কসমেটিক্সের ভাল-মন্দ, কোনটি ত্বকের জন্য খারাপ, কোনটি উপকারী, বিশেষজ্ঞের থেকে জানুন

কসমেটিক্সে যেমন ভাল উপাদানও থাকে, তেমনি বাছাই করে না কিনলে এর খারাপ উপাদান ত্বকের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। কোনটা ভাল. কোনটা মন্দ, জানালেন বিশেষজ্ঞ।

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

রূপচর্চা শুধু বিউটি প্রোডাক্টের কেরামতি নয়। রূপচর্চা এমন এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেটা মেনে চললে এবং সেই অনুপাতে প্রসাধনী ব্যবহার করলে তবেই রূপ খোলতাই হয়। প্রসাধনী বা কসমেটিক্সেরও একটা বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা আছে। স্কিন স্পেশালিস্টরা বলেন, প্রসাধনী হবে এমন যা ত্বককে আর্দ্র, টানটান করবে। রোমকূপে জমে থাকা ময়লা টেনে বার করে সুন্দর, ঝকঝকে মাখনের মতো জেল্লা এনে দেবে। রোদের ঝাঁঝ থেকেও বাঁচাবে আবার শীতের রুক্ষতা থেকে আড়াল করবে। কাজেই ত্বকের ধরন অনুযায়ী প্রোটিন-ভিটামিন, খনিজ উপাদানের সঠিক মিশেলে প্রসাধনী বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। যতই দামি ব্র্যান্ডের ক্রিম বা টোনার কিনে বাহাদুরি দেখানো হোক না কেন, ত্বক অনুযায়ী প্রোটিন-ভিটামিন না থাকলে কিন্তু সব চেষ্টাই মাটি।

আমাদের দেশের জলবায়ু অনুযায়ী ত্বক গরম সইতেই অভ্যস্ত। শীত বেশিদিন থাকে না। জ্বালাপোড়া রোদে আমাদের ত্বকে বাদামি ছোপ পড়ে যাকে বলা হয় ট্যান। এই ট্যান তুলতে এমন কিছু প্রসাধনী ব্যবহার করা হয় যার ক্ষতিকারক টক্সিন ত্বকের ক্ষতি করে। আবার বলিরেখা গায়েব করতে বাজার চলতি এমন অনেক প্রসাধনী ব্যবহার করা হয় যার ফল আদতেও ভাল হয় না। কসমেটিক্সে যেমন ভাল উপাদানও থাকে, তেমনি বাছাই করে না কিনলে এর খারাপ উপাদান ত্বকের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রিম, টোনার, সুগন্ধী, চুলের রং, ডিওডোরান্টে অনেক উপাদানই থাকে যা কার্সিনোজেনিক অর্থাৎ ক্যানসারের জন্য দায়ী। আবার এমনও দেখা গেছে প্রসাধনীর রাসায়নিক থেকে ত্বকে ছড়িয়ে পড়েছে শ্বেতী।

এখন দেখে নেওয়া যাক, কসমেটিক্সে কী কী খারাপ উপাদান থাকে—

ইমালসিফায়ার (Emulsifier)– ইমালসিফায়ার ক্রিমের মতো একধরনের উপাদান যাতে তেল ও জল সমঅনুপাতে মেশানো থাকে। প্রসাধনীর ৫-৮ শতাংশ থাকে এই ইমালসিফায়ার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উপাদান বেশি থাকলে ত্বক খসখসে হয়ে যায়। আর ত্বকের শুষ্কতার সমস্যা বাড়তে থাকলে চুলকানি থেকে দেখা দেয় একজিমা।

তেল (Oil)-যে কোনও ক্রিম, লোশন, লিপস্টিক বা অন্য মেকআপ প্রোডাক্টে তেল জাতীয় উপাদান থাকেই। উদ্ভিজ্জ ফ্যাট বা প্রাণীজ ফ্যাট থেকেই প্রসাধনীর এই তেল তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশি সময় ধরে বা বেশি পরিমাণে মেকআপ প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে এই তেল জাতীয় উপাদানের অক্সিডেশন হয়ে তার রঙ বদলে যায়। দীর্ঘ সময় এটা ত্বকে লেগে থাকলে নানারকম চর্মরোগ হতে পারে।

সিন্থেটিক রঙ (Color)-মেকআপ মানেই নানা রকম রঙ। এর মধ্যে থাকে ভারী ধাতব উপাদান যেমন পারদ, সীসা ও ক্রোম, যা ত্বকের সমস্যা তৈরি করে।

কসমেটিক পিগমেন্ট (Cosmetic Pigment)-বেশিরভাগ প্রসাধনীতেই এই কসমেটিক পিগমেন্ট থাকে। হোয়াইট পিগমেন্ট যেমন জিঙ্ক অক্সাইড, টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড বেশিরভাগ কসমেটিক্স প্রোডাক্টেই থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পিগমেন্টে এমন উপাদান থাকে যা ত্বকের ক্যানসারের জন্য দায়ী।

অ্যান্টিসেপটিক (Antiseptic)-প্রসাধনীর তেল জাতীয় উপাদানে জীবাণুদের বংশবৃদ্ধি হয়। একে রোখার জন্যই অ্যান্টিসেপটিক থাকে। তবে সেটারও একটা নির্দিষ্ট অনুপাত থাকা দরকার।

অ্যারোমেটিক অয়েল (Aromatic Oil)-ক্রিম, লোশন, লিপস্টিক বা অন্য প্রসাধনীতে অ্যারোমেটিক অয়েল থাকেই। নিম্নমানের প্রসাধনীতে যে অ্যারোমেটিক অয়েল ব্যবহার করা হয় তা ত্বকের র‍্যাশ, চুলকানির জন্য দায়ী।

ইমিডাজোলিডিনিল ইউরিয়া (imidazolidinyl urea)–  এটি একধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রিজারভেটিভ যেটি প্রসাধনীর উপাদানে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উপাদানে টক্সিক পদার্থ থাকে যা ত্বকের সমস্যা তৈরি করে।

প্যারাবেনস (Parabens)- এটিও প্রিজারভেটিভ যার মধ্যে থাকে প্যারাহাইড্রক্সিবেনজোয়েটস, যেটি ত্বকের চুলকানি, খসখসেভাব, ত্বকের জ্বালাপোড়া অনুভূতির জন্য দায়ী।

থ্যালেটস (Phthalates)-প্লাস্টিসাইজার হিসেবে কাজ করে এই রাসায়নিক উপাদান। প্রসাধনীতে থাকলে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করে।

ট্রাই-ইথানোথ্যালামাইন (Triethanolamine)-এই অ্যামাইনো অ্যাসিড কম্পাউন্ড ত্বকের চুলকানি, র‍্যাশের জন্য দায়ী। প্রসাধনীতে বেশি পরিমাণে থাকলে ত্বক খসখসে হয়ে যায়।

পলিইথিলিন গ্লাইকলস (Polyethylene Glycols)-পলিইথার কম্পাউন্ড কসমেটিক্সে সলভেন্টের কাজ করে। বেশি পরিমাণ এই উপাদান থাকলে ত্বকের নানারকম সমস্যা দেখা দেয়।

সিন্থেটিক ফ্র্যাগরেন্স (Synthetic Fragrances)-সুগন্ধীর রাসায়নিক উপাদান শুধু ত্বকের অ্যালার্জি নয়, শ্বাসের সমস্যাও তৈরি করে। মাথা ব্যথা, বমি ভাব, নানারকমের চর্মরোগের জন্য দায়ী।

সোডিয়াম লরিয়াল সালফেট (Sodium Lauryl Sulfate)- বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই রাসায়নিক উপাদান চোখ, ত্বক এবং ফুসফুসের জন্যও ক্ষতিকর।

পিভিপি/ভিএ কো-পলিমার (PVP/VA Copolymer)-পেট্রোলিয়াম থেকে তৈরি এই রাসায়নিক মূলত হেয়ার প্রোডাক্টেই বেশি থাকে। তাছাড়া জেল, ওয়াক্স, ক্রিমেও পাওয়া যায় এই উপাদান। ত্বকের জন্য মোটেও ভাল নয়।

প্রসাধনীতে ভাল যারা

আরবুটিন (Arbutin)- ক্র্যানবেরি, বিয়ারবেরি, ব্লুবেরিতে পাওয়া যায় এই হাইড্রোকুইনন কম্পাউন্ড। ত্বককে যে কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিকের হাত থেকে বাঁচায় আরবুটিন। প্রসাধনীর হোয়াইট পিগমেন্ট বা ফর্সা হওয়ার ক্রিমের রাসায়নিক থেকে ত্বককে সুরক্ষা দেয়। মেলানিন তৈরিতে সাহায্য করে।

অ্যাসকরবিক অ্যাসিড (ASCORBIC ACID)- অ্যাসকরবিক অ্যাসিড হল ভিটামিন-সি যা ত্বকের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। পিএইচের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

অ্যাসকরবিল ডিপালমিটেট (ASCORBYL DIPALMITATE)– ভিটামিন সি ও পামিটিক অ্যাসিডের ডাই-ইস্টার। প্রসাধনীর এই উপাদান ত্বকের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

অ্যাসকরবিল গ্লুকোসাইড (AScorbyl Glucoside)– এল-অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের মতোই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। কোলাজেন তৈরিতে (প্রোলিল ও লাইসিল হাইড্রক্সিলেজ) ও মেলানিন উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

অ্যাসকরবিল পামিটেট (Ascorbyl Palmitate)– সেনসিটিভ ত্বকের জন্য এই উপাদান খুব জরুরি। ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অক্সিডেশনের হাত থেকে ত্বককে বাঁচায় এই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কম্পাউন্ড।

কোজিক অ্যাসিড (Kojic Acid)-টাইরোসিন তৈরিতে বাধা দেয়, মেলানিনের উৎপাদন কমায়, ফলে ত্বকের ফর্সা ভাব বাড়ে। ক্রিম, লোশন, সাবানে থাকে কোজিক অ্যাসিড।

ম্যাগনেসিয়াম অ্যাসকরবিল ফসফেট (Magnesium Ascorbyl Phosphate)- ভিটামিন সি-এর উপাদান, ত্বকের আর্দ্রভাব ধরে রাখে। কোলাজেন তৈরিতে এর বিশেষ ভূমিকা আছে।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব গেল্ফের গবেষকরা বলছেন, পরীক্ষা করে দেখা গেছে ৪০ শতাংশ কসমেটিক্স প্রোডাক্টে স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস ব্যাকটেরিয়া থাকে। বিজ্ঞানী কেইথ ওয়ারিনার বলেছেন, যে কোনও প্রসাধনী কেনার আগে সেগুলিকে চোখে, ঠোঁটে বা মিউকাস মেমব্রেনের বদলে হাতের যে কোনও জায়গায় লাগিয়ে পরীক্ষা করে নেওয়া যেতে পারে যে কোনও রকম অ্যালার্জি বা র‍্যাশ হচ্ছে কিনা। ত্বকের জন্য উপযোগী হলে তবেই সেটা কেনা যেতে পারে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More