কমবয়সি মহিলাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে টাইপ ২ ডায়াবেটিস, বিপদ এড়াবেন কীভাবে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা সময় ছিল, যখন ধারণা করা হত হার্ট অ্যাটাক মূলত পুরুষদের এবং বয়স্কদের অসুখ। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই ধারণা অনেক বদলে গেছে। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, ইদানীং হার্ট অ্যাটাক নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের একটা বড় অংশই কমবয়সি ও মহিলা। জিনগত কারণে বা জন্মগতভাবেও পুরুষ ও মহিলাদের হার্টের রোগ থাকতে পারে। কিন্তু এমন কোনও সমস্যা নেই বা আগাম রোগের লক্ষণও নেই, আচমকাই দুর্বল হয়ে পড়ছে হার্ট বা যন্ত্রণাহীন হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে, এমন রোগীর সংখ্যা এখন অসংখ্য। আর তাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশই মহিলা।

এই হার্ট অ্যাটাকের অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে অন্যতম বড় কারণ হল ডায়াবেটিস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫৫ বছরের কমবয়সি মহিলাদের টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এবং এই ডায়াবেটিসই চুপিসাড়ে হার্টের রোগ ডেকে আনে।

Type 2 diabetes: Women in mentally draining jobs more at risk of condition,  says study | Express.co.uk

কী থেকে হয় টাইপ ২ ডায়াবেটিস?

ডায়াবেটিস হল এমন এক অসুখ যেখানে রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস দু’ধরনের—টাইপ ১ ও টাইপ ২। প্যানক্রিয়াসের বিটা কোষ থেকে ইনসুলিন বলে একটা হরমোন বের হয়। এই ইনসুলিন হরমোন ক্ষরণের তারতাম্য হলেই ডায়াবেটিস হয়। সাধারণত আমরা যে ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খাই তা বিপাকের পরে গ্লুকোজে পরিণত হয়। ইনসুলিন এই গ্লুকোজকে দেহকোষে ঢুকতে সাহায্য করে। গ্লুকোজ যখন দেহকোষের মধ্যে ঢোকে তখন সেটা অক্সিডাইজড হয় এবং তার থেকে অডিনোসিন ট্রাই ফসফেট (এটিপি) অর্থাৎ এনার্জি তৈরি হয়।

কিন্তু যদি বিটা কোষ নষ্ট হয়ে যায় এবং ইনসুলিন হরমোনের ক্ষরণ কমে যায় তাহলে এই পক্রিয়াটা বাধা পায়। ইনসুলিন কোষের মধ্যে প্রবেশের জন্য যে রিসেপ্টরটি লাগে, সেটি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ইনসুলিন আর ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ইনসুলিন কোষের মধ্যে গ্লুকোজকে প্রবেশ করাতে পারে না। রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে যায়। একে বলে টাইপ ২ ডায়াবেটিস।

Women who smoke or have diabetes more at risk of heart attack | Lifestyle  News,The Indian Express

মহিলাদের হার্টের রোগের ঝুঁকি বাড়ায় টাইপ ২ ডায়াবেটিস

‘জামা কার্ডিওলজি’ নামে একটি মেডিক্যাল জার্নালে ডায়াবেটিস সংক্রান্ত গবেষণার রিপোর্ট সামনে আনা হয়েছে। সেই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিস করোনারি ডিজিজের ঝুঁকি প্রায় ১০ গুণ বাড়াতে পারে।

গবেষকরা বলেছেন, প্রায় ২৮ হাজার মহিলাকে পর্যবেক্ষণে রেখে দেখা গেছে হার্ট অ্যাটাকের ৫০টি রিস্ক ফ্যাক্টরের মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। টাইপ ২ ডায়াবেটিস যাঁদের আছে তাঁদের শরীরে লাইপোপ্রোটিন ইনসুলিন রেসিস্ট্যান্স (LPIR)বেড়ে যায়। যে কারণে প্রতিরোধ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ডায়াবেটিসের কারণে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রাও বাড়ে। এই খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল কোলেস্টেরল হার্টের রোগের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন,  আজকের এই গতিময় জীবনে কর্মক্ষেত্রের টেনশন, বাতানুকূল পরিবেশে বসে কাজ করার অভ্যাস, কম পরিশ্রম, অতিরিক্ত ফাস্টফুড খাওয়া এবং ধূমপান, পুরুষ ও মহিলা নির্বিশেষে সকলকেই ঠেলে দিচ্ছে বিপদের মুখে। তা ছাড়াও রয়েছে ওবেসিটি ও ডায়াবেটিস। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, আগে হাতে গোনা আট থেকে দশ জন রোগী আসতেন হার্টের রোগের সমস্যা নিয়ে। এখন সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষত কমবয়সি মহিলাদের ডায়াবেটিস ধরে গেলে হার্টের রোগের ঝুঁকি চড়চড় করে বেড়ে যাচ্ছে।

মেয়েদের শরীরে থাকা ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোন হার্টের অসুখ রুখে দিতে সাহায্য করে। তাই হিসেবমতো মেয়েদের ক্ষেত্রে মেনোপজের আগে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কম। তবে এখন এই তত্ত্ব বহু সময়েই খাটছে না। আর হার্ট অ্যাটাক হলে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বিপদ বেশি।

 

কী কী লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন মেয়েরা

কিছু লক্ষণ দেখে আগে সতর্ক হতে হবে, যেমন–ডায়াবেটিস হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে, দেহের ওজন কমে যেতে পারে, বারবার তেষ্টা পেতে পারে, ঘনঘন বাথরুম যেতে হতে পারে, খিদে বেড়ে যেতে পারে। হাতে পায়ে ব্যথাও শুরু হয় অনেকের।

অনেক মহিলাই বলেন পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। এমনও মনে হয় সারা পায়ে কেউ পিন ফোটাচ্ছে। ফোঁড়া বা ফুসকুড়ি, র‍্যাশের মতো সমস্যা বেড়ে যায়। অনেক সময়েই মহিলাদের যৌনাঙ্গে চুলকানি হয়। এই সবই ডায়াবেটিসের লক্ষণ।

 

লাইস্টাইলে বদল, সামান্য কিছু নিয়ম, অনেক বিপদ কাটাতে পারে

ডায়াবেটিসও লাইফস্টাইল ডিজিজ। রোজকার জীবনে অনিয়ম অনেক বিপদ ডেকে আনে। এখন কায়িক পরিশ্রম অনেক কম হয়, বিশেষত করোনা কালে বাড়ি বসেই কাজ বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম বেড়ে গেছে। কাজেই আলস্য বেড়েছে। এক্সারসাইজে ইতি দিয়েছেন অনেকেই। তার ওপর অনিয়মিত ডায়েট তো রয়েছেই। চটজলদি ফাস্টফুড খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সবুজ শাকসব্জি, ফলের বদলে পাস্তা, পেস্ট্রি, কোল্ড ড্রিংকস, আইসক্রিম, নুডলস ইত্যাদি হাই ক্যালোরির খাবারেই রুচি বেশি। এই সমস্ত খাবার বেশি করে খাওয়া এবং কম পরিশ্রম করার ফলে  ওবেসিটি হচ্ছে। এই ওবেসিটিই হচ্ছে ভবিষ্যতে সুগার, প্রেসার, হার্টের অসুখের রিস্ক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

নিয়মিত শরীরচর্চা ও খাদ্যাভাসে সামান্য অদলবদল করলেই রক্তে বাড়তি শর্করা বশে রাখা যায়। দেখে নিন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের কিছু ঘরোয়া টোটকা-

রোজ সকালে দু’টি তুলসী পাতা চিবিয়ে খান। খালি পেটে খেতে হবে। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন তাহলে রক্তে শর্করা বাড়তে পারে না।

এক গ্লাস জলে এক গ্রাম দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে রোজ সকালে খান। ম্যাজিকের মতো কাজ হবে।

Good News for Those with Type 2 Diabetes: Healthy Lifestyle Matters

নিম পাতা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের মোক্ষম দাওয়াই। ভারতীয় আয়ুর্বেদে নিম পাতার বহুমুখী উপকারিতার কথা লেখা আছে।

চোখ, নাক বন্ধ করে হলেও সকালে খালি পেটে এক গ্লাস লাউয়ের রস খেয়ে ফেলুন। টানা খেয়ে যান। এই রস ডিহাইড্রেশনের হাত থেকে যেমন বাঁচায়, তেমনি হজম শক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে, শরীরে টক্সিন দূর করে।

ধূমপান ছেড়ে দিন বা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনুন। কম ফ্যাট এবং মাপমতো কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার খান। কবারে কম খেয়ে বার বার অল্প অল্প করে খান।

এক্সারসাইজ বা যোগাসন দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে, বিভিন্ন রোগ দূরে রাখতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিক হলে প্রতিদিন দু’বেলা সময় করে হাঁটার অভ্যাস করুন।

Yes, You Can Manage Type-2 Diabetes With Exercise

মানসিক চাপ কমানো দরকার, রাতে টানা সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম দরকার।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ও নিয়ম মেনে না চললে পরবর্তীকালে কিডনি, নার্ভের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। চোখের ক্ষেত্রে রেটিনোপ্যাথি কিংবা অন্ধত্বও আসতে পারে। অনেক সময় পায়ের নার্ভ অ্যাফেক্টেড হলে নিউরোপ্যাথি হতে পারে যার ফলে পায়ে অসাড়তা আসে। ডায়াবেটিক ফুট বা ডায়াবেটিক আলসারের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই নিয়ম মানুন এখন থেকেই, মেয়েরা শুনছেন তো!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More