করোনা থেকে কীভাবে সতর্ক থাকবেন ক্যানসার রোগীরা, সংক্রমণ ধরা পড়লে কী করতে হবে বললেন ডাক্তাররা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: রক্তের ক্যানসার নিয়ে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সে ভর্তি হয়েছিলেন বছর পঞ্চাশের এক ব্যক্তি। কেমোথেরাপি চলছিল। শারীরিক অবস্থা যখন কিছুটা স্থিতিশীল, তখন দেখা যায় ব্যক্তির সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা হচ্ছে। সেই সঙ্গেই মুখের স্বাদ ও নাকের গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা চলে গেছে। উপসর্গ দেখে কোভিড টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এই ঘটনা শুধু দিল্লির এইমসে নয়, দেশের আরও কয়েকটি হাসপাতালেও হয়েছে। ক্যানসার রোগীদের করোনায় সংক্রামিত হওয়ার বেশ কয়েকটি রিপোর্ট সামনে এসেছে। একেই মারণ রোগ, তার ওপর মারণ ভাইরাসের সংক্রমণ, দুয়ে মিলে আতঙ্কের পারদ চড়েছে।

ক্যানসার রোগীদের কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কতটা সে নিয়ে নানা মতামত দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষত বলা হয়েছে, ফুসফুসের ক্যানসারের রোগীদের করোনার ঝুঁকি বেশি। কারণ করোনা ফুসফুসকেই সবচেয়ে আগে সংক্রামিত করে। সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বাড়ে। তাছাড়া স্তন ক্যানসার, লিভার ক্যানসার, লিউকেমিয়া ও লিমফোমার রোগীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ক্যানসার রোগী যদি করোনায় আক্রান্ত হন তাহলে কী কী করণীয়, কীভাবে ক্যানসার রোগীদের করোনা থেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ডাক্তার, বিশেষজ্ঞরা।

 

ক্যানসার রোগীদের কোভিড ঝুঁকি কতটা?

ক্যানসার আক্রান্তদের উপরে কোভিড সংক্রমণের প্রভাব কতটা, সেই নিয়ে গবেষণা চলছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কিছুদিন আগে ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নালে ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ক্যানসার রোগীদের শরীরে কোভিড সংক্রমণের প্রভাব মারাত্মক। করোনার সংক্রমণ ক্যানসার রোগীদের মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিতে পারে।

ক্যানসার আক্রান্ত কোষের উপরে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের প্রভাব কীভাবে পড়ছে সেটা এখনও গবেষণার স্তরেই আছে। তবে বিজ্ঞানীদের দাবি, ক্যানসারের কারণে শরীরে নানা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের প্রতিরোধ ক্ষমতা তলানিতে এসে ঠেকে। ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলি এমনিতেই ঝাঁঝরা হয়ে থাকে। তার উপর আরএনএ ভাইরাসের সংক্রমণ হলে গোটা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই তছনছ হয়ে যায়। অঙ্গ বিকল হয়ে বা হৃদস্পন্দন থেমে গিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মৃত্যু হয় রোগীর। তবে গবেষকরা বলছেন, ক্যানসার রোগীদের উপরে কোভিড সংক্রমণের প্রভাব ও মৃত্যুহার নির্ভর করছে রোগীর বয়স, শারীরিক গঠন ও রোগ কতটা ছড়িয়েছে তার উপরে।

This type of cancer increases severity of COVID-19 by 60 per cent - Times of India

হাই-রিস্ক গ্রুপে কারা

ডাক্তাররা বলছেন, দুই ধরনের ক্যানসার রোগী হাই-রিস্ক গ্রুপে রয়েছেন। প্রথম, যাঁদের রোগ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থাৎ ক্যানসারের থেরাপি দীর্ঘদিন ধরে চলেছে এবং শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। দ্বিতীয়, যে ক্যানসার রোগীদের সদ্য থেরাপি শুরু হয়েছে। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি চলছে, যার মাঝেই কোভিড সংক্রমণ হয়েছে। এই দুই ধরনের রোগীদেরই সতর্ক থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি।

কেমোথেরাপি নিচ্ছেন যে ক্যানসার রোগীরা, তাঁদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে।

রেডিওথেরাপি হয়েছে যে রোগীদের, তাঁদের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

গত ছ’মাসের মধ্যে অস্থি-মজ্জা প্রতিস্থাপন বা স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে যাঁদের, তাঁরাও হাই-রিস্ক গ্রুপে রয়েছেন। ইমিউনোসাপ্রেসিভ ড্রাগ নিচ্ছেন যাঁরা সতর্কতা তাঁদেরও দরকার।

ক্রনিক লিউকেমিয়া, লিমফোমা বা মায়েলোমা রোগীদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই কমে যায়। তাই সামান্য অসাবধানতাতেই সংক্রমণ ধরে যেতে পারে।

Coronavirus and cancer hijack the same parts in human cells to spread – and our team identified existing cancer drugs that could fight COVID-19

কী কী উপসর্গ দেখে সাবধান হতে হবে

কিছু উপসর্গ দেখে সাবধান হতে হবে। ক্যানসারের চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভেবে অনেকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এই করোনা পরিস্থিতিতে এই সমস্ত উপসর্গ দেখা দিলেই ডাক্তারকে বিশদে জানাতে হবে।

হঠাৎ করেই জ্বর, শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া।

শুকনো কাশি, গলা ধরে যাওয়া। কথা বলার সমস্যা। খাবার গিলতে গেলে গলায় ব্যথা।

শ্বাস নিতে কষ্ট। ফুসফুসের ক্যানসারের রোগীদের বিশেষ করে সতর্ক থাকতে হবে।

পেশির ব্যথা। গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা।

ক্লান্তিভাব, ঝিমুনি, ঘুম কমে যাওয়া।

মুখের স্বাদ চলে যাওয়া, গন্ধ না পাওয়া।

এই উপসর্গগুলি দেখা দিলে রিয়েলটাইম আরটি-পিসিআর টেস্ট অবশ্যই করাতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেরোলজিতে ক্যানসার রোগীদের পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে আগে করোনা সংক্রমণ কখনও হয়েছিল কিনা। এখন সংক্রমণ হলেও বেশিরভাগ রোগী উপসর্গহীন। তাই অজান্তেই সংক্রমণ ধরছে অনেকের। রক্তে অ্যান্টিবডি দেখে সংক্রমণ চিহ্নিত করা যেতে পারে। ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে এমন হলে থেরাপি শুরু করতে হবে সঙ্গে সঙ্গেই।

NCCAPS: How Does COVID-19 Affect People with Cancer? - National Cancer Institute

ক্যানসার রোগীরা কীভাবে সতর্ক থাকবেন?

ভ্যাকসিন না আসা অবধি মেলামেশা একেবারেই বন্ধ রাখা উচিত। তবে ভ্যাকসিনের ডোজ নেওয়ার পরেও সতর্ক থাকতে হবে। জনবহুল জায়গায় যাওয়া চলবে না। মুখে মাস্ক বাধ্যতামূলক। পেশার কারণে অনেককেই জনবহুল জায়গায় যেতে হয়, তখন সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং মাস্ট। প্রয়োজন হলে পিপিই পরে যাওয়া ভাল। এখন কোভিড কেয়ার সেন্টারগুলিকে করোনা আক্রান্ত ক্যানসার রোগীদের থেরাপির জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। তাই সংক্রমণের সামান্য উপসর্গ আঁচ করলেই কাছাকাছি কোভিড কেয়ার সেন্টারে যোগাযোগ করা ভাল।

মানসিক স্বাস্থ্যে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। ক্যানসার ধরা পড়লে রোগীরা এমনিতেই অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়েন। তার ওপর করোনা সংক্রমণ হলে ভয় আর আতঙ্কে স্ট্রেস আরও বাড়বে। শরীরের জন্য যা একেবারেই ভাল নয়।

এখন জটিল রোগের চিকিৎসায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার থেরাপির প্রয়োগ করেন ডাক্তাররা। ক্যানসারের মতো মারণ রোগ, ফুসফুসের ক্রনিক রোগ, সিওপিডি ইত্যাদি যেসব অসুখে রোগী একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে, রোগ সারানোর তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই সেক্ষেত্রে প্যালিয়েটিভ কেয়ার থেরাপিতে রোগীদের কষ্ট কমাবার চেষ্টা করা হয়। একাধিক রোগ শরীরে ধরলে এবং রোগী যন্ত্রণা পেতে থাকলে শারীরিক কষ্ট কমাবার পাশাপাশি মন ভাল রাখারও চেষ্টা করেন ডাক্তাররা। ফিজিক্যাল থেরাপির সঙ্গেই ডিপ ব্রিদিং টেকনিকে রোগীকে রিলিফ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। রোগী যদি মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন, তখন রোগীর কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি তাঁর বাড়ির লোকজনেরও কাউন্সেলিং করা হয়। কীভাবে রোগীর মনের জোর বাড়াতে হবে, স্ট্রেস কমাতে হবে তা শেখানো হয় রোগীর পরিবারকে। ডাক্তাররা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লে শরীর সারানো খুব মুশকিল। তাই এই দিকটা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতেই হবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More