আলাস্কায় হয় এস্কিমোদের অলিম্পিক, ইভেন্টগুলি তাদের জীবনযুদ্ধ থেকে নেওয়া

আলাস্কার ফেয়ারব্যাঙ্কস শহরে হয় এই অলিম্পিক।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আমেরিকার বৃহত্তম রাজ্য আলাস্কা। আলেউট ভাষার ‘alaxsxaq‘ শব্দটি থেকে এসেছে আলাস্কা নামটি। যার অর্থ ‘মূল ভূখণ্ড’। আয়তনে আলাস্কা প্রায় ৬,৬৩,২৬৮ বর্গ মাইল। উত্তরমেরু সংলগ্ন আলাস্কা আগে রাশিয়ার দখলে ছিল। ১৮৬৭ সালের ৩০ শে মার্চ, মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে আলাস্কা বিক্রি করে দিয়েছিল রাশিয়া। কিনে নিয়েছিল আমেরিকা।

অদ্ভুত এক জায়গা এই আলাস্কা। যেখানে আছে প্রায় এক লাখ হিমবাহ। শীতকালে উত্তর আলাস্কায় টানা ৬৭ দিন সূর্যের দেখা মেলে না। আবার গ্রীষ্মকালে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত টানা ৮০ দিন সূর্য অস্ত যায় না। গড় তাপমাত্রা +৪ ডিগ্রি থেকে – ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। তবে শীতে নেমে আসে – ৪০ ডিগ্রি এবং গ্রীষ্মে পৌঁছয় +১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আলাস্কার তৃণভূমি, অরণ্য, পাহাড়ে বাস করে প্রায় এক হাজার প্রজাতির পশুপাখি ও সতেরোশো প্রজাতির উদ্ভিদ। সংলগ্ন সমুদ্রে পাওয়া যায় প্রায় তিন হাজার প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী।

নয়নাভিরাম আলাস্কা

আলাস্কার দুর্গম তুষারমরু ও পাহাড়ি উপত্যকাগুলিতে বাস করে প্রায় দুশোর বেশি উপজাতি। আলাস্কার আদি বাসিন্দা তারাই। ভাষার মিল অনুযায়ী পাঁচটি বিভাগে ভাগ করা হয় তাদের। আলেউট, নর্দান এস্কিমো (ইনুপিয়াট), সাউদার্ন এস্কিমো (ইউইট), ইন্টিরিয়র ইন্ডিয়ানস(আথাবাসকান) ও সাউথ-ইস্ট কোস্ট ইন্ডিয়ানস(টিলিঙ্গেট ও হাইডা)।

আলাস্কার উপজাতিদের কাছে জীবন মানেই সংগ্রাম। প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিমুহূর্তে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। তবুও তাদের জীবন ভরে থাকে আনন্দে। শিকার ও পশুপালনের অবসরে তারা মেতে ওঠে নাচ গান খেলাধূলায়। বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে তারা বিশেষ কিছু জানে না বা জানতেও চায় না। নিজেদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে বাঁচছে যুগের পর যুগ।

এস্কিমো

১৯৬০ সাল

এয়ার আলাস্কার পাইলট ছিলেন বিল ইংলিশ ও টম রিচার্ড। উত্তর আলাস্কার শহর ফেয়ারব্যাঙ্কসের বিমানবন্দর থেকে ‘ডগলাস ডিসি-থ্রি’ বিমান নিয়ে তাঁদের নিয়মিত উড়ে যেতে হত আলাস্কার দুর্গম এলাকাগুলিতে। পৌঁছে দিতে হত সরকারি সাহায্য বা নির্দেশ। অত্যন্ত দক্ষ এই দুই পাইলট তাঁদের বিমান নামাতেন বরফের প্রান্তরে। দুর্গম উপত্যকার একফালি সমতল জমিতে। প্রথমদিকে ভয়ে তাঁদের কাছে ঘেঁষত না এস্কিমো সহ অনান্য উপজাতিরা। পরে দুই পাইলটের ব্যবহার তাদের মত জিতে নিয়েছিল। বিল ও টম হয়ে গেছিলেন তাদের ঘরের লোক।

দুই পাইলট দেখেছিলেন, কাজের অবসরে বিভিন্ন ধরণের খেলায় মেতে ওঠে পুরুষেরা। নারীরা মেতে ওঠে গান বাজনা ও হস্তশিল্প নিয়ে। তবে উপজাতিদের খেলাগুলি একেবারেই তাদের নিজস্ব। যেগুলি খেলার জন্য প্রচুর শারীরীক ও মানসিক শক্তি লাগে। সহ্য করতে হয় প্রচুর যন্ত্রণা। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে খেলায় জেতার আনন্দও খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বিল ও টম। দুজনের মনে হয়েছিল, নিছকই খেলার জন্য খেলা নয়, জীবনের লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য খেলাগুলি খেলেন এস্কিমোরা। তাঁদের মনে হয়েছিল এস্কিমোদের এই অনন্য খেলাগুলি বাইরের পৃথিবীকে জানানো উচিত। কারণ খেলাগুলি থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। যা জীবনের চলার পথে কাজে লাগতে পারে।

এস্কিমোদের একটি বিখ্যাত খেলার নাম নালুকাতাক

পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন শহরে ফিরেই

বিল ও টম যোগাযোগ করেছিলেন ফেয়ারব্যাঙ্কস চেম্বার অফ কমার্স ও তাঁদের এয়ারলাইন্স কোম্পানির উপরমহলের সঙ্গে। সংস্থা দু’টির কর্তাদের দুই যুবক বলেছিলেন, এস্কিমোরা ভাল শিকারি তা সারা বিশ্ব জানে। কিন্তু খেলাধূলায় এস্কিমোদের পারদর্শিতার কথা কেউ জানে না, কারণ তারা সারা বিশ্বে প্রচলিত খেলাগুলি খেলে না। কিন্তু তারা বিশ্বের সেরা অ্যাথলিটদের থেকে কোনও অংশে কম নয়। যেহেতু এস্কিমোরা কোনও দিন অলিম্পিকে যেতে পারবে না। তাই বিল ও টম এস্কিমো সহ অনান্য উপজাতি গোষ্ঠীকে নিয়ে আলাদা একটি অলিম্পিক করতে চান। সেই অলিম্পিকের আসরে খেলাধূলার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে হস্তশিল্প ও সেরা এস্কিমো সুন্দরীর প্রতিযোগিতা।

আলাস্কার ফেয়ারব্যাঙ্কস শহর, এখানেই হয় এস্কিমোদের অলিম্পিক

দুই যুবকের অভিনব পরিকল্পনায় মুগ্ধ হয়েছিলেন চেম্বার অফ কমার্স ও এয়ার আলাস্কার কর্তারা। অর্থের কথা চিন্তা না করে দুই যুবককে এগিয়ে যেতে বলেছিলেন। বিল ও টম বিমান উড়িয়ে গ্রামে গ্রামে গেছিলেন। গোষ্ঠীপতিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিলেন অলিম্পিকের ইভেন্টগুলি নিয়ে। টানা ছ’মাস ধরে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে ঠিক করা হয়েছিল গোটা পঁচিশেক ইভেন্ট। যে খেলাগুলির সৃষ্টি হয়েছিল উপজাতিদের জীবনযুদ্ধের ময়দানে।

আলাস্কার উপজাতিদের একটি গ্রাম

১৯৬১ সাল 

জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হয়েছিল প্রথম ‘ওয়ার্ল্ড এস্কিমো অলিম্পিক‘। এই অলিম্পিকে যোগ দিয়েছিল আলাস্কা ছাড়াও, সাইবেরিয়া ও গ্রিনল্যান্ড থেকে আসা এস্কিমোরা। আলাস্কার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে অলিম্পিকে দিয়েছিল নেটিভ ইন্ডিয়ানরা। সবথেকে দুর্গম এলাকা থেকেও প্রচুর প্রতিযোগীকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন বিল ও টম। দুই যুবকের আপ্রাণ চেষ্টায় সফল হয়েছিল এস্কিমোদের প্রথম অলিম্পিক। সফল হয়েছিল হস্তশিল্প ও ‘এস্কিমো কুইন’ প্রতিযোগিতা। অথচ দু’জনের কেউই আলাস্কার স্থানীয় মানুষ ছিলেন না।

সেই থেকে প্রত্যেক বছর জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এস্কিমোদের অলিম্পিক। শুরুর কয়েক বছরের মধ্যে গড়ে উঠেছিল ‘ওয়ার্ল্ড এস্কিমো অলিম্পিক’ সংস্থা। সত্তরের দশকে ‘ওয়ার্ল্ড এস্কিমো অলিম্পিক’ সংস্থাটি নাম পালটে হয়েছিল ‘ওয়ার্ল্ড এস্কিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিক’। কারণ শুরু থেকে আলাস্কার নেটিভ ইন্ডিয়ানেরা ‘এস্কিমো অলিম্পিক’-এ যোগ দিত। তাদের অসামান্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান দিতেই এস্কিমোর সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান’ শব্দটিও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

যদিও ‘এস্কিমো’ নামটি আলাস্কার নেটিভ ইন্ডিয়ানদের প্রিয়। কারণ এস্কিমো শব্দটির অর্থ, স্নো বুটে ফিতে পরানো। তাই আলাস্কার সব উপজাতিই ‘এস্কিমো’। কিন্তু বিশ্ব এস্কিমো বলতে চেনে কেবলমাত্র ইউইট, ইনুপিয়াট ও ইনুইট গোষ্ঠীকে। তাই ‘ইন্ডিয়ান’ শব্দটি অলিম্পিকের সঙ্গে জুড়তে অনুরোধ করেছিল নেটিভ ইন্ডিয়ানেরা। অলিম্পিকের লোগোর মতই তৈরি করা হয়েছিল ‘ওয়ার্ল্ড এস্কিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিক’-এর লোগো। অলিম্পিকের লোগোতে থাকে পাঁচটি বলয়, এস্কিমোদের ওলিম্পিকের লোগোতে বলয়ের সংখ্যা ছ’টি।

ওয়ার্ল্ড এস্কিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিকের লোগো

তাক লাগানো ইভেন্ট

ওয়ার্ল্ড এস্কিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিকের প্রত্যেকটি ইভেন্টই অত্যন্ত কঠিন। প্রতিযোগীকে পৌঁছতে হয় তাঁর শারীরিক ক্ষমতার শীর্ষে। একই সঙ্গে কল্পনাতীত শারীরিক যন্ত্রণার শেষসীমায় পৌঁছে জিতে নিতে হয় গোল্ড, সিলভার ও ব্রোঞ্জ পদক। কিছু ইভেন্টের উদাহরণ দিলে হয়ত বুঝতে সুবিধা হবে।

​নাকল হপ বা সিল হপবরফের বুকে সিল যেমন করে হাঁটে, সেভাবেই একজন প্রতিযোগীকে পুশ-আপের ভঙ্গিতে, দুই হাতের মুঠো ও দুই পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে হবে। শিড়দাঁড়া সোজা এবং কনুই ভাঁজ করা থাকবে।

নাকল হপ

ইয়ার ওয়েটযন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্যই উপজাতিদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল এই খেলাটি। এই ইভেন্টে প্রতিযোগীর এক কানে দড়ি বাঁধা হয়। দড়ির অপর প্রান্ত বাঁধা থাকে ১৬ পাউন্ডের একটি বাটখারার সঙ্গে। কান দিয়ে দড়ি টেনে বাটখারাটিকে শূন্যে তুলে এগিয়ে যেতে হয় সামনে। যে বেশি দূরে বাটখারাটিকে নিয়ে যাবেন তিনিই হবেন বিজয়ী।

ইয়ার ওয়েট

ইয়ার পুলএই ইভেন্টটিতেও প্রচুর যন্ত্রণা সহ্য করে জয় ছিনিয়ে নিতে হয়। দুই প্রতিযোগী মুখোমুখি বসেন। এক প্রতিযোগীর একটি কানের সঙ্গে অন্য প্রতিযোগীর একটি কান বাঁধা থাকে দড়ির ফাঁস দিয়ে। একজনের ডান কানের সঙ্গে অন্য জনের বাম কান অথবা একজনের বাম কানের সঙ্গে অন্য জনের ডান কান। ঘণ্টা বাজা মাত্র দুই প্রতিযোগী তাঁদের কানে বাঁধা দড়ি টেনে, একে অপরের মুখ সামনে টেনে আনার চেষ্টা করেন। দড়ি ক্রমশ চেপে বসে কানে। যন্ত্রণায় দুই প্রতিযোগীরই মুখ কুঁচকে যায়। যিনি হাল ছেড়ে দেন বা যাঁর মুখ বেশি এগিয়ে আসে, তিনি হবেন পরাজিত।

ইয়ার পুল

ড্রপ দ্য বোম্বতুষার ফাটলে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতেই এই খেলাটি সৃষ্টি হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। এই ইভেন্টে প্রতিযোগী উপুড় হয়ে এরোপ্লেনের ডানার মতো দুটো হাত দু’পাশে ছড়িয়ে দেন। পা দুটো টান টান করে রাখেন। প্রতিযোগীর কবজি ও গোড়ালি ধরে তাঁকে শূন্যে তুলে নিয়ে এগিয়ে যাবেন চারজন অফিসিয়াল। যে প্রতিযোগী ‘এরোপ্লেন পজিশন’ বজায় রেখে সব থেকে দূরে যেতে পারবেন, ইভেন্টের সোনার পদকটি হবে তাঁরই।

ড্রপ দ্য বোম্ব

টু ফুট হাই কিকআলাস্কার উপকূলভাগে থাকা তিমি শিকারি গ্রামগুলিতে আজও এক অদ্ভুত প্রথা আছে। তিমি বা অন্য কোনও বড় শিকার মেলার পর, শিকারিদের একজন দৌড়ে গ্রামে আসেন। গ্রামে ঢোকেন না, দূর থেকেই শূণ্যে জোড়া পায়ে লাথি মারার চেষ্টা করেন। গ্রামবাসীরা বুঝে যান বড় শিকার ধরা পড়েছে। সব কাজ ফেলে তাঁরা ছুটে যান শিকারিদের সাহায্য করার জন্য। তিমি শিকারিদের এই বিশেষ সংকেতকে আনা হয়েছিল এস্কিমোদের অলিম্পিকে। এই ইভেন্টে প্রতিযোগিকে শূন্যে ঝোলানো একটি বলে জোড়া পায়ে লাথি মারতে হয়। বলের উচ্চতা ক্রমশ বাড়ানো হয়। যে প্রতিযোগী নিজের ব্যালান্স ঠিক রেখে সর্বোচ্চ উচ্চতায় টাঙানো বলে লাথি মারতে পারবেন, তিনিই হবেন বিজয়ী।

টু ফুট কিক

ইন্ডিয়ান স্টিক পুলএটি মুঠোর শক্তি যাচাইয়ের খেলা। নদীর জল বা বরফের ফাটল থেকে মাছকে লেজ ধরে তুলে আনা খুব কঠিন। হাত থেকে পিছলে প্রচুর মাছ পালিয়ে যায়। তাই মাছকে হাতে ধরে রাখতে হলে বাড়াতে হবে মুঠোর ক্ষমতা। মুঠোর ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল এই খেলা। গ্রিজ মাখানো এক ফুট লম্বা একটি লাঠির দুটি প্রান্ত থাকবে দুই প্রতিযোগীর হাতের মুঠোয়। ঘন্টা বাজার পর দুই প্রতিযোগী লাঠিটিকে অপর প্রতিযোগীর হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। লাঠি হবে যাঁর, ম্যাচে জয় তাঁর।

ইন্ডিয়ান স্টিক পুল

ব্ল্যাঙ্কেট টস বা নালুকাতাকতিমি শিকারের সফল মরশুমের পর, নালুকাতাক উৎসবে মেতে ওঠে আলাস্কার উপজাতিরা। এই উৎসবের জন্য, তিমির চামড়া দিয়ে তারা তৈরি একটি আয়তক্ষেত্রাকার চাদর। সেটির চারদিকে বাঁধা থাকে সিলের নাড়ি দিয়ে তৈরি করা অসংখ্য দড়ি। দড়িগুলি টেনে ধরে চাদরটিকে টান টান অবস্থায় নিয়ে যান গ্রামের যুবকেরা। এরপর চাদরের ওপর উঠে দাঁড়ান মরশুমের সবথেকে সফল তিমি শিকারি। দড়িগুলি টেনে শিকারিকে শূন্যে ছুড়ে দেন গ্রামবাসীরা। ফুট দশেক শূণ্যে উঠে শিকারি আবার এসে পড়েন চাদরের ওপর। আবার দড়ি টেনে শূন্যে উঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। এভাবেই সফল শিকারিকে অভিবাদন জানান গ্রামবাসীরা।

এস্কিমো-ইন্ডিয়ানদের অলিম্পিকে আনা হয়েছিল এই খেলাটিও। যে প্রতিযোগী সবথেকে বেশি উচ্চতায় পৌঁছতে পারবেন তিনিই হবেন বিজয়ী। তবে এই অলিম্পিকের প্রতিযোগীরা হামেশাই পঁচিশ তিরিশফুট উচ্চতায় উঠে পড়েন। চিরাচরিত অলিম্পিক গেমসের জিমনাস্টিক বিভাগে থাকা ‘ট্রাম্পোলাইন’ ইভেন্টটিও সম্ভবত এসেছিল এই ‘নালুকাতাক’ খেলাটি থেকে।

ইভেন্ট ব্ল্যাঙ্কেট টস

গ্রিজড পোল ওয়াকগ্রীষ্মকালে আলাস্কার খরস্রোতা নালাগুলি পার হওয়ার পদ্ধতি থেকে এই খেলাটির সৃষ্টি। পারাপারের জন্য নালাগুলির ওপর উপজাতিরা ফেলে রাখে গাছের গুঁড়ি। শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিল গুঁড়িগুলির ওপর দিয়ে পারাপার করা অসম্ভব বিপজ্জনক। মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এস্কিমো-ইন্ডিয়ানদের অলিম্পিকেও গ্রিজ মাখানো পনেরো ফুট লম্বা একটি গুঁড়ি পার হতে হয় প্রতিযোগীদের।

গ্রিজড পোল ওয়াক

ওপরের খেলাগুলি ছাড়াও ওয়ার্ল্ড এক্সিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিকের আসরে অনুষ্ঠিত হয় ফোর ম্যান ক্যারি, আলাস্কান হাই কিক, ওয়ান হ্যান্ড রিচ, নিল জাম্প, এস্কিমো স্টিক পুল, ওয়ান ফুট হাই কিক, টো কিক, আর্ম পুল, বেঞ্চ রিচ, ফিশ কাটিং, সিলের চামড়া ছাড়ানোর মত আরও অনেক ইভেন্ট।

প্রচার ছাড়াই কেটে গেছে ষাট বছর

আজও প্রত্যেক জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হয় এস্কিমোদের অলিম্পিক, হস্তশিল্প ও ‘এস্কিমো কুইন’ সুন্দরী প্রতিযোগিতা। গত ২৩ জুলাই (২০২১) টোকিওতে অলিম্পিক-২০২০ শুরু হয়েছিল। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে বসে পড়েছিলেন টেলিভিশনের সামনে। ঠিক সেদিনই টোকিও থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে থাকা আলাস্কায় চলছিল ওয়ার্ল্ড এক্সিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিক। ২১ তারিখে শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল ২৪ তারিখে। প্রচারের আলোর কণামাত্র পৌঁছয়নি আলাস্কায়।

‘এস্কিমো কুইন’ প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়া এস্কিমো সুন্দরীরা

তবে তা নিয়ে আদৌ চিন্তিত ছিলেন না এস্কিমো ও নেটিভ ইন্ডিয়ানরা। কারণ তাঁদের কাছে এস্কিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিক হল বৃহত্তম মিলনমেলা। তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতির মাধুর্য্যে চারদিন তাঁরা মাতিয়ে দিয়েছিলেন ফেয়ারব্যাঙ্কের পরিবেশ। তবে চতুর্থ দিন বিকেল গড়াতেই চোখের জলে ভারী হয়ে উঠেছিল বাতাস। শেষ হয়েছিল এস্কিমো-ইন্ডিয়ান অলিম্পিক। ঘরে ফেরার ডাক এসেছিল। দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রতিযোগীরা ফিরে চলেছিলেন নিজের নিজের গ্রামে।

ফেরার আগে হাত ধরাধরি করে শপথ নিয়েছিলেন প্রতিযোগীরা, “আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। বন্ধু আবার দেখা হবে আগামী বছরে।” নিজের চোখে প্রথমবার এই দৃশ্য দেখে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন বৃদ্ধ এস্কিমো নুনিক। নিশীথ সূর্যকে আকাশের সীমানায় রেখে, স্লেজ চালিয়ে নিজের গ্রামে ফেরার সময় বৃদ্ধের মুখে ফুটে উঠেছিল তৃপ্তির হাসি। পূর্বপুরুষদের দিয়ে যাওয়া সম্পদের বাকিটুকু আর হয়ত মুছে যাবে না পৃথিবীর বুক থেকে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More