রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৪

নিজেকে খুন করে নিজেই নিখোঁজ খুনি! নিখুঁত ছক যেন হার মানায় সিনেমাকেও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বীভৎস অবস্থায় খেতের পাশ থেকে উদ্ধার হয় দেহটি। গলার নলি কেটে ক্ষতবিক্ষত। খুনের আগে অ্যাসিড ঢেলে ঝলসে দেওয়া হয়েছে মুখ। সারা শরীরে অজস্র ক্ষত। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, প্রচণ্ড হিংসার জেরে কেউ বা কারা খুন করেছে নিকটবর্তী গ্রামের বাসিন্দা হিম্মত পাটিদারকে। মৃতদেহের পোশাক, পকেট, মোবাইল তল্লাশি করে এই পরিচয়ই জানতে পারে পুলিশ।

মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে, রাতলামের কামেদ গ্রামে ২৩ জানুয়ারি দেহ উদ্ধার হওয়ার এই ঘটনায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ। ওই গ্রামেরই বাসিন্দা হিম্মতের পরিবার দাবি করে, অন্য দিনের মতো রাত দেড়টা নাগাদ হিম্মত খেতে গিয়েছিলেন জমিতে জল দেওয়ার পাম্প চালাতে। তার পর আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। খুনের ঘটনাস্থলের কাছে তাঁর বাইকটিও উদ্ধার করে পুলিশ।

স্থানীয় সূত্রের খবর, হিম্মত ছিলেন ওই এলাকার আরএসএসের প্রাক্তন সদস্য। এই খুনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই, ওই রাজ্যে সদ্য ক্ষমতা হারানো বিজেপি রাজনৈতিক চক্রান্তের অভিযোগ তোলে। অন্য দিকে হিম্মতের পরিবার পুলিশকে জানায়, তাঁদের সন্দেহ ওই গ্রামেরই বাসিন্দা মদন মালব্য, হিম্মতকে খুন করেছে। এক সাক্ষী আবার জানান, ঘটনার দিন রাতে ওই খেতের কাছে মদনকে দেখেছিলেন তিনি। পুলিশও তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারে, হিম্মতের সঙ্গে মদনের স্ত্রী-র বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে দু’জনের দীর্ঘদিনের গন্ডগোল ছিল। ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ মদন।

সব মিলিয়ে মদনকেই খুনি ধরে নিয়ে এগোতে থাকে তদন্ত।

কিন্তু, খুনের পাঁচ দিনের মাথায় উল্টে গেল সমস্ত তদন্তের হিসেব। থমকে গেল তদন্তের গতিও। কারণ কাহিনিতে এমন এক মোচড় এল, যাতে হতভম্ব তদন্তকারীরাও! তাঁরা ভাবতে থাকেন, এটা খুনের তদন্ত, নাকি সিনেমার চিত্রনাট্য! যাঁকে খুনি বলে সন্দেহ করা হয়েছিল প্রথম থেকে, মিলেছিল একাধিক তথ্যপ্রমাণ, আসলে খুন হয়েছেন সেই মদনই! আর খুনি সেই হিম্মত, যিনি আদৌ খুন হননি!

তদন্তে নেমে পুলিশের হাতে আসে, ঘটনাস্থলের কাছেই পড়ে থাকা এক পাটি চটি। মদনের বাবা সেই চটি নিজের ছেলের বলে শনাক্ত করেন। মৃতের পরনের পোশাক হিম্মতের হলেও, পোশাকের ভিতরে থাকা অন্তর্বাসও মদনের বাবা নিজের ছেলের বলেই দাবি করেন।

এর পরেই মৃতদেহের নমুনার সঙ্গে মদনের পরিবার এবং হিম্মতের পরিবারের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। আর সেই পরীক্ষার রিপোর্ট থেকেই বেরিয়ে আসে আসল তথ্য! রিপোর্টে জানা যায়, মৃতের দেহের নমুনার সঙ্গে  মেলেইনি হিম্মতের পরিবারের নমুনা। বরং নমুনা মিলেছে মদনের পরিবারের সঙ্গে। এর পরেই তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়ে যান, খুন করা হয়েছে মদনকে।

তা হলে হিম্মত কোথায় গেল? পুলিশ জানতে পারে, সম্প্রতি ঋণে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিলেন হিম্মত। প্রায় ন’লাখ টাকা ধার ছিল তাঁর। এই অবস্থায় মাস কয়েক আগেই ২০ লাখ টাকার একটি বিমা করিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যু হলে ওই টাকা পেত পরিবার।

তদন্তকারীদের দাবি, বিমার টাকা হাতে পেতেই চরম ঠান্ডা মাথায় মদনকে খুনের ছক কষেন হিম্মত। তার পর মদনকে খুন করে, তার মুখে অ্যাসিড ঢেলে বিকৃত করে, এমন ভাবে গোটা ছকটা সাজান, যাতে মনে হয় মদনই তাঁকে খুন করে উধাও হয়ে গিয়েছে।

পুলিশের দাবি, এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা করেছিলেন হিম্মত। এক দিকে দীর্ঘ দিনের শত্রু মদনকেও খুন করা হবে, আবার সেই সঙ্গে বিমার টাকা পেয়ে ঋণও পরিশোধ করে দেবে পরিবার।

হিম্মত এখনও পলাতক। পুলিশের ধারণা, কাছেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে হিম্মত। খুব তাড়াতাড়িই খুঁজে পাওয়া যাবে তাঁকে।

Shares

Comments are closed.