দুর্গাপুজোর আগেই অকাল বোধনে মনসা পুজো, লোকাচারের পিছনে লুকিয়ে আছে আশ্চর্য কিছু গল্প

দেবী দশভূজার আগমনের আগেই অকাল বোধনী মনসা ভেলা পুজোয় মেতে উঠলেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ। এই লোকাচারের ভিতরেই লুকিয়ে আছে পুরোনো বাংলার ঐতিহ্য। বিশ্বাস আর সংস্কারের অদ্ভুত মেলবন্ধন ভেলা ভাসানো দেখতে ঢল নামলো মানুষের...

দ্য ওয়াল ব্যুরো, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: সেটা ২০০১ সাল। প্রত্যন্ত সুন্দরবনের অঞ্চলের ক্যানিং ১নং ব্লকের ইটখোলা পঞ্চায়েতের দক্ষিণ বুধোখালি গ্রামে সেবছর ভাদ্র মাস নাগাদ প্রবল সাপের উপদ্রপ দেখা দেয়। আশেপাশের বেশ কয়েকটি হিন্দু-মুসলমান পরিবারে সাপের কামড়ে পর পর কয়েকজন গ্রামবাসীর মৃত্যু ঘটে সেসময়। প্রচলিত সংস্কার অনুযায়ী সাপে কাটা মৃতদেহকে কলার ভেলায় করে মাতলা নদীর বুকে ভাসিয়ে দেওয়াই রীতি। মনসামঙ্গলের লখীন্দরের মতো সাপের কামড়ে মরা সেইসব মানুষজনের শরীরেও আবার অলৌকিকভাবে জীবনের সঞ্চার হতে পারে বলে বিশ্বাস করেন গ্রামবাসীরা। কিন্তু এত কিছুর পরেও আতঙ্ক কমেনি। বরং আরও বেড়ে গেছিল সর্প দংশনে মৃতের সংখ্যা। এমনকি সেসময় সাপের কামড়ের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে পালিয়েও যায় বেশ কিছু পরিবার।

বছরের পর বছর এইভাবে সাপের কামড়ে মারা পড়ছিলেন বুধোখালির মানুষ। অবশেষে আজ থেকে প্রায় ১৯ বছর আগে পাড়ার মোড়ল-মাতব্বররা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন ‘অকাল বোধনী মনসা পুজো করে মাতলা নদীতে কলার মান্দাস (ভেলা) ভাসিয়ে মা মনসাকে তুষ্ট করে তবে গ্রামে বসবাস করতে হবে। আরও আশ্চর্যের বিষয় এই অকাল বোধনী মনসা পুজো আর কলার ভেলা নদীতে ভাসানো শুরু হতেই অদ্ভুতভাবে বন্ধ হয়ে যায় সাপের উপদ্রব। রক্ষা পায় গ্রামের মানুষজন। নতুন করে গ্রামে ফিরে আসেন পুরোনো বাসিন্দারাও। ১৯ বছর আগের সেই রীতি-নিয়ম মেনেই আজও ইটখোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের দক্ষিণ বুধোখালি গ্রামের সকল হিন্দু পরিবার মিলিত হয়ে আশ্বিন মাসে দেবী দশভূজার আগমনের আগেই অকাল বোধনী মনসা পুজোয় মেতে ওঠেন।

এবছরও দক্ষিণ বুধোখালি গ্রামের আদি জয় মা কালি যুবক সংঘে অতীতের সমস্ত নিয়মরীতি মেনে ৫ ই সেপ্টেম্বর শনিবার শুরু হয় ১৯তম অকাল বোধনী মনসা পুজো। পুজোশেষে মাতলা নদীবক্ষে ভেলা ভাসানো অনুষ্ঠানও হয়। গ্রামের সাধারণ গৃহস্থবধূরা নদীবক্ষে সাজানো কলার ভেলায় নৈবেদ্য সাজিয়ে দুধ কলা সহযোগে ভক্তি সহকারে পুজো দিয়ে গ্রামের মঙ্গল কামনা করলেন এদিনও।

পুজো শেষে গ্রামের যুবকেরাই সাধারণত নদীবক্ষে ভেলা ভাসিয়ে দেয়। নিয়মের ব্যতিক্রম হল না এবছরও। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রতিবছরই ওই এলাকায় প্রচুর মানুষের জমায়েত হয়। এমনকি ক্যানিং মহকুমার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও সাধারণ মানুষজন এই ভেলা ভাসানোর অনুষ্ঠান দেখতে আসেন।

ক্যানিং থেকে আসা দিবাকর সরকার, ফারুক আহমেদ সরদার, তন্ময় হালদার, শাহরুখ লস্করেরা এদিন জানান “দীর্ঘদিন ধরে এমন লৌকিক কলার ভেলা ভাসানোর অনুষ্ঠানের কথা বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে শুনতাম। আজ তা স্বচক্ষে দেখে আনন্দ পেলাম।”

প্রতিবছরের মতো এবছরও এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে পেরে খুশী আশপাশের মানুষ। দেবী বিষহরির আরাধনা করে সকলের মঙ্গলকামনা করতে পেরে খুশি বুধোখালি গ্রামের মানুষও।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More