ভাইয়ের সুইসাইড, বাবা দুর্ঘটনায় শয্যাশায়ী, আইপিএলে সাফল্যের আলোয় আঁধার কাটল চেতনের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোনও ক্রিকেটারের জবরদস্ত পারফরম্যান্সের পরে তাঁর দল হয়তো হারল, কিন্তু তিনি নায়ক হয়ে গেলেন। তাঁদের হয়তো বলা হয় ট্র্যাজিক নায়ক, আবার অনেকেই সেই তকমা না পেলেও মনের মনিকোঠায় স্থান করে নেন।
এরকমই এক তরুণ বাঁহাতি পেসারকে ঘিরে আইপিএলের ঝলমলে মঞ্চ আরও উজ্জ্বল। রাজস্থান রয়্যালসের চেতন সাকারিয়াকে নিয়ে অনেকেই এ মুহূর্তে উচ্ছ্বসিত। যেমন, বীরেন্দ্র সেহওয়াগ তো খেলা শেষ হতেই টুইটারে সাকারিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে রাজস্থানের নামীদামী বোলাররা যেখানে বেদম মার খেয়েছেন, চেতনের বোলিংয়ে লোকেশ রাহুলদের নাভিশ্বাস উঠেছে। মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়েতে পেসারদের বধ্যভূমিতে ২৩ বছরের পেসারের বোলিং একঝলক টাটকা বাতাস।
অন্যান্য ক্রিকেটারদের সঙ্গে চেতনের জীবনলিপি আলাদা। সম্প্রতি অ্যারাউন্ড দ্য উইকেট নিয়ে একটি শীর্ষক অনুষ্ঠানে চেতনের মা সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন। যা সাধারণ ক্রিকেট প্রেমীদের মনকে বিষাদে কুঁকড়ে রাখে।
রাজকোট শহর থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে ভারতেজ নামের এক অঞ্চলে জন্ম এই সুইং বোলারের। ছোটবেলায় চেতন হতে চেয়েছিলেন ব্যাটসম্যান। কিন্তু স্কুলে থাকতে দেখলেন, সেখানে ব্যাটসম্যানদের কেউ তেমন ধর্তব্যের মধ্যে আনে না।
পেস বোলার হলেই সবাই দাম দেন। সিদ্ধান্ত বদলে হয়ে গেলেন পেস বোলার। তাই বলে ছোটবেলা থেকেই যে বোলিং করা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছেন, তা কিন্তু নয়। ১৬ বছর বয়সের আগেই স্রেফ গায়ের জোরে বোলিং করতে গিয়ে চোট পেলেন, একবছরের জন্য মাঠের বাইরে চলে যান চেতন। এরপর অবশ্য এমআরএফ পেস বোলিং ফাউন্ডেশনে কিংবদন্তি অস্ট্রেলিয়ান পেসার গ্লেন ম্যাকগ্রার সাহচর্য পেয়েছেন। পেয়েছেন কারিকুরি শিক্ষাও।
চেতনের দুঃখের জীবনের কথা বলতে গিয়ে আবেগ হারিয়েছেন তাঁর মা। তিনি জানিয়েছেন, ‘‘আশা করব, আমরা যেসব কষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছি, কাউকে যেন কাটাতে না হয়। আমার মেজ ছেলে, চেতনের চেয়ে যে এক বছরের ছোট ছিল, সে মাসখানেক আগে আত্মহত্যা করে। চেতন তখন সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি খেলছিল। আমরা চেতনকে ওর ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটা দিইনি। কারণ, দিলে দেখা যেত, ওর খেলায় সেটার খারাপ প্রভাব পড়ছে। ১০ দিন ওকে ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ দিইনি আমরা। ওকে শুধু বলেছিলাম, ওর বাবার শরীরটা খারাপ।’’
কত দিন আর সত্য লুকিয়ে রাখা যায়? চেতনের মা-ও পারেননি। সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘‘এরপর থেকে ও যখনই ফোন করত, বাবার সম্পর্কে জানতে চাইতো। ওকে বাবার সঙ্গে কথা বলতে দিইনি। কারণ, উনি কথা লুকিয়ে রাখতে পারবেন না, বলে দেবেন, তার ভাই মারা গেছে। ও যখন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইত, তখন আমি প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলতাম। কিন্তু এক দিন আমি আর সত্য লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। কাঁদতে কাঁদতে ওর ভাইয়ের মৃত্যুর খবর আমি দিয়ে দিই। আমাদের সঙ্গে এক সপ্তাহ কথা বলেনি। লুকিয়ে চোখের জল ফেলত।’’
সেই সময় পরিবারের দায়িত্ব চেতনের বাবার ওপর থাকলেও অতর্কিতে হানা দেয় আরও ট্রাজেডি। চেতনের মা বলছিলেন, ‘‘ওর বাবা ছিলেন ট্রাক ড্রাইভার। তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনবার অস্ত্রোপচার হয়েছে তাঁর। এখন বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। উনি এখন আর উপার্জন করতে পারেন না। উনি এখনও বড় ছেলের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কিছুই খান না, কথাও বলেন না।’’
এত কষ্টের পর আইপিএলের চুক্তি পেয়ে চেতনের পরিবার এখন নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছে, ‘‘এর এক মাস পরই চেতন আইপিএলের চুক্তি পায়। ১ কোটি ২০ লাখ টাকার চুক্তি। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন স্বপ্ন দেখছি। আমরা আর্থিকভাবে অনেক কষ্ট করেছি। ছোটবেলায় মামার স্টেশনারি দোকানে কাজ করত চেতন। পাঁচ বছর আগেও আমাদের ঘরে টিভি ছিল না। ক্রিকেটের মাঠে চেতনের উন্নতির খবর ওর বাবা বাইরে থেকে শুনে এসে আমাদের বলত। আমার স্বামীর অসুস্থতার পর থেকে আমাদের পরিবারের ভার চেতন একাই বহন করে। এত কিছুর মধ্যে চেতনের আইপিএল চুক্তি আমাদের কষ্ট লাঘব করেছে।’’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More