ঘন ঘন স্যানিটাইজার একদম নয়, মিষ্টি গন্ধেও লুকিয়ে বিপদ, কী করা উচিত বললেন বিশেষজ্ঞ

হ্যান্ড-স্যানিটাইজার ভাল না মন্দ, সেই নিয়ে নিশ্চিত মতামত এখনও পাওয়া যায়নি। তবে স্যানিটাইজারের কিছু খারাপ গুণ আছে সেটা ত্বকের জন্য মোটেও ভাল নয়। বরং বেশি স্যানিটাইজার ব্যবহার করলে তার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে।

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

করোনা সংক্রমণ কালে মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস হয়ে উঠেছে ফেস-মাস্ক ও হ্যান্ড-স্যানিটাইজার। ভাইরাস থেকে বাঁচতে মাস্ক বাধ্যতামূলক, এতে কোনও সন্দেহই নেই। গোল বেঁধেছে স্যানিটাইজার নিয়ে। রাস্তায় ঘুরে এলে হাতে দু’ফোঁটা স্যানিটাইজার, যত্রতত্র যেখানে সেখানে হাতে ঘন ঘন স্যানিটাইজার ঢেলে ঘষে নেওয়া কতটা সুরক্ষিত সেই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডাক্তাররা বলছেন, স্যানিটাইজার জীবাণুনাশক তো বটেই, কিন্তু এর বেশি ব্যবহার ত্বকের জন্য ভাল নাও হতে পারে। জীবাণু মারার রাসায়নিক ও অ্যালকোহল সবসময় শরীরের সংস্পর্শে এলে তার প্রভাব খারাপও হতে পারে।

হ্যান্ড-স্যানিটাইজার ভাল না মন্দ, সেই নিয়ে নিশ্চিত মতামত এখনও পাওয়া যায়নি। তবে স্যানিটাইজারের কিছু খারাপ গুণ আছে সেটা ত্বকের জন্য মোটেও ভাল নয়। বরং বেশি স্যানিটাইজার ব্যবহার করলে তার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে। আসলে, যেসব রাসায়নিকের মিশ্রণে স্যানিটাইজার তৈরি হয়, তাদের অনুপাত যে সবসময় সঠিক হবে এমনটা নয়। তাই স্যানিটাইজারের উপরে খুব একটা ভরসা করতে পারছেন না ডাক্তাররা। বরং, বারে বারে স্যানিটাইজার না ঢেলে সাবান-জলে হাত ধুয়ে নেওয়ার পরামর্শই দিচ্ছেন অনেকে।

১৯৯০ সাল থেকে হ্যান্ড-স্যানিটাইজার মানুষের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নেয়। সাবান নিয়ে ঘোরা সম্ভব নয়, অথচ স্যানিটাইজার ব্যাগে ভরে নিয়ে যাওয়া যায়, স্যানিটাইজার দিলে হাত ধোওয়ার দরকার পড়ে না, খাটনি কম কিন্তু কাজ বেশি—তাই স্যানিটাইজারে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। তবে এতদিন স্যানিটাইজার ছিল জরুরি প্রয়োজনের তালিকায়, এখন দাঁড়িয়ে গেছে অভ্যাসে। করোনা যেহেতু ছোঁয়াচে ভাইরাস, তাই নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে স্যানিটাইজারেই ভরসা বেড়েছে বেশি। বর্তমান সময়ে এই অভ্যাস এতটাই মাত্রাছাড়া হয়ে যাচ্ছে যে এর থেকে শারীরিক সমস্যা বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এবার দেখে নেওয়া যাক স্যানিটাইজারের বেশি ব্যবহারে কী কী সমস্যা হতে পারে—

বেশি অ্যালকোহলে শুষ্ক হচ্ছে ত্বক, ভাইরাস মারতে গিয়ে অ্যালার্জি হানা দিচ্ছে

মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) তাদের একটি গাইডলাইনে বলেছিল, স্যানিটাইজারে অ্যালকোহলের মাত্রা বেশি হলে জীবাণুনাশ করার ক্ষমতা বাড়ে। সেই গাইডলাইনে ৬০ শতাংশের বেশি অ্যালকোহলের কথা বলা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, স্যানিটাইজারে ৩০ শতাংশ অ্যালকোহল থাকলেই জীবাণুনাশক হয়ে উঠতে পারে। মিশ্রণে অ্যালকোহলের ঘনত্ব যত বাড়ে, ততই সেই মিশ্রণটি জীবাণুনাশের ক্ষেত্রে আরও বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।  তবে অধিক অ্যালকোহল-যুক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহারেরও নিয়ম আছে। বেশি জীবাণু মারবে মনে করে সারাদিন ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাতে স্যানিটাইজার ঢাললে তার ফলে হবে উল্টো। ত্বক শুকিয়ে যেতে শুরু করবে। খসখসে ত্বকে চুলকানি থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। হাতে ফোস্কা পড়ে দগদগে ঘাও হতে পারে। ভেজাল স্যানিটাইজারে বিপদ বেশি। দোকান থেকে কেনার সময় অ্যালকোহলের মাত্রা দেখে না কিনলে, ত্বকের সংক্রমণজনিত রোগ হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

ত্বকে র‍্যাশ, বলিরেখা

স্যানিটাইজারে সাধারণত তিন ধরনের রাসায়নিক থাকে– ইথাইল অ্যালকোহল বা ইথানল, আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল এবং এন-প্রোপানল। এই অ্যালকোহলগুলির কাজ যেমন জীবাণুনাশক, তেমনি এরা ত্বকের জন্য খুব একটা ভাল নয়। এই অ্যালকোহল ত্বকের সঙ্গে বেশি মিশলে চামড়া শুকিয়ে যেতে থাকে। ত্বকের স্বাভাবিক তেলতেলে ভাবটা উধাও হয়। রুক্ষ ত্বকে অ্যালার্জি, লালচে ছোপ পড়ে যায়। ত্বক তার স্বাভাবিক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে নানা রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশি স্যানিটাইজার ব্যবহার করলে ত্বক কুঁচকে যেতে শুরু করে, খুব তাড়াতাড়ি বলিরেখা দেখা যায়।


স্যানিটাইজারের অ্যান্টিবায়োটিক উপাদান সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়

অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ হল ব্যাকটেরিয়া, প্যাথোজেন বা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো। কিন্তু স্যানিটাইজারকে জীবাণু-প্রতিরোধী বানাতে ট্রিকলোসান নামে এমন এক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, যার বেশি প্রয়োগ হলে প্যাথোজেন এর বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এই রাসায়নিক উপাদান থেকেই তখন ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সিডিসি এই উপাদানকে ক্ষতিকর বলে ঘোষণা করেছিল। এর কারণে ত্বকের সংক্রমণজনিত রোগে মৃত্যুও হয়েছিল অনেক রোগীর।

শিশুদের ইমিউনিটি কমিয়ে দেয়

নর্থওয়েন্টার্ন রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, স্যানিটাইজারে এমন রাসায়নিক আছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষত শিশুদের প্রস্রাবে সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন (crp) পাওয়া গিয়েছিল যা স্যানিটাইজারের অধিক ব্যবহারে তৈরি হয়েছিল। সিআরপি এমন এক ধরনের ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান যা রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমিয়ে দিতে পারে। ছোট থেকে স্যানিটাইজারে অভ্যাস তৈরি হলে শরীরের স্বাভাবিক ইমিউন সিস্টেমও দুর্বল হতে থাকে। কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদানে অভ্যস্ত হতে থাকে শরীর। ফলে শরীরের টি-কোষ প্যাথোজেনের মোকাবিলায় নিজে থেকে সক্রিয় হতে পারে না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হতে থাকে।

 

মিষ্টি গন্ধেই লুকিয়ে বিপদ

স্যানিটাইজারের মিষ্টি গন্ধে ভুললে চলবে না। কারণ এই গন্ধই বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এই গন্ধ তৈরির জন্য phthalates নামক উপাদান ব্যবহার করা হয় যার প্রভাব মারাত্মক। স্যানিটাইজার লাগানোর পরে হাত দিয়ে খাবার খেলে এই উপাদান শরীরে ঢুকে টক্সিনের পরিমাণ বাড়াতে থাকে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে শিশুদের শরীরে এই উপাদান এখন অনেক বেশি। যার অর্থই হল, পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য বাচ্চাদের বেশি করে স্যানিটাইজার দেওয়া হচ্ছে। আর যার কারণেই এই ক্ষতিকর রাসায়নিক ঢুকছে শরীরে। এমনও দেখা গেছে, মায়ের শরীর থেকে সদ্যোজাতের শরীরেও চলে এসেছে এই উপাদান। তাই সতর্ক থাকা বিশেষ জরুরি।

ঘন ঘন স্যানিটাইজার নয়, সাবান জলেই হাত ধোওয়া নিরাপদ

বাড়িতে থাকার সময় ১০ বার সাবানের মাঝে এক-দু’বার স্যানিটাইজার চলতেই পারে, তবে ঘন ঘন নয়। বদলে সাবান জলে বা ডেটল জলে হাত ধুয়ে নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ। সাবানের উপাদানও ত্বকের জন্য খুব একটা ভাল নয়, তবে স্যানিটাইজারের মতো রাসায়নিক তাতে থাকে না। আয়ুর্বেদিক সাবান বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো ত্বকের ধরন অনুযায়ী সাবান ব্যবহার করলে স্যানিটাইজারের থেকে বেশি কাজ হয়। ত্বকও নিশ্চিন্তে শ্বাস নিতে পারে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More