সিজন চেঞ্জে ডায়রিয়া, পেট গরম থেকে জ্বর, ‘স্টমাক ফ্লু’ নয় তো! সামলে রাখুন ছোটদের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কখনও ঠান্ডা আবার কখনও গরম। এই সিজন চেঞ্জের সময় যত চিন্তা। আজ জ্বর তো কাল পেটে ব্যথা। নানানটা রোগ। সর্দি-কাশি তেমন নেই। গা-হাত পায়ে ব্যথাও নেই। তাও জ্বর আসছে মাঝে মাঝে। সেই সঙ্গে পেটে অসহ্য যন্ত্রণা। ক্লান্তি, বমিভাব, খিদে নেই। বাচ্চাদের আবার যখন তখন ডায়রিয়া হয়ে যাচ্ছে। কিছু খেলেই বমি। শরীরের তাপমাত্রা ওঠানামা করছে। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, নিছকই পেট গরম থেকে জ্বর নয়। ভাইরাল ইনফেকশন হয়ে থাকতে পারে অন্ত্রে। সংক্রমণ থেকেই ঘন ঘন জ্বর এবং পেটে ব্যথা। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে ‘স্টমাক ফ্লু’ (Stomach Flu) ।

Prevent The Spread Of Norovirus In Your Restaurant | Penn Jersey Paper

কী থেকে হয় স্টমাক ফ্লু?

অন্ত্র বা ইন্টেসটাইনে ভাইরাসের সংক্রমণ হলে তাকে ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস (gastroenteritis)বলা হয়। সহজ কথায়, পেটের ভেতর ভাইরাসের সংক্রমণ। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস বলে অনেকে গুলিয়ে ফেলেন, আসলে তা নয়। আমাদের খাদ্যনালীতে অনেক বন্ধু ব্যাকটেরিয়া থাকে যারা খাবারের বিপাকে সাহায্য করে। কিন্তু বাইরে থেকে কোনও সংক্রামক ভাইরাস বা প্যাথোজেন সেখানে ঢুকে পড়লে তীব্র প্রদাহ শুরু হয়। খাবার ঠিকমতো হজম হয় না, পেটে যন্ত্রণা শুরু হয়। পেট খারাপ, বমি এবং তা থেকেই জ্বর চলে আসে। এই জাতীয় ভাইরাসকে স্টমাক বাগ (Stomch Bug) বলা হয়।

বিশ্বে প্রায় ২ কোটি মানুষ এই স্টমাক ফ্লুয়ের শিকার। বয়স্করা তো বটেই এই ধরনের ভাইরাল সংক্রমণের শিকার ছোটরাই বেশি। শীত, গরম বা বর্ষায় আবহাওয়ার বদলের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মের অদলবদল, খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম, বেশি মাত্রায় জাঙ্ক ফুড, প্যাকেট পানীয় ইত্যাদি থেকেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

Gastroenteritis (Stomach Flu):… | DHP Digestive Health Partners

ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, আমাদের দেশে পাঁচ বছরের কমবয়সিপ্রায় নয় লক্ষ শিশু প্রতিবছর হাসপাতালে ভর্তি হয় শুধু এই সংক্রমণের কারণে।যার মধ্যে প্রায় আশি হাজার শিশু মারাও যায়। এদের মধ্যে প্রায় ষাট হাজার শিশুর মৃত্যু হয় জন্মের দু’বছরের মধ্যেই।

 

কী ধরনের লক্ষণ দেখে সতর্ক হতে হবে

স্টমাক ফ্লু হলে তার প্রাথমিক লক্ষণ হবে পেটে ক্রমাগত ব্যথা। পরবর্তী লক্ষণ ডায়রিয়া। বমিভাব থাকবে। পেট খারাপ সহজে সারতে চাইবে না। সেই সঙ্গে ঘন ঘন জ্বর আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক এক সময় মনে হবে পেটে ব্যথা কামড়ে ধরছে। তীব্র প্রদাহ হবে। পেশির ব্যথাও শুরু হতে পারে। বয়স্ক বা ছোটদের জ্বর, খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে অসহ্য মাথা যন্ত্রণা।

ডিহাইড্রেশন বা জল শূন্যতাও স্টমাক ফ্লুয়ের বড় উপসর্গ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেটে সংক্রমণ হলে শরীরে জলের পরিমাণ কমতে থাকবে। বারে বারেই গলা শুকিয়ে যাবে। প্রস্রাব কম হবে। চোখ, নাক, মুখের চামড়া শুকিয়ে টানতে থাকবে। প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগবে, অল্পেই ঝিমুনি আসবে।

Gastroenteritis - Wikipedia

কোন কোন ভাইরাসের সংক্রমণে স্টমাক ফ্লু হতে পারে?

ব্যাকটেরিয়া, প্যারাসাইট বা সংক্রামত প্যাথোজেন থেকে স্টমাক ফ্লু হতে পারে। সাধারণত দুধরনের ভাইরাস এর জন্য দায়ী—নোরোভাইরাস ও রোটাভাইরাস। নোরোভাইরাসের সংক্রমণে বয়স্কদের শরীরে এই অসুখ দেখা যায়। আর রোটাভাইরাসের প্রকোপ পড়ে মূলত শিশুদের শরীরে। জল, খাবার, সংক্রামত রোগীর সংস্পর্শ থেকে অসুখ ছড়াতে পারে। পাঁচ বছর বা তার কমবয়সীদের মধ্যে যত ডায়রিয়ার সংক্রমণ হয় তার ৪০-৫০ শতাংশই রোটাভাইরাস ঘটিত। এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে টিকাকরণও জরুরি।

Think your child has stomach infection? Here's how you can find out | Lifestyle News,The Indian Express

ছোটদের শরীরে সংক্রামিত হতে পারে রোটাভাইরাস, রোগ চিনতে হবে অভিভাবকদের

আগেই বলা হয়েছে, রোটাভাইরাস সংক্রামিত হতে পারে। সাধারণ ডায়রিয়ার সঙ্গে অনেক সময়েই এর তফাৎ করা যায় না। কিন্তু রোগের লক্ষণ চিনে রাখতে হবে অভিভাবকদের। ছোটদের এই রোগ ধরলে এক ধাক্কায় শরীরের তাপমাত্রা উঠে যাবে ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। খিদে হবে না, পেট খারাপ হয়ে যাবে বারে বারেই। কিছু খেলেই বমি হবে, সেই সঙ্গে হাতে-পায়ে খিঁচুনি, পেটে যন্ত্রণা। অনেক সময় রক্ত আমাশা হতে দেখা যায় বাচ্চাদের, তখনও সতর্ক হতে হবে। মলের সঙ্গে রক্তও বের হতে পারে।

ডিহাইড্রেশন বাড়বে। গলা শুকিয়ে যাবে বারে বারে। গাঢ় রঙের প্রস্রাব হবে। অল্পেই ঝিমিয়ে পড়বে বাচ্চা। চোখ, মুখ শুকিয়ে যাবে।

স্টমাক ফ্লু হলে বাচ্চাদের বিশেষ করে সাবধানে রাখতে হবে। কারণ মলমূত্র থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। সংক্রামিতের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।

 

স্টমাক ফ্লু প্রতিরোধের উপায় কী

রোগের উপসর্গ দেখলেই মলের নমুনা পরীক্ষা করাতে হবে। এলাইজা বা পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে এই ভাইরাস চিহ্নিত করা যায়। সাধারণ কোনও অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই এই রোগের। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্যালাইন ওয়াটার বা ওআরএস দেওয়া হয়।

রোটাভাইরাস ঠেকাতে টিকাই একমাত্র উপায়। শিশুর দেড় মাস, আড়াই মাস ও সাড়ে তিন মাস বয়সে অন্যান্য টিকার সঙ্গে রোটাভাইরাসের টিকাও দিতে হবে।

Introduction of rotavirus vaccine: how far is the journey? | The Daily Star

কিছু সাবধানতা মেনে চলতেই হবে যেমন—

বাচ্চাদের বাইরের জল খেতে দেওয়া চলবে না। স্কুলে বা অন্য কোথাও গেলে বাড়ির জলই ভাল। তা না হলে ভাল ব্র্যান্ডের মিনারেল ওয়াটার।

রাস্তার খাবার একেবারেই নয়। বিশেষ করে রাস্তায় বিক্রি হওয়া আইসক্রিম, বরফের গোলা ইত্যাদি না খাওয়াই ভাল।

রাস্তায় বিক্রি হওয়া কাটা ফল, বা দীর্ঘসময় ফেলে রাখা স্যালাড খাওয়া চলবে না। ফল খাওয়ালে ভাল করে ধুয়ে তবেই বাচ্চাদের দিন।

নরম পানীয়, প্যাকেট জাতীয় পানীয় এই সময় একেবারেই চলবে না।

প্রচুর পরিমাণে জল খেতে হবে। বারে বারে ওআরএস খাওয়ালে বাচ্চা ভাল থাকবে।

বমির সঙ্গে শরীরে পটাসিয়াম অনেকটাই বেরিয়ে যায়। তাই এই সময় কলা খাওয়া ভাল। ব্রাউন রাইস না খেয়ে সাদা ভাত উপকারি। ব্রাউন রাইসে বেশি ফাইবার থাকে, এতে গ্যাস হতে পারে।

বেশি মশলাদার খাবার বা বেশি নুন দেওয়া খাবার একেবারেই চলবে না। যেসব খাবারে বেশি ফাইবার আছে তা এই সময় এড়িয়ে চলাই ভাল। দুধ বা ডেয়ারি প্রোডাক্ট অনেকেরই সহ্য হয় না। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই ডায়েটে রাখা উচিত।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More