দিদি ভাঙা পায়েও দু’শ, যে ৫ কারণে এই বড় জয়

শঙ্খদীপ দাস

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাটি মনে পড়ে? দিদি বলেছিলেন, খেলা তো হবেই! ওরা সারা মাঠ জুড়ে খেলবে। আর আমি একা গোল কিপারের মতো দাঁড়িয়ে থাকব। ভাঙা পায়েও দশ গোল দেব ওদের।
রবিবার বোঝা গেল, শুধু গোলকিপারের বার পোস্ট আগলে থাকেননি দিদি। বরং যে অস্ত্রে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা তাঁর দলকে ক্ষমতাচ্যূত করতে চেয়েছিলেন, ফিরতি আক্রমণে সেই অস্ত্রেই বাংলায় বিজেপিকে রুখে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মেরুকরণের সুবিধা বিজেপির তুলনায় অনেক বেশি পেল তৃণমূল। এবং মেরুকরণকে শুধু ধর্মীয় মেরুকরণ বলে দাগিয়ে দিলেও মহাভুল হবে। বিজেপির বিরুদ্ধে হিন্দু, অহিন্দু, সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী, বামপন্থী, কংগ্রেসি মায় সমাজের সব অংশ থেকে বিপুল মানুষ সমষ্টিগত ভাবে পাশে রইলেন তৃণমূলের।
ফলে বাংলায় গত পঞ্চাশ বছর ধরে নির্বাচনের যে ধারা চলছিল, এত দীর্ঘ ভোট যুদ্ধের শেষে সেই ধারাই অব্যহত রইল। গত পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলায় যে যখন জিতেছে একাই দু’শ পার করে দিয়েছে। ষোল সালের ভোটেও তাই করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এ বার ভাঙা পায়েও দু’শ পেরিয়ে গেলেন তিনি। তাঁর এই জয়ের অর্থ, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব ও ব্যপ্তি আগামী দিনে আরও বড় হতে পারে। কারণ, দিদি শুধু বাংলায় বিজেপিকে রুখে দেননি। এই জয় নরেন্দ্র মোদীকে পর্যুদস্ত করে মমতার জয়ও বটে। চোদ্দ সাল থেকে আসমুদ্র হিমাচলে যে বিজয় রথ ছুটিয়েছেন মোদী, তা এই প্রথম এত ভয়াণক ভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল বাংলায় এসে।
সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা পরেও নিশ্চয়ই হবে। আপাতত দেখা যাক, দিদির এই প্রত্যাবর্তনের রসায়ন কী ছিল।
ব্র্যান্ড মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—বাংলার নিজের মেয়েকেই চায়
এই নির্বাচনে বার বার করে মোদী-অমিত শাহকে যে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে তা হল, তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী পদের প্রার্থী কে? একদিকে যখন তৃণমূলের মজবুত একটি মুখ স্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছিল, তখন বিপরীতে পুরোটাই ঝাপসা। একটা কথা এখানে অতিশয় প্রাসঙ্গিক। তা হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল নির্বিশেষে শুধু বাংলার সর্বোচ্চ নেত্রী নন, সর্বভারতীয় রাজনীতিতেও এই মুহূর্তে তাঁর সমতুল রাজনৈতিক মর্যাদা ও উচ্চতার নেতা বা নেত্রী বিরল। তাঁর বিপরীতে বিজেপির রাজ্যস্তরের কোনও মুখই দাঁড়াতে পারেনি।
একদিকে যখন সেই কঠোর বাস্তব ছিল, অন্যদিকে টিম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসামান্য কৌশলও কাজে লেগেছে। ভোটের প্রচারে, হোর্ডিংয়ে তাঁরা মমতাকে দিদি বলে তুলে ধরেননি। মমতাকে তুলে ধরা হয়েছিল, বাংলার নিজের মেয়ে হিসাবে। বোঝানোর চেষ্টা হয়েছিল, বাংলার নিজের মেয়েই আক্রান্ত। সুতরাং যে দিদি আপনাদের সুখে ও দুঃখে সর্বক্ষণ পাশে থাকেন, তাঁকে রক্ষা করার দায়িত্ব এবার আপনাদেরই নিতে হবে।
বহিরাগত—বাঙালি ও অবাঙালি
সিপিএমকে হারাতে একদা জাতীয় তথা রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপির সঙ্গে জোট করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এ বার কৌশলগত ভাবে বারবার বিজেপিকে বাইরের দল, গুজরাতের পার্টি, বহিরাগত বলে ক্রমাগত দাগিয়ে দিয়ে বহু মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হন, ওরা ক্ষমতায় এলে বাংলা পরাধীন হয়ে যাবে। বাংলার বহুত্ববাদ, সম্প্রীতির বাতাবরণ, সংস্কৃতি নষ্ট হবে। আর তৃণমূলের নিচু তলার নেতারা সেই কথাকেই আরও এগিয়ে নিয়ে অনেককে বোঝাতে সফল হন যে গুটখাওয়ালাদের হাতে চলে যাবে ক্ষমতা। মোদী-অমিত শাহরা তৃণমূলের এই কৌশল ধরতে পারেনি তা নয়। তবে ঘটনা হল, সেই সমালোচনাকে মোকাবিলা করার মতো বাংলায় বিজেপির মুখ কেউ ছিল না। তার জবাবও দিতে হয়েছে মোদী-অমিত শাহকেই। এবং তাতে আরও বেশি করে এই বার্তা গিয়েছে যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে কোনও ভূমিপুত্রই মুখ্যমন্ত্রী হবেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সুতো বাঁধা থাকবে দিল্লিতে।
প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ও দুয়ারে সরকার
এ ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই যে দ্বিতীয়বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মধ্যমেয়াদে দলের বহু নেতা মানুষের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে প়ড়েছিলেন। বস্তুত এটাই ক্ষমতার ধর্ম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটা উনিশের ভোটের পরই ভাল মতো টের পান। তার পর প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শ নিয়ে বুদ্ধিমানের কাজ করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পিকে-র পরামর্শে প্রথমে শুরু হয় সেই বিচ্ছিন্নতা কাটানোর অভিযান—দিদিকে বলো। প্রথম দফায় সেই কর্মসূচির পর ধাপে ধাপে এগোন মমতা। তার পর একেবারে ভোটের মুখে এসে দুয়ারে সরকার কর্মসূচি শুরু হয়। এমনিতে জনমুখী প্রকল্পে গ্রহণ করা ও তার বাস্তবায়ণে দিদি বামেদের থেকেও অনেকটাই বামপন্থী। দুয়ারে সরকারের মাধ্যমে সরকারি পরিষেবা মানুষের দরজায় পৌঁছে দিয়ে সম্ভবত অনেকটাই আস্থা ফিরে পান মমতা। বিশেষ করে ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর সহ যে সব এলাকায় মানুষের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাদের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল, অধিকারের টাকা না পেয়ে যাঁরা মুখ ফেরাচ্ছিলেন, তাঁরা যে পুনরায় আস্থা জানিয়েছেন তা ফলাফলেও পরিষ্কার।
অর্থাৎ এক টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছিল তা দুয়ারে সরকারের মতো প্রকল্প দিয়ে অনেকটা ঠেকিয়ে দিয়েছেন দিদি। সেই সঙ্গে অন্তত একশ আসনে হয় প্রার্থী বদল করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হয় সেখানে নতুন মুখ দিয়েছেন, কিংবা আসন বদলে দিয়েছেন। আর তার মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, তৃণমূলের বিকল্প এ বার উন্নততর তৃণমূল। তাতেই সোনা ফলেছে ভোটে।
ধর্মীয় মেরুকরণ
বাংলায় প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে উন্নয়নের বিকল্প মডেল দেখাননি তা নয়। কিন্তু এই ভোটে বিজেপি কৌশলগত ভাবেই ধর্মীয় মেরুকরণে শান দিয়েছে। তাঁদের অনেকে আন্দাজ ছিল, মেরুকরণ প্রবল হলে বাংলাও ত্রিপুরার মতো হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই মেরুকরণের অস্ত্রেই বিজেপিকে বধ করেছেন দিদি।
বাংলায় সংখ্যালঘু ভোট গত দশ বছর ধরেই তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছে। বিজেপির উগ্র মেরুকরণ দেখে এই নির্বাচনে সেই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যে আরও মজবুত ভাবে তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়েছে তা ফলাফলেই বোঝা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে উদার ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু ভোটও বিজেপিকে রুখতে শক্ত করেছেন দিদির হাত। অর্থাৎ মেরুকরণে সুবিধা বিজেপি যা পেয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছে তৃণমূল।
বাম,কংগ্রেসের ভোট
সর্বোপরি এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাম-কংগ্রেসের ভোট। দক্ষিণবঙ্গে সামগ্রিক ভাবে অনেক দিন আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে সিপিএম এবং কংগ্রেস। বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু আসনে ছাড়া তাদের কোনও অস্তিত্বই নেই দক্ষিণে। এই অবস্থায় অনেকে ভেবেছিলেন, অন্তত মুর্শিদাবাদ, মালদহে ভাল ফল করবে সংযুক্ত মোর্চা। কিন্তু দেখা গেল, বাম, কংগ্রেসের বিপুল সংখ্যক ভোটার হয়তো মনে করেছেন, তাঁদের দলকে ভোট দেওয়া মানে তা নষ্ট করা। তাই ‘সাম্প্রদায়িক শক্তিকে’ রুখে দিতে তাঁরা তৃণমূলেই ভোট দিয়েছেন। ফলে মালদা, মুর্শিদাবাদেও তেমন কোনও সাফল্য দেখাতে পারেনি সংযুক্ত মোর্চা।
তবে শুধু এই পাঁচ কারণেই যে তৃণমূল জিতেছে তা বলা হয়তো সরলিকরণ হবে। একটি নির্বাচনে বহুবিদ বিষয় থাকে। বহুবিদ বিষয় কাজ করে। তবে হ্যাঁ এটুকু বলা যায় যে মোটের উপর বড় কারণগুলির মধ্যে এই পাঁচ বিষয় অন্যতম। যা দিদির প্রত্যাবর্তনকেই সুনিশ্চিত করে দিয়েছে। এবং ভাঙা পায়েই খেলায় জিতে ফের সরকার গঠন করতে চলেছেন দিদি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More