শরীর সারায়, ওজন ঝরায়, ভাল রাখে হার্ট! কালো চায়ের হরেক গুণের কথা বললেন বিশেষজ্ঞ

কালো চায়ের গুণ অনেক। এর অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট উপাদান অসুখবিসুখ সারায়। অম্বল-বুকজ্বালা সারাতে পারে। এক কাপ কালো চা মুড বদলে দিতে পারে। তার ছাপ পড়ে শরীরেও।

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই…

বাঙালির কাছে চা শুধু নেশা নয়, এক কাপ আবেগ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চা হোক বা নামী রেস্তোরাঁয় বাহারি পোর্সেলিনের পাত্র, চায়ের কাপে তুফান তুলেই বাঙালির কত না আড্ডা, সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক। ঘন দুধ দিয়ে সাদা চায়ের প্রতি মোহ কোন বাঙালির নেই!  তবে স্বাস্থ্য সচেতনরা একটু সমঝে চলেন। সেক্ষেত্রে গ্রিন টি, কালো চা (অক্সিডাইজড), হলুদ চা (আনঅক্সিডাইজড), সবুজ হার্বাল টি—চায়ের রকম অনেক।

কালের নিয়মে যেমন রুচিতে বদল এসেছে, তেমনি খাদ্য ও পানীয়ের গুণাগুন বিচার করে তবেই তার ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছে মানুষ। চা-ও সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। আম বাঙালির বৈঠকি আড্ডায় চা আর এখন শুধু বিনোদনের সঙ্গী নয়, স্বাস্থ্য সচেতন ডায়েটেও জায়গা করে নিয়েছে। গ্রিন টি, হার্বাল টি, জাসমিনের গন্ধ দেওয়া অ্যারোমা টি-এর চাহিদা বেড়েছে। ঘরোয়া উপায় রোগ সারানোর টোটকা হয়ে উঠেছে চা।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, কালো চায়ের গুণ অনেক। এর অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট উপাদান অসুখবিসুখ সারায়। অম্বল-বুকজ্বালা সারাতে পারে। এক কাপ কালো চা মুড বদলে দিতে পারে। তার ছাপ পড়ে শরীরেও।

কালো চা বা ব্ল্যাক টি এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয় চিনে। ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস প্রজাতির গাছ থেকে যে পাতা সংগ্রহ করা হয় তাই ব্ল্যাক টি। রঙের জন্য এর রসকে আমরা বলি লাল চা। এখন দেখে নেওয়া যাক, এই কালো চায়ে কী কী গুণ রয়েছে।

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রোগ সারায়, ওজন কমাতেও জুরি মেলা ভার

কালো চায়ে ভরপুর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে। আর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট মানেই রোগ-জীবাণু নাশ করে। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। যে কোনও ক্রনিক রোগের ঝুঁকি কমায়।

কালো চায়ের আরও একটা ভাল গুণ হল এর মধ্যে থাকা পলিফেনল। এই পলিফেনল হল একরকম অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট যা শরীর ভাল রাখতে সাহায্য করে। কালো চায়ে তিন ধরনের পলিফেনল থাকে—ক্যাটেচিনস, থিয়েফ্ল্যাভিন এবং থিয়ারুবিগিনস। থিয়েফ্ল্যাভিন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্যাটেচিনস মেদ কমাতে সাহায্য করে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ১২ সপ্তাহ ধরে যদি ৬৯০ মিলিগ্রাম ক্যাটেচিনস শরীরে ঢোকে তাহলে মেদ ঝরতে শুরু করে খুব দ্রুত।

এক কাপ চায়ে চনমনে থাকে হৃদয়

কালো চায়ে থাকে ফ্ল্যাভোনয়েড অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। এই ফ্ল্যাভোনয়েড হার্টের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১২ সপ্তাহ ধরে নিয়ম করে কালো চা পান করে গেলে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ ৩৬ শতাংশ কমে যায়। রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে ১৮ শতাংশ। একই সঙ্গে রক্তচাপ বশে থাকে। কোলেস্টেরল, ওবেসিটি কমায়। জটিল হার্টের রোগের ঝুঁকি কমে। ডায়েটে প্রতিদিন চিনি ছাড়া কালো চা রাখলে কার্ডিয়াক রোগের ঝুঁকি ১১ শতাংশ কমে যায়।

ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস

দূরে থাক খারাপ কোলেস্টেরল

আমাদের শরীরে দু’রকমের লাইপোপ্রোটিন থাকে যা কোলেস্টেরল সারা শরীরে পৌঁছে দেয়। একটা হল লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এলডিএল) যাকে খারাপ কোলেস্টেরল বলা হয়। অন্যটা, হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এইচডিএল) যাকে ভাল কোলেস্টেরল বলে। যদি শরীরে এলডিএলের পরিমাণ বেড়ে যায় তাহলে নানা রোগ ধরতে শুরু করে। হার্ট ফেলিওরের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কালো চা এই এলডিএলকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল জমতে পারে না। হার্টের রোগের ঝুঁকি কমে।

কালো চায়ের পলিফেনল

খাদ্যনালীর সংক্রমণ নৈব নৈব চ

কালো চা নিয়ম করে খেলে খাদ্যনালীতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধতে পারে না। অন্ত্রে জটিল রোগ ধরার সম্ভাবনাও থাকে না। আসলে কালো চায়ে যে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে তা সারা শরীরেই ছড়িয়ে পড়ে। ৭০-৮০ শতাংশ জীবাণু বা প্যাথোজেন নাশ করতে বিশেষ ভূমিকা নেয়। ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাস্কুলার রোগের প্রকোপ কমে।


রক্তচাপ থাকে বশে, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে

গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, ছ’মাস ধরে নিয়মিত তিন কাপ কালো চা রক্তচাপের ভারসাম্য ধরে রেখেছে। কিডনি ফেলিওর, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমিয়েছে।

স্ট্রোকের সম্ভাবনাও কমিয়েছে কালো চা। ১০ বছর ধরে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষের উপর পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রতিদিন তিন থেকে চার কাপ কালো চায়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমেছে ৩২ শতাংশ।


আতঙ্কের নাম টাইপ-২ ডায়াবেটিস

টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন কমে যায় এবং বিটা সেল নষ্ট হয়ে যায়। তবে টাইপ ১ এর মতো পরিমাণে নয়। ইনসুলিন কোষের মধ্যে প্রবেশের জন্য যে রিসেপটরটি লাগে, সেটি নষ্ট হয়ে যায়। তার ফলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ইনসুলিনের মাত্রা কমে না ঠিকই কিন্তু কোষের রিসেপটর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ইনসুলিন কাজ করতে পারে না। যার ফলে ইনসুলিন কোষের মধ্যে গ্লুকোজকে প্রবেশ করাতে পারে না। রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, দেহের ওজন কমে যায়, বারবার তেষ্টা পায়, ঘনঘন বাথরুম যেতে হতে পারে, খিদে বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে হাত-পা ঝিমঝিম করতে থাকে। হাইপারটেনশন, থাইরয়েড, হার্টের অসুখ, ফ্যাটি লিভার, আর্থারাইটিজের মতোই ডায়াবেটিস মূলত একটি ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’। জীবনশৈলীর কারণে যে অসুখগুলো হয় তার মধ্যে অন্যতম হল ডায়াবেটিস। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনই এই ধরনের অসুখের মূলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কালো চায়ে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।

 

ক্যানসারের সুরক্ষা কবচ

কালো চায়ের পলিফেনল ক্যানসার কোষের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ১০০ রকমের ক্যানসার আছে যার অনেকগুলোই প্রতিরোধ করা যায় না। তবে ক্যানসারের বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা যেতেই পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কালো চায়ের পলিফেনল স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। হরমোনের তারতম্যে যে ক্যানসার হয় তার প্রকোপ কমাতে পারে কালো চা।

তবে চা খাওয়াতে কিছু নিয়ম মানতেই হবে। উন্নত মানের কালো চা কিনতে হবে অবশ্যই। চিনি ছাড়া চা খাওয়াই বেশি উপকারি। দিনে তিন থেকে চার বার চা খাওয়া যেতে পারে। তবে শরীর বুঝে কতবার চা খাওয়া ঠিক সেটা বিশেষজ্ঞরের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More