ন্যাড়া মাথায় সংকেত পাঠানো হত সে সময়, চুলের বিনুনি ছিল গোপন মানচিত্র

এই যে গোপন বার্তা বা গুপ্ত খবর, যুগ যুগ ধরেই তার ধরন ও বৈশিষ্ট্য বদলেছে। ‘গোপন কথাটি...’ গোপনীয়তার মোড়কে ঢাকাচাপা দিয়ে পাঠানোর কৌশল সেই প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: তখন কোডিং শব্দটার সঙ্গে পরিচিতি ছিল না মানুষের। কয়েক হাজার বছর আগের কথা। প্রযুক্তি তখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে গোপন কথা চালাচালির নিজস্ব ফর্মুলা ছিল। ছোট ছোট গোষ্ঠীর মানুষরা একে অপরের কাছে গোপন খবর পৌঁছে দিত খুব সাবধানে। মুখের কথা তো আর ভাসিয়ে দেওয়া যাবে না, তাই গুপ্ত বার্তা পৌঁছনো হত নানাভাবে। হয় কাঠের ওপরে খোদাই করে লিখে তার ওপরে মোম ঢেলে চাপা দিয়ে গোপন চিঠি তৈরি হতন না হলে পশু বা পাখিদের সাহায্য নেওয়া হত গুপ্ত খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। যুদ্ধ বাঁধলে তো আরও চিত্তির। তখন এক রাজ্যের খবর অন্য রাজ্যে পাঠাতে হবে শত্রুসেনার চোখ বাঁচিয়ে। মাঝপথে খবর ফাঁস হয়ে গেলেই বিপদ। তখন সবশুদ্ধ ভরাডুবি হবে। দূতের প্রাণও যাবে, রাজ্যও হবে হাতছাড়া।

এই যে গোপন বার্তা বা গুপ্ত খবর, যুগ যুগ ধরেই তার ধরন ও বৈশিষ্ট্য বদলেছে। ‘গোপন কথাটি…’ গোপনীয়তার মোড়কে ঢাকাচাপা দিয়ে পাঠানোর কৌশল সেই প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু তার খোলসটা বদলেছে মাত্র। প্রাচীন পৃথিবীর সংকেতলিপি এখনকার স্টেগানোগ্রাফি। এই শব্দটাও এসেছে গ্রিস থেকে। স্টেগোস মানে হল ‘আচ্ছাদন’, আর  ‘গ্রেফিয়া’ অর্থে ‘লিখন’। গোপন খবরের অস্তিত্বটাই এমনভাবে চাপা দেওয়া হত যে মর্মোদ্ধার করা সকলের সাধ্য ছিল না । এ বার্তা কেবল যিনি পাঠাবেন এবং যাঁকে উদ্দেশ্য করে পাঠনো হচ্ছে, তিনিই বুঝতে পারবেন। কারণ সংকেতলিপির গোপন সংকেত কেবল তাঁদেরই জানা।

The relationship between steganography and cyberattacks - ManageEngine Blogএই সংকেতলিপি বা স্টেগানোগ্রাফি নানা ধরনের হত। প্রাচীন গ্রিসে এই স্টেগানোগ্রাফির ব্যবহার এত বেশি ছিল যে একে ঘিরে নানা রকম গল্প কাহিনী শোনা যায়। সংকেতলিপি পাঠানোর সেরা উপায় ছিল মানুষের শরীর। কথা চালাচালির জন্য মানব শরীরকেই এক অভিনব উপায় ব্যবহার করা হত। ধরা যাক, দুই রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধেছে। এক রাজা হারছেন, অন্যজন জিতছেন। যিনি হেরে প্রায় কোণঠাসা তিনি এবার মিত্র রাজাদের কাছে সাহায্যের জন্য প্রস্তাব পাঠাবেন। কিন্তু রাজ্যের চারদিকে শত্রুসেনার পাহারা। তাহলে খবর পৌঁছনো যাবে কীভাবে? এমন পরিস্থিতিতে অভিনব কৌশল প্রয়োগ করতেন গ্রিক রাজারা।

hareenlaks: History of Steganographyশত্রুদের চোখ বাঁচিয়ে গুপ্ত খবর পাঠানো জন্য দূতদের মাথা ন্যাড়া করে দিতেন। ন্যাড়া মাথায় উল্কির মতো করে সংকেতলিপিতে বার্তা লিখে রাখতেন। এরপর অপেক্ষা করা হত কতদিনে দূতের মাথায় চুল গজাবে। ন্যাড়া মাথা কচি কচি চুলে ভরে গেলে আর সংকেতলিপি বাইরে থেকে বোঝা যাবে না। এবার সেই দূতকে পাঠানো হবে ভিন্ রাজ্যে মিত্র রাজাদের কাছে। সেই রাজ্যের রাজা আবার দূতের মাথা কামিয়ে সংকেত পড়ে নিজের ইচ্ছার কথা লিখে দেবেন। আবারও সেই চুল গজানোর অপেক্ষা। তারপর দূত ফিরে আসবে তার রাজ্যে। গ্রিসে এই ন্যাড়া মাথায় সংকেত লেখার কৌশল খুবই প্রচলিত ছিল এক সময়। এই পদ্ধতি ছিল স্টেগানোগ্রাফির প্রাথমিক দিক।

এই প্রসঙ্গে গ্রিক রাজা মিলানের স্বৈরতন্ত্রী শাসক হিস্টিয়াসের কথা বলাই যায়। স্টেগানোগ্রাফির এই অভিনব কৌশলের জন্য তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়। সেটা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক। গ্রিক ও পারস্যের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ বেঁধেছে। পার্সিয়ান রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তুঙ্গে। হিস্টিয়াসের লোকবল দরকার। তাঁকে সেই খবর পাঠাতে হবে অ্যারিস্টগোরাসের কাছে। যে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, অ্যারিস্টগোরাস থাকেন সেখানেই। অতএব উপায়! একেবারে সিংহের খাঁচায় ঢুকে বাহাদুরি দেখানোর মতো ব্যাপার। সে সময় স্টেগানোগ্রাফির এমন কৌশল ব্যবহার করতেন হিস্টিয়াস। দূতের মাথা ন্যাড়া করে ট্যাটু করে পাঠিয়ে দিতেন। এই ট্যাটুর আড়ালে লেখা হত সংকেত। কাকপক্ষীতেও টের পেত না কীভাবে সকলের চোখের সামনে দিয়েই গোপন খবর আদানপ্রদান হচ্ছে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে।

Steganography: Introduction, Examples and Tools | CommonLounge

গোপন খবর পাঠানোর নানা নিদর্শন পাওয়া গেছে ইতিহাসের জনক হেরোডোটাসের সময়ে। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রিস ও পারস্যের মধ্যে যুদ্ধের যে বিবরণী দিয়েছেন হেরোডোটাস, সেখানে তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন এই সংকেতলিপির কথা। স্টেগানোগ্রাফির এমন আশ্চর্যজনক কায়দার জন্যই পারস্যের রাজার কাছে দাসত্ব স্বীকার করতে হয়নি গ্রিকদের। এ প্রসঙ্গে রাজা ডিমারাটাসের সংকেত পাঠানোর পদ্ধতি ইতিহাস হয়ে আছে। পারস্যের রাজা জেরক্সেসের বিরুদ্ধে স্পার্টানদের উস্কে দেওয়ার জন্য তিনি খবর পাঠাতেন এক নতুন কায়দায়। মানুষের শরীর ব্যবহার করেননি। তবে দূতের হাত দিয়েই চিঠিতে সংকেতলিপি পাঠাতেন। এই চিঠি কাগজের তৈরি নয়। কাঠের গায়ে খোদাই করে সংকেত লিখে তার উপরে মোম গলিয়ে প্রলেপ দিয়ে দেওয়া হত। বাইরে থেকে দেখলে কিছুই বোঝা যেত না। মনে হত কাঠের কোনও ফলক। বার্তা যাঁর কাছে যেত একমাত্র তিনিই বুঝতেন এর রহস্য। মোম গলিয়ে সংকেতের পাঠোদ্ধার করতে হত।

মাথা কামিয়ে সংকেত পাঠানোর এই যে গুপ্ত পদ্ধতি তা কেবল গ্রিসেই ছিল না। ১৮৬০ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময়ও এমন প্রক্রিয়া রপ্ত করেছিলেন গুপ্তচররা। তবে মাথা ন্যাড়া করা হত না সব সময়েও, মেয়েরা তাঁদের খোঁপায় ভরে নিয়ে যেত সংকেত লেখা চিঠি। রোজ গ্রিনহাউ নামে এক মহিলা গুপ্তচর এভাবেই খবর পাঠাতেন। তখন উত্তরের রাজ্যগুলির সঙ্গে দক্ষিণের বিবাদ। রোজের দায়িত্ব ছিল দক্ষিণের দিকে খেয়াল রাখা। তিনি একদিন জানতে পারেন উত্তর থেকে সৈন্যরা হানা দেবে দক্ষিণে। সে খবর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু হাতে করে চিঠি বা কোনও কাগজ নিয়ে যাওয়া চলবে না। কারণ শত্রুসেনাদের গুপ্তচররা থিকথিক করছে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে। নজরদারি খুব কড়া। একবার ধরা পড়লেই ভয়ঙ্কর শাস্তি। তাহলে কী করা যাবে? অনেক ভেবে রোজ এক উপায় বের করলেন। বান্ধবী বেট্টি ডুভালকে বললেন গুপ্ত খবর বয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু খোলাখুলি নয়। বেট্টি শত্রু সেনাদের চেনা মুখ নন। তাই তাঁকে ভিড়ের মাঝে শণাক্ত করা কঠিন। রোজ বেট্টির চুল ভাল করে আঁচড়ে বড় খোঁপা করে দিলেন। এবার সিল্কের সুতো দিয়ে সংকেত সেলাই করে একটি প্যাকেট খোঁপার ভেতর ঢুকিয়ে আটকে দিলেন। মাথায় চিরুণি গুঁজে নতুন রকম হেয়ারস্টাইল বানালেন। তারপর বেট্টিকে পাঠিয়ে দিলেন সঠিক জায়গায়। শোনা যায়, এভাবে নাকি দিনের পর দিন খবর আদানপ্রদান করতেন রোজ। তবে পরে অ্যালান পিনকারটনের কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। এই অ্যালানই আমেরিকায় সিক্রেট সার্ভিস তৈরি করেছিলেন। তবে এমনও শোনা যায়, রোজ নাকি এরপরেও থামেননি। কখনও জামায়, কখনও জুতোয় সেলাই করে গোপন খবর পাঠিয়ে দিতেন। এই কাপড়, কাগজে সেলাই করে খবর পাঠানোর পদ্ধতি প্রাচীন চিন দেশেও প্রচলিত ছিল এক সময়।

এ তো গেল প্রাচীন গ্রিসের কথা। মাথায় বা চুলে ভরে গোপন বার্তা পাঠানোর পদ্ধতি ইতিহাস হয়ে আছে আফ্রিকায়। সেখানের চুলের বাঁধন বা বিনুনিতে সংকেত পাঠাতো হত। এ সংকেত হার-জিতের নয়, এর পিছনে ছিল এক মর্মান্তিক, মনকে ছিঁড়েখুঁড়ে দেওয়া কান্নার ইতিহাস। দাসত্বের নির্মম শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য চুলের বাঁধনেই স্বাধীনতার কথা লিখতেন আফ্রিকার মা-বোনেরা।

মাথার নানা জায়গা থেকে চুল টেনে নিয়ে বিনুনি বাঁধা হত। অনেকগুলো বিনুনি একসঙ্গে নিয়ে উঁচু করে চূড়ো বাঁধা হত। বিনুনি বাঁধার ধরন ও চুল বাঁধার পদ্ধতি ছিল আসলে এক একটা সংকেত। নিষ্ঠুর মনিবদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে কোন পথে পালাতে হবে তার মানচিত্র আঁকা হত এভাবেই। আফ্রিকান মহিলারা এই চুল বাঁধার বিশেষ পদ্ধতিকে বলতেন কর্নরোজ (Cornrows) । এখন তো কর্নরোজ আফ্রিকানদের সিগনেচার স্টাইল হয়ে গেছে। আফ্রিকান শুধু নয়, যে কোনও ফ্যাশনিস্তার পছন্দের হেয়ারস্টাইল কর্নরোজ। কিন্তু এই চুল বাঁধার ধরনের পিছনে রয়েছে লম্বা ইতিহাস। দাসত্বের যন্ত্রণা। স্বজন হারানোর হাহাকার।

A Brief History Of Black Hair Braiding And Why Our Hair Will Never Be A Pop Culture Trend | BET

দাস-ব্যবসার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। ওলন্দাজ বণিকরা দাস নিয়ে আসত জাহাজ ভর্তি করে। দক্ষিণ আফ্রিকার মূল কেন্দ্রটি ছিল কেপ টাউন। তখন এখানে ব্যবসাবাণিজ্যের রমরমা। দাস কেনাবেচাও চলত সমান তালে। ১৬৭৯ সালে ওলন্দাজরা একটা বাড়িই তৈরি করে ফেলে। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জাহাজে করে দাসদের এনে এ বাড়িতে তুলত। মিশর, গ্রিস, ভারত নানা দেশ থেকে দাসদের বোঝাই করে আনা হত। আফ্রিকার কালো মানুষরা তো ছিলেনই। এই বাড়িতে নির্মম অত্যাচারের শিকার হত দাসরা। মুক্তির জন্য তারা নানারকম কৌশল আয়ত্ত করেছিল। যার মধ্যে আফ্রিকান মহিলাদের কর্নরোজ ছিল একটা।

সপ্তদশ শতকে আফ্রিকার এক অঞ্চলের রাজা বেঙ্কোস বিয়োহোর কথাও এসে পড়ে এ প্রসঙ্গেই। বেঙ্কোস দাসপ্রথার বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ক্যারিবিয়ালে সে সময় দাস ব্যবসা এবং কালো মানুষদের উপর অত্যাচার চরমে উঠেছিল। সাদা ও অ-সাদা এই দুই গোষ্ঠীতে সমাজ বিভক্ত ছিল। এই বেঙ্কোস একবার পর্তুগিজদের হাতে ধরা পড়েন। তাঁকে কলম্বিয়ায় নিয়ে আসা হয়। এখান থেকে পালানোর এক উপায় বের করেন তিনি। ২৯ জন বিদ্রোহী দাসকে নিয়ে তাঁর মনিব জুয়ান গোমেজের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যান। তবে এই পালানোর রাস্তা একদিনে আসেনি। দিনের পর দিন কৌশল সাজিয়েছিলেন বেঙ্কোস। যে পথে তাঁদের ধরে নিয়ে যাওয়া হত সেখানে সংকেত ছেড়ে যেতেন। মহিলাদের চুলের কর্নরোজে মানচিত্র আঁকা হত। চুলের বাঁধনেই নানারকম নকশা ফুটিয়ে তোলা হত মাথায়। সেগুলো ছিল পালানোর পথের ম্যাপ। কখনও সংকেতবার্তাও দেওয়া হত। সাহায্যের জন্য বার্তা পাঠানো হত। এভাবেই একদিন পর্তুগিজদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি নিজের জন্য একটা গ্রাম তৈরি করেছিলেন। এখানে বৈষম্য আর দাসত্বের শৃঙ্খল ছিল না। গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের সেনাদলও তৈরি করেছিলেন।

গোপন বার্তা পাঠানোর এমন নানা পদ্ধতি যুগে যুগেই প্রচলিত ছিল। আধুনিক সময় কোড বা ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার বেড়েছে। ক্রিপ্টোগ্রাফিতে গোপন বার্তাকে লুকিয়ে রাখা হয় না, বরং বার্তার মানে গোপন রাখা হয়, যাকে এনক্রিপশন বলে। এমন বার্তার অর্থ উদ্ধার করতে হলে ডি-কোড করতে হয় যা শুধু প্রেরক ও প্রাপকই জানেন। তাই বার্তা শত্রুর হাতে পড়লেও ভয় নেই, কারণ কোডিংয়ের জ্ঞান ছাড়া তার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব নয়।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More