করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিধ্বস্ত সিংহভাগ গ্রাম, বিনা চাষে ধূ ধূ করছে জমি, দেহ সৎকারের লোক নেই

দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুনশান মেঠো পথ। খাঁ খাঁ করছে অলিগলি। চাষের জমিজুড়ে যেন মরুভূমির শূন্যতা। করোনা আবহে দেশের প্রায় সিংহভাগ গ্রামে এমনই খণ্ডচিত্র উঠে আসছে। কোথাও পুরো পরিবার মুছে গেছে। কোথাও উপার্জনশীল পুরুষরা জ্বর-শ্বাসকষ্ট নিয়ে গৃহবন্দি। সবমিলিয়ে কোভিডের ধাক্কায় বেসামাল গ্রামজীবন। যার জের পড়েছে অর্থনীতিতে। ঘা খেয়েছে রাজনৈতিক বিশ্বাসও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার প্রথম ঢেউয়ের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তখন মূলত শহরে হানা দিয়েছিল সংক্রমণ। গ্রাম তুলনায় অনেকটাই সুরক্ষিত ছিল। কিন্তু সেকেন্ড ওয়েভ যত গড়াচ্ছে, ততই আতঙ্ক বাড়ছে গ্রামীণ এলাকায়৷

দিল্লি থেকে ঢিলছোড়া দূরের গ্রাম বাসি৷ মেরেকেটে দেড় ঘণ্টার পথ। জনসংখ্যা মোটে ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এমন কম জনঘনত্বের গ্রামেও থাবা বসিয়েছে করোনা। গত তিন সপ্তাহে সেখানে ৩০ জন কোভিডে মারা গেছেন। নানান উপসর্গ নিয়ে তিন ভাগের একভাগ গ্রামবাসী আপাতত ঘরবন্দি। আশঙ্কার কথা, বাসিতে ন্যূনতম চিকিৎসা পরিকাঠামো নেই। অক্সিজেন সিলিন্ডার কিংবা কোভিড বেডের বন্দোবস্ত তো অনেক দূরের কথা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখানকার কেউ অভ্যস্তও নন, যে চটজলদি ব্যবস্থা পেতে টুইটের দ্বারস্থ হবেন।

যে কারণে কোনও রাখঢাক না করেই স্থানীয় কৃষক সভার নবনির্বাচিত প্রধান সঞ্জীব কুমার বলেন, ‘অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকলে অনেকের জীবন বাঁচানো যেত। যাঁরা অসুস্থ হচ্ছেন তাঁদের শহরে নিয়ে যেতে হচ্ছে। আর যাঁদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর, তাঁরা ৪ ঘণ্টা পর হাসপাতালে পৌঁছচ্ছেন।’

এই সমস্যা শুধু বাসির নয়। দেশের অধিকাংশ গ্রামের। সরকারি পরিসংখ্যানে যার পুরোটা উঠে আসে না। কিংবা সবটা দেখানোও হয় না। তার কারণ, জ্বর গায়ে অনেক গ্রামবাসী ঘরে বসে থাকছেন। দূরে কোনও হাসপাতালে যাচ্ছেন না। আর স্বাস্থ্য দফতরও বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেসমস্ত তথ্য সংগ্রহ করছে না। ফলে বলা কথা আর আসল ঘটনার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান।

এই প্রেক্ষিতে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ চড়ছে। বাসি গ্রামের বাসিন্দা, বছর বাহাত্তরের সাহেব সিং। ভরদুপুরে ফাঁকা গলিপথের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘মোদী ও যোগী আদিত্যনাথের উপর আমাদের পূর্ণ ভরসা ছিল। কিন্তু আর নেই৷ এখন যাই হোক না কেন, আমরা বিজেপির বিরুদ্ধেই ভোট দেব।’

সাহেব সিংয়ের রাগের কারণ থাকাটাও স্বাভাবিক। কিছুদিন আগে অতিমারির আবহেও এখানে গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়। তাতে অনেক প্রার্থী কোভিডে আক্রান্ত হন। তাঁদের মধ্যে একজন কুমারসাঁই নৈন। অন্যজন তাঁর ছেলে। চরম শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দু’জনকে বেশ কিছুটা দূরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষার পরই চিকিৎসক জানিয়ে দেন, কুমার মারা গেছেন। আধ ঘণ্টা বাদে তাঁর ছোট ছেলেও মারা যান।

বড় ছেলে প্রবীণ সেদিন নিজের চোখে চূড়ান্ত অব্যবস্থা দেখেছিলেন। কোথাও অ্যাম্বুলেন্স কিংবা অক্সিজেনের যোগান নেই। হাতেগোনা সিলিন্ডারে কোনওমতে ছ’জন রোগীর চিকিৎসা চলছে। এমনকী বাবা আর ভাইয়ের করোনা পরীক্ষা না করেই ডেথ সার্টিফিকেট ‘হার্ট অ্যাটাক’ লিখে দেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক।

এই অবস্থা কবে ঘুচবে, জানেন না প্রবীণ। প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বারবার গ্রামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে ঝোঁক দিয়েছেন। কিন্তু কাজে সেটা কবে দেখা যাবে, এই অপেক্ষায় দিন গুনছেন সাহেব, প্রবীণরা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More