ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলেই ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের ঝুঁকি বাড়বে, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞ

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

করোনা আবহে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। করোনা চিকিৎসায় থাকা বা কোভিড সারিয়ে ওঠা রোগীদের ছত্রাকের সংক্রমণ বেশি ধরা পড়ছে। অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, শুধু কোভিড থাকলেই কি ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের রোগ বা মিউকরমাইকোসিস হবে? মিউকরমাইকোসিস অন্যান্য জটিল অসুখ থেকেও হতে পারে। তবে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে গেলে মিউকরমাইকোসিসের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে, কোভিডের বাড়াবাড়ির মূলে প্রায় ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস দায়ী। করোনার জন্য যে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেতে হয় তাতে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, তখনই ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের ঝুঁকি বাড়ে। আবার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই এমন রোগীরাও আছেন হাই-রিস্ক গ্রুপে।

আসল কথা হল, করোনা সংক্রমণ এবং ডায়াবেটিস এই দুইয়ের প্রভাবেই মিউকরমাইকোসিস এমন বাড়াবাড়ি জায়গায় চলে গেছে। ডায়াবেটিস থাকলে এমনতিও শরীরের নানা অঙ্গে তার প্রভাব পড়ে,ক্ষতিগ্রস্থ হয় চোখের রেটিনা। মিউকরমাইকোসিসেও তেমনই রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। রোগীর ফুসফুস, সাইনাস, মস্তিষ্ক, চোখে জটিল অসুখ ধরা পড়ছে।

এখন জেনে নেওয়া যাক, মিউকরমাইকোসিস কী? মিউকরমাইসিটিস নামে এক শ্রেণির ছত্রাকের সংক্রমণে যে রোগ হয় তাকে বলে মিউকরমাইকোসিস। পচে যাওয়া গাছের পাতা, নোংরা-আবর্জনা, প্রাণীর মৃতদেহ বা মলমূত্র ইত্যাদি থেকে এই ছত্রাক জন্ম নেয়। এদের রেণু বাতাসে মিশে ভেসে বেড়ায়। শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকে গেলে দেহকোষগুলিকে সংক্রামিত করে। নাক, মুখ, ত্বকের ছিদ্র দিয়েও সহজে ঢুকে পড়ে মানুষের শরীরে। শরীর যদি দুর্বল হয় ও রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমে আসে তাহলে এই ছত্রাকের রেণু শরীরে ঢুকলে তা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। শরীরের যে অঙ্গে সংক্রমণ ছড়ায় সেখানে কালো আস্তরণের মতো পড়ে যায়, নাক থেকে কালো দুর্গন্ধযুক্ত তরল বেরতে দেখা যায় অনেকের, তাই একে কালো ছত্রাকের রোগ বলা হয়।

Black fungus: Centre issues advisory on management of Mucormycosis in Covid  patients | India News - Times of India

ডায়াবেটিস চিন্তার কারণ?

আমাদের দেশে ডায়াবিটিসের প্রকোপ খুব বেশি। অনিয়মিত জীবনযাপনের ফলে ৩০ পেরতে না পেরতেই বহু মানুষ এর কবলে পড়েন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তেমনি রক্তে শর্করার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে কোভিডের জটিলতাও বাড়ে। আর যদি কোভিড ও ডায়াবেটিস একই সঙ্গে থাকে, তাহলে চিন্তা আরও বেশি।

আরও একটা সমস্যা হচ্ছে ডায়াবেটিসের ওষুধ। ডায়াবেটিক কিটো অ্যাসিডোসিস বা ডিকেএ নামের সমস্যা একবার হয়ে গেলে করোনার কারণে জটিলতা আরও বেড়ে যায়। তখন সেই পরিস্থিতিকে সামলানোর জন্য যে ধরনের ওষুধ দেওয়া হয় তার ডোজ বেশি হলেই বিপদ। যেমন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ। এর ব্যবহার নিয়ম মেনে না হলে নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তখন মিউকরমাইকোসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

What is Mucormycosis? Centre warns that it may turn fatal if uncared for-  All you need to know!

ডায়াবেটিস থেকে কীভাবে হতে পারে মিউকরমাইকোসিস?

রক্তে শর্করার মাত্র অতিরিক্ত বেড়ে গেলে সেই অবস্থাকে বলা হয় হাইপারগ্লাইসেমিয়া। এই হাইপারগ্লাইসেমিয়া কালো ছত্রাকের রোগ তথা মিউকরমাইকোসিসের অন্যতম রিস্ক-ফ্যাক্টর। হাইপারগ্লাইসেমিয়ার কারণে বিভিন্ন কগনিটিভ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

হাইপারগ্লাইসেমিয়া হলে এন্ডোথেলিয়াল রিসেপটর জিআরপি৭৮ এর সক্রিয়তা বেড়ে যায়। যে কারণে পলিমরফোনিউক্লিয়ার ডিসফাংশন দেখা দেয় রোগীর। শরীরের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস তখন তার পুষ্টির জন্য আয়রন ও অন্যান্য উপাদান সেইসব কোষ থেকে পেয়ে যায়। ফলে সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে।

আরও একটা কারণ হল কোভিড ও ডায়াবেটিস একসঙ্গে থাকলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনিয়মিত হয়ে যায়। তখন রক্ত নালিকায় রক্ত জমতে থাকে, সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়। যে কারমে ব্লাড ক্লট বা থ্রম্বোসিস ঘটে। তাতে শরীরের প্রত্যন্ত অংশে রক্ত সরবরাহ বাধা পেয়ে সেখানকার কোষ মরে যায়। মৃত কোষে, স্যাঁতসেতে পরিবেশে কালো ছত্রাক জন্ম নেয়।

Mucormycosis (Black Fungus) Symptoms, Treatment & Diagnosis

স্টেরয়েডের বেশি ব্যবহার বিপদ বাড়াতে পারে?

মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে থাকে। যদি বাইরে থেকে কোনও ভাইরাস বা পরজীবীর সংক্রমণ হয় তাহলে শরীর তার প্রতিরোধে সাড়া দেয় ও ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সক্রিয়তারও একটা সীমা আছে। যদি দেখা যায় রোগ প্রতিরোধে ইমিউন সিস্টেম অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছে তখনই প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন শুরু হয়ে যায়। সংক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে উল্টে শরীরের সুস্থ কোষগুলিই ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রেও এমনটাই হচ্ছে রোগীর শরীরে। অতিসক্রিয় ইমিউন সিস্টেমের কারণে সাইটোকাইন স্টর্ম দেখা দিচ্ছে। এই অতিসক্রিয়তাকে নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন রেসপন্স ফিরিয়ে আনার জন্যই স্টেরয়েডের ব্যবহার করতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। আর গণ্ডগোলটা হচ্ছে সেখানেই।

Covid-19: Is mucormycosis contagious? | Deccan Herald

স্টেরয়েডের বেশি ব্যবহার রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমিয়ে দেয়। নানা রকম জটিল রোগ ধরতে থাকে শরীরে। আর রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমে গেলেই ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, স্টেরয়েডের ব্যবহারে রক্তে শর্করার পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে। ব্লাড সুগার লেভেল ১০০-১১০ এর চেয়ে বেশি হলে ঝুঁকির কারণ আছে। ১৪০ ছাড়িয়ে গেলে তা বিপজ্জনক হতে পারে। তাছাড়া ডায়াবেটিস রয়েছে এমন করোনা রোগী যাঁদের স্টেরয়েড দেওয়া হচ্ছে তাঁদের ডোজ বেশি হয়ে গেলেই বিপদ। তখন ছত্রাকের সংক্রমণ ধরে যাচ্ছে।

Lethargy and vision loss: successful management of rhinocerebral  mucormycosis | BMJ Case Reports

কীভাবে সতর্ক থাকবেন?

মিউকরমাইকোসিস থেকে বাঁচতে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের বিশেষ করে সতর্ক থাকতে হবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর ব্লাড সুগার টেস্ট করাতে হবে, মিউকরমাইকোসিসের সামান্য লক্ষণ দেখা দিলেই ডাক্তারের পরমর্শ নিতে হবে। চোখ লাল হয়ে ফুলে যাওয়া, চোখ না নাকের চারপাশে ব্যথা হতে পারে। নাকের ওপর কালচে ছোপ, নাক থেকে কালো তরল বেরিয়ে আসা, জ্বর, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঘন ঘন বমি, মুখের একপাশের পেশিতে ব্যথা, দাঁত আলগা হয়ে আসা, দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে বা  ডবল ভিশন, ত্বকের সংক্রমণ, র‍্যাশ দেখলেই সতর্ক হতে হবে। আর নিজে থেকে স্টেরয়েড বা কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় সাপ্লিমেন্ট বা অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ওষুধ খাওয়া একেবারেই ঠিক হবে না।

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More