মোবাইলের রশ্মি সজোরে ধাক্কা দেয় মাথায়, বাড়ে মনের অসুস্থতাও, কী ক্ষতি হচ্ছে বললেন বিশেষজ্ঞ

একসঙ্গে বসে গল্প-আড্ডার দিনও তো শেষ হয়ে এল প্রায়। আপনজনদের মাঝে বসেও মানুষ এখন একা। মুঠোফোনের স্ক্রিনেই তার নজর বন্দি। যে কারণে সম্পর্কে ভাঙন, একাকীত্ব, মানসিক অবসাদের মতো রোগেরও উপদ্রবও বেশি। মোবাইল প্রয়োজন, মনোরঞ্জনের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু সুস্থ মনের চাবিকাঠি কখনওই নয়।

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

হাতে এক টুকরো মুঠোফোন এখন হীরের চেয়েও বেশি দামি। মোবাইলেই অভ্যস্ত জীবন। একে ছাড়া জগৎ-সংসার যেন অন্ধকার। মোবাইল যেন কোনও ইলেকট্রনিক গ্যাজেট নয়, নিজেকে ঢেকে রাখার মুখোশ। চিন্তা, ভাবনা, অভিব্যক্তির প্রকাশ এখন এই মুঠোফোনেই বন্দি। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ভাব বিনিময় এখন আর মুখোমুখি হয় না, সবই মোবাইলের সোশ্যাল সাইটে। ডিজিটাল যুগে যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে মানুষও। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে শরীরে, মনে, সমাজ, সভ্যতায়।

মোবাইলের সুবিধা যেমন অনেক, ক্ষতিকর দিকও কম কিছু নয়। শারীরিক ক্ষতি তো বটেই, মনের অসুস্থতার কথাও এড়িয়ে গেলে চলবে না। কোনও একটা সময় মোবাইল ছাড়া নিজেকে ভেবে দেখুন, মন আনচান করবে। আর চোখের সামনে সাধের মুঠোফোনটিকে না দেখতে পেলে, যেন সাইক্লোন বয়ে যাবে। এই যে অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা সেটাও এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা। যার ছাপ পড়ে শরীরেও। মোবাইল এর জন্য দায়ী।

একসঙ্গে বসে গল্প-আড্ডার দিনও তো শেষ হয়ে এল প্রায়। আপনজনদের মাঝে বসেও মানুষ এখন একা। মুঠোফোনের স্ক্রিনেই তার নজর বন্দি। যে কারণে সম্পর্কে ভাঙন, একাকীত্ব, মানসিক অবসাদের মতো রোগেরও উপদ্রবও বেশি। মোবাইল প্রয়োজন, মনোরঞ্জনের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু সুস্থ মনের চাবিকাঠি কখনওই নয়।

 

মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন সজোরে ধাক্কা দেয় মস্তিষ্কে

মোবাইল বেশিক্ষণ কানে চেপে থাকলে মাথা ধরে যায়। কান-মাথা গরম হয়ে যায়। ডাক্তাররা তো হামেশাই বলেন, হেডফোনে বেশি জোরে গান শুনতে না, তাহলে মাথা যন্ত্রণা আরও বাড়বে। মস্তিষ্কের রোগও হতে পারে। মাথার স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়বে। এর কারণ কী? আসলে মোবাইল ফোন বার্তা পৌঁছে দেয় তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে। এখন রশ্মির বিকিরণ যখন হচ্ছে সেটি ছোট ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রশ্মিতে ভেঙে যায়। একে আমরা মাইক্রোওয়েভ বলি। এই মাইক্রোওয়েভ রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য এক মিটার থেকে এক মিলিমিটার হতে পারে। কম্পাঙ্ক হতে পারে ৩০০ মেগাহার্টজ় থেকে ৩০০ গিগাহার্টজ় পর্যন্ত।

How Cell Phone Radiation Affects our Brain's Activity | VEST | Radiation Blocking Products for Everyday Use

এই মাইক্রোওয়েভই হল যত নষ্টের গোড়া। মোবাইল থেকে যে মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন বের হচ্ছে তা সরাসরি মাথায় গিয়ে আঘাত করছে। এখন তো মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশনকে কাজে লাগিয়ে অস্ত্র তৈরি হচ্ছে। দূর থেকে রশ্মি ছুড়ে ঘায়েল করা যায় শত্রুসেনাকে। এই রশ্মি যত সূক্ষ্ম হবে ততই তার ক্ষতিকর প্রভাব বেশি। স্নায়ুর দফারফা করে দেবে। যে কারণে দেখা যায় বেশিক্ষণ মোবাইলে কথা বললে কান, মাথা গরম হয়ে যায়। মাথার ভেতর দপদপ করে। অনেকের আবার বেশিক্ষণ হেডফোনে গান শুনলে বা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকলে মাথা ঘোরে, বমিভাব আসে, ঘাড়ে ও মাথার পেছনে যন্ত্রণা শুরু হয়। মাইগ্রেনের ব্যথা থাকলে সেটাও চড়চড় করে বাড়ে।

Mobile Phone Radiations Health Risk - Government says Yes!

তেজস্ক্রিয় রশ্মি তো বটেই মোবাইলের খারাপ গুণ অনেক। সারা শরীরেরই ক্ষতি করতে পারে।

হাতের পেশিতে চাপ পড়ে, প্রদাহ হয় আঙুলে

জানতেন কি, মোবাইল বেশিক্ষণ হাতে ধরে রাখলে বা আঙুল দিয়ে খুটখাট করলে পেশির মারাত্মকভাবে জখম হতে পারে। প্রদাহ হয় টেন্ডনে। আঙুলের পেশি ফুলে যায়। হাতের কব্জি, কনুইতে ব্যথা শুরু হয়। বেশি সময় ধরে মোবাইল কি-প্যাডে  টাইপ করলে আঙুলের গাঁটে ব্যথা হতে পারে। এমনকি আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।  অনেকক্ষণ ফোন ধরে রাখলে এমনিতেই হাতের কব্জি ব্যথা করে, তাই এই অভ্যাস যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে পেরিটেনডিনাইটিসের মতো রোগের উপসর্গ দেখা দেয়।

Negative Effects of Cell Phones on Your Health | Kids Cell Phone Monitoring Issues | Pumpic Blog

মোবাইলের নীল রশ্মি চোখের জন্য মোটেও ভাল নয়

মায়োপিয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় মোবাইল ফোন। একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে ব্যথা করে, শুষ্ক হয়ে যায়, জ্বালা করতে থাকে। রাতে শুয়ে অন্ধকারে ফোন ঘাঁটার অভ্যাস আছে বেশিরভাগেরই। বিশেষত কমবয়সীরা ঘুমোবার আগে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বা মেসেজ করতে অভ্যস্ত। রাতের অন্ধকারে ফোন দেখার ফলে প্রচণ্ড চাপ পড়ে চোখে। ড্রাই আইসের সমস্যা দেখা দেয় অনেকেরই। চোখের রেটিনার ক্ষতি হয়। কনজাঙ্কটিভাল রোগও হতে পারে।

Blue Light and Your Eyes - Prevent Blindness
ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দেয় মোবাইল

ঘুমোবার আগে মোবাইল দেখা মানেই ঘুমের বারোটা বেজে যাওয়া। মোবাইল, ট্যাবলেট বেশিক্ষণ ব্যবহার করলেই শরীরে মেলাটোনিন ক্ষরণ প্রায় ২২ শতাংশ কমে যায়। মেলাটোনিন উৎপাদন কমে যাওয়া মানেই শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়াগুলো ব্যাহত হওয়া। দেখা গেছে, ঘুমোবার সময় যারা মোবাইল করে তাদের অনিদ্রা রোগের ঝুঁকি বেশি। মোবাইল থেকে বেরনো রশ্মিতে মস্তিষ্কের স্নায়ু সজাগ হয়ে যায়। ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না।

Relax, Turn Off Your Phone, and Go to Sleep

ঘাড়ে-মাথায় ব্যথা এখন ঘরে ঘরেই

ঘাড় ঝুঁকিয়ে মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকলে ব্যথা তো হবেই। পেশিতে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। যে কারণে ব্যথা শুরু হয়। ঘাড়ে, গলায় সমস্যা হয় অনেকের। ক্রনিক হাইপারমিয়া দেখা দেয়। স্পন্ডিলোসিসের রোগ বাঁধিয়ে বসেন অনেকেই।

 

ক্ষতি হয় ত্বকের, শুক্রাণু উৎপাদনও কমে

মুখ-চোখের একেবারে কাছাকাছি ফোন নিয়ে এলে তার ছাপ পড়ে ত্বকে। বেশিক্ষণ মোবাইল দেখলে চোখ ফুলে যায়, ক্লান্ত দেখায়। অনেকেই জানেন না, সর্বক্ষণ নাকের একেবারে ডগায় ফোন নিয়ে এসে দেখলে মুখের ত্বকেও কালচে ছোপ পড়তে পারে। ব্রণ, অ্যাকনের সমস্যাও হতে পারে।

মোবাইল ফোন থেকে বের হওয়া মাইক্রোওয়েভ রশ্মি মস্তিষ্কের ক্যানসারের কারণ। এই রশ্মি শরীরে ঢুকলে নানাবিধ রোগ হতে পারে। শরীরের কোষগুলিতে ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ হয়। রেশ পড়ে পুরুষের প্রজননতন্ত্রেও। শুক্রাণুর ঘনত্ব কমে যেতে পারে।

 

দুর্বল হয় স্নায়ু, মস্তিষ্কের রোগ দেখা দিতে পারে

মোবাইল থেকে দুধরনের রেডিয়েশন হয়, এক, স্ক্রিন রেডিয়েশন, দুই, বডি সিগন্যাল রিসেপশন। সাধারণত আমাদের শরীরে পজিটিভ ও নেগেটিভ আয়নের মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকে। মোবাইল ফোনের উচ্চ কম্পাঙ্কের রশ্মি এই ভারসাম্যকে বিগড়ে দেয়। একটানা মোবাইলে কথা বললে বা স্ক্রিনের দিকে দেখলে মাথার স্নায়ুতে তার প্রভাব পড়ে। দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনার শক্তি কমতে থাকে। মানসিক অবসাদেরও ঝুঁকি বাড়ে।

Cell Phone Radiation - How Safe Is Your Mobile Phone? - MobLogOn

মোবাইলে কথা বলুন, কিন্তু খেয়াল রাখুন শরীরেরও

টানা ফোনের দিকে তাকাবেন না। কয়েক সেকেন্ড করে চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে নিন। এতে মোবাইলের ক্ষতিকর রশ্মি সরাসরি চোখে ঢুকবে না।

ঘাড় একদিকে কাত করে কথা বলার চেয়ে ব্লুটুথ ব্যবহার করা ভাল। গাড়ি চালানোর সময় অনেকেই এভাবে কথা বলেন, এটা একেবারেই ঠিক নয়। হেডফোনে সমস্যা হলে ব্লুটুথ ভাল। বা স্পিকার অন রেখে কথা বলুন। কানের থেকে কিছুটা দূরে মোবাইল রাখাই ভাল।

ঘাড় ও মাথার ব্যায়াম খুব জরুরি। মাথা নিচু করে একটানা মোবাইল দেখবেন না। ১০ থেকে ২০ বার নেক রোটেশন, মাথার ব্যায়াম করে নেওয়া ভাল।

মাথার কাছে ফোন নিয়ে না শোওয়াই ভাল। বরং ঘরের বাইরে ফোন রেখে দিন।

দৈনন্দিন জীবনে ফোনকে প্রয়োজনের জন্য ব্যবহার করুন। অভ্যাস করে ফেললেই মুশকিল। এর প্রভাব শুধু শরীরে নয়, সম্পর্কেও পড়তে বাধ্য।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More