালির অ্যানা সিতেল্লি গ্রাফিক ডিজাইনিং নিয়ে পড়াশোনা করার পর যোগ দিয়েছিলেন একটি আর্ট এজেন্সিতে। বিজ্ঞাপন ও গল্পের বইয়ের জন্য ছবি আঁকতেন। সিনেমার সেট ও হরেকরকম পুতুলের ডিজাইন করতেন। আর্ট এজেন্সিতে কাজ করার সময় অ্যানার পরিচয় হয়েছিল বয়েসে কয়েক বছরের ছোট রাউল ব্রেটজেলের সঙ্গে। তিনিও ছিলেন ডিজাইনার। তবে রাউল মূলত কাজ করতেন গাড়ি ও আসবাবপত্র কোম্পানির হয়ে।

The organic burial pod
অ্যানা সিতেল্লি

আলাপ পরিণত হয়েছিল বন্ধুত্বে

কাজের অবসরে তাঁরা ঘুরে বেড়াতেন দেশ বিদেশের অরণ্য পাহাড় ও মরুভূমিতে। দিগন্ত বিস্তৃত ধু ধু মরুভুমি দেখে পর্যটকেরা আনন্দ পেলেও, কষ্ট পেতেন অ্যানা ও রাউল। তাঁরা ভাবতেন এখানেই হয়ত একদিন ছিল সবুজ অরণ্য। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অরণ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত সবার। কিন্তু দুই বন্ধুর মন কেঁদে উঠত নির্দয় বৃক্ষচ্ছেদন দেখে।

সবুজ পৃথিবীর ক্রমশ বিবর্ণ হয়ে যাওয়াকে রুখতে বিভিন্ন পরিবেশ প্রেমী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন দু’জন। মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে তৈরি করেছিলেন নিজেদের কোম্পানি। নিজেরাই বিভিন্ন জিনিসপত্রের ডিজাইন করবেন। নিজেরাই সেগুলি বানিয়ে বিক্রি করবেন। কারণ তাঁরা দেখেছিলেন বিভিন্ন কোম্পানি ব্যাপক হারে উৎপাদন ও মুনাফা করতে গিয়ে পরিবেশের দিকে নজর রাখে না। তাই তাঁরা পরিবেশ বান্ধব শিল্প সামগ্রীগুলি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

রাউল ব্রেটজেল

বিষণ্ণতায় ঘেরা সমাধিক্ষেত্র, আতঙ্কের উপত্যকাও

সময়টা ছিল আশির দশক। দু’জনে একদিন অফিস থেকে গিয়েছিলেন একটি সমাধিক্ষেত্রে। তখন সেখানে সদ্যপ্রয়াত এক ব্যক্তিকে সমাধি দেওয়ার কাজ চলছিল। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মৃতের আত্মীয়স্বজন। কারণ একটু পরেই মাটির বুকে চিরতরে হারিয়ে যাবেন প্রিয়জন। তাই কফিনের ঢাকনা বন্ধ হওয়ার আগে শেষদেখাটুকু দেখে নেওয়ার জন্য পাগলের মত ঠেলাঠেলি করছিলেন তাঁরা। মৃত ব্যক্তির কন্যা কফিনের ঢাকনা বন্ধ করতে দিচ্ছিলেন না। হাত ঢুকিয়ে রেখেছিলেন কফিনের ভেতর। যাতে ঢাকনা বন্ধ না করা যায়। দৃশ্যটি দেখে ভীষণ মনখারাপ হয়ে গেছিল রাউল ও অ্যানার। সরে গিয়েছিলেন সেখান থেকে।

সমাধিক্ষেত্রটির ভাঙা পথে হাঁটছিলেন দু’জনে। আগাছায় ঘেরা সমাধিক্ষেত্রের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল কংক্রিট ও পাথরের স্মৃতিসৌধগুলির টুকরো। অনাদরে পড়েছিল শুকনো ফুল, বৃষ্টিতে ভিজে অক্ষর হারিয়ে ফেলা বার্থ-ডে কার্ড, কোনও মৃত শিশুর বিবর্ণ হয়ে যাওয়া প্রিয় পুতুল। অস্তিত্বহীন সমাধি বেদীর নীচে হাঁ করে থাকা কংক্রিটের চৌব্বাচ্চায় পড়েছিল কালো হয়ে যাওয়া হাড়ের টুকরো। স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছিল অপুষ্টিতে ভোগা কিছু চারাগাছ। শ্যাওলা ধরা বড় গাছগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়ে বীভৎস রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

প্রতীকী চিত্র

অ্যানা এবং রাউল দু’জনেই সেদিন অনুভব করেছিলেন, এই পরিবেশে প্রিয়জনকে চিরকালের জন্য রেখে যেতে কতটা কষ্ট পান স্বজনহারা মানুষগুলি। সত্যিই সমাধিক্ষেত্র এক অদ্ভুত এক জায়গা। দিনের বেলা যেখানকার বাতাস ভিজে থাকে স্বজনহারা মানুষদের চোখের জলে। রাতের আঁধারে সেই বাতাসই হয়ে ওঠে প্রেতাত্মার দীর্ঘ নিঃশ্বাস। দু’জনের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল, এই পরিবেশ কি কোনও দিনই বদলাবে না!

সেই রাতেই ভাবনাটা এসেছিল রাউলের মাথায়। ফোন করে বলেছিলেন অ্যানাকে। ফোনের ওপারে উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠেছিলেন অ্যানা,”অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, বদলে যাবে পৃথিবী।” অন্যদের হাতে অফিসের দায়িত্ব দিয়ে, পরের দিন থেকেই দু’জনে নেমে পড়েছিলেন গবেষণার কাজে। যোগাযোগ করেছিলেন নামকরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। পরিকল্পনা শুনে বিজ্ঞানীরাও চমকে উঠেছিলেন। সাহায্য করার প্রতিশ্রতি দিয়ে বলেছিলেন, নতুন দিগন্তের সূচনা করতে গেলে পার হতে হবে অনেক বাধার পাহাড়। এরপর কেটে গিয়েছিল এক দশক। প্রত্যেক দিন এক পা এক পা করে দুই বন্ধু এগিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের লক্ষ্যের দিকে।

ওয়ার্কশপে অ্যানা ও রাউল

ক্যাপসুলা মুণ্ডি

প্রত্যেক বছরের মত ২০০৩ সালেও ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক আসবাবপত্র প্রদর্শনী  ‘সালোন ডেল মোবাইল’। বিভিন্ন দেশের কয়েকশো কোম্পানি নিয়ে এসেছিল তাদের তৈরি আধুনিক আসবাবপত্র ও কফিন। প্রদর্শনীতে যোগ দিয়েছিলেন অ্যানা ও রাউলও। ছোট্ট একটি স্টলে রেখেছিলেন, সাদা ও বালিরঙা কয়েকটি ডিম্বাকৃতি পাত্র। সেগুলিকে দেখে ক্রেতারা ভেবেছিলেন ফুলদানি। এক উৎসুক ক্রেতা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এতে ফুল রাখা যাবে?” অ্যানা উত্তর দিয়েছিলেন, “না রাখা যাবে না। এই পাত্রটি একদিন ফুল উপহার দেবে। তবে মালিকের মৃত্যুর পর।” আঁতকে উঠে পিছিয়ে গিয়েছিলেন প্রশ্নকর্তা। মুখে মুখে খবর ছড়িয়েছিল। প্রদর্শনীর প্রায় সবকটি স্টল খালি করে, অ্যানাদের স্টলটিকে ঘিরে ধরেছিল কৌতুহলী জনতা।

ক্যাপসুলা মুন্ডি

উপস্থিত জনতাকে অ্যানা ও রাউল জানিয়েছিলেন তাঁদের অবিশ্বাস্য পরিকল্পনাটির কথা। যা পাল্টে দেবে সমাধিক্ষেত্রের পরিবেশ। মানুষের ‘অন্তিম সংস্কার’ হয়ে উঠবে কবিতার মতই মায়াবী। তাঁরা জনতাকে বলেছিলেন, ডিম্বাকৃতি পাত্রগুলির নাম ‘ক্যাপসুলা মুণ্ডি‘। ‘ক্যাপসুলা’-র অর্থ হল বীজ এবং ‘মুণ্ডি’ হল পৃথিবী। অর্থাৎ পৃথিবীর বীজ। ডিম্বাকৃতি ক্যাপসুলা মুন্ডি আসলে একটি জৈব কফিন। যেটি তৈরি করা হয়েছে বায়োপ্লাস্টিক দিয়ে। বিভিন্ন গাছপালা থেকে নেওয়া স্টার্চ থেকে তৈরি করা হয়েছে এই বায়োপ্লাস্টিক।

মৃত্যু নয় পুনর্জন্ম

সেদিন দু’ধরনের ‘ক্যাপসুলা মুণ্ডি’ জনতাকে দেখিয়েছিলেন অ্যানা ও রাউল। ছোট আকারের পাত্রগুলির মধ্যে রাখা হবে মৃত মানুষের চিতাভস্ম ও বড় আকারের পাত্রগুলির মধ্যে রাখা হবে শবদেহ। একটি মৃতদেহ দাহ করে গড়পড়তা আড়াই কেজি ছাই পাওয়া যায়। ছাইয়ের মধ্যে মিশে থাকে কার্বনেট ও না পোড়া হাড়ের গুঁড়ো। যাতে মিশে থাকে বিভিন্ন প্রকার লবণ, চুন, সোডিয়াম, সালফার, জিঙ্ক, তামা, ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম আরও কত কী।

আরও পড়ুন: কোথায় আছে শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসন! ইস্তানবুল, ভারত মহাসাগর, নাকি ‘হেলা হেলা’ উপত্যকায়!  

ক্যাপসুলা মুণ্ডির ওপরে থাকা একটি ছিদ্র দিয়ে চিতাভস্ম ঢেলে দেওয়া হবে ভেতরে। তারপর ক্যাপসুলা মুণ্ডিটিকে মাটিতে পুঁতে তার ঠিক ওপরে বসিয়ে দেওয়া হবে একটি বীজ বা চারাগাছ। কোন গাছের বীজ বা চারা, তা ঠিক করবেন মৃতের পরিবার। ক্যাপসুলা মুণ্ডির ওপরে থাকা বীজ বা চারাগাছটি চিতাভষ্ম থেকে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠবে।

বড় আকারের ক্যাপসুলা মুণ্ডির মধ্যে হাত পা গুটিয়ে সযত্নে বসিয়ে দেওয়া হবে মৃত মানুষটিকে। ঠিক যেভাবে তিনি ভ্রূণ হয়ে বসে থাকতেন মায়ের পেটে। এরপর মাটিতে পুঁতে দেওয়া হবে ক্যাপসুলা মুণ্ডি। ওপরে বসিয়ে দেওয়া হবে বীজ বা চারাগাছ। মৃত সন্তানের পুনর্জন্মের অপেক্ষায় থাকবেন ধরিত্রী মা। মাটিতে থাকা অণুজীবেরা পচিয়ে দেবে ক্যাপসুলা মুণ্ডির আবরণ। মাটির বুকেই গলে যেতে থাকবেন মাটির সন্তান। তাঁর দেহরস থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণ করবে ক্যাপসুলা মুণ্ডির ওপরে বসানো বীজ বা চারাগাছ। একদিন সত্যি সত্যিই গাছ হয়ে যাবেন মানুষটি। পুরোটা শোনার পর বেশিরভাগ মানুষই সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।

মাটির ভেতর এভাবেই গাছ হওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন মৃত মানুষটি

কাঠের কফিন নয় কেন!

অ্যানা ও রাউল বলেছিলেন, কাঠের কফিনের প্রয়োজন কেবলমাত্র তিনদিনের জন্য। অথচ সেই কফিন তৈরির প্রয়োজনে সারা পৃথিবী জুড়ে কাটা হয় তিরিশ চল্লিশ বছরের পুরোনো গাছ। ভবলে অবাক লাগে, মৃত মানুষদের সঙ্গেই মরতে হয় লক্ষ লক্ষ পূর্ণবয়স্ক গাছকে। যা ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে প্রকৃতির ওপর। এছাড়াও কফিন তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিক, পলিথিন, বিভিন্ন ধাতু ও বিষাক্ত রঙ। যেগুলি পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করে। এছাড়া সমাধিক্ষেত্রের চিরাচরিত রীতি মেনে সমাধির ওপর গড়ে তোলা হয় পাথর বা কংক্রিট দিয়ে তৈরি স্মৃতিসৌধ। যা মাটিতে বৃষ্টির জল প্রবেশে বাধা দেয়। কিন্তু ক্যাপসুলা মুণ্ডির ফলে সমাধিক্ষেত্র হবে শোকমুক্ত, আতঙ্কমুক্ত ও পরিবেশ বান্ধব। হাজার হাজার ক্যাপসুলা মুণ্ডি একদিন গড়ে তুলবে ঘন সবুজ অরণ্য। ফুলে ফুলে ভরে থাকা অরণ্যটিকে মাতিয়ে রাখবে প্রজাপতি, মৌমাছি ও পাখিদের দল। সুগন্ধী বাতাস ঘিরে থাকবে গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয়জনদের।

ক্যাপসুলা মুন্ডি দেবে এক স্বপ্নীল সমাধিক্ষেত্র

অ্যানা ও রাউলের স্বপ্ন আজ সফল। আমেরিকা ও ইউরোপের মানুষ কিনতে শুরু করেছেন ক্যাপসুলা মুণ্ডি। পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ই-কমার্স সাইটেও। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দিক থেকে এসেছিল বিরোধিতা। তবে পাশে ছিল সে সব দেশের সরকার ও আইন। তবে অ্যানা ও রাউলের দুঃখ একটাই। তাঁদের দেশ ইতালিই এখনও ক্যাপসুলা মুণ্ডিকে ছাড়পত্র দেয়নি।

তবুও স্বপ্ন দেখেন সাতান্ন বছরের অ্যানা

আজ থেকে বেশ কিছু বছর পর, হয়ত তাঁর ছেলেমেয়েদের গাড়ি এসে থামবে এক ঘন সবুজ অরণ্যের কিনারায়। যেখানে ‘ম্যাপল’ গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন অ্যানা। কিছু দূরে হয়ত ‘টিউলিপ’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন বন্ধু রাউল। সবুজ ঘাসের গালচেতে হুটোপাটি করবে তাঁদের নাতিপুতিরা। ছেলেমেয়েরা এসে বসবে গাছের নীচে। পরম ভালোবাসায় হাত বুলিয়ে দেবে অ্যানা ও রাউলের গায়ে। আজকের মত তখনও তাদের ছায়া দেবেন অ্যানা ও রাউল। আদর করতে পারবেন না। তাই ছেলেমেয়েদের গায়ের ওপর ঝরিয়ে দেবেন গোলাপি পাতা বা সুগন্ধী ফুল। সারাদিন কাটিয়ে ফিরে যাবে ছেলেমেয়েরা। শেষ বিকেলের মায়াবী আলোয় ঝাঁকড়া শাখা দুলিয়ে রোজকার মতো গল্পে মেতে উঠবেন অ্যানা ও রাউল। হয়ত গল্পে যোগ দেবেন যুগ যুগ ধরে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা কোনও আন্দ্রেয়া মেহগিনি, অ্যাঞ্জেলো সিলভার ওক বা স্তেফানো উইলো।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More