‘ডিজিজ এক্স’ নিয়ে কেন এত চর্চা, হইচই পড়ে গেছে বিজ্ঞানীমহলে, সতর্ক করেছে হু

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে এক অজানা রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্বে। করোনার মতোই ফের কোনও ছোঁয়াচে রোগ ভয়ঙ্কর মহামারীর চেহারা নিতে পারে। মানুষে মানুষে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে, মৃত্যুমিছিল শুরু হতে পারে। হতে পারে কোনও নতুন ভাইরাস সেই রোগ ছড়াবে, অথবা চেনা ভাইরাসই তার রূপ বদলে সংক্রামক হয়ে উঠবে। কিন্তু সে কোন ভাইরাস বা কেমন হতে পারে সেই অজানা রোগ, এ ব্যাপারে এখনও অবধি কিছুই বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। অপরিচিত সেই ভাইরাস কতটা সংক্রামক তাও অজানা। শুধু অনুমান করা হয়েছে, আগামী দিনে ফের এক অতিমহামারীর মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব।

ভাইরাস নাকি জটিল রোগ—কী এই ‘ডিজিজ এক্স’

ডিজিজ এক্স নিয়ে বিজ্ঞানীমহল দ্বিধাবিভক্ত। নানা রকম যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। নানা রকম মত। ১৯৭৬ সালে প্রথম ইবোলা ভাইরাস চিহ্নিত করেছিলেন যে বিজ্ঞানী সেই জিন-জ্যাকাস মুয়েম্বি এই ডিজিজ-এক্সের কথা সামনে এনেছেন। বিজ্ঞানী বলেছেন, করোনার থেকেও মারাত্মক সংক্রামক ভাইরাল স্ট্রেন ডিজিজ-এক্স। এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে আরও এক মহামারীর মুখোমুখি হতে হবে বিশ্বকে।

জিন মুয়েম্বির বক্তব্য কী? ইবোলার মতোই ভাইরাল স্ট্রেন। মনে করা হচ্ছে, ইবোলা ভাইরাসের জিনের গঠন বদলে অর্থাৎ জেনেটিক মিউটেশনের কারণে এই নতুন ধরনের ভাইরাল স্ট্রেনের জন্ম হয়েছে। যদিও কী ধরনের ভাইরাস বা কোন পর্যায় অবধি সংক্রমণ ছড়াতে পারে তার বিস্তারিত তথ্য এখনও মেলেনি।

‘এক্স’ মানে হল অজানা কিছু। যেমন, অঙ্কের ফর্মুলায় এক্স অর্থে কোনও একটা অজানা মান ধরে নেওয়া হয়। যেহেতু এই ভাইরাসের ব্যাপারে এখনও তেমন কিছুই জানা নেই, তাই একে ডিজিজ-এক্স বলেই চিহ্নিত করছেন বিজ্ঞানীরা।

এ তো গেল জিন মুয়েম্বির কথা। বাকি বিজ্ঞানীরা কী বলছেন? ডিজিজ-এক্স কোনও নতুন ভাইরাস নয়। করোনাভাইরাসের মতোই চেনা পরিচিত কোনও ভাইরাস পরিবারেরই সংক্রামক স্ট্রেন জিনের গঠন বদলে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। জটিল রোগও ছড়াতে পারে। হতেই পারে, নতুন কোনও রোগ নয়, ভাইরাস সংক্রমণে যে ধরনের জটিল রোগ হয়ে থাকে অর্থাৎ বিজ্ঞানীদের খাতায় যে সমস্ত রোগের তালিকা আছে তারই কোনও একটা মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বে। অতএব সবটাই এখনও অজানা।

Disease X': Why it is a major cause of concern - 'Disease X': The unknown  pathogen | ET HealthWorld
হু-র ব্লু-প্রিন্টে ৯ রকম সংক্রামক রোগের কথা লেখা আছে, ডিজিজ-এক্স কি ১০ নম্বর?

২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ৯ রকম ভাইরাসজনিত রোগের মধ্যে এই ডিজিজ-এক্সের কথা উল্লেখ করেছিল। হু-র চিহ্নিত করা সংক্রামক রোগের তালিকায় বিশেষভাবে ডিজিজ-এক্সের কথা বলা হয়েছিল। হু বলছিল, পশুদের থেকে যে সমস্ত ভাইরাসনিত রোগের সংক্রমণ হয়েছে যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, রেবিস, ব্রুসেলোসিস, লাইম ডিজিজ ইত্যাদি, ডিজিজ-এক্সও তেমনই হতে পারে।

২০১৮ সাল থেকে আজ অবধি হু-র রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্লু-প্রিন্টে ৯ রকম সংক্রামক রোগের তালিকা আছে, যথা– কোভিড-১৯, কঙ্গো হেমোরজিক ফিভার, ইবোলা ভাইরাস, মারবার্গ ভাইরাস, লাসা জ্বর, মিডল-ইস্ট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম তথা মার্স, সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম তথা সার্স, নিপা ও হেনিপাভাইরাল ডিজিজ, রিফ্ট ভ্যালি ডিজিজ, জিকা ভাইরাস। এই ভাইরাসজনিত রোগগুলির সঙ্গে ডিজিজ-এক্সের সম্ভাবনার কথাও বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

২০১৯ সালে করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ছবি সামনে আনে উহানের স্বাস্থ্য দফতর

কঙ্গোর অজানা রোগ ডিজিজ-এক্সের সম্ভাবনা উস্কে দিয়েছে

ডিজিজ-এক্স কি আসলে ইবোলা ভাইরাসেরই নতুন রূপ? সে নিয়েও চর্চা চলছে বিজ্ঞানীমহলে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে এক মহিলার শরীরে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণের মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ায় এই আশঙ্কা করা হয়েছে। যদিও মহিলার যে রোগ হয়েছে তা নাকি অনেকটাই আলাদা।

গবেষকরা বলছেন, ইবোলা ভাইরাস আফ্রিকায় নতুন রোগ নয়।  ১৯৭৬ সালে ইবোলা ভাইরাস প্রথম হানা দেয় আফ্রিকায়। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় মহামারীর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইবোলা ভাইরাস। গিনির জঙ্গলে এ রোগের কথা শোনা যায় ২০১৩ ডিসেম্বরেই। ক্রমশ লাইবেরিয়া, গিনি আর সিয়েরা লিওন, তিন দেশেই বিশেষ করে ছড়াতে থাকে অসুখ। মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে দিনে দিনে। ইবোলার মোট পাঁচটি প্রজাতি এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। তার মধ্যে তিনটি প্রজাতি অত্যন্ত মারাত্মক। যাদের একটি ছোবলে মৃত্যু একেবারে নিশ্চিত। ভাইরাসটির মূল বাহক এক প্রজাতির ফল-খেকো বাদুড়- টেরোপডিডাই। তারা ভাইরাসটি বহন করে, তবে নিজেরা আক্রান্ত হয় না। পরে ওই বাদুড় থেকে বিভিন্ন প্রাণীর দেহে রোগ সংক্রামিত হয়। আর কোনও ভাবে আক্রান্ত প্রাণীদের মাংস খেয়ে ফেললে বা সংস্পর্শে এলেই ইবোলা ভাইরাসটি চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ে মানবদেহে। তার পর সংক্রামিত মানুষের রক্ত বা দেহরস (যেমন হাঁচি, কাশি) থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে অন্য মানুষের দেহে।

Disease X warning as doctor who helped discover Ebola fears new deadly  viruses - World News - Mirror Online

এই ভাইরাসের সংক্রমণে জ্বর, রক্তক্ষরণ দেখা যায় রোগীর। হেমোরজিক ফিভারের উপসর্গ দেখা দিতে থাকে। ডিজিজ-এক্সের সংক্রমণেও তেমনই উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। কঙ্গোতেই এই সংক্রমণের কথা প্রথম শোনা গেছে। গবেষকরা বলছেন, এই ডিজিজ-এক্স ইবোলার থেকেও সংক্রামক বলেই মনে করা হচ্ছে। কোথা থেকে এই সংক্রমণ ছড়ালো, জেনেটিক মিউটেশন হচ্ছে কিনা, তার পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। এই সংক্রমণের মধ্যবর্তী বাহক কোনও প্রাণী কিনা সেটাও খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

 

নতুন মহামারী ঠেকাতে কী স্ট্র্যাটেজি নিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা

২০১৮ সালে নরওয়ের রিসার্চ কাউন্সিলের চিফ একজিকিউটিভ ও হু-র বিজ্ঞানবিষয়ক উদেষ্টা জন-আর্নে রটিনজেন বলেছিলেন, অজানা এক ভাইরাসের আতঙ্ক ছড়াতে পারে বিশ্বে। তিনিও ডিজিজ-এক্স কথাটার উল্লেখ করেছিলেন। ইবোলার আবিষ্কর্তা জিন মুয়েম্বি বলছেন, যদি আফ্রিকা এই অজানা রোগের কেন্দ্রস্থল হয়, তাহলে সতর্ক হতে হবে এখন থেকেই। ইবোলার মতো ভাইরাস ছড়ালে তাকে রোখার উপায় আছে। কারণ ইবোলার সংক্রমণ এর আগে বহুবার সামাল দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আফ্রিকাও এই রোগের সঙ্গে পরিচিত। তাই এই ধরনের রোগ হলে এখন থেকেই রোগীদের আইসোলেশনে রেখে পরীক্ষা করতে হবে। ভাইরাল স্ট্রেনের জিনোম সিকুয়েন্স করে তার উৎসের খোঁজ করতে হবে। করোনার সময় এতকিছু ভাবার সময় পাওয়া যায়নি। যতদিনে সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের জিনের বিন্যাস বের করা হয়েছিল, ততদিনে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা বিশ্বে।

The Hardest MMI Stations, Part 3 - "The Outbreak"

মুয়েম্বি বলছেন, আফ্রিকা থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে রোগ ছড়াতে সময় লাগবে। তাই স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে হবে এখন থেকেই। প্রয়োজনে লকডাউনের পথে যেতে হতে পারে।

তবে যদি ভাইরাস জিনের গঠন বারে বারে দলে ফেলে তাহলে বেশি সতর্কতা দরকার। কী ধরনের রোগ ছড়াতে পারে তার আঁচ করে থেরাপির পদ্ধতি ঠিক করতে হবে এখন থেকেই। প্রয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ফের দীর্ঘদিনের লকডাউনে যেতে হতে পারে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More