কঙ্গোর জঙ্গলে পা ভেঙে চার টুকরো! কীভাবে উদ্ধার করা হল হলিউডের অভিনেত্রীকে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী অ্যাশলে জুড। তাঁর সাফল্যের তালিকায় আছে প্যারাডাইস, হিট, আ টাইম টু কিল, ফ্রিডা, ডলফিন টেল সহ বহু সুপারহিট সিনেমা। তিনি জড়িয়ে আছেন সমাজসেবা ও রাজনীতির সঙ্গেও। পরিবেশপ্রেমী জুড সেই কাজেই ঘুরে বেড়ান সারা বিশ্বের জঙ্গলে জঙ্গলে। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি কঙ্গোয় গিয়েছিলেন বোনোবো প্রজাতির বানর নিয়ে গবেষণা করার জন্য।

অ্যাশলে জুড

একদিন ভোর রাতে, কঙ্গোর জঙ্গলের বিপজ্জনক পথে চলেছিলেন জুড। সঙ্গে ছিলেন দু’জন ট্র্যাকার। যাঁরা পশুদের চলার পথ খুঁজে বের করার কাজ করছিলেন জুডের টিমে। তিন জনেই এগিয়ে চলেছিলেন একটি বিশেষ স্থানের দিকে, যেখানে গাছগুলিতে বাস করে বোনোবো প্রজাতির বানর। জুডের মাথায় লাগানো হেডল্যাম্পটা হঠাৎ অকেজো হয়ে গিয়েছিল। ট্র্যাকার দু’জন অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন। হেডল্যাম্পটা নিভে যাওয়ায় বিপদে পড়েছিলেন জুড। প্রায় হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে চলেছিলেন বিপদসংকুল কঙ্গোর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। রাস্তায় পড়েছিল বিশাল গাছের গুঁড়ি।

অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে গুঁড়িটিতে সজোরে ধাক্কা মেরেছিলেন জুড। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠেছিলেন। সেই চিৎকার ছড়িয়ে গিয়েছিল অনেক দূরে। ছুটে এসেছিলেন ট্র্যাকার পাপা জিন ও দিউমার্সি। যন্ত্রণায় তখন কাদামাটিতে কাতরাচ্ছেন জুড। হাউহাউ করে কাঁদছেন। পায়ে হাত দিয়েই আঁতকে উঠেছিলেন। পা চার টুকরো হয়ে গেছে। বুঝতে পারছিলেন ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। নার্ভের ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। তার ওপর অসহ্য যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় মরেই যাবেন ভেবেছিলেন জুড।

দৌড়ে এসে পাপা জিন ভাঙা পায়ের টুকরো গুলো একই সরল রেখায় আনার চেষ্টা করছিলেন। অসম্ভব যন্ত্রণায় তীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসছিল জুডের মুখ থেকে। তবুও পাপা জিন কাজটা করে চলেছিলেন। মাটিতে পড়েছিলেন জুড। তাঁকে সোজা করে বসিয়ে দিয়েছিলেন দুজনে।

তারপর দিউমার্সি বসে পড়েছিলেন মাটিতে। তাঁর কোলে বসিয়ে নিয়েছিলেন জুডকে। জুডের ভাঙা পায়ের নীচে নিজের পা’টি একই সরল রেখায় রেখেছিলেন। যাতে ভাঙা পা’টি সেট থাকে। এই ভাবে কাদায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বসেছিলেন ডিউমার্সি। একবারও নিজের পা নাড়াননি। ডিউমার্সি পা নাড়ালেই তাঁর পায়ের ওপর থাকা জুডের পায়ের হাড় আবার সরে যাবে।

পোকার কামড় খেতে খেতে কেটে গিয়েছিল এতটাসময়, তার পরে এসেছিল স্থানীয় উদ্ধারকারী দল। জুড তখন প্রায় অজ্ঞান। ছ’জন কঙ্গোবাসী সন্তর্পণে জুডকে তুলে নিয়েছিল দোলনায়।

দোলনাটি যতটা কম নাড়িয়ে এগোনো যায়, সেভাবেই এগোচ্ছিল দলটি। মাঝে মাঝে বাহক বদলে নিচ্ছিলেন নিজেরা। রেনফরেস্টের কর্দমাক্ত পথ ধরে প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর দলটি এসেছিল, জঙ্গলের বাইরে থাকা একটি অসমতল অংশে।

সেখানে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়েছিল দু’টি যুবক। দিদিয়ের ও মারাদোনা। মোটরসাইকেলের পেট্রল ট্যাঙ্কের ওপরে বসেছিলেন দিদিয়ের। তারপর সিটে পিছনদিকে মুখ করে বসানো হয়েছিল জুডকে। জুডের পিঠ লেগেছিল বাইকচালক দিদিয়ের পিঠে। বাইকের শেষে বসেছিলেন মারাদোনা। তার দুপাশে রাখা পায়ের ওপর ছড়ানো ছিল জুড়ের দুটি পা। জুডের ভাঙা পা’টি গোড়ালির নীচ থেকে মারাদোনা তুলে ধরে রেখেছিল। তারপর টানা ছ’ঘন্টা বাইক অ্যাম্বুলেন্স ছুটেছিল স্থানীয় গ্রামের পথে।

সারা পথে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জুডকে উৎসাহ দিয়ে গিয়েছিলেন দিউমার্সি এবং মারাদোনা। গ্রামে পৌঁছাতেই জুডকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কঙ্গোর প্রত্যন্তে থাকা গ্রামের মহিলারা।

প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করেছিলেন তাঁরাই। পরে এসেছিলেন চিকিৎসকদের দল। ততক্ষণ পর্যন্ত জুডের মাথা কোলে নিয়ে বসেছিলেন গ্রামের এক মহিলা। তিনি জুডের ভাষা বুঝতেন না। কিন্তু নিজের ভাষায় সান্ত্বনা নিয়ে যাচ্ছিলেন। জুডের মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছিলেন।

কঙ্গোর  গ্রাম থেকে যখন বিদায় নিয়েছিলেন জুড। চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল জলে। দ্বিতীয় জীবনের পথে ফিরিয়ে দেওয়া ভাই বোনেদের বলেছিলেন, “আবার আসব, এবার গ্রামটাকে সাজিয়ে তোলার জন্য।”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More