বাংলার হেঁশেল- পুরাতনী নিরামিষ রান্না

শমিতা হালদার

এখন এক্কেবারে যাকে বলে ‘দারুণ দহন দিন’… এই গরমে হাঁসফাঁস অবস্থায় কী খাবো আর কী খাবো না- সেটাই লাখটাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত পেটপাতলা বাঙালির হজমের সমস্যা তো নতুন কিছু নয়! তবে এই পরিপাকের গোলমাল বেশ গুরুতর চেহারা নেয় গরমকালে। আর তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরমের দিনে প্রচুর জল খেতে হবে, সে লেবু জল হোক বা ডাবের জল, কি দই এর ঘোল। আর তার পাশাপাশি চাই মুখরুচি আর পুষ্টিকর হালকা খাবার। দুপুরে ভাতের সঙ্গে একটু পাতলা ডাল, সঙ্গে মরসুমি সবজি দিয়ে নানারকম তরকারি… সেই সবজি অবশ্য রান্না করতে হবে কম তেল-মশলাতে, যাতে খাবার পর হজমের সমস্যা না হয়। আর শেষ পাতে অবশ্যই চাই হালকা টক বা অম্বল।

হালকা খাবার চাই ঠিকই, কিন্তু তাই বলে স্বাদের সঙ্গে সমঝোতা! উঁহু, একেবারেই নয়। রন্ধন শৈলীকে চৌষট্টি কলার অন্যতম কলা কি আর সাধে বলা হয়!  গ্রীষ্মের বাজারে এখন যেসব সব্জি সহজেই পাওয়া যায়, যেমন লাউ, ঝিঙে, কুমড়ো ইত্যাদি, তা দিয়ে একঘেয়ে রান্নার বদলে নতুন কী বানানো যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আজকে একটা সাবেকি রান্নার রেসিপি দিলাম- চাপড় ঘন্ট। গরমের দিনে বাড়িতে বসে সহজেই রান্না করা যায় এমন একটা পদ, এই চাপড় ঘন্ট…

ঠাকুমা দিদিমাদের আমলে ঘন্ট রান্না নিয়ে কতরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা যে হয়েছে, তাঁর লেখাজোখা নেই। তবে এ-পার বাংলাই হোক, আর ও-পার বাংলা, ঘন্ট হবে নরম, মাখামাখা, আর স্বাদু। আরেহ, ঘেঁটে যাওয়া থেকেই তো ঘন্ট। সাধারণত সবজিপাতি ডুমো ডুমো করে কেটে অল্প তেল-মশলার সাহায্য নিয়ে রান্না হয় ঘন্ট। নানারকম শাকসবজির বদলে অনেকসময় একটা সবজি দিয়েও ঘণ্ট রান্না হয়, যেমন ধরুন নিরামিষ মোচার ঘন্ট, থোড় চালের ঘন্ট, আবার আমিষের মধ্যে মাছের মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট। তবে আজকের পদটি আগাগোড়াই নিরামিষ। পুরোনো বাঙালিয়ানার গন্ধ মাখা পদ- চাপড় ঘন্ট…

উপকরণ-

আলু
কুমড়ো
ঝিঙে
পটল
বরবটি
ইত্যাদি কম করে হলেও ৫ রকম সবজি
আর লাগবে মটরডাল, ৫-৬ ঘন্টা জলে ভিজিয়ে রেখে মিক্সারে লংকা দিয়ে বেটে নিতে হবে। নুন চিনি মিক্স করে তারপর ননস্টিক প্যানে অল্প ঘি বা তেল দিয়ে কেকের মতো চ্যাপ্টা করে ডাল দিয়ে দু-পিঠ সেঁকে নিতে হবে ভালো মতো।

প্রণালী-

কড়াতে সরষের তেল গরম করে নিয়ে গোটা দুয়েক তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা আর পাঁচফোরন দিতে হবে, তারপর সবজি ছেড়ে নাড়াচাড়া করে নিতে হবে। খানিকটা পর মেশাতে হবে, নুন, হলুদ, চিনি আর কাঁচা লঙ্কা। সবজি ঢাকাচাপা দিয়ে আঁচ কম করে রান্না করতে হবে। সবজির জলেই ভাপে সেদ্ধ হবে সব, তাই আর আলাদা জল মেশাবার প্রয়োজন নেই। সবজি সেদ্ধ হবে কিন্তু একেবারে গলে যাবে না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সবজি সেদ্ধ হয়ে জল কমে এলে তাঁর সঙ্গে মেশাতে হবে অল্প আদা বাটা আর নারকেল কোরা।

সব মিক্স করে আগে থেকে ভাজা মটর ডাল এর বড়া হাতে ভেঙে এতে মিশিয়ে নিয়ে একটু চাপা দিয়ে গ্যাস কম করে কয়েক মিনিট রাখলেই রেডি চাপড় ঘন্ট।

চাপড় সাধারণত মটর ডালের হয়। থোড়ের চাপড় ঘন্ট, মোচার চাপড় ও ভীষণ ভালো খেতে, পদ্ধতি কমবেশি একই, তবে সেক্ষেত্রে শেষে একটু ঘি মেশালে ভালো লাগে।

 

শমিতা হালদার, গুরগাঁও-এর বাসিন্দা, সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেও পেশায় একজন অনলাইন কুকিং ট্রেনার এবং হোম শেফ। যুক্ত আছেন রান্না সংক্রান্ত একাধিক ব্লগের সঙ্গে। বর্তমানে সারা দেশে এবং পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে আছে তাঁর ছাত্রছাত্রী। রান্না ছাড়াও দুস্থ বাচ্চা এবং মহিলাদের নিয়ে কাজ করেন। কোভিড আবহে সমাজকল্যাণমূলক নানা কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ব্যক্তি=গত উদ্যোগে কোভিড পেশেন্টদের পরিবারে পাঠাচ্ছেন বেসিক মিল।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More