পাকিস্তান, চিন, নেপাল সীমান্তে পরপর গোলমাল, ভারতকে কি ঘিরে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে?

রাজীব সাহা

যুদ্ধের মূল কথাই হল শত্রুকে ধোঁকা দেওয়া। শত্রু যখন অপ্রস্তুত, তখনই তাকে আক্রমণ কর। চুপিসাড়ে এসে শত্রুর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড় বজ্রের মতো…।

যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর আগে এই কথাগুলি বলে গিয়েছেন এক চিনা সমরবিদ। তাঁর নাম সুনৎসু। তিনি যুদ্ধশাস্ত্রের ওপরে একটি বই লিখেছিলেন। তার নাম ‘আর্ট অব ওয়ার’। চিনারা এখনও সুনৎসুকে মানে। শত্রু দেশের বিরুদ্ধে তাঁর কৌশল প্রয়োগ করে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকে না। ১৯৬২ সালে চিন যুদ্ধের কয়েক বছর আগে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এমন ভাব দেখাতেন যেন জওহরলাল নেহরু তাঁর বড়দা। বান্দুং সম্মেলনে তিনি নেহরুর হাত ধরে ঘুরছিলেন। এমনকি যুদ্ধের কয়েকমাস আগেও তিনি শান্তির বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন দিল্লিতে। নেহরু ভাবছিলেন, সিয়াচেন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ছোটখাটো বিরোধ আছে বটে, কিন্তু চিন নিশ্চয় পুরোদস্তুর যুদ্ধের পথে যাবে না।

ভারত যখন অপ্রস্তুত, তখনই সীমান্তে আচমকা উদয় হয়েছিল লাল ফৌজ। একেবারে সুনৎসুর নীতি মেনে যুদ্ধের ছক সাজিয়েছিলেন চিনা রাষ্ট্রনায়করা। শত্রু যখন অপ্রস্তুত, তখন তার ওপরে বজ্রের মতো ঝাঁপিয়ে পড়।

তার প্রায় ৬০ বছর বাদে চিনারা কি একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে চায়?

আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ইতিপূর্বে কয়েকবার বৈঠক করেছেন চিনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং। ইনফরমাল মিটিং। মানে সরকারি আনুষ্ঠানিকতার বাইরে দুই নেতার অন্তরঙ্গ আলোচনা। কিন্তু চিনের রাষ্ট্রপ্রধান মুখে যতই অন্তরঙ্গতা দেখান, সীমান্তে দিন দিন বাড়ছে তাঁদের সেনা মোতায়েন। অনেক উঁচু পাহাড়চূড়ায় যুদ্ধ চালানোর উপযোগী অস্ত্রশস্ত্রও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ২০১৭ সালে ডোকলামে দুই দেশের যুদ্ধ লাগব লাগব হয়েছিল। ভারত বরাবর মাথা ঠান্ডা রেখেছে। তাই সংঘর্ষ বড় আকার নেয়নি। কিন্তু চিনের নীতি হল নিয়মিত উস্কানি দিয়ে যাওয়া। শত্রুকে খুঁচিয়ে ব্যতিব্যস্ত করা।

নেহরু ও চৌ এন লাই

মঙ্গলবার চিনের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র খুব গম্ভীর মুখে বলেছেন, সোমবার গভীর রাতে ভারতের সেনা দু’বার বর্ডার পেরিয়ে আমাদের এলাকায় ধুকে পড়েছিল। আমাদের সেনা তাদের দূর করে দিয়েছে।

একে বলে চোরের মায়ের বড় গলা। নিজে দোষ করে জোর গলায় অস্বীকার করা। উল্টে অন্যের ওপরেই দোষ চাপিয়ে দেওয়া। লাদাখ সীমান্তে গালওয়ান নদী ও প্যাংগং সো হ্রদ অঞ্চলে উত্তেজনা রয়েছে প্রায় দেড়মাস ধরে। প্যাংগং লেকের ধারে দুই দেশের টহলদার সেনার মধ্যে সংঘর্ষ বাধার উপক্রম হয়েছে একাধিকবার। গত সপ্তাহে দুই দেশের সেনাকর্তারা আলোচনায় বসেছিলেন। চিন ভাব দেখায় যেন কতই না খুশি হয়েছে। বেজিং থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়, বৈঠকে আমরা ‘ইতিবাচক ঐকমত্যে’ আসতে পেরেছি। ভারতীয় সেনা ভাবছিল, চিনারা এবার সংযত হবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো।

মোদীর সঙ্গে শিনপিং

মঙ্গলবার ভারতীয় সেনা বিবৃতি দিয়ে বলেছে, লাদাখ সীমান্তে ‘ডি-এসক্যালেশন প্রসেস’ চলছিল। অর্থাৎ উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হচ্ছিল। কিন্তু সোমবার রাতে চিনের সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ বাধে। দু’পক্ষই লাঠি, রড ও পাথর নিয়ে পরস্পরের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মঙ্গলবার রাতের খবর, এই সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা। চিনাদের তরফেও বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছে।

ভারত যতই উত্তেজনা কমাতে চাক, চিনারা চায় না। দু’পক্ষের সদিচ্ছা না থাকলে কোনও ঝগড়াই মেটে না। সুতরাং লাদাখ সীমান্তে শান্তি আপাতত দূরঅস্ত।

পাকিস্তান সীমান্তেও গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকবার অশান্তি হয়েছে। পাকিস্তানিরা বরাবর সীমান্তে গোলাগুলি চালায়। ভারতীয় সেনা পাল্টা জবাব দিলে চুপ করে যায়। কিন্তু এই মুহূর্তে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অতিমহামারী। সব দেশই লড়ছে করোনার বিরুদ্ধে। কিন্তু পাকিস্তান এর মধ্যেই ভারতের বিরুদ্ধে শানিয়ে চলেছে অস্ত্র। সীমান্তে আগের মতোই হাঙ্গামা বাধিয়ে চলেছে।

গত ১৩ জুন রাতে পুঞ্চ জেলার শাহপুর-কারনি সেক্টরে পাকিস্তানের সেনা আচমকা গোলা দাগতে শুরু করে। তাতে আমাদের এক সেনা জওয়ান নিহত হয়েছেন।

গত এক সপ্তাহে কাশ্মীরে চারবার জঙ্গিদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। সন্ত্রাসবাদীরা পাকিস্তানে ট্রেনিং নেয়। সেখান থেকে অস্ত্রশস্ত্র পায়।

কয়েকদিন আগে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার পরিষদে ফের ‘কাশ্মীরের স্বশাসন’, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ইত্যাদি নিয়ে সরব হয়েছেন পাকিস্তানের দূত। ভারত জবাবে বলেছে, যারা বালুচিস্তানে ধারাবাহিক গণহত্যা চালায়, তাদের মুখে মানবাধিকারের বড় বড় কথাগুলো শোভা পায় না।

সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারটা ঘটেছে গত সোমবার। এদিন সকাল সাড়ে আটটা-ন’টা নাগাদ ইসলামাবাদে ভারতীয় হাইকমিশনের দুই গাড়িচালকের ওপরে দুষ্কৃতীরা চড়াও হয়। তাঁরা যখন পেট্রল পাম্প থেকে তেল নিচ্ছিলেন, তাঁদের ঘিরে ফেলে ১০-১২ জন। দু’জনের চোখে কাপড় বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় কোনও অজ্ঞাত স্থানে। সেখানে তাঁদের লাঠি, রড দিয়ে মারধর করা হয়। ভিডিও ক্যামেরার সামনে তাঁদের দিয়ে জোর করে বলানো হয়, আমরা ভারতীয় গুপ্তচরদের হয়ে কাজ করছিলাম।

ডোকলামে ভারত ও চিনের সেনা মুখোমুখি

পাকিস্তান আর চিন বরাবর ভারতের সঙ্গে শত্রুতা করে এসেছে। কিছুদিন আগে তাদের সঙ্গে গ দিয়েছে নেপাল। যে দেশটার অর্থনীতি ভারতের সাহায্যের ওপরে নির্ভরশীল, তারা হঠাৎ উত্তরাখণ্ডের খানিকটা জায়গা নিজেদের বলে দাবি করে বসেছে! রাতারাতি নতুন করে এঁকে ফেলেছে নেপালের ম্যাপ। তাতে ভারত সীমান্তে কালী নদীর পশ্চিমদিকে একটা সরু ফিতের মতো এলাকা বেমালুম নেপালের অন্তর্ভুক্ত বলে চালিয়ে দিয়েছে।

নেপালের সব দলেরই দাবি, তাদের ওই অঞ্চলটা ভারত অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে। ওটা এখনই ফেরত চাই।

একরত্তি একটা দেশ ভারতের সঙ্গে ঝামেলা পাকাতে সাহস পায় কী করে? চিনের মদত না থাকলে এত সাহস হয়? মনে হচ্ছে, চিনারা নেপাল সীমান্তে ভারতের সঙ্গে অশান্তির আরও একটা ফ্রন্ট খুলতে চায়।

পাকিস্তানের পিছনেও চিনারা আছে। সেই ১৯৭১ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে গলায় গলায় বন্ধুত্ব। চিনাদের মদত না পেলে এই অতিমহামারীর সময় সীমান্তে গোলাগুলি ছোড়া বা জঙ্গিদের সাহায্য করার ক্ষমতাই ইমরান খানের হত না। অত অর্থ তাঁর নেই। মাঝে মাঝে তাঁকে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির কাছে ভিক্ষা চাইতে হয়।

কোভিড ১৯ অতিমহামারী ঠেকাতে বিশ্বের সব দেশই ব্যতিব্যস্ত। ভারতও ব্যতিক্রম নয়। চিনারা এই সুযোগে তিন দিক থেকে ভারতকে ঘিরে ফেলতে চায়। অর্থাৎ তাদের ইচ্ছা আরও বড় আকারে ’৬২ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটানো। সেবার তাদের সঙ্গে পাকিস্তান বা নেপাল ছিল না। এবার চিনারা ভারতের দুই প্রতিবেশী দেশকে নিয়ে শত্রুতা করার চেষ্টায় আছে।

এখনও পর্যন্ত ভারত আছে আলোচনার পথেই। কিন্তু একটা কথা মনে রাখা দরকার। ভদ্রলোকের সঙ্গেই আলোচনা চলতে পারে, দুর্বৃত্তের সঙ্গে নয়। যার উদ্দেশ্য খারাপ, তাকে মিষ্টি কথায় বুঝিয়ে লাভ নেই। তাকে গায়ের জোর দেখাতে হয়।

চিনারা ভাবছে, ভারত বুঝি এখনও ’৬২ সালের পর্যায়েই পড়ে আছে। তাদের সমঝে দেওয়া চাই, পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই। একুশ শতকের ভারত অনেকগুণ বেশি শক্তি ধরে।

চিনারা যদি এই কথাটা বুঝতে পারে, তাহলে হয়তো আর সীমান্তে গোলমাল পাকাতে সাহস পাবে না। ঝামেলা পাকাবার জন্য কাউকে মদতও দেবে না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More