ফড়িং সেদ্ধ, ঝিঁঝিঁর তরকারি, কঙ্গোতে পোকাতেই পুষ্টি মিলছে শিশু থেকে প্রসূতির

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোর থেকেই বাজারে পসরা সাজিয়ে বসেছেন মিনোভা। বয়স ষাট বছর। চটের বস্তার উপর গুছিয়ে রাখা গঙ্গাফড়িং। জ্যান্ত, ডানাগুলো ছেঁটে দিয়েছেন মিনোভা। মুঠো করে তুলে ভরছেন কাঁচের শিশিতে। আরও কয়েকটি গামলা সাজানো তাঁর সামনে। সেগুলোতে ঠাসা ঝিঁঝিঁ পোকা, শুঁয়োপোকা, মথের লার্ভা ইত্যাদি। এই পোকাই ভাল দামে বিকোবে বেলা বাড়লেই। রুগ্ন, অপুষ্ট ছেলে কোলে নিয়ে মায়েরা এসে শিশি ভরে পোকা নিয়ে যাবে। এই পোকার ঝোল বা তরকারিতেই একবেলা পেট ভরবে দিব্যি।


দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা গোমায় পুষ্টির চাহিদা মেটায় ঝিঁঝি, গঙ্গাফড়িং, মথ

কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্ব দিকে উত্তর কিভুর রাজধানী গোমা। রুক্ষ, আগ্নেয়গিরি ঘেরা এই শহরের সিংহভাগ দারিদ্রসীমার নীচে। খাদ্যাভাসে পোকাতেই এরা স্বচ্ছন্দ। মিনোভার কথায়, ‘‘গোটা নভেম্বরটা ঝাঁকে ঝাঁকে গঙ্গাফড়িং উড়ে আসে এখানে। আমরা ধরে বিক্রি করি। উপাদেয় খাবার। পেটও ভরে, পুষ্টিও মেলে।’’

ভোর পাঁচটায় ছেলে কোলে পোকা কিনতে এসেছিলেন এক মা। এক বছরের ছেলের শরীর প্রায় কঙ্কালসার। ধুঁকছেন মাও। বোতল ভরে ঝিঁঝিঁ পোকা কিনে নিয়ে গেলেন। সামান্য কিছু সবজির সঙ্গে এই পোকা প্রোটিনের ঘাটতি মেটাবে। ছেলেটাকে তো বাঁচাতে হবে!

গোমা শুধু নয় গোটা কঙ্গো প্রজাতন্ত্রেই পোকা খাওয়ার অভ্যাস আছে। গোমার বাজারে মাছ, মাংসের চেয়েও পোকার কদর অনেক বেশি। আফ্রিকা, এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, ইউরোপের নানা জায়গায় মানুষের খাদ্যাভাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে পোকা।

পোকা ধরা অনেক সহজ, জানিয়েছেন মিনোভা। তাঁর কথায়, ‘‘বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় প্রচুর ফড়িং পাওয়া যায়। সেগুলো ধরে আনি। চাষের জন্য বীজ কেনার খরচ, খামারের খরচের চেয়েও সস্তায় হয়ে যায় পোকা চাষ। আমার বাড়িতেই পচা ফল, খাবারের ঝুড়ি রেখে দিলে সেখানে পোকা উড়ে আসে। শুঁয়োপোকার জন্য কিছু গাছ লাগে। খাবার এরা নিজেরাই যোগাড় করে নেয়। আমাদের লাভ অনেক বেশি হয়।’’ তা ছাড়া, পোকাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ফাইবার। কঙ্গোর একটা বড় অংশে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষরা তাই পোকা থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ পেয়ে যান।


বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ ‘এন্টোমোফ্যাগাস’

পোকা খাওয়ার অভ্যাসকে বলে এন্টোমোফ্যাগি। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড-সহ বিশ্বের নানা দেশের খাদ্যাভাসেই পোকা রয়েছে। সমীক্ষা বলছে ৮০ শতাংশ মানুষ ‘এন্টোমোফ্যাগাস’। হাজারেরও বেশি ধরনের পোকা রয়েছে তাদের খাবারের তালিকায়। জীববিজ্ঞানী জুলিয়েটা র‍্যামোসের কথায়, Creepy Crawly Cuisine। আমাজন, আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে পিঁপড়ে খুব উপাদেয়। কয়লার আগুনে সেঁকে বা পপকর্ন বানিয়ে খাওয়া হয় নানা ধরনের পিঁপড়ে।

পতঙ্গের মধ্যে প্রজাপতি ও মথ পছন্দ মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বাসিন্দাদের। প্রজাপতির লার্ভা খাওয়ানো হয় শিশুদের। মেক্সিকোতে পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পোকার চল রয়েছে।

এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকায় মৌমাছির লার্ভা, পিউপা খুবই উপাদেয় ডিশ। সেই সঙ্গে লাল পিঁপড়ে খাওয়া হয় প্রচুর। বিশেষজ্ঞরা বলছে, ১০০ গ্রাম লাল পিঁপড়েতে ১৪ গ্রাম প্রোটিন, ৪৮ গ্রাম ক্যালসিয়াম, আয়রন সমেত নানা খনিজ উপাদান থাকে।

‘ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন’ এবং ‘ম্যাডিসন নেলসন ইনস্টিটিউট ফর এনভায়োরনমেন্টাল স্টাডিজ’-এর গবেষকেরা জানিয়েছেন, কীট-পতঙ্গের মধ্যে রয়েছে প্রোটিন-সহ নানা পুষ্টিকর উপাদান। পাশাপাশি, এরা শরীরে বাসা বাধা ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়াগুলিকে নষ্ট করে, রোগ প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলে। গত বছর বিজ্ঞান পত্রিকা ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্ট’-এ সেই গবেষণার ফলও প্রকাশিত হয়। ‘ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন’-এর গবেষক স্টাল বলেছেন, বর্তমানে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ জায়গায় ‘ইনসেক্ট ইটিং কালচার’ শুরু হয়েছে। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, পিঁপড়ে (Ants), ছোট কীট বা পতঙ্গ (Bugs),  রেশম মথ (silkworm) এগুলির মধ্যে রয়েছে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেলস এবং হেলদি ফ্যাট। পেট এবং হজমের সমস্যা দূর হয় নিয়মিত পোকা খেলে। অতিরিক্ত উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং নানা শারীরিক জটিলতা থেকে রেহাই মেলে।


কী ভাবে পুষ্টি জোগায় ইনসেক্ট মিল
?

পোকার মধ্যে রয়েছে চিটিন নামে একপ্রকার ফাইবার যা সাধারণত ফল বা সব্জির ডায়েটারি ফাইবারের থেকে অনেক আলাদা। এই ফাইবার হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। অন্ত্রে সাহায্যকারী ব্যকটিরিয়া ‘প্রোবায়োটিকস’ তৈরিতে সাহায্য করে, যেগুলি Gastrointestinal Tract-এ বাসা বাঁধা ক্ষতিকর ব্যকটিরিয়াগুলিকে সমূলে বিনাশ করে।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন নিয়মিত ক্রিকেট মিল যাঁরা খেয়েছেন তাঁদের দেহে সাহায্যকারী ব্যাকটিরিয়া বা ‘প্রোবায়োটিকস’ Bifidobacterium animalis (BB-12) অনেক বেশি কার্যকরী। এই ব্যাকটিরিয়া পেটের রোগ নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির কথা যদি বাদই দেওয়া হয়, বিশ্বজুড়ে বিপুল খাবারের চাহিদা পূরণে আগামী দিনে ইনসেক্ট মিল সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হবে বলেই মনে করছেন গবেষকদের একটা বড় অংশ। ‘ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন’-এর গবেষক স্টাল বলেছেন, জাম্বিয়াতে এখন উইপোকার চাষ করছেন মানুষজন। স্টালের কথায়, ‘এটি খেতে মুচমুচে পপকর্নের মতো। বেশ অয়েলি স্ন্যাকস।’ দেখুন আপনিও ট্রাই করবেন কি না!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More