মেটাবলিক সিনড্রোম হানা দিচ্ছে ছোট থেকেই, বয়সকালে বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি

চৈতালী চক্রবর্তী

এই ব্যস্ততার সময় লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্টকে বাতিলের খাতাতেই রেখেছি আমরা। সঠিক সময়ে খাওয়া দাওয়ার বালাই নেই, শরীরচর্চা মানেই একরাশ আলস্য। মানসিক চাপ কমাতে সিগারেটে টান। অ্যালকোহলে আসক্তি। সব মিলিয়ে ওজন বাড়ছে হুড়হুড়িয়ে। রক্তে লাগামছাড়া ট্রাইগ্লিসারাইড। ব্লাড সুগার সপ্তমে, ইউরিক অ্যাসিডও বাড়ছে। সেই সঙ্গে উদ্বেগ, উচ্চ রক্তচাপ তো আছেই। এক কথায় শরীরজুড়েই নানা রোগ, নিত্যদিন অসুস্থতা। রোজকার জীবনযাপনের এই রোগগুলোই যখন জোট বেঁধে বড় আকার নেয়, তখন তাকে বলে মেটাবলিক সিনড্রোম। যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে হার্টে। বলা বাহল্য মেটাবলিক সিনড্রোম কীভাবে হার্ট এজিংয়ের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে সে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় অ্যাপোলো গ্লেনেগলস হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর প্রকাশ চন্দ্র মণ্ডল।

How Healthy is Your Heart? - Saint Mary's County Health Department

‘মেটাবলিক সিনড্রোম’ নামটাই অজানা, মাথা ঘামাই না আমরা

আমরা সারাদিন যা যা করছি, কী খাচ্ছি, কতটা শরীর নাড়াচাড়া করছি, কতটা সংযম রাখছি রোজকার যাপনে, এই সবকিছুই কিন্তু মেটাবলিক সিনড্রোমের সঙ্গে জড়িত। অথচ এই নামটাই বেশিরভাগের অজানা। এশিয়দের মধ্যে বিশেষ করে ভারতীয়রা সবচেয়ে বেশি মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়। রোগের লক্ষণ দেখা দেয় ছোট থেকেই। অথচ আমরা খেয়াল করি না। বয়স বাড়লে রোগটা পাকাপোক্তভাবে বসে যায় শরীরে। তখন আমরা রোগ সারাই না, বরং রোগীর চিকিৎসা করি।

তাই মেটাবলিক সিনড্রোম কী সেটা আগে জানতে হবে। সহজ করে বললে, এই যে হঠাৎ করে ওজন বাড়ছে। পেট-কোমরে থলথলে চর্বি জমছে, কোমর চওড়া হযে যাচ্ছে যাকে আমরা স্থূলত্ব বা ওবেসিটি বলছি, এও কিন্তু মেটাবলিক সিনড্রোমেরই উপসর্গ। তারপর ধরা যাক রক্তের গোলমাল যেমন কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, খারাপ কোলেস্টেরল স্তরে স্তরে জমছে, ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ছে, গ্লুকোজের পারদ চড়ছে, ইউরিক অ্যাসিড জমছে আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রক্তচাপ। এই সবকিছুই কিন্তু একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাওয়া, ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া সব মিলিয়ে যে রোগের জন্ম দিচ্ছে তাই হল মেটাবলিক সিনড্রোম। আর রোগের ফল গিয়ে পড়ছে হার্টের ওপরে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে, দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে হার্টের। ঝুঁকি বাড়ছে হৃদরোগের।

METABOLIC SYNDROME

রোগের শুরু টিনএজ থেকেই, ‘ট্রাঙ্কাল ওবেসিটি’ জানেন তো!

আর একটা কথা বলি, এই মেটাবলিক সিনড্রোম শুধু হার্টের রোগ নয়, স্ট্রোক, ডায়াবেটিসের শঙ্কাও বাড়িয়ে দেয় অনেকটা। মেটাবলিক সিনড্রোমকে ‘সিনড্রোম এক্স’ বা ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সিনড্রোম’ বা ‘ডিসমেটাবলিক সিনড্রোম’ও বলা হয়। রোগের সূত্রপাত কিন্তু ছোট বয়স থেকেই হয়। টিনএজের ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ বেশি দেখা যায়। সে সময় কেউ আমল দিতে চায় না। বয়স যখন ৩৫ ছাড়ায়, তখনই নানা উপসর্গ বড় হয়ে দেখা দিতে থাকে। আজ কোলেস্টেরল বেশি, তো কাল ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ছে, রক্তে শর্করা বাড়ছে, মেদ জমছে ইত্যাদি নানাটা ধরতে থাকে শরীরে। অথচ যদি ছোট বয়স থেকেই রোগের লক্ষণ চিনে সতর্ক হওয়া যায়, তাহলে বয়সকালে সমস্যা তৈরিই হয় না।

Abdominal obesity - Wikipedia

ছোটবেলায় দেখা যায় হঠাৎ করে মেদ জমতে শুরু করেছে। বুক, পেট, কোমর চওড়া হচ্ছে। শরীরে ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা কমছে। হাত-পায়ের তুলনায় পেট ফুলে যাচ্ছে। তখন সতর্ক হতে হবে। রক্তের পরীক্ষা করাতে হবে। আরও একটা ব্যাপার চিন্তার যা হল ট্রাঙ্কাল ওবেসিটি বা অ্যাবডোমিনাল ওবেসিটি। ভুঁড়ি বাড়তে থাকে। অনেকেরই দেখবেন, পেট ও তলপেটে মেদের ভাগ বেশি। কোমর চওড়া এবং পেটে মেদ জমে ফুলতে শুরু করেছে। এই দশাকেই বল ট্রাঙ্কাল ওবেসিটি। সেন্ট্রাল ওবেসিটিও বলেন অনেকে। তখন মেদ না ঝরালে কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মেদ তো কেবল বাইরে জমে না, পাকস্থলীর ভেতরেও জমে। তখন অগ্ন্যাশয়ে চাপ পড়তে থাকে। ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণও বেড়ে যায়। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।

Obesity: Metabolic and Clinical Consequences - The Medical Biochemistry Page

মেটাবলিক সিনড্রোম বুঝবেন কীভাবে?

ওই যে বললাম ট্রাঙ্কাল ওবেসিটি এই রোগের একটা লক্ষণ। আরও আছে যেমন, ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’। মানে হল, শরীর আর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না যা গ্লুকোজ ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাবে। ফলে এই দুটোই রক্তে বাড়তে থাকে। রক্তচাপ বেড়ে যায়। লিপিড প্রোফাইলে গোলমাল দেখা দেয়, হাই ট্রাইগ্লিসারাইড, কম এইচডিএল ও হাই অক্সিডাইজড এলডিএল—এই তিনটিকে একসঙ্গে বলে ডেডলি কম্বিনেশন। রক্ত পরীক্ষা করালেই রোগ ধরছে কিনা তা সামনে আসবে।
আরও কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যাবে যেমন, কোমরের মাপ বাড়তে থাকবে। ছেলেদের ক্ষেত্রে ৪০ ইঞ্চি বা তার বেশি, মহিলাদের ৩৫ ইঞ্চি বা তার বেশি। ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেল ১৫০ ছাড়াবে। হাই ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন লেভেল নেমে যাবে ৪০ মিলিগ্রাম (পুরুষ) ও ৫০ মিলিগ্রামের (মহিলা)নীচে। হোমোসিস্টিন লেভেল বাড়তে থাকে। থ্রম্বোসিস বা রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণও দেখা যায় শরীরে।

 

Acanthosis Nigricans
ঘাড়ে-গলায় কালো কালো ছোপ পড়ছে? তা হলে সাবধান

মেটাবলিক সিনড্রোমের এটাও একটা লক্ষণ। অনেক সময় দেখা যায়, ঘাড়ে, গলায়, বগলে, হাতের তালুর ওপরে খয়েরি বা কালো কালো ছোপ পড়ছে। স্কিন ট্যাগ দেখা যাচ্ছে। একে ডাক্তারি ভাষায় বলে ‘অ্যাকান্থোসিস নাইগ্রিক্যানস’। ইনসুলিন রেডিস্ট্যান্স ও হাইপারইনসুলিনেমিয়াতে এই ধরনের স্কিন ট্যাগ দেখা যায়। কম বয়সীদের মধ্যেই এই স্কিন ট্যাগ বেশি দেখা যায়। সাধারণও ওজন বেশি হলে বা ওবেসিটি থাকলে এই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। হাইপোথাইরয়েডিজম, অ্যাক্রোমেগালি, পলিসিস্টিক ওভারি ডিজিজ থাকলেও স্কিন ট্যাগ হতে পারে। তখন সাবধান হতে হবে।

Childhood acanthosis nigricans Das A, Misra P, Panda S - Indian J Paediatr  Dermatol
ছোট থেকেই এইসব লক্ষণ দেখে সচেতন না হলে ৩৫ বছরের পরে গিয়ে হার্টের রোগ দেখা দেবে। অনেক রোগীই আসেন আচমকা বুকে ব্যথা নিয়ে। যাকে বলে অ্যাকিউট প্রেজেন্টেশন, এশীয়দের মধ্যে এটা বেশি দেখা যায়। একে থ্রম্বোজেনিক প্রেজেন্টেশনও বলে। হৃদ্‌যন্ত্রের ধমনীতে চর্বি জমে সরু হয়ে যায়। তখন রক্ত প্রবাহ বাধা পায়, রক্ত জমাট বাঁধতে দেখা যায়। পরিণাম হার্ট অ্যাটাক।

ছোটদের যখন তখন ফাস্ট ফুড নয়, বাবা-মায়েরা শুনছেন তো

ওই যে বললাম, স্থূলত্ব বা ওবেসিটি মেটাবলিক সিনড্রোমের মারাত্মক এক রিস্ক ফ্যাক্টর। ছোট থেকেই জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে। তারপর বয়স বাড়লে ডালপালা মেলে। স্থূলত্বের কারণে শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধে। হার্টের ক্ষমতা কমে, ফুসফুসের কার্যকারীতা কমে। ফ্যাটি লিভার, লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন অনেক রোগীই। অধিক স্থূলত্ব থেকে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, লিভার, খাদ্যনালীর রোগ এমনকি হরমোন ক্ষরণেরও তারতম্য দেখা দেয়। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই কমে যায়।

Fast Food Buffer Zones Around Schools Will Decrease Childhood Obesity  Rates, Says Doctors - Organic Authority

ছোটবেলা থেকেই শিশুকে নির্দিষ্ট নিয়মে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। মা-বাবাকেও মানতে হবে কিছু নিয়ম। রান্না করতে ইচ্ছে করছে না বলে শিশুকে যথেচ্ছ সাপ্লিমেন্ট বা হেলথ ড্রিঙ্ক খাইয়ে রাখা, কিংবা যখন তখন বায়না করলেই চকোলেট দিয়ে বায়না মেটানো, ঘুম থেকে তুলে পড়তে বসানো এ সব অভ্যাস বদলাতেই হবে।

How Do You Treat Metabolic Syndrome?
শরীরচর্চার অভ্যাস হোক ছোট থেকেই, মেদ কমান, ভাল থাকবে হার্ট

ছোট থেকে শরীরচর্চার অভ্যাস তৈরি হলে মেদ জমার প্রবণতা কমে। যে খাবারই খান, তা যেন প্রাকৃতিক ভাবে উৎপন্ন হয়। সোজা কথায় বললে, প্যাকেটজাত বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চেষ্টা করুন পাতে টাটকা ও প্রাকৃতিক খাবার রাখতে। প্রক্রিয়াজাত খাবারে অতিরিক্ত চিনি ও লুকনো ট্রান্স ফ্যাট মেদ জমায়। আজকাল প্যাকেটজাত প্রসেসড মিট খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। প্রসেসড মিট বেশি খেলে পাকস্থলিতে কিছু ক্ষতিকারক ব্যাকটিরিয়া দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করে৷ যা মাংসের কারনিটিন নামের উপাদান ভেঙে গিয়ে ট্রাইমিথাইল্যামিন যৌগে পরিণত হয়। রক্তে শোষিত হয়ে, লিভারের বিপাক ক্রিয়ায় ভেঙে ট্রাইমিথাইল্যামিন-এন-অক্সাইডে পরিণত হয় যা হার্টের সূক্ষ্ম রক্তনালিতে চর্বি জমিয়ে ইসকিমিক হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সব রকম খাবারই রাখতে হবে খাদ্যতালিকায়। তাতে যেমন প্রোটিন থাকবে, তেমনই ফ্যাট ও শর্করাও। সবই রাখতে হবে পরিমাণ মতো। সে ক্ষেত্রে ফ্যাট নিতে হবে প্রয়োজনীয় মাছ-মাংস বা রান্নায় যেটুকু তেল লাগছে তা থেকেই। বাড়তি ফ্যাটযুক্ত খাবার তালিকায় না রাখাই ভাল।

Mintel Finds Americans Prefer Exercise To Healthy Eating - Nutraceuticals  World

ওবেসিটির মূল কারণই হচ্ছে শরীরচর্চার অভাব। বাচ্চারা খেলাধূলা এখন অনেক কম করে, তাছাড়া অনেকেই এক জায়গায় বসে ঘণ্টার পরে ঘণ্টা কাজ করছেন। ফলে শারীরিক পরিশ্রম সেভাবে হচ্ছেই না। কাজের জায়গায় মানসিক চাপও আছে, সব মিলিয়ে তাই হার্টের ওপরেও চাপ পড়ছে।

Live with a healthy heart - eHealth Magazine
মেটাবলিক সিনড্রোম প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় দাওয়াই হল লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট। জাঙ্ক ফুড কমিয়ে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও যোগব্যায়াম করতে হবে। সেই সঙ্গে নেশার মাত্রা কমাতে হবে। কম বয়সীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা খুবই বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অ্যালকোহলের নেশা। ধূমপানে লাগাম না টানলে আগামী দিনে খুব বড় বিপদ হতে পারে সেটা বুঝতে হবে জেন এক্স-জেন ওয়াইদের। ঝালমশলার খাবারের বদলে রোজকার ডায়েটে রাখতে হবে ডাল, মাছ, মুরগির মাংস, সবুজ শাকসব্জি, ফল আর সয়া প্রোটিন। এই নিয়ম মেনে চললে মেটাবলিক সিনড্রোমকে বুড়ো আঙুল দেখানো যাবে সহজেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More