নেতাজি উদ্বোধন করেছিলেন সিনেমা হলটি, বন্ধ হয়েও মলিন স্মৃতির আলোয় উজ্জ্বল সে

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘চিত্রা’ সিনেমা। নাম পাল্টে পরে হয় ‘মিত্রা’ সিনেমা। ঠিকানা: ৮৩, কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতা। এখন এ রাস্তা হাতিবাগানের বিধান সরণী। এই ‘মিত্রা’ বা ‘চিত্রা’ সিনেমার উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এ হল আজ বন্ধ হয়ে গেছে। তবু আজও রোজ হল পরিষ্কার করা হয়, সামনের আলো জ্বালানো হয়। আজ নেতাজির ১২৫তম জন্মদিবসে ফিরে দেখা যাক, কেমন ছিল তাঁর সিনেমাহল উদ্বোধন করার সেই দিনটা।

‘চিত্রা’ সিনেমার স্থপতি ছিলেন নিউ থিয়েটার্সের মালিক বীরেন্দ্রনাথ সরকার। বিএন সরকার নামেই তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। ১৯৭০ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ও ১৯৭২ সালে পদ্মভূষণে ভূষিত হন তিনি। সেই বীরেন্দ্রনাথ সরকার কলকাতার হিন্দু স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে বিলেত গিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। তার পরে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন দেশের মাটির টানে। দেশে পরিকাঠামো না থাকলেও, হাজার সমস্যা থাকলেও যে নিজেই উদ্যোগপতি হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়, তা তিনি প্রমাণ করেন অতদিন আগে। সবকিছুর মধ্যে চলচ্চিত্রের প্রতি প্রেম ছিল তাঁর মনে। তিনি যখন ভারতে ফিরলেন তখন তাঁকে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি এ প্রস্তাবে রাজিও হয়ে যান।

এর পরে তিনি প্রযোজনা সংস্থা ও প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণে উৎসাহী হন। বৃহত্তম চলচ্চিত্র প্রযোজক সংস্থা নিউ থিয়েটার্স বাংলার ও বাঙালির জাতীয় সম্পদ। চলচ্চিত্র প্রযোজনার পাশাপাশি বীরেন্দ্রনাথ সরকার প্রেক্ষাগৃহ তৈরিতেও উদ্যোগী হয়েছিলেন। ‘চিত্রা’ চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহ ছিল তাঁর প্রথম সৃষ্টি। নিউ থিয়েটার্স প্রাইভেট লিমিটেডের কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকারের অবদান বাংলা চলচ্চিত্রের শ্রীবৃদ্ধিতে অনস্বীকার্য।

নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও।

বিএন সরকার ছিলেন নিপাট ভদ্রলোক। বাংলাকে তিনি যে আন্তর্জাতিক জায়গায় নিয়ে গেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তা ঐতিহাসিক। বি এন সরকারের সঙ্গে তৎকালীন স্টার অভিনেতা দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা জুটি ছিল। তাঁরা দুজন মিলে নিউ থিয়েটার্স এবং চিত্রা সিনেমাকে আরও বিকশিত করেন। বাংলা ও বাঙালিকে নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে বাঙালির ফিল্ম কোম্পানি নিউ থিয়েটার্স বড়সড় প্রতিপত্তি বিস্তার করে সারা ভারতে। বাঙালি হিসেবে একটা দাপট দেখানোর উদাহরণ তৈরি করেন বি এন সরকার।

বাঙালি লেখকদের সাহিত্য থেকে সিনেমা বানিয়ে, বাঙালি শিল্পী, বাঙালি কলাকুশলী, বাঙালি পরিচালক নিয়ে, বাঙালি প্রযোজকের এই সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার পেছনে দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বলিষ্ঠ বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটা ভূমিকা ছিল। সে কাহিনি আজ আর খুব একটা কেউ মনে রাখেনি। অনেকেই হয়তো জানেনই না, এই বিএন সরকার স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও পরোক্ষে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি ছিলেন নেতাজি সুভাষ বসুর অনুগামী।

বিএন সরকার তাঁর প্রেক্ষাগৃহ উদ্বোধন করার অনুরোধ করেন নেতাজিকে। নেতাজি সটান জানিয়ে দেন, হলের সামনে কোনও ব্রিটিশ পুলিশ মোতায়েন করা যাবে না, তবেই তিনি রাজি। বলাই বাহুল্য, বিএন সরকার কোনও দ্বিমত করেননি। কিন্তু মুশকিল হল, নেতাজির মতো জীবন্ত কিংবদন্তী দেশনেতা হল উদ্বোধ আসছেন শুনে জনতার ঢল তো নামবেই সেদিন! সেটা সামলাবে কে? ভেবেই হলেন বিএন সরকার। শেষমেশ কলকাতা ময়দানের খেলার মাঠের পালোয়ান জব্বর আলিকে এই ভিড় সামলানোর ভার দেন সরকার মশাই।

চিত্রার বিজ্ঞাপন ‘উদয়ের পথে’ ছবিতে।

১৯৩০ সালের ২০ ডিসেম্বর হাতিবাগানে চিত্রা থিয়েটার উদ্বোধন করেন কলকাতার তদানীন্তন মেয়র, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। বম্বের অনুকরণ না করে বাঙালি রুচি ও সংস্কৃতি বিকাশের ইচ্ছে নিয়েই চিত্রা ও নিউ থিয়েটার্স তৈরি হয়, যার প্রেরণাদাতাও ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র। বস্তুত, শুধু দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেই যে নেতাজির ভূমিকা ছিল তা নয়, চিত্রা সিনেমা-সহ স্টার থিয়েটার, মহাজাতি সদনের সঙ্গেও নেতাজির নাম যুক্ত। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে তিনি সবসময় পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করেছেন।

তবে সেই সময়েও নেতাজি-বিরোধী কিছু লোকের অভাব ছিল না, যাঁদের গাত্রদাহ হতে শুরু করে নেতাজি প্রেক্ষাগৃহ উদ্বোধন করতে আসায়। তাঁরা অনুষ্ঠান ভন্ডুল করার চেষ্টা করেন। প্রধান অতিথি যেখানে নেতাজি স্বয়ং, সেখানে যে জনতার ঢল কতটা বিপুল ভাবে নেমেছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বিএন সরকার সেইসব বিরোধীদের অপচেষ্টা খুব দক্ষ ভাবে সামলান এবং ‘চিত্রা’র সঙ্গে জড়িয়ে যায় নেতাজির নামও। সেদিন ‘চিত্রা’ সিনেমায় প্রথম প্রদর্শিত সিনেমা ছিল রাধা ফিল্মসের ‘শ্রীকান্ত’।

‘ডাক্তার’ ছবিতে পঙ্কজ মল্লিক।

তবে বর্তমানে নাম পরিবর্তনের পরে হওয়া ‘মিত্রা’ হলের মালিক দীপেন মিত্র জানাচ্ছেন ‘নেতাজি ফিতে কাটেননি সেদিন। শুধু উদ্বোধন উৎসবে উপস্থিত ছিলেন।’

দ্বিমত আছে এই ইতিহাসে।

তবে সে যাই থাকুক, একথা সত্য যে সেদিন চিত্রায় দাঁড়িয়ে নেতাজি বলেছিলেন, বাংলা ভাষার ছবিতে বাংলা ভাষাকেই গুরত্ব দিতে হবে। বাংলায় সিনেমার টিকিট প্রকাশ করার কথাও বলেন তিনি।

শুধু এই ঘটনাই নয়, আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনাতেও হাতিবাগানের ‘চিত্রা’ বা ‘মিত্রা’ জড়িয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাস থেকে বাংলা ছবি বানিয়েছিলেন অভিনেতা পরিচালক নরেশ মিত্র। ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সংগীত পরিচালনায় কাজি নজরুল ইসলাম। কিন্তু বিশ্বভারতী সেইসব রবি গান চলচ্চিত্রে ব্যবহার করার অনুমতি দিল না। বলা হল, ‘নজরুল কি জানে রবীন্দ্রনাথের গানের সঠিক প্রয়োগ? সঠিক মর্যাদা?’

‘গোরা’ ছায়াছবি।

ছবি করার সময়ে নরেশ মিত্র রবীন্দ্রনাথের অনুমতি নেননি সেভাবে। তখন কাজি নজরুল একটি ছোট প্রজেক্টর আর গোরা ছবির প্রিন্ট নিয়ে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের কাছে হাজির। রবীন্দ্রনাথ তো মহা খুশি নজরুলকে দেখে। নজরুল সব খুলে বললেন। গানের ব্যবহার দেখে রবীন্দ্রনাথ বললেন, “তুমিই পারবে আমার গানের মর্যাদা দিতে। তুমি শিখিয়েছো শিল্পীদের আমার গান। বিশ্বভারতী ভুল ধরার কে?”

ছবির গানে কোনও ভুল নেই, লিখে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। বললেন “ছবি দেখাতে চাও, সকলকে দেখাও, সবাই আনন্দ পাবে।”

১৯৩৮ সালের ৩০ জুলাই দেবদত্ত ফিল্মসের প্রযোজনায় নরেশ মিত্রর পরিচালনায় ‘গোরা’ মুক্তি পেল ‘চিত্রা’ সিনেমা হলে। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন রাণীবালা, জীবেন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজলক্ষ্মী দেবী (বড়), নরেশ মিত্র প্রমুখ। এই রবীন্দ্র-নজরুল ইতিহাসেও ‘চিত্রা’ সিনেমার নাম জড়িয়ে।

তবে যত দিন গড়ায়, হিন্দি প্রভাব বিএন সরকারের উপরেও পড়তে থাকে। অন্য হলমালিকরা তাঁকে উস্কে দেন আরও, যেমন এসপ্ল্যানেডের পিকাডিলি সিনেমা হলের ম্যানেজার শ্যামল সরকার। বিএন সরকার তাঁর ব্যবসাকে আরও বিকশিত করতে বম্বের এবং লাহোরের প্রোডিউসারদের ছবিও নিজের সিনেমা হলের চেইনে দেখাতে দিতেন। সে তাঁর ছবিকে কেউ বম্বের আর লাহোরের মার্কেটে জায়গা দিক আর না দিক।

এই নিয়ে দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বীরেন্দ্রনাথ সরকারের মতভেদও হয়। দুর্গাদাসের কাছে নীতি ও আদর্শ ছিল বড়। তিনি চাইতেন শুধুই বাংলা ছবি নিউ থিয়েটার্স ‘চিত্রা’ ও চেইন প্রেক্ষাগৃহগুলিতে দেখানো হোক। কারণ তিনিও নিউ থিয়েটার্সের ছবিতেই অভিনয় করতেন। কিন্তু এ নিয়ে মতভেদ এত বিশাল রূপ নেয় নিউ থিয়েটার্স ছেড়ে দেন দুর্গাদাস। ভেঙে যায় সরকার-বন্দ্যোপাধ্যায় জুটি। শ্যামল সরকার, বিএন সরকার ওদুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিটিংয়ে রেগে আগুন হয়ে  বেরিয়ে আসেন দুর্গাদাস।

পরের দিন সংবাদপত্রে শিরোনাম হল ‘চলচ্চিত্রতারকার গুন্ডামি। পিকাডিলি হলের ম্যানেজার শ্যামল সরকারকে মেরে তার নাক ফাটিয়ে দিয়েছেন প্রবাদপ্রতিম ফিল্মস্টার দুর্গাদাস ব্যানার্জী।’ এতে দুর্গাদাসের কিছু এসে যায়নি। কিন্তু নিউ থিয়েটার্স ছেড়ে অবাঙালির মালিকানায় চলা ‘ভারতলক্ষ্মী পিকচার্স’ জয়েন করতে হয় দুর্গাদাসকে। ভারতলক্ষ্মীর ব্যানারেই তাঁর সব ছবি মুক্তি পেতে থাকে এর পরে।

নেতাজি সুভাষচন্দ বসু যে বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকারও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তার নিদর্শনও পাওয়া যায় বাংলা ছবির ইতিহাসে। সুভাষ বসুর পরামর্শে কালীশ মুখোপাধ্যায় ‘রূপ মঞ্চ’ নামে চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার পত্রিকা প্রকাশ করেন ১৯৩৯ সালে। সুভাষ এ সংক্রান্ত নির্দেশটি প্রথম কালীশকেই দিয়েছিলেন আরও বছর দুয়েক আগে। ‘রূপমঞ্চ’র প্রচ্ছদে যে অভিনেতার ছবি প্রকাশিত হত, তাঁর বাজারদর সেসময় সবচেয়ে বেশি বলে গণ্য হত।

এইসময় দুর্গাদাসের সঙ্গে বি এন সরকারের ঝগড়া মেটাতে মধ্যস্থতায় বসেন কালীশ মুখোপাধ্যায়।

দুর্গাদাসের সব শর্ত মেনে নেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার। ঠিক করেন, বাংলার উন্নতিই হবে তাঁদের আদর্শ। ১৯৪০ সালে বাংলা সুপারহিট ছবি ‘ডাক্তার’ মুক্তি পায়। অভিনয় করেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক, অহীন্দ্র চৌধুরী, জ্যোতিপ্রকাশ, ভারতী দেবী প্রমুখ।
১৯৪১ সালে ‘ডাক্তার’ হিন্দিতে রিমেক করার সময়ে প্রত্যেক বাঙালি শিল্পীকেই রিপিট করালেন বিএন সরকার, কোনও অবাঙালি শিল্পীকে আনেননি। একই কাস্টিং ছিল। বাংলা ছবিটির পরিচালক ফণী মজুমদার অন্যত্র ব্যস্ত ছিলেন, তাই সুবোধ মিত্র পরিচালনা করেন ডাক্তারের হিন্দি চিত্ররূপ।

চিত্রা সিনেমায় উৎসবের দিনগুলিতে বিএন সরকার সারারাতব্যাপী বাংলা ছবি দেখাতেন। তবে কিছু হিন্দি ছবিও থাকত দর্শকের চাহিদা মেনে।

১৯৪০ সালের ২৪ অগাস্ট ছিল জন্মাষ্টমী, সারারাত চিত্রায় চলে ‘দুলারী বিবি’, ‘জীবন মরণ’, ‘পরাজয়’ ও ‘মীরাবাঈ’ দেখানো হয়। লক্ষণীয়, দুটো বাংলা ছবি ও দুটো হিন্দি ছবি।

এর পরে ১৯৪১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শিবরাত্রিতে সারারাত চিত্রায় দেখানো হয় ‘পরাজয়’, ‘জীবন মরণ’, ‘চণ্ডীদাস’।

ওই বছরেই ১৪ অগাস্ট জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে চিত্রায় ‘মুক্তি’, ‘ডাক্তার’, ‘জীবন মরণ’, ‘মাসতুতো ভাই’ দেখানো হয়।

সেই আমলে ফিল্ম ফেস্ট মিত্রায়।

অর্থাত একচল্লিশের শিবরাত্রি আর জন্মাষ্টমী, দু’দিনই সারারাত ধরে শুধু বাংলা ছবি দেখালো চিত্রা। তবে এই হিন্দি ও বাংলা ছবির যৌথ প্রদর্শনে লাভ বই লোকসান হয়নি শিল্পী,কলাকুশলী ও চিত্রার।

তিরিশ চল্লিশের দশকে উৎসবের রাতে হাতিবাগানের ‘চিত্রা’য় ছবি দেখতে আসা ছিল বাঙালি কালচারগুলির একটা। বাড়ির মেয়ে-বৌরাও ঘোড়ার গাড়ি করে আসতেন। সারারাতব্যাপী তিনটে করে শো হত। তাই লুচি, তরকারি, মিষ্টি আর এক ঘড়া জল নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠতেন বাঙালি মেয়ে-বৌরা। সঙ্গে পুরুষও কয়েকজন থাকতেন। শো ভাঙলে বিরতিতে খানাপিনা হত। ভোররাতে সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরা। তবে ইংরেজ উপদ্রব তো ছিল, তাই মেয়ে-বৌদের গাড়ি কাপড় দিয়ে আবৃত করে দেওয়া হত। দক্ষিণ থেকে উত্তর কলকাতা যেতে তাড়াতাড়ি পার করা হত ফোর্ট উইলিয়ামের পথ।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সশরীরে চিত্রা প্রেক্ষাগৃহে ‘দেবদাস’ ছবি দেখতে গেছিলেন এবং সিনেমা দেখে খুশি হয়ে চিত্রার সকলকে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন।

দেবদাস ছবিতে প্রমথেশ ও যমুনা বড়ুয়া।

বিএন সরকারের তিনটি প্রেক্ষাগৃহ ছিল ‘চিত্রা’, ‘রূপালি’ ও ‘নিউ সিনেমা’। বাকি দুটি হল আগেই উঠে গেছে। কিন্তু ইতিহাসে পাওয়া যাচ্ছে, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি নিউ থিয়েটার্সের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। ফলে হলটি বেশ কিছুকাল বন্ধ ছিল। ১৯৬৩ সালের পয়লা বৈশাখ বিএন সরকার চিত্রা বিক্রি করে দেন হেমন্তকুমার মিত্রকে। মিত্র পদবী অনুসারে হলের নাম হয় মিত্রা। উদ্বোধনে হাজির ছিলেন অতুল্য ঘোষ এবং প্রাক্তন মালিক বিএন সরকার। এরপর ‘চিত্রা’ নাম পরিবর্তন করে নবরূপে ‘মিত্রা’ নামে প্রেক্ষাগৃহ শুরু হয়।

২০১৯ সালের পয়লা বৈশাখে সেই মিত্রাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে বিভিন্ন কারণে। বহু জায়গায় প্রকাশিত হয় ‘মিত্রা’ হল উঠে গেছে, মালিকানা বদল হয়ে শপিং মল মালিক কিনে নিয়েছেন। তা কিন্তু এখনও হয়নি। এখনও মিত্রার মালিক হেমন্ত মিত্র উত্তরসূরী দীপেন মিত্র মহাশয়।

অকৃতদার দীপেন মিত্র পঁচাত্তরের বৃদ্ধ হলেও মনে-শরীরেও এখনও পঁচিশ। কিন্তু তাঁর মনটা ভাল নেই। দর্জি পাড়ার মিত্র বাড়ির ছেলে তিনি। আজও পরনে শ্বেতশুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবি। তাঁর সাদা পাক দেওয়া গোঁফ ও সাদা চুল। দীপেন মিত্র ও তাঁর দাদা ‘মিত্রা’ সিনেমা হলটি চালাতেন। দীপেন বাবুর বৌদির নাম হল মিত্রা। সেই থেকে চিত্রার নাম মিত্রা দেওয়া হয় এটাও অনেকে বলেন। সে যাই হোক, উত্তর কলকাতার মানুষদের নস্ট্যালজিয়া আজও মিত্রা সিনেমা।

প্রমথেশ-কাননের ছবি থেকে উত্তম-সুচিত্রা, অমিতাভ-রেখা, তাপস-দেবশ্রী, প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা, দেব-কোয়েল …যেন সমস্ত যুগের ভারতীয় ছবিই এখানে প্রদর্শিত হয়েছে। আদি চলচ্চিত্রযুগ থেকে এখনকার চলচ্চিত্রে সেতুবন্ধন করে ‘মিত্রা’। সিনেমা শেষে ‘সুপ্তির কেবিন’-এ মোগলাই পরোটা, ডিমের ডেভিল খেয়ে বাড়ি ফেরা। সেইসব দিনগুলোর স্মৃতি নিয়ে আজ বন্ধ দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ‘মিত্রা’।

মিত্রা বন্ধ থাকলেও আজও রোজ হল পরিষ্কার করা হয়, সামনের আলো জ্বালানো হয়। কিন্তু হলটা দায়িত্ব নিয়ে পরিচালনা করার লোকের বড় অভাব আজ। এমনকি নবরূপে হলে থ্রিডি প্রযুক্তির ছবি প্রদর্শন ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। বসার সিটের আধুনিকীকরণ করেন দীপেনবাবু। তবু বন্ধ হল করে দিতে বাধ্য হন তিনি। আবার যদি ‘মিত্রা’ খুলে যায় এবং দর্শকধন্য হয় তার থেকে সুখবর কিছু হয় না।

যদিও বাঙালির হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাঙালি দর্শকরাও দায়ী। ঝাঁ চকচকে শপিং মলের মাল্টিপ্লেক্সে বার্গার-পপকর্ন হাতে ছবি দেখতে বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বড় অংশের মানুষ। মাল্টিপ্লেক্সে ছবি দেখার আপডেট সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করাটাই হয়তো নয়া ফ্যাশন। এখন তো অণু পরিবারের বাঙালিরা জানেই না সবাই একসঙ্গে ছবি দেখতে যাওয়ার সেই নির্মল আনন্দ, যেখানে স্টেটাস বড় ছিল না। হইহইটাই বড় ছিল। সেসব দিন আজ আর নেই। এভাবেই বাঙালি দর্শক নিজেদের সংস্কৃতিকে ক্ষয়িষ্ণু করে দিচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে নেতাজির স্নেহধন্য হলের কথা যে আলাদা করে কেউ জানবে না, সেটাই বোধহয় স্বাভাবিক।

(কৃতজ্ঞতা: সাত্যকি ভট্টাচার্য, দীপেন মিত্র, তমাল দাশগুপ্ত ও কালীশ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘রূপমঞ্চ’ পত্রিকা।)
You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More