অপারেশন বাগদাদি: বাচ্চাদের কান্না, কুকুরের চিৎকার, তারপরেই বিস্ফোরণ, উড়ে গেলেন আইএস প্রধান

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাথা-মুখ চাদরে ঢাকা। ছুটতে গিয়ে সামান্য হোঁচট খেলেন। হাতের আগ্নেয়াস্ত্র শক্ত করে ধরে অন্ধকার গুহার ভিতরে গিয়ে সেঁধোলেন তিনি। বিশ্বের ভয়ঙ্করতম জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রতিষ্ঠাতা ও কুখ্যাত জঙ্গি নেতা ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আল-বদরি ওরফে আবু বকর আল-বাগদাদি। সঙ্গে তিনটি শিশু। বাগদাদিকে ধাওয়া করে গুহার মুখে গিয়ে পৌঁছল মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডস ডেল্টা টিমের বাহিনীরা। সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্ত বন্ধ, কাজেই বেরোনোর পথ নেই। গুহার উপর পাক খাচ্ছে বায়ুসেনার কপ্টার। অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতরে মানুষের গন্ধ পেয়ে চিৎকার করছে প্রশিক্ষিত সেনা কুকুরগুলো। আচমকাই ছিটকে একটি কুকুর ঢুকে পড়ল সুড়ঙ্গের অন্ধকারে। ভেসে এল কান ফাটানো আর্তনাদ, শিশুদের কান্না। কয়েক সেকেন্ড মাত্র, বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল গুহা। ছিটকে এল আগুনের ফুলকি।

সিরিয়ায় ইদলিব প্রদেশের বারিশা এলাকার অভিযান সফল। আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি যার মাথার দাম ২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা), তাকেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপারেশনে নিকেশ করেছে মার্কিন সেনা। মৃত ব্যক্তি যে বাগদাদি সেটাও নিশ্চিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, আত্মঘাতী জ্যাকেটের বোতাম টিপে নিজেকে উড়িয়ে দিয়েছেন আইএস প্রধান। দেহাংশের ডিএনএ পরীক্ষা করে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, মৃত ব্যক্তি বাগদাদি ছাড়া আর কেউ নন।

বাগদাদির খোঁজ শুরু হয় পাঁচ বছর আগেই

২০১৪ সাল। ততদিনে ইরাক ও সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছে ইসলামিক স্টেট। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিলের অপারেশন নেপচুন স্পিয়ারে আল কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পরে আল কায়দার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে নিজের বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে ফেলেছেন বাগদাদি। ২০১৪-র জুনে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখল করে নেয় আইএস। নিজেকে ‘আমির’ বা  ‘খলিফা’ হিসেবে ঘোষণা করেন বাগদাদি। শুরু হয় নৃশংস সন্ত্রাসবাদের নতুন অধ্যায়। ইয়েজাদি গোষ্ঠীর সংখ্যালঘুদের উপর আইএসের অত্যাচার দেখে শিউরে ওঠে বিশ্ব। আইএসের ডালপালা ছড়িতে পড়তে থাকে গোটা বিশ্বেই। বাগদাদির মাথার দাম ওঠে ২ কোটি ডলার। জঙ্গি নেতাকে কব্জায় আনতে তৎপর হয় মার্কিন বাহিনী। অথচ বাগদাদি সামনে আসেন মাঝেমধ্যে। কখনও ইরাকের মসুলে আল নুরি মসজিদের বারান্দায় কালো পোশাকে দেখা যায় তাঁকে, আবার কখনও সামনে আসে শুধুমাত্র তাঁর অডিও বার্তা।

২০১৭ সালে আল নুরি ইরাকি সেনা দখল করে নেওয়ার পর থেকে কোণঠাসা হতে শুরু করে আইএস। সেই সময় একবার মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ঘোষণা করেছিল এয়ার স্ট্রাইকে জখম হয়েছেন বাগদাদি। তারপর থেকে তার আর কোনও খোঁজ মেলেনি। খবর এমনও রটেছিল যে, শীর্ষ জঙ্গিনেতা শয্যাশায়ী। যদিও পেন্টাগন তখন সে খবরের সত্যতা স্বীকার করেনি। ততদিনে বাগদাদির মাথার দাম ছুঁয়েছে ২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার। চলতি বছর এপ্রিলে শ্রীলঙ্কায় ইস্টার হামলার পরে নাশকতার দায় স্বীকার করে আইএস। ফের সামনে আসে বাগদাদির ভিডিও।

আরও পড়ুন: জঙ্গি নয়, বাগদাদি নাকি ইসলামী পণ্ডিত! চরম ট্রোল, শিরোনাম বদলাতে বাধ্য হল ওয়াশিংটন পোস্ট

সিরিয়ার ইদলিবে সপরিবার লুকিয়ে আছে বাগদাদি, খোঁজ দেয় সিআইএ

পাঁচ মাস আগে সিরিয়ার কুর্দ বাহিনীর কম্যান্ডার মাজলৌম আবদি মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে জানায় ইদলিবের বারিশা এলাকায় আত্মগোপন করে রয়েছেন বাগদাদি। তাঁর গতিবিধির উপর নজর রাখা শুরু করে গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রায়েন জানিয়েছেন, বাগদাদিকে নিকেশ করার পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়। মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে হাত মেলায় সিরীয় কুর্দরা। অন্যদিকে, নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিতেও রাজি হয়ে যায় রাশিয়া, তুরস্ক, সিরিয়া।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স জানিয়েছেন, বারিশা এলাকার একটি কম্পাউন্ডে বাগদাদিকে শেষবার দেখা গেছে বলে নিশ্চিত করে সিআইএ। গত শুক্রবারই জঙ্গি নেতাকে খতম করার পুরো পরিকল্পনা সাজানো হয়ে যায় হোয়াইট হাউসে। শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ হোয়াইট এসে পৌঁছন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিরিয়ার তখন স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টা।

অপারেশন বাগদাদি

সিরিয়ায় রাত নেমেছে। বারিশার যে কম্পাউন্ডে বাগদাদির থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তার পুরোটাই ঘিরে ফেলে মার্কিন বায়ুসেনার আটটি হেলিকপ্টার। ডেল্টা কম্যান্ডোরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকেন কম্পাউন্ডের দিকে। সঙ্গে সেনা ৭-৮টি সেনা-কুকুর। মার্কিন সেনার গতিবিধি আঁচ করেই স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ছুটে বেরিয়ে যান বাগদাদি। পিছু নেয় ডেল্টা বাহিনী।

গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-র ডিরেক্টর জিনা হাসপেল জানিয়েছেন, রাতের আঁধারে মার্কিন বাহিনীর পদক্ষেপ ছিল ধীর ও সতর্ক। যে এলাকায় বাগদাদি সপরিবারে লুকিয়েছিলেন, তার চারপাশ ছিল ধূ ধূ প্রান্তর। কাজেই পালানোর চেষ্টা করলেও খুব একটা সুবিধা হত না। গোটা এলাকাই ঘিরে ফেলেছিল মার্কিন বায়ুসেনার কপ্টার। যে কম্পাউন্ডের ভিতরে বাগদাদি ছিলেন, সেখানে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে ডেল্টা বাহিনী। দুই স্ত্রী ঝাঁঝরা হয়ে যান। আকস্মিক আক্রমণে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পায়নি আইএস বাহিনী। বেশিরভাগই গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। কম্পাউন্ডের বাইরে যারা পাহারা দিচ্ছিল, তাদের খতম করে বাযুসেনা। গুলির লড়াই চলাকালীন, তিন সন্তানকে নিয়ে ছুটে বাইরে বেরিয়ে যান বাগদাদি।

আত্মঘাতী জ্যাকেটের উপর চাদর জড়িয়ে রেখেছিলেন বাগদাদি। সম্ভবত তাঁর তিন সন্তানের শরীরেও ছিল আত্মঘাতী জ্যাকেট। গুহার অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে আর্তনাদ ভেসে আসছিল। চিৎকার করে কাঁদছিল বাচ্চারা। বাগদাদিকে ধাওয়া করে সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকে পড়ে ডেল্টা বাহিনীর তিনজন আর দু’টি কুকুর। মার্কিন সেনারা জানিয়েছেন, কুকুর দেখে বাচ্চাদের কান্না আরও বেড়ে যায়। চিৎকার করতে করতেই নিজেকে উড়িয়ে দেন বাগদাদি।

অভিযানের বর্ণনা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেছেন, বাগদাদিকে আড়াল করতে গিয়ে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন তাঁর দুই স্ত্রী। ওই কম্পাউন্ড থেকে ১১টি শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাগদাদির সঙ্গে যে তিনটি শিশু ছিল তাদের মৃত্যু হয়েছে। সেনাদের দু’জন নিহত। একটি কুকুর গুরুতর জখম। আর কোনও প্রাণহানি হয়নি।

আরও পড়ুন:

কে এই ‘আবু বকর আল-বাগদাদি’! যাঁর মাথার দাম ছিল আড়াই কোটি মার্কিন ডলার

শয্যা উত্তোলন

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More