অসমের পর ২ সন্তান নীতি উত্তরপ্রদেশেও? কোন ফ্যাক্টর, কী ভাবনা?

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলে কয়েকটি রাজ্য সরকারি স্কিমের সুবিধা পাওয়া যাবে না বলে ইতিমধ্যেই তোড়জোড় শুরু করেছে অসম। ধাপে ধাপে সব সরকারি প্রকল্পেই দুই সন্তান নীতি কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা।  জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আইন চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। উল্লেখ করার ব্যাপার, হিমন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের দায়ী করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কেই ‘ভদ্রস্থ জনসংখ্যা নীতি’ মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। এবার আরেক বিজেপি শাসিত রাজ্যে উত্তরপ্রদেশও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আইন তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।  রাজ্য ল কমিশন এব্যাপারে ইতিমধ্যে খসড়া আইন বানাচ্ছে। আইনটি কার্যকর  হলে যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যেও দুই সন্তান নীতি লঙ্ঘনকারীদের উত্তরপ্রদেশে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মিলবে না। আইন কমিশন দুমাসে যোগী সরকারকে রিপোর্ট জমা দেবে।

সিএএ, এনআরসির প্রেক্ষাপটে অসমের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরই জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসাবে দেখানো হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, উত্তরপ্রদেশেও কি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে ধর্মীয় মেরুকরণের ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছে আদিত্যনাথ প্রশাসন? সরাসরি যদিও কোনও সম্প্রদায়ের উল্লেখ করা হয়নি। ২০২৪ এর লোকসভা ভোটের আগে সেমিফাইনাল হিসাবে দেখা হচ্ছে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে। পশ্চিমবঙ্গ দখলের জন্য লাগাতার নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহকে প্রচারে নামিয়েও ফায়দা তুলতে পারেনি বিজেপি। উত্তরপ্রদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে খুব একটা ভাল জায়গায় নেই বিজেপি, যোগী আদিত্যনাথ। দলের ভিতরেই বিধায়করা মুখ খুলছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকবিলা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়া আদিত্যনাথকে আগামী ভোটে মুখ করা হবে কিনা, এমন জল্পনায় মাথাচাড়া দেয়  সম্প্রতি। কিছুদিন আগে অযোধ্যাতেই স্থানীয় নির্বাচনে হেরেছে বিজেপি। প্রশ্ন উঠছে, এসব থেকে নজর ঘোরাতে শেষমেষ কি ধর্মীয় মেরুকরণের পথে  হাঁটবে তারা। ২ সন্তান নীতিকে হাতিয়ার করে কি সংখ্যালঘুদের নিশানা করবে? আমজনতার মধ্যে মুসলিমরা বহুবিবাহ করে বলে বেশি সন্তানদের জন্ম দেয়, এমন বহুল প্রচারিত ধারণাকে অস্ত্র  করবে?

ঘটনাচক্রে আদমসুমারি অনুসারে ১৯৫১ সালে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৯.৮ শতাংশ, ২০০১ সালে হয় ১৩.৪ শতাংশ, ২০১১-য় বেড়ে দাঁড়ায় ১৪.২ শতাংশ। আদিবাসী জনসংখ্যা ১৯৫১-য় ছিল ৫.৬ শতাংশ, ২০১১-য় হয় ৮.৬ শতাংশ। দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই গরিবি, নিরক্ষরতা বিদ্যমান। সামাজিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক অবস্থানে বদলের জেরেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাড়ে বা কমে।

মুসলিম জনসংখ্যায় এক দশকের বৃ্দ্ধির হার ২০১১ সালে ছিল ২০ বছরে সবচেয়ে কম। ১৯৯১ সালে তা ছিল ৩২.৮ শতাংশ। তা কমে হয় ২৪.৬ শতাংশ। পাশাপাশি হিন্দু জনসংখ্যাও কমেছে। ১৯৯১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৯৯১ সালে ছিল ২২.৭ শতাংশ। ২০১১য় তা কমে হয় ১৬.৭ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হল,  ভারতে সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই জনসংখ্যা বৃ্দ্ধির হার কমছে।

মুসলিমরা একাধিক বিয়ে করে, অনেক সন্তানের জন্ম দেয়, এমন ধারণার ক্ষেত্রে এটা ভুলে যাওয়া হয় যে, বাচ্চার সংখ্যা নির্ভর করে সন্তান উত্পাদনে সক্ষম হওয়ার বয়সে পৌঁছনো মোট মেয়েদের সংখ্যার ওপর। ১৯৭৪ সালেই ভারতে মহিলাদের অবস্থা সংক্রান্ত কমিটি তথ্য দিয়েছিল, বহুবিবাহ শুধু মুসলিম নয়, ভারতের সব সম্প্রদায়ের মধ্যেই আছে। তারা দেখিয়েছিল, বহুবিবাহের হার আদিবাসীদের মধ্যে ১৫.২ শতাংশ, বৌদ্ধদের মধ্যে ৯.৭ শতাংশ, জৈন ও হিন্দুদের মধ্যে যথাক্রমে ৬.৭ ও ৫.৮ শতাংশ। সবচেয়ে কম মুসলিমদের মধ্যে ৫.৭ শতাংশ।

ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে ২০০৫-০৬ বলছে, হিন্দু ও  মুসলিম ফার্টিলিটি প্রায় সমান গতিতে কমছে।  ২০০৪-০৫ এ ভারতীয় মহিলাদের সন্তান ধারনের গড় হার ছিল ৩। হিন্দু মহিলাদের মধ্যে তা ২.৮ শতাংশ। মুসলিম মহিলাদের মধ্যে ৩.৪। ২০১৪ সালে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে রিপোর্টে বলা হয়, জাতীয় স্তরে সন্তান ধারণের হার কমে হয়েছে ২.২ শতাংশ। তা রিপ্লেসমেন্ট ফার্টিলিটি রেট ২ শতাংশের খুব বেশি নয়। হিন্দু মহিলাদের মধ্যে তা ২.১৩ শতাংশ (০.৬৭ শতাংশ কম), মুসলিম মহিলাদের মধ্যে ২.৬২ শতাংশ (০.৭৮ শতাংশ হ্রাস)। পাশাপাশি শিক্ষাগত মান মহিলাদের মধ্যে বৃদ্ধি পাওয়াও ছোট পরিবারের পিছনে একটা বড় কারণ। ২০১১র সেনসাস অনুসারে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ১৭.২ কোটি, হিন্দু জনসংখ্যা ৯৬.৬ কোটি। শতাংশের বিচারে হিন্দু জনসংখ্যা ৭৯.৮, মুসলিম জনসংখ্যা ১৪.২। বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিচার করে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৫০ নাগাদ হিন্দু সংখ্যা হতে পারে ১৩০ কোটি, মুসলিম জনসংখ্যা ৩১ কোটি। প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণাধর্মী বইয়ে দেখিয়েছেন, মুসলিমদের মধ্যে বিরাট অংশ পরিবার পরিকল্পনামুখী কর্মসূচি খুব ভালভাবে অনুসরণ করছে।

গত বছর কংগ্রেস রাজ্যসভা সাংসদ ডঃ অভিষেক মনু সিংভিও বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিল ২০২০ পেশ করেছিলেন। সেই  বিলেরও উদ্দেশ্য ছিল একাধিক সুযোগসুবিধার অফার দিয়ে দুই সন্তান নীতি চালু করা। বিলে বলা হয়, একটি সন্তান হওয়ার পর গরিবি রেখার নীচে বসবাসকারী দম্পতি স্বেচ্ছায় নির্বীর্যকরণ অপারেশন করালে তাদের এককালীন অর্থসাহায্য মিলবে। বিলে একটি জাতীয় জনসংখ্যা স্থিতিশীলতা ফান্ড তৈরির কথাও ছিল। অন্যদিকে দুটির বেশি সন্তান হলে স্বামী, স্ত্রীর কেউ লোকসভা, রাজ্যসভা ভোটে, বিধানসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়তে পারবেন না। এমনকী সেক্ষেত্রে সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি হবে না, গ্রুপ এ-র  কাজের আবেদন করা যাবে না বা সরকারি ভর্তুকিও মিলবে না। বিলের পুরানো খসড়ায় এও বলা হয়েছিল, সরকারি কর্মীদের লিখিত হলফনামা দিতে হবে যে, তাঁরা দুটির বেশি সন্তানের জন্ম দেবেন না। প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, দুটি বা তার কম সন্তানের বাবা-মাকেই চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে সরকারকে।

 

 

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.