মোদীর শিক্ষানীতি: বাস্তবতা, প্রয়োজনীয়তা আর আত্মনির্ভরতাই মূল ভাবনা

সোমেশ্বর বড়াল

যেদিন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণা করলেন, তার পরদিন, একটি সর্বভারতীয় ইংরাজি দৈনিক একটি প্রতিবেদনের যে শিরোনাম করে তার আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় – ‘ভারতীয় সংস্কৃতিতে জোর দেওয়া নতুন শিক্ষানীতিতে আরএসএসের প্রভাবকে প্রতিফলিত করে’। দেশের একটা বড় অংশের শিক্ষিত মানুষের ভাবনা এরকম উদ্ভট বলেই বোধ হয় দেশ হিসেবে সমস্ত সম্ভাবনা থাকা সত্বেও ভারতকে আজও ‘উন্নয়নশীল’ হয়ে থাকতে হয়েছে। অন্য ভাবে বলা যায়, এই শ্রেণির মানুষেরা পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন, ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি সত্যিই কারা শ্রদ্ধাশীল বা কারা এত দিনের অবহেলা দূর করে ভারতীয় সংস্কৃতিকে তার অতীতের মহিমান্বিত আসনে ফিরিয়ে দিতে চাইছে। তবে বিরূপ সমালোচনা করতে গিয়েও তারা কিন্তু ‘জাতীয় শিক্ষানীতির’ মূল ভাবনাটি চিহ্নিত করতে পেরেছেন।

‘ভারতীয় সংস্কৃতি’, ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’, ‘সংস্কৃত ভাষা’– এসব শব্দ থাকা মানেই যাঁদের মনে হচ্ছে এই শিক্ষানীতি ‘সবাইকে হিন্দু বানানোর অপকৌশল’ তাঁরা নয় নতুন শিক্ষানীতি ভাল করে পড়েননি কিংবা ‘বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা ’ এই কুঅভ্যাস এখনও ছাড়তে পারেননি।

আরও পড়ুন- মোদীর শিক্ষানীতি: সামনে জনমুখী মুখোশ, আসলে টিকিখানি বাঁধা আছে আম্বানিদের ওয়ালেটে

ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি ভারতীয় সংস্কৃতি অনুসারী না হয়ে কি ব্রিটেনের, আমেরিকার, কিউবার, চিনের, কিংবা সৌদি আরবের সংস্কৃতি অনুসারী হবে! আসলে, এতকাল তাই হয়ে এসেছে। দেশের মানুষকে একই সঙ্গে স্বাভিমানী ও স্বাবলম্বী করার যে নীতি নতুন শিক্ষানীতিতে আছে তা অবশ্যই অভিনব। যে কোনও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমাজের বা দেশের বাস্তব অবস্থার কথা ভাবতে হয়। নতুন শিক্ষানীতিতে বিদ্যালয় স্তরে এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নমনীয়তা ও বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সব স্তরেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি’ অর্থাৎ, বহুমুখী করার কথা বলা হয়েছে।

একজন শিক্ষার্থী তার রুচি, পছন্দ ও সামর্থ্য অনুসারে পড়াশোনা করার সুযোগ পাবে। বিদ্যালয় স্তরে মূল্যায়নের যে পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে সেখানে অভিভাবক বা শিক্ষার্থীদের নম্বরের ইঁদুর দৌড় থেকে মুক্ত করার ভাবনা রয়েছে। রিপোর্ট কার্ড হবে একজন শিক্ষার্থীর সামর্থ্য ও দক্ষতার সম্পূর্ণ বিবরণ। এমন কিছু মজ্জাগত বিভাজন দূর করার চেষ্টা হয়েছে যা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে হীনমন্যতার জন্ম দিত। আর্টস, সায়েন্স, ভোকেশনাল, একাডেমিক ইত্যাদি ভাগ দূর করার চেষ্টা হয়েছে। আমাদের দেশের এখনও অবধি মাত্র পাঁচ শতাংশ ছেলেমেয়ে বৃত্তিমূলক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হয়, যা পৃথিবীর বস্তুগতভাবে উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্পর্কে খারাপ ধারণা তৈরি হয় এবং আগ্রহ কমে যায়। মূলধারার শিক্ষা একটা স্তরের পর গ্রহণ করার সামর্থ্য বা ইচ্ছা অনেকেরই থাকে না, তারা স্কুল-ছুট হয়ে যায়। ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান তাদের কাছে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এখন থেকে বিদ্যালয় স্তর থেকেই বৃত্তিমূলক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে পড়ুয়ারা।

অদ্ভুত ভাবে একটি রাজনৈতিক পক্ষ এই পদক্ষেপকে ‘শিশু শ্রমিক’ তৈরির প্রচেষ্টা বলে প্রচার করছে। বিদ্যালয়ে জীবন বিজ্ঞান পড়লেই যেমন কেউ ডাক্তার হয়ে যায় না, বিদ্যালয় স্তরে বৃত্তিমূলক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হলেও কেউ যে শ্রমিক হয়ে যায় না সেটা মনে রাখতে হবে। এর ফলেই আজও ‘একশো দিনের’ কাজের পরিসংখ্যান নিয়ে আমাদের গৌরব করতে হয়।

এই শিক্ষানীতিতে সমস্ত স্থানীয় এবং আঞ্চলিক ভাষাকে শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরামর্শ দেওয়া হয়েছে (নির্দেশ নয়) অন্তত বিদ্যালয় স্তরে স্থানীয় এবং আঞ্চলিক ভাষাকে যেন শিক্ষাদানের মাধ্যম করা হয়। শিক্ষানীতি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি বহু শ্রুত পুরনো রেকর্ড বাজানো শুরু হয়েছে- ইংরাজির গুরুত্ব কমিয়ে, হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঘোষিত শিক্ষানীতির কোনও অনুচ্ছেদে কি এমনটা বলা আছে যে, ইংরাজি পড়ানো যাবে না? বরং, ইংরাজি ছাড়াও অন্য একাধিক বিদেশি ভাষা শিক্ষার কথা বলা হয়েছে।

কী অদ্ভুত মানসিকতা! একটি বিদেশি ভাষার ক্ষেত্রে তাঁরা কখনওই বলেন না যে, ‘ইংরাজি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে’। অথচ এদেশের মাটিতেই তৈরি একটি ভাষা সম্পর্কে এত ঘৃণা! বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, সত্যিই কি হিন্দি চাপানোর দরকার আছে? স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই আজকের বাঙালি ছেলেমেয়েরা হিন্দিতে সড়গড় হয়ে গেছে। এজন্যই তো যাদবপুরের বিপ্লবীরা বাংলায় নয়, হিন্দিতে স্লোগান দিয়ে বেশি ‘জোশ’ পান। এমনকি বাংলার দলীয় কর্মীদের সাহস যোগাতে হিন্দিতেই বলতে হয়, ‘হাম হ্যায় না!’

শিক্ষার মাধ্যম প্রসঙ্গে এই শিক্ষা নীতিতে এক জায়গায় লেখা হয়েছে, ‘কোনও ভাষা শেখা বা শেখানোর জন্য সেটিকেই শিক্ষাদানের মাধ্যম হওয়ার দরকার নেই।’ আমরা যাঁদের প্রবাদপ্রতিম ইংরাজি জানা মানুষ বলে গণ্য করি তাঁরা কতজন ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে পড়েছিলেন? এখনও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বা পেশায় একদম প্রথম সারিতে যাঁরা আছেন, তাঁদের কত জন ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করেছেন? আসলে পরিকল্পিত ভাবেই একটা ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, শুধুমাত্র ভাল ইংরাজি জানাটাই ‘কোয়ালিটি এডুকেশন’-এর পূর্ব শর্ত।

ভাষা হিসেবে ‘সংস্কৃত’-এর কথা উঠলেই এদেশের বাম শিক্ষিতদের মনে হয়, এই বুঝি সবাইকে হিন্দু করে দেওয়া হল! সংস্কৃত একটি অতন্ত্য উচ্চমানের ধ্রুপদী ভাষা যা বিশ্বের সমস্ত উন্নত দেশ স্বীকার করে। তারা সংস্কৃত–চর্চার প্রসারও করছে। আর আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ভারতীয় হিসেবে আমরা সবাই সমান ভাবে এই ভাষা শিখিনি। নতুন শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, ছাত্রদের কাছে অন্যতম ভাষা হিসাবে সংস্কৃতকে রাখা উচিত। সংস্কৃতের পাশাপাশি পালি, পার্সিয়ান, প্রাকৃত প্রভৃতি ধ্রুপদী ভাষার উপরেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোথাও কোনও স্তরে সংস্কৃত চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়নি বরং পরিষ্কার করে লেখা আছে, ‘কোনও রাজ্যের উপরে কোনও ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’ আরও লেখা আছে, শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দমত ভাষা বেছে নিতে পারবে। ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’– নামে একটি প্রকল্পের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশের সমস্ত ভাষার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকার ফলে মাঝেমধ্যেই কী ধরণের জটিলতা তৈরি হয়, সেই অভিজ্ঞতা কম বেশি সকলেরই আছে। এগুলিকে সমন্বিত করে উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কলেজগুলিতে স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং কলেজের যে স্তর অবধি এক জন শিক্ষার্থী পড়তে পারবে সেই স্তর অবধিই তাকে শংসাপত্র দেওয়া হবে। এত দিন ফার্স্ট ইয়ার পর্যন্ত পড়ে কেউ পড়া ছেড়ে দিলে তাকে উচ্চ মাধমিক পাশ ধরা হত। এখন থেকে সেও একটা সার্টিফিকেট পাবে। আগামীর পৃথিবীর ভূ-প্রাকৃতিক , সামাজিক চাহিদা, অর্থনীতির পরিবর্তিত কাঠামোর সঙ্গে তাল রেখে জীবন জীবিকার ধরনও বদলে যাবে। পৃথিবীতে তরুণ নাগরিকের সংখ্যা আমাদের দেশেই সর্বাধিক হবে। সেই বিপুল সংখ্যার তরুণকে সময়ের প্রয়োজন অনুসারে যোগ্য করে তুলতে হলে গতানুগতিকতা থেকে বেরোতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে আর বেশি প্রযুক্তি নির্ভর করার কথাও বলা হয়েছে নয়া শিক্ষানীতিতে। জোর দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল এবং অন-লাইন প্রযুক্তির উপরে। এত দিনে নিশ্চয়ই দেশের মানুষ বুঝেছেন এর প্রয়োজন কতখানি, আরও আগে এই উদ্যোগ নিলে আজ অনেক সুবিধা হত। পাঠ্য সামগ্রী, স্কুলের পরিবেশ, মূল্যায়নের প্রক্রিয়া সব কিছুতেই প্রযুক্তির ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে।

আমাদের দেশ কি এই শিক্ষানীতির রূপায়ন করতে পারবে? জিডিপি-র ছয় শতাংশ কী করে শিক্ষা খাতে দেবে? এত টাকা কোথায়? পরিকাঠামো কই? যে কোনও নীতি তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা শিল্প যাই হোক না কেন তা নির্ধারণের সময়ে বর্তমান পরিকাঠামো ও ভবিষ্যতে সেই পরিকাঠামো কতটা উন্নত করা যায়, এই দু’টিকেই বিবেচনা করা হয়। শুধু বর্তমান অবস্থার কথা ভেবে সব পরিকল্পনা করলে কোনও দিনই এগনো সম্ভব হবে না। পঁচিশ বছর আগে কত জন মোবাইল ফোন ব্যবহারের স্বপ্ন দেখতেন! বাড়িতে বসে ব্যাঙ্কের হিসেব দেখা কিংবা ট্রেনের টিকিট কাটার কথা ভাবতে পারতেন। কিন্তু সেটা হয়েছে। আগামী দিনে আরও অনেক কিছুই হবে। শুধু ‘হবে না’ তে আটকে থেকে কী লাভ হয়েছে?

এই শিক্ষানীতির দর্শন কী? বলা হয়েছে, ‘এই জাতীয় শিক্ষানীতিতে মূলত এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার কল্পনা করা হয়েছে, যার মূল ভারতীয় সংস্কারের মধ্যে প্রোথিত এবং যা ভারতকে রূপান্তরিত করতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখবে। সেই নতুন ভারত সকলকে উচ্চমানের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এবং স্থায়ী ভাবে একটি ন্যায়সঙ্গত এবং প্রাণবন্ত সমাজে পরিণত করবে এবং এর মাধ্যমে জ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারত একটি শক্তিশালী দেশ হিসাবে গণ্য হবে।’

মনে রাখতে হবে, ভাবনা না বদলালে দেশ বদলাবে না।

মতামত সম্পূর্ণত লেখকের নিজস্ব

বীরভূম জেলায় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত লেখক পেশায় শিক্ষক।  বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর নিবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে থাকে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More