করোনা চিকিৎসায় বড় সাফল্য, অ্যান্টিবডি ককটেলে ১২ ঘণ্টায় অসুখ সারল দুই সঙ্কটাপন্ন রোগীর

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হরিয়ানায় এক বৃদ্ধকে প্রথম অ্যান্টিবডি ককটেলে চিকিৎসা করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রেও সাফল্য এসেছিল। এবার আরও বড় সাফল্য এল দুই সঙ্কটাপন্ন কোভিড রোগীর চিকিৎসায়। করোনা ছাড়াও নানারকম কোমর্বিডিটি ছিল দুজনেরই। অ্যান্টিবডি ককটেলে থেরাপি করে মাত্র ১২ ঘণ্টায় রোগমুক্ত হয়েছেন দুই ব্যক্তি। দিল্লির স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে এই অ্যান্টিবডি থেরাপি করা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে ৩৬ বছর বয়সী এক স্বাস্থ্যকর্মী ও ৮০ বছরের এক বৃদ্ধের চিকিৎসা হয়েছে অ্যান্টিবডি ককটেলে। স্বাস্থ্যকর্মী যিনি কোভিড রোগীদের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন তাঁর সংক্রমণ ধরা পড়ে কিছুদিন আগে। উপসর্গ ধরা পড়ার সাতদিনের মাথায় অ্যান্টিবডি দিয়ে থেরাপি শুরু করেন ডাক্তাররা। অসুস্থ স্বাস্থ্যকর্মীর প্রচণ্ড জ্বর ছিল, তাছাড়া লিউকোপেনিয়া ও অন্যান্য রোগও ছিল। অ্যান্টিবডি ককটেলে থেরাপি করার ১২ ঘণ্টার মাথায় রোগমুক্ত হন তিনি। শরীরে ভাইরাল লোডও কমে যায়। হাসপাতাল থেকে ছেড়েও দেওয়া হয়েছে তাঁকে।

অপর ব্যক্তি ৮০ বছরের আর কে রাজদান। কোভিড আক্রান্ত হওয়ার ছ’দিনের মাথায় অ্যান্টিবডি ককটেলে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। ডাক্তাররা বলেছেন, ওই বৃদ্ধের ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনসন ছিল। শরীরে সংক্রমণও বেশিমাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু অ্যান্টিবডি ককটেলে রোগ সেরে যায় ১২ ঘণ্টার মধ্যেই।

Regeneron Antibody Cocktail Cuts COVID-19 Viral Load, 'Medical Visits' | MedPage Today

কোভিড চিকিৎসার সম্ভাব্য থেরাপি হিসেবে অ্যান্টিবডির মিশ্রণ বা ককটেল তৈরি করেছে আমেরিকার বায়োটেকনোলজি কোম্পানি রিজেনারেশন ফার্মাসিউটিক্যালস। তাদের তৈরি ওষুধের ব্র্যান্ড নাম রিজেন-কভ (REGEN-COV) । দুরকম মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে এই ককটেল তৈরি করা হয়েছে—ক্যাসিরিভিমাব (REGN10933) ও ইমডেভিমাব (REGN10987) । এই ওষুধের চিকিৎসা শুরু হয়েছে ভারতেও।

এই দুই অ্যান্টিবডির মিশ্রণে তৈরি ওষুধ দেশের বাজারে বিতরণ করবে সিপলা ফার্মাসিউটিক্যালস। ওষুধের একটি ডোজ হবে ১২০০ মিলিগ্রামের যার মধ্যে ৬০০ মিলিগ্রাম থাকবে ক্যাসিরিভিমাব ও ৬০০ মিলিগ্রাম ইমডেভিমাব। দেশের বাজারে এই ককটেলের দাম পড়বে ৫৯ হাজার ৭৫০ টাকা (ট্যাক্স সমেত)। আর মাল্টিডোজ প্যাকের দাম হবে ১ লক্ষ ১৯ হাজার টাকা। প্রতি প্যাকে দুজন কোভিড রোগীর থেরাপি করা যাবে।

স্যর গঙ্গারাম হাসপাতালের সিনিয়র সার্জন ডক্টর পূজা খোসলা বলছেন, এই ওষুধ কোভিড থেরাপিতে গেমচেঞ্জার হতে পারে। স্টেরয়েডের ব্যবহার কমাবে, অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ও থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবডি ককটেলে করোনা রোগীদের চিকিৎসা করলে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা কমবে। হাই-রিস্ক গ্রুপে রয়েছেন যে কোভিড রোগীরা তাঁদের অবস্থা খারাপের দিকে যাওয়ার আগে অ্যান্টিবডি ককটেলের থেরাপিতে সংক্রমণ কমানো যাবে বলেই আশা করা হচ্ছে। ভ্যাকসিন দিলে বা করোনার ওষুধ দিলে ১৪ দিন পর থেকে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু এই ককটেল ওষুধে সঙ্গে সঙ্গেই অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকবে রক্তে। এই অ্যান্টিবডি ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করবে। কোভিডের ছোঁয়াচে বি.১.৬১৭ প্রজাতির সংক্রমণও ঠেকাতে পারবে বলে আশা করছেন গবেষকরা।

ভাইরাল স্ট্রেন যখন শরীরে ঢুকছে তখন তার প্রতিরোধে রক্তের বি-কোষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এই বি-কোষ তার অনেকগুলো প্রতিলিপি তৈরি করে ফেলে যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ক্লোনিং’ ।  এমন অজস্র কোষ থেকে লক্ষ লক্ষ অ্যান্টিবডি তৈরি হয় রক্তরসে। এদের সমষ্টিগতভাবে বলে পলিক্লোনাল অ্যান্টিবডি। এই সমষ্টির মধ্যে থেকে যদি একটিকে ছেঁকে বের করা যায়, তাহলে তাকে বলে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি। এই মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি নিয়ে কাজ করার সুবিধা বেশি। গবেষণাগারে এই অ্যান্টিবডি স্ক্রিনিং করে বের করে নিয়ে তার ক্ষমতা ইচ্ছামতো বাড়িয়ে নিতে পারেন বিজ্ঞানীরা, যেমন কী ধরনের ভাইরাল প্রোটিনের সঙ্গে বাঁধা যাবে এই অ্যান্টিবডিকে, কীভাবে ভাইরাল প্রোটিন নষ্ট করা যাবে তা ল্যাবরেটরিতে ডিজাইন করে নেওয়া যায়। আর এমন দুরকম মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি মিশিয়ে দিলে তার শক্তি আরও বাড়ে বলেই দাবি গবেষকদের। ককটেল থেরাপিতে ভাইরাসের মিউটেশন থামানো যেতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More