ভিটামিন সি কি ঠেকাতে পারে কোভিড সংক্রমণ, দ্বিধায় বিজ্ঞানীমহল, বিশেষজ্ঞ দিলেন সহজ যুক্তি

কোভিড মোকাবিলায় হঠাৎ করে ভিটামিন সি নিয়ে এত হইচই হচ্ছে কেন? তার কারণ হল চিনের একটি গবেষণা।

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

 

ভিটামিন সি হল শরীরের বর্ম। অসুখ বিসুখ থেকে বাঁচায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবেও এর কদর আছে। আবার চুল ও ত্বক ভাল রাখতেও ভিটাসিন সি-এরই ডাক পড়ে। এখন যে প্রশ্নটা বিজ্ঞানীমহলে ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা হল, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতেও কি ভিটামিন সি কাজে আসতে পারে? শরীরের রোগ প্রতিরোধ যে বাড়ায়, সে কি তবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পাঁচিল গড়ে তুলতে পারে?

এই প্রশ্নের যথাযোগ্য উত্তর মেলেনি। ভিটামিন সি কোভিড সংক্রমণ ঠেকাতে পারে কিনা তার মীমাংসা এখনও হয়নি। বিজ্ঞানীমহলও দ্বিধাবিভক্ত। একাংশ বলছে, করোনা হানা দিলে শরীরে যে উপসর্গগুলো দেখা যায় যেমন সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া ইত্যাদি, সে সব ঠেকাতে পারবে ভিটামিন সি। ফুসফুসের প্রদাহও কমাতে পারবে। মোদ্দা কথা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ভাইরাসের মোকাবিলা করার মতো একটা বন্দোবস্ত করতে পারবে। আবার, অন্য পক্ষ বলছে ভিটামিন সি যে কোভিড সংক্রমণ রুখতে পারে তেমনটাই প্রমাণিত হয়নি মোটেও। ফ্লু ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পারবে না ভিটামিন সি। সঙ্কটাপন্ন কোভিড রোগীকে ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট দিলেই যে সংক্রমণ হুড়মুড়িয়ে কমে যাবে সেটা জোর দিয়ে বলা যাবে না, তেমন তথ্যপ্রমাণও নেই। কাজেই কোভিড ঠেকাতে ভিটামিন সি-এর ভূমিকা আছে কিনা এবং থাকলেও কতটা আছে, সেটা এখনও গবেষণার স্তরেই আছে বলা যায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোভিড মোকাবিলায় হঠাৎ করে ভিটামিন সি নিয়ে এত হইচই হচ্ছে কেন?  তার কারণ হল চিনের একটি গবেষণা।

সাংহাই মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন দাবি করেছিল ভিটামিন সি-তে নাকি সারছে করোনা

 

ভিটামিন সি সঙ্কটাপন্ন করোনা রোগীদের শরীরে ভাল কাজ করছে, সাংহাই মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণার রিপোর্ট চাইনিজ জার্নাল অব ইনফেকশাস ডিজিজ-এ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিজ্ঞানীমহলে হইচই পড়ে যায়। তার কারণও আছে। সাইহাই মেডিক্যাল রীতিমতো তথ্য দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছিল, ভেন্টিলেটরে থাকা সঙ্কটাপন্ন রোগীদের যদি বেশি পরিমাণে ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যায়, তাহলে সংক্রমণ দ্রুত কমতে পারে। তবে এই সাপ্লিমেন্ট ইনজেক্ট করতে হবে শিরার মধ্যে।

বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, ১৪০ জন রোগীকে প্রতিদিন ১৫-২৪ গ্রাম করে সাতদিনের ডোজে ভিটামিন সি দিয়ে দেখেন অনেকেরই সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে। মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটরের থাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছে অনেকেরই। এমনকি মৃত্যুহারও নাকি কমেছে। চিনের এই গবেষণার রিপোর্টের ভিত্তিতে ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট দিয়ে ট্রায়াল শুরু করার পরিকল্পনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। করোনা রোগীদের শরীরে ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট দিয়ে ট্রায়াল করে অস্ট্রেলিয়াও। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা সাফ বলে দেন যে করোনা চিকিৎসায় ভিটামিন সি-এর কোনও সুফল তাঁরা পাননি। আমেরিকার ট্রায়ালের রিপোর্ট যদিও সামনে আসেনি।

 

ভিটামিন সি ভাল

এই করোনা কালে সবকিছুকেই কোভিডের সঙ্গে যোগ বিয়োগ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সে ডাক্তার হোক বা বিজ্ঞানী, কিসে যাবে করোনা সেটাই এখন মাথাব্যথার কারণ। ভিটামিন সি করোনা পরীক্ষায় কতটা পাস করবে জানা নেই, তবে শরীরে জন্য এই ভিটামিনের কোনও তুলনাই হয় না। অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন সি যে শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে সেটা তো বরাবরই বলে আসছেন ডাক্তার, বিশেষজ্ঞরা। ভিটামিন সি-এর অভাব হলে কোলাজেন সিন্থেসিস বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে ত্বকের বাইরের স্তর (এপিডার্মিস) পাতলা ও ফ্যাকাশে হতে থাকে। ত্বকের নীচের রক্তজালকগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ভিটামিনের অভাবে দাঁতের সমস্যা দেখা দেয়। রক্তাল্পতা ঠেকাতেও ভিটামিন সি-এর ভূমিকা আছে। তাছাড়া চুল ভাল রাখা, লিম্ফোসাইট বা শ্বেতকণিকার সংখ্যা বাড়িয়ে যে কোনও রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, এসব কাজও করে ভিটামিন সি। তাই বলা যায় ভিটামিন সি ভালই, শরীরের জন্য তো বটেই।

 

কোভিড ঠেকাক বা না ঠেকাক, শরীরের সুরক্ষা কবচ হতে পারে ভিটামিন সি

 

একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের দিনে ৯০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি দরকার। মহিলাদের ক্ষেত্রে দিনে ৭৫ মিলিগ্রাম, অন্তঃসত্ত্বাদের প্রায় ১২০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি দরকার। ইমিউনিটি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ৭০–৭৫ শতাংশ আসে আমাদের রোজকার খাবার থেকে। আর বাকি ২৫–৩০ শতাংশ নিয়মিত ব্যয়াম ও কায়িক শ্রম থেকে গড়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাপ্লিমেন্ট ভাল, তবে সুষম খাবার থেকেই ভিটামিন সি পেলে বেশি ভাল হয়। একটা কমলালেবু মানেই তাতে ৭০ শতাংশ ভিটামিন সি থাকে, একটা পেয়ারায় থাকে ১২৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। এক কাপ হলুদ ক্যাপসিকামে (৭৫ গ্রাম)ভিটামিন সি থাকে ১৩৭ মিলিগ্রাম। কিউই ফলে থাকে ৭৯ শতাংশ ভিটামিন সি। হাফ কাপ ব্রোকোলি মানে তাতে ভিটামিন সি থাকবে ৫১ মিলিগ্রাম, একটা লেবুতে থাকে ৮৩ মিলিগ্রাম। পেঁপে (১৪৫ গ্রাম)  ভিটামিন সি থাকে ৮৭ মিলিগ্রাম, স্ট্রবেরি (১৫২ গ্রাম) ভিটামিন সি থাকে ৮৯ মিলিগ্রাম। তাছাড়া সবুজ শাকসব্জিতে ভরপুর ভিটামিন তো আছেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিটামিন সি খেলেই যে কোভিড সংক্রমণ হবে না তার গ্যারান্টি নেই। তবে আগাম সুরক্ষা তো নেওয়া যেতেই পারে। করোনাভাইরাসের আক্রমণের একটা পদ্ধতি হল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আগে ভেঙে দেওয়া। শক্তপোক্ত শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ ধরলেও তাকে কাবু করা সম্ভব। কিন্তু শরীর যদি আগে থেকেই ফাঁপা হয়, ক্রনিক রোগে ঠাসা থাকে, তাহলে ভাইরাসের মোচ্ছব শুরু হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ফ্রি র‍্যাডিকালস ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের হাত থেকে শরীরকে বাঁচায় ভিটামিন সি। তাই নিয়মিত ডায়েটে যদি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল বা সব্জি রাখা যায় তাহলে আর কিছু না হোক, এই করোনা কালে শরীরকে ভেতর থেকে একটা শক্তপোক্ত বর্ম পরিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More