করোনা ঠেকাতে কীভাবে সাড়া দেয় শরীর, কেমন করে তৈরি হয় ‘ইমিউনিটি’, বিস্তারিত বললেন বিশেষজ্ঞ

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা যে কোনও সংক্রামক জীবাণু যদি শরীরে হুট করে ঢুকে পড়ে তাহলে তাকে ঠেকিয়ে শরীরের কোষ-কলাকে বাঁচাতে আপনা থেকেই একটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়। শরীর নিজেই তা তৈরি করে।

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

করোনাভাইরাস আর ইমিউনিটি, আজকের দিনে এই দুটোই পরিচিত শব্দ। ভাইরাসের সংক্রমণের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে ইমিউনিটি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ শক্তি। করোনা কালে ভয় আর আতঙ্ক এতটাই চেপে বসেছে যে মানুষ শুধু ভাইরাস থেকে বাঁচতে বাইরের পরিবেশের কথাই ভাবছে। শরীরে ভেতরেও যে সুরক্ষার বর্ম আছে সে ধারণা নেই অনেকেরই। হালে অ্যান্টিবডি, টি-কোষ ইত্যাদি শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে অনেকেরই। আসলে আমাদের শরীরের কাঠামো এমনভাবেই তৈরি যে তার মধ্যেও একটা সুরক্ষা কবচ তৈরি করা আছে। প্রাকৃতিকভাবে জন্মের সময় থেকেই এই সুরক্ষা কবচ তৈরি হয় শরীরে। যাকে আমরা বলি ইমিউন সিস্টেম (Immune System) বা রোগ প্রতিরোধের বর্ম। এখন এই ইমিউন সিস্টেম আসলে কী এবং কীভাবে কাজ করে সেটাই হল মূল আলোচ্য বিষয়।

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা যে কোনও সংক্রামক জীবাণু যদি শরীরে হুট করে ঢুকে পড়ে তাহলে তাকে ঠেকিয়ে শরীরের কোষ-কলাকে বাঁচাতে আপনা থেকেই একটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়। শরীর নিজেই তা তৈরি করে। এখন কার শরীর কতটা শক্তপোক্ত, অসুখবিসুখ নেই তার উপরেই এই রোগ প্রতিরোধ শক্তি নির্ভর করে। এখন শরীর যত নিয়ম মেনে চলবে, তার উপর অত্যাচার যত কম হবে, সঠিক ডায়েট ও শরীরচর্চার অভ্যাস থাকবে , তার রোগ প্রতিরোধ শক্তি স্বভাবতই বেশি হবে। বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, দুর্বল শরীর মানেই ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। আগে মনে করা হত প্রবীণ ব্যক্তিদের বয়সজনিত কারণে এবং নানা বার্ধক্যজনিত রোগের কারণে রোগ প্রতিরোধ কম বলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কম বয়সীদের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি প্রায় একই রকম। বলাই বাহুল্য, ইদানীং সময় কম বয়সীরাই সংক্রমণের শিকার বেশি হয়েছে, বিশেষত যাদের স্থূলত্ব, ফুসফুসের রোগ, ধূমপানের অভ্যাস বা অন্য কোনও ক্রনিক রোগ রয়েছে তারাই সবচেয়ে বেশি ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে।

এখন দেখে নেওয়া যাক, আমাদের শরীরে ঠিক কী কী রকমের রোগ প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হয়।

ভাইরাসের গন্ধ পেলেই জেগে ওঠে রক্তের বি-কোষ

অ্যান্টিবডি হল শরীরের প্রাথমিক সুরক্ষা কবচ। ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল প্রোটিন তথা অ্যান্টিজেন শরীরে ঢুকলেই সতর্ক হয়ে যায় রক্তের শ্বেতকণিকার বি-কোষ বা বি লিম্ফোসাইট কোষ। এই কোষের কাজই হল যে কোনও ভাবেই বাইরে থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা ভিনদেশী প্রোটিনকে আটকে দেওয়া। কারণ এই প্রোটিন একবার দেহকোষে ঢুকে গেলেই প্রতিলিপি তৈরি করে সংখ্যায় বাড়তে থাকবে।

বি-কোষের কাজই হল অ্যান্টিবডি তৈরি করা। একে ইমিউনোগ্লোবিউলিন বলা হয়। অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এই বি-কোষ তার অনেকগুলো প্রতিলিপি তৈরি করে ফেলে যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ক্লোনিং’ ।  এমন অজস্র কোষ থেকে লক্ষ লক্ষ অ্যান্টিবডি তৈরি হয় রক্তরসে। এইসব অ্যান্টিবডি শৃঙ্খল তৈরি করে ভাইরাল প্রোটিনকে ঘিরে ফেলে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার চেষ্টা করে। গবেষকরা বলেছেন, আরএনএ ভাইরাসের স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিনের সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে এই অ্যান্টিবডি। অনেকটা ক্যাপের মতো স্পাইক প্রোটিনের উপর আবরণ তৈরি করে দেয়। ফলে ভাইরাল প্রোটিন আর দেহকোষের ACE-2 রিসেপটরের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে না। অর্থাৎ ভাইরাসের দেহকোষে ঢোকার রাস্তাটা বন্ধ হয়ে যায়।

 

ঘাতক টি-কোষ জীবাণু সমেত সংক্রামক কোষকে নষ্ট করে দেয়

করোনাভাইরাসকে মারতে শরীরের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল এই টি-কোষ বা টি-লিম্ফোসাইট কোষ। এই কোষ তৈরি হয় হেমাটোপোয়েটিক স্টেম কোষ থেকে। অস্থি মজ্জায় তৈরি হয় এই কোষ। এরপরে  সেখান থেকে চলে আসে থাইমাসে। সেখানেই বড় হয়। এই টি-কোষের কাজ হল রক্ষীর মতো। মানুষের জন্মের পর থেকে মৃত্যু অবধি, এই টি-কোষ শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বা ইমিউন সিস্টেমকে সচল রাখার চেষ্টা করে। অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজও এই কোষেরই। টি-কোষের নিজস্ব রিসেপটর থাকে(TCR) । এই রিসেপটরের কাজ হয় ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা সংক্রামক প্যাথোজেনকে চিহ্নিত করে তাদের ধ্বংস করা। সাধারণত CD8 রিসেপটর প্রোটিন যুক্ত হলে টি-কোষ সাইটোটক্সিক হয়ে ওঠে, তখন তাকে বলে ঘাতক কোষ। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া যদি শরীরের কোনও কোষে ঢুকে প্রতিলিপি তৈরি শুরু করে দেয়, তাহলে ভাইরাস সমেত সেই কোষকে ধ্বংস করে দিতে পারে ঘাতক টি-কোষ। বিজ্ঞানীরা এই ঘাতক কোষকেই ভাইরাস বধের অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করতে চাইছেন।

শরীরে রোগ প্রতিরোধ কতটা তৈরি হল সেটা জানতেই এখন রক্তের বি-কোষ ও টি-কোষ পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেরো সার্ভেতে রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ দেখেই নির্ধারণ করা হচ্ছে কতজন ভইরাস সংক্রামিত হয়েছিলেন আর কী পর্যায়ে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। রোগীর রক্তে অ্যান্টিবডি কতদিন থাকছে সেটা নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ করোনার সংক্রমণে রক্তে অ্যান্টিবডি তিন মাসের বেশি স্থায়ী হচ্ছে না। তাই জোরালো ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না কারও শরীরেই।

এটা গেল শরীরের অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এবার দেখে নেওয়া যাক ভাইরাসের কবল থেকে সুরক্ষা পেতে কী কী ধরনের সাবধানতা মেনে চলতে হবে। এই নিয়মগুলো মানলেই বাইরে থেকেও ভাইরাস প্রতিরোধী নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি হবে।

 

কী কী নিয়ম মানতে হবে

প্রথমত, শরীরের তাপমাত্রা মাপা প্রথম কাজ। অফিসে, কর্মক্ষেত্রে, দোকানে-বাজারে, রেস্তোরাঁ বা শপিং মলে, যে কোনও জনবহুল জায়গায় গেলে সবচেয়ে আগে থার্মাল স্ক্রিনিং দরকার। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বেশি হলেই তখন পরীক্ষা করা দরকার সংক্রমণ রয়েছে কিনা। প্রাথমিক র‍্যাপিড টেস্টে সংক্রমণের চিহ্ন দেখা গেলে তখন আরটি-পিসিআর টেস্ট বা ট্রুন্যাট টেস্ট করিয়ে করোনা পজিটিভ কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া দরকার।

কাজের জায়গায়, রাস্তাঘাটে সবসময়ই ফেস-মাস্ক পরে থাকা জরুরি। থ্রি-লেয়ার মাস্ক না থাকলে বাড়িতে তৈরি সুতির মাস্কই ভাল। হেড গিয়ার বা ফেস-শিল্ড না থাকলেও ক্ষতি নেই। ওড়না বা পরিষ্কার স্কার্ফ মাথায়, মুখে জড়িয়ে রাখা যেতে পারে।

খুব বেশি ভিড় বা জনবহুল জায়গায় না যাওয়াই ভাল। এমনকি বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠানে বা কাজের জায়গায় বেশি জমায়েত না হওয়াই এই সময় বাঞ্ছনীয়।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে আগে দরকার। বাড়িতে বা কাজের জায়গায় পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিতে হবে। বড় জায়গা হলে স্যানিটাইজ করে নেওয়া জরুরি।

দূরত্ব বিধি মেনে চলাটা দরকার। পারস্পরিক দূরত্ব কম করেও ৬ ফুট রাখতে হবে। সুরক্ষা বিধিতে স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশিকা মেনে চলাই ভাল।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More