দুর্ধর্ষ হিরে চোর ‘ডায়মন্ড ডোরিস’, মহিলা নাকের ডগা থেকে চুরি করবে ধরতেও পারবেন না

ডোরিস পেইন। বিশ্ববাসীর কাছে ডায়মন্ড ডোরিস। জীবনে যত চুরি করেছেন তা নিয়ে আস্ত একটা বইও লিখিয়ে ফেলেছেন ডোরিস—‘ডায়মন্ড ডোরিস: দ্য ট্রু স্টোরি স্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট নোটোরিয়াস জুয়েল থিফ।’

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  ‘আমি হিরে চোর, তাতে কোনও অনুতাপ নেই। খারাপ লাগে যখন ধরা পড়ে যাই’, চোখে সানগ্লাস, মাথায় হ্যাট, বলিরেখা মাখা মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি। ধিকিধিকি জ্বলছে যেন দুই চোখ, বড়ই উজ্জ্বল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি মাখা হাসি। চামড়া কুঁচকেছে, দু’হাত সা মান্য কাঁপে, তবে এখনও তাতে শ্বাপদের ক্ষিপ্রতা। ছোঁ মেরে কখন যে চোখের সামনে থেকেই মূল্যবান জিনিস হাপিশ করে দেবে, বুঝতেও পারবেন না। ইনি বিশ্বখ্যাত হিরে চোর। জগতজোড়া তাঁর নাম। এই ৯০ বছরেও দিব্যি হেসেখেলে রয়েছেন। ভাবখানা এমন সুযোগ পেলেই চুরি করবেন। এবং বুক ফুলিয়ে গর্বের সঙ্গেই করবেন।

ডোরিস পেইন। বিশ্ববাসীর কাছে ডায়মন্ড ডোরিস। জীবনে যত চুরি করেছেন তা নিয়ে আস্ত একটা বইও লিখিয়ে ফেলেছেন ডোরিস—‘ডায়মন্ড ডোরিস: দ্য ট্রু স্টোরি স্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স মোস্ট নোটোরিয়াস জুয়েল থিফ।’ নিজেকে হিরে চোর বলতেই বেশি পছন্দ করেন ডোরিস। এতে নাকি তাঁর সম্মানে একটুও ছেদ পড়ে না। তিনি যে ব্যতিক্রমী, বুদ্ধিদীপ্ত এক মহিলা, পুরুষশাসিত সমাজে একা নিজের অস্তিত্ব তৈরি করেছেন তারই প্রমাণ দেয়। বয়স হয়েছে, শরীর দুর্বল হয়েছে কিন্তু বুদ্ধিতে মরচে পড়েনি। ডোরিস এখনও গর্ব করে বলেন, তাঁর মতো তুখোড় চোর নাকি আর দুটি নেই। কেবলমাত্র বুদ্ধিতে শান দিয়েই একের পর এক চুরি করে গেছেন ডোরিস, কখনও নিউ ইয়র্কে, কখনও ব্রিটেনে, কখনও প্যারিসে, মিলানে বা টোকিওতে। বেশিরভাগ সময়েই চোরাই জিনিস উদ্ধার করতে হিমশিম খেতে হয়েছে পুলিশকে। কীভাবে এবং কোন উপায় হিরে লুকিয়ে ফেলতেন ডোরিস সেটা তিনি না বললেন বোধহয় জানাও সম্ভব হত না।

নার্সের চাকরি ভাল লাগেনি, মন ছোঁকছোঁক করত চুরিতেই

গরিব কয়লা শ্রমিকের ঘরে জন্ম ১৯৩০ সালে। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার স্ল্যাব ফর্কে। বাবা খনিতে কাজ করেন। মদ্যপ অবস্থায় রাতে বাড়ি ফেরেন। বেধড়ক পেটান মাকে। দিনের পর দিন চোখের সামনে মাকে মারধোর খেতে দেখে পুরুষদের ওপর ঘৃণা জন্মায় ডোরিসের। নিজের আত্মজীবনীতেই বলেছেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করার ইচ্ছা সেই কিশোরীবেলা থেকেই ছিল তাঁর। তিনি হতে চেয়েছিলেন সবার থেকে আলাদা। এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর কথা মুখে মুখে ফিরবে। প্রশংসা করতে বাধ্য হবেন সকলে।

The Life and Crimes of Doris Payne - Home | Facebookতা সে যাই হোক, ডোরিস তো ছোট থেকেই বাবার অন্যায় অত্যাচার সয়েছে। পড়াশোনা খুব একটা হয়নি। মাকে নিয়ে আলাদা থাকার মতো সামর্থ তখনও ছিল না। টাকা রোজগার হবে কী করে? ভাবতে ভাবতেই প্রথম চুরির সুযোগ এসে যায়। তখন ১৯৫২ সাল। ডোরিস তারুণ্যে পৌঁছে গেছেন। পিটসবার্গের একটি গয়নার দোকান থেকে প্রায় ২০ হাজার ডলারের হিরের আংটি সরিয়ে ফেলেন। চুরি তো হল, এবার লুকোবেন কোথায়! তখনও তো অপরাধে হাত পাকেনি। মনে বয়, অনুতাপ সবকিছু মিলেমিশে গিয়ে এক অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে। সেই সঙ্গে অজানা ভয় চেপে বসেছে। ডোরিস ঠাঁই নিলেন পাবলিক টয়লেটে। বুকের মধ্যে আংটি চেপে রেখে সারা রাত কাটিয়ে ভোর হতেই পৌঁছে গেলেন অন্য একটি গয়নার দোকানে। বিবেক বলছিল আংটি ফেরত দেওয়াই ভাল, কিন্তু মাথায় চলছিল অন্য পরিকল্পনা। আংটিটা শেষমেশ বেচেই দিলেন ডোরিস। সাত হাজার ডলার লাভ (এখনকার দাম প্রায় ৬৫ হাজার ডলার)। তবে ডোরিস বলেছেন, তাঁর মা মেনে নিতে পারেননি এই চুরি। তাই নার্সের চাকরি করতে যেতে হয় ডোরিসকে। কিন্তু মন মানেনি। চোখের সামনে ভেসে উঠত জ্বলজ্বলে হিরে ভর্তি দোকানের শো-রুম। ঝুলি ভরে সেসব তুলে আনতে ইচ্ছে করত ডোরিসের।

 

দুহাতে ছিল জাদু, আঙুল চলত সাপের মতো, পাকা চোর হয়ে ওঠেন ডোরিস

নার্সের চাকরি ভাল লাগছিল না। এদিকে মাকেও বোঝাতে পারছিলেন না। ওই হিরের দ্যুতি তাঁকে চুম্বকের মতো টানত। ডোরিস অবশ্য বয়সকালে বলেছেন, সব গয়নাই যে তিনি চুরি করেছিলেন তেমনটা নয়, দাম দিতে ভুলে যেতেন অনেকসময়েই। তবে এ কথায় খুব একটা বিশ্বাস করেননি কেউ। যাই হোক, নার্সের চাকরি তো ছাড়লেন। পেশা হিসেবে বেছে নিলেন চুরিকেই। তারজন্য কসরতও কিছু কম করতে হয়নি। ডোরিস তো আর অস্ত্র দেখিয়ে লুঠপাট করতেন না, সবটাই ছিল তাঁর হাতের জাদু ও প্রখর বুদ্ধির ভেল্কি। তাতেই কুপোকাৎ হতেন দোকানের ডাকাবুকো, সতর্ক কর্মচারীও। ডোরিস বলেছেন, চুরিতে সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট ছিল তাঁর চেহারা। এতটাই বিশেষত্বহীন যে আলাদা করে নজর পড়ত না। তারপর কৃষ্ণাঙ্গী। কেউ বিশেষ মর্যাদাও দিত না। এইসব কিছুকেই নিজের ফায়দার কাজে লাগিয়েছিলেন ডোরিস। তাঁর আঙুলে ছিল জাদু। কোর্ট-প্যান্ট পরা কেতাবী দোকানদার বুঝতেও পারতেন না কখন আঙুলে পরতে পরতে আংটি চালান হয়ে যেত ডোরিসের ব্যাগে বা হ্যাটের মধ্যে, অথবা স্কার্টের ভাঁজে। দশ আঙুলে দশ রকম আংটি পরতে পরতেই একটা হাপিশ করে দিতেন ঝট করে। এমনভাবে আঙুলের খেলা দেখাতেন যে চোখে ধাঁধাঁ লেগে যেত দোকানির। যতক্ষণে ঠিকমতো ঠাওর হত, ডোরিস চলে যেতেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি অবধি এক লক্ষ ডলারের হিরে ও গয়না চুরি করেছিলেন ডোরিস। এই চোরাই জিনিসের বেশিরভাগই উদ্ধার করা যায়নি।

ধরা পড়েছিলেন একবার, তবে বেঁচেও গিয়েছিলেন। সে নিয়েও মজার ঘটনা বলেছেন ডোরিস। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝিই হবে। মন্টি কার্লোতে বিস্তর চুরি করে পাকাপাকি আস্তানা গোটানোর চেষ্টা করছেন ডোরিস। এদিকে পুলিশও তক্কে তক্কে রয়েছে। এক মহিলা একের পর এক চুরি করে যাচ্ছেন, অথচ কোনও প্রমাণ নেই। ডোরিসকে ধরতে জাল বিছানো হচ্ছে। এদিকে ডোরিসও শেষবার মোক্ষম দাঁও মারার তালে রয়েছেন। মন্টি কার্লোর নামী গয়নার দোকানই এবার তাঁর টার্গেট। বিশাল টাকার হিরের আংটি সরালেন ডোরিস। কিন্তু সামান্য ভুল হল একটা। আংটির দামের স্টিকার আর দোকানের নাম লেখা কাগজ তাঁর কাছেই থেকে গিয়েছিল। সবশুদ্ধ ধরা পড়লেন এয়ারপোর্টে। জেল হল। কিন্তু ডোরিস অপ্রতিরোধ্য। আংটি থেকে হিরে খুলে স্কার্টের বিশেষ ভাঁজে রেখে দিলেন। রিংটা ফেলে দিলেন বাইরে। জেলরক্ষীর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে বশ করে কখন যে পালিয়ে গেলেন তা ধরতেও পারলেন না দুঁদে পুলিশ অফিসাররা। যখন খেয়াল হল, ডোরিস অন্য শহরে, অন্য নামে চুরি করে যাচ্ছেন।

প্রেম আসে, স্বামী-স্ত্রী যেন বান্টি-বাবলি

১৯৫৭ সালের মাঝামাঝি হবে। প্রেমে পড়েন ডোরিস। ইজরায়েলি সুদর্শন যুবক, উচ্চতা ৬ ফুটের বেশি। লোকে বলে ‘বেব’ । আসল নাম হ্যারল্ড ব্রনফিল্ড। কী যেন একটা আছে সেই ছেলের দু’চোখে। ডোরিসের মতোই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি যেন গিজগিজ করছে মাথায়। তার ওপর প্রভাবশালী লোকজনের সঙ্গেও ওঠাবসা। ডোরিস মনস্থির করে ফেললেন। চারহাত এক হল। দু’জনে মিলে বড়সড় চুরির পরিকল্পনা করলেন। ১৯৬৬ সাল। আমেরিকার একটি বড় জুয়েলারি শপ থেকে লক্ষ ডলারের গয়না সরান হ্যারল্ড ও ডোরিস। দোকানদারের চোখের সামনে থেকেই গয়না সরিয়েছিলেন, কিন্তু ধরা পড়েননি। ডজনখানেক হিরের হার, আংটির মধ্যে থেকে কতগুলো যে ডোরিসের ব্যাগে ঢুকেছিল তার হিসেব মেলেনি। শোনা যায়, সেই চুরির তদন্ত শুরু হয়েছিল। কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তখনকার বান্টি-বাবলি হ্যারল্ড-ডোরিস।

তবে আমেরিকা ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল দু’জনের কাছেই। বড় বড় শহরে হিরে-চোরদের হন্যে হয়ে খুঁজছিল পুলিশ। এর মাঝেই হ্যারল্ডের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন ডোরিস। তবে আত্মসমর্পণ করেননি। শেষবারও পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যান।

Heist Master Doris Payne Swiped Millions in Jewels Over 70-Year Span - HISTORY

Doris Payne, 79, is not your typical jewel thief - Hartford Courant

৩২ টা নাম, ৯ খানা পাসপোর্ট, ডোরিস ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে

ডোরিসের নাম ছড়াচ্ছিল। আন্তর্জাতিক হিরে চোরকে পাকড়াও করার জন্য বড় অঙ্কের টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। ডোরিস তখন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সুযোগ পেলেই মামুলি চুরি করছেন। ১৯৮০ সালে ফের বড় ছক কষলেন। বিশাল অঙ্কের টাকার হিরের আংটি নিয়ে পালিয়ে গেলেন জুরিখে। তার মাঝেও অবশ্য নানা ঘটনা ঘটে। মদ্যপ ডোরিস প্রায় পুলিশের হাতে ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে যান। জুরিখে গিয়ে বাড়ি কেনেন। “হাতে তখন বিশেষ কিছু নেই। দেখলাম পকেটে একটা রোলেক্স ঘড়ি রয়েছে। তাই বেচে টাকা পেলাম অনেক। কীভাবে যে রোলেক্স ঘড়িটা এল সেটাই মনে পড়েনি,” বলেছেন ডোরিস। আত্মজীবনীতে বলেছেন, অনেক সময় চুরি করে নাকি নিজেই ভুলে যেতেন। আবার অজান্তেই চুরি করে ফেলতেন যখন তখন।

কিন্তু একবার পারেননি ডোরিস। ১৯৯৯ সালে ডেনভারে ৫৭ হাজার ডলারের গয়না চুরি করে পালাবার সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে যান। জেল হয়। তবে পাঁচ বছর জেলে কাটিয়ে ছাড়া পান। তাতেও অবশ্য চুরিতে ইস্তফা দেননি ডরিস। বয়স তখন প্রায় আশির কোঠায়। দুই সন্তান আছে। ২০১০ সালে ফের ধরা পড়েন ডোরিস। এবার ক্যালিফোর্নিয়ায়। ১৩০০ ডলারের একটা কোট নাকি গায়ে পরেই বেরিয়ে যাচ্ছিলেন বৃদ্ধা হিরে চোর। ধরা পড়ে বলেছিলেন, তিনি দাম মেটাতে ভুলে গিয়েছেন।

জেলে বেশিদিন রাখতেই পারত না পুলিশ, চুরির প্রমাণই তো থাকত না

ডোরিসের কর্মকাণ্ড বলে শেষ করা যাবে না। একের পর এক দুর্ধর্ষ চুরি। ছিটেফোঁটাও ছাপ রাখতেন না হিরো-চোর। ধরা পড়তেন, জেলও খাটতেন, কিন্তু হিরে উদ্ধার হত না বেশিরভাগ সময়েই। ২০১৩ সালে ২২ হাজার ডলারের হিরের আংটি চুরি করেন ডোরিস। ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত দোকান থেকে স্রেফ আঙুলের খেল দেখিয়েই আংটিখানা সরিয়ে ফেলেন। বয়স তখন ৮৩ বছর। ধরা পড়েন এক বছর পরে। শুধুমাত্র দোকানীর দেওয়া বর্ণনার ভিত্তিতে। বছর দুয়েকের জেল হয়। পুলিশ কর্তারা পরে জানান, হিরে নাকি সঙ্গেই ছিল ডোরিসের। সেটা জানতও পুলিশ। কিন্তু কিছুতেই সেই হিরের খোঁজ মেলেনি। কোথায় এবং কী কৌশলে লুকিয়ে রেখেছিলেন ডোরিস তা ধরাই যায়নি। তাই সাজার মেয়াদ কমে তিনমাসে দাঁড়ায়। বেরিয়ে ফের চুরি। ২০১৫ সালে আরও বেশি দামের হিরের গয়না চুরি করেন ডোরিস। সেবারও প্রমাণ মেলেনি। দোকানের সিক্যুরিটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে কানের দুল সরিয়ে ফেলছেন এক বৃদ্ধা। পরে জানা যায়, দুল শুধু নয় ৩৩ হাজার ডলারের হিরের আংটিও চুরি করেছিলেন। তবে সে আংটির খোঁজ আজও মেলেনি। কমদামি দুল অবশ্য ফেরত দিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

২০১৬ ও ২০১৭ সালে ফের চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েন। শেষ চুরি ডায়মন্ড ডোরিসের। তবে বেশি টাকার জিনিস চুরি করেননি ডোরিস। তাঁর বক্তব্য ছিল, সেগুলো চুরি নয়। এমনিই দাম দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। বয়স হচ্ছে তো!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More