সহজ যোগেই সারবে শরীর, সুখী হবে মন, টগবগ করবে আত্মবিশ্বাস, উপায় বললেন বিশেষজ্ঞ

উদ্বেগপ্রবণতা, অবসাদ সরিয়ে ঝকঝকে শরীর আর তরতাজা মনের উপায় কিন্তু একটাই, সেটা হল নিয়ম করে যোগাসন।

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

ছোটাছুটির জীবনে শারীরিক ক্লান্তি যতটা, তার থেকেও বেশি মানসিক চাপ। এই দুয়ের জাঁতাকলে পড়েই নানানটা রোগ। সেই সঙ্গে দুর্ভোগ। আজ হাত-পা-পিঠে ব্যথা, তো কাল গভীর মানসিক অবসাদ। কিসে যে রেহাই মিলবে সেটাই বোঝা যায় না! সেডেন্টারি লাইফস্টাইলেও যদি নীরোগ শরীর ও ফুরফুরে মনের স্বাদ জাগে, তাহলে সহজ সমাধান একটাই–যোগাসন। প্রতিযোগিতার যুগে চাপকে একেবারে দূরে সরিয়ে রাখা যাবে না, সে আনাগোনা করবেই। তবে উদ্বেগপ্রবণতা, অবসাদ সরিয়ে ঝকঝকে শরীর আর তরতাজা মনের উপায় কিন্তু একটাই, সেটা হল নিয়ম করে যোগাসন।

প্রেশার, সুগার, অনিদ্রার মতো ঘ্যানঘ্যানে রোগ থেকে রেহাই তো মিলবেই আবার ক্লান্তির ছাপ পড়া মনটাও বেশ সতেজ হয়ে উঠবে। শরীরের অসুখ হোক বা মনের রোগ, বিশেষজ্ঞরা বলেন নিয়ম করে যোগব্যায়ামের অভ্যাস করলেই দেখা যাবে সব রোগ উধাও। আর এখন তো ডিজিটাল ভারতের ফিট থাকারও মোক্ষম মন্ত্র হল যোগাসন।


মরচে পড়া শরীরের ভেতরটা ঝকঝকে করবে যোগাসন

রোগের তো শেষ নেই। রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, হৃদরোগ থেকে সর্দিকাশি, হাঁপানি, গাঁটে গাঁটে ব্যথা—তালিকাটা লম্বা। শরীরের ভেতরটাই যদি মরচে পড়ে যায়, তার ছাপ বাইরে তো পড়বেই! সুস্থ শরীর মানেই ফিট, আত্মবিশ্বাসী চেহারা। বাইরেটা ঝকঝকে করতে হলে আগে ভেতরের খোলনলচে সারিয়ে তুলতে হবে। এখন দেখা যাক, যোগাসনে কী কী সুফল মেলে—

রক্তচাপ—নিয়মিত যোগাভ্যাসে রক্তচাপ থাকে নিয়ন্ত্রণে। শরীরে রক্ত সঞ্চালন ঠিকভাবে হয়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো সঠিক যোগাসন করলে উচ্চরক্তচাপের সমস্যা দূর হয়। ঘন ঘন ওষুধ খাওয়ার দরকার পড়ে না।

পালস রেট—হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ মানেই পালস রেট হঠাৎ করে খুব বেড়ে যাওয়া, বা একেবারে কমে যাওয়া। যোগাসন এই পালস রেটকে ঠিক জায়গায় রাখে।

রক্ত সঞ্চালন—নিয়মিত যোগাসন মানেই সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন সঠিকভাবে হওয়া। বিপাকের হার বাড়ে, শরীরের প্রতিটি অঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছয়।

শ্বাসযন্ত্র থাকে ফিট–যাঁরা ক্রনিক সর্দিকাশির সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কিছু ব্রিদিং এক্সারসাইজ খুব ভাল কাজ দেয়। ফুসফুসকে ভাল রাখে। শ্বাসের সমস্যা, হাঁপানির মতো রোগ দূর করে।

শরীরের প্রতিটি অঙ্গ থাকে ফিট–ব্রিদিং এক্সারসাইজ, ডাইজেস্টিভ সিস্টেম ভাল রাখার এক্সারসাইজ, স্পাইনাল এক্সারসাইজ (ব্যাক বেন্ডিং, ফরওয়ার্ড বেন্ডিং, এক্সটেনশন ইত্যাদি), নানা রকম আসন শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে ভাল রাখতে সাহায্য করে। জটিল রোগের ঝুঁকি কমায়।

রোগ প্রতিরোধ বাড়ায়—নীরোগ শরীর মানেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। বর্তমানে যেভাবে সংক্রামক রোগের প্রার্দুভাব বাড়ছে, তাতে শরীরকে সবচেয়ে আগে শক্তপোক্ত করতে হবে। ইমিউনিটি বাড়লেই কাবু হবে যে কোনও সংক্রামক ব্যধি।

বিপাকের হার বাড়ায়—নিয়মিত যোগাসনে খিদে বাড়ে, হজমের সমস্যা দূর হয়। খাবারের পুষ্টি সারা শরীরে পৌঁছয়। হজমশক্তি বাড়াতে মুঠো মুঠো ট্যাবলেট খাওয়ার দরকার পড়ে না।

গাঁটে গাঁটে ব্যথা কমায়—আর্থ্রাইটিসের মোক্ষম দাওয়াই হল যোগ ব্যায়াম। তাছাড়া অফিসে সারাদিন একভাবে বসে থেকে শিরদাঁড়ায় ব্যথা, পিঠে বা পায়ের ব্যথায় আরাম পেতেও নিয়মিত যোগাসন করা উচিত। যেমন, ঘাড় আর কাঁধের কিছু ব্যায়ামের মধ্য দিয়ে কাঁধের ব্যথা বা ঘাড়ের ব্যথা সারিয়ে নেওয়া যায়।


ঝকঝকে চেহারা, আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর

ভেতর ফিট, তো বাইরেটাও ঝরঝরে। যোগাসনের ম্যাজিক এখানেই।

১) নিয়মিত যোগাসন শরীরকে ডিটক্সিফাই করে। বয়সের ছাপ সহজে পড়তে দেয় না।

২) হাত-পা, চেহারা টানটান থাকে। ত্বকও উজ্জ্বল হয়। আত্মবিশ্বাসের ছাপ পড়ে চলাফেরায়।

৩) শরীরের শক্তি বাড়ায়। রোগ প্রতিরোধ ভেতর থেকে বাড়লে শরীরও শক্তপোক্ত, মজবুত হয়। অল্পে ক্লান্তির ছাপ পড়ে না।

৪) এনার্জি—যোগাসনের অন্যতম বড় উপকারিতা। যতই পরিশ্রম হোক না কেন, উদ্যোম আর উৎসাহের অভাব হবে না। সামান্য রোগে শরীর দুর্বল হবে না।

৫) ওজন কমে। সেডেন্টারি লাইফস্টাইলে স্থূলতা বা ওবেসিটি একটা বড় সমস্যা। এর থেকেই নানা জটিল রোগ বাসা বাঁধে শরীরে। নিয়মিত যোগাসন স্থূলতা কমাতে সাহায্য করে।

৬) অনিদ্রা দূর হয়। শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর হলে ঘুমও ভাল হয়। অনেক স্ট্রেস ফ্রি থাকা যায়। যাঁদের আসন করার সমস্যা রয়েছে, তাঁদের বিশেষজ্ঞরা নানারকম প্রণায়ামের পরামর্শ দেন। তাতেও মন হাল্কা থাকে। অবসাদ কাটে।

৭) শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। বডি ব্যালান্স খুব জরুরি বিষয়, সেটা মেলে সঠিক এক্সারসাইজে।

8) নিয়মিত যোগাসন মানেই ক্লান্তিহীন চেহারা, আত্মবিশ্বাসী মন। মানসিক চাপ কমায় সঙ্গীর সঙ্গেও ভাল সময় কাটানো যায়। যৌন জীবনেও সুফল মেলে।

 

মন থাক সুখে


মুড
মেজাজই আসল রাজা। যোগাসন সবচেয়ে ভাল মুড বুস্টার। যোগের একটা সুন্দর গালভরা নাম আছে— সাইকো-সম্যাটিক মেডিসিন। মানে, মন থেকে শরীরে যে সব রোগ জন্ম নেয়, তাদের মোক্ষম দাওয়াই যোগাসন।

স্ট্রেস ফ্রি—মেজাজ ফুরফুরে তো স্ট্রেস বা ক্লান্তি পালাবে বহুদূর। হাল্কা আসান, নিয়মিত প্রাণায়ামে মন থাকবে একেবারে চাঙ্গা।

অবসাদ, উদ্বেগ গায়েব—অফিসের টেনশন হোক, বা সাংসারিক চাপ, নিজের জন্য দু’দণ্ড সময় বার করে যোগাসন করেই দেখুন না, অবসাদ-উদ্বেগ উধাও হয়ে যাবে চোখের পলকে।

মনের উপর নিয়ন্ত্রণ—এর জন্য যোগাসনের চেয়ে ভাল ওষুধ আর কিছু হয় না। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে সঠিক মেডিটেশন করতে পারলে মনের উপর নিয়ন্ত্রণ হয় জোরালো। আবেগ, অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব দেখা যায়।

পজিটিভিটি– দুশ্চিন্তা সরিয়ে জীবনকে সুন্দর করে দেখতে হলে মানসিক চাপ আগে কমাতে হবে। তার জন্য যোগাসন প্রয়োজন।

মনোযোগ বাড়ে—যে কোনও কাজেই মনোযোগ বাড়াতে যোগাসনের চেয়ে ভার টোটকা কিছু হয় না। স্মৃতিশক্তিও বাড়ে।

চঞ্চল মন শান্ত হয়—উদ্বেগ কমা মানেই মন শান্ত, ধীরস্থির হয়। চিন্তাভাবনাগুলো ডানা মেলতে পারে।

শরীরের রসায়ন বোঝে সেই

সুস্থ শরীরের ভাষা বোঝে যোগাসনই।

১) রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। শরীরচর্চার মাস্টারস্ট্রোক এখানেই।

২) টক্সিন দূর করে। রোগ প্রতিরোধ বাড়ায়।

৩) রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

৪) শরীরে সোডিয়াম, পটাসিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।

৫) নিয়মিত যোগাসনে শরীরের কলকব্জা ঠিকভাবে কাজ করে। হরমোনের ক্ষরণও সঠিক মাত্রায় হয়।

৬) ট্রাইগ্লিসারাইড বা রক্তের ফ্যাটকে বলে গুডবাই। হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়।

৭) রক্তে লোহিত কণিকার সংখ্যা বাড়ায়। রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করে।

8) শরীরে ভিটামিন সি-এর মাত্রা বাড়ায়। ভিটামিন সি হল এমন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

 

জটিল রোগকে গুডবাই

হৃদরোগ—নিয়মিত যোগাসন রক্তচাপ কমায়, স্ট্রেস কমায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে, ফলে হৃদরোগের রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো কমে যায়।

অস্টিওপোরেসিস—ওজম কমানোর ব্যায়াম হাড়কে মজবুত করে।

অ্যালঝাইমার্স—নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত যোগাসন, প্রাণায়াম মস্তিষ্কে গামা-অ্যামাইনোবিউটারিক (GABA)-এর মাত্রা বাড়ায়। ফলে স্মৃতিভ্রংশ বা অ্যালঝাইমার্সের মতো রোগের ঝুঁকি কমে।

টাইপ-টু ডায়াবেটিস— এ ক্ষেত্রে ইনসুলিন কমে যায় এবং বিটা সেল নষ্ট হয়ে যায়। ইনসুলিন কোষের মধ্যে গ্লুকোজকে প্রবেশ করাতে পারে না। রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে যায়। যোগাসন ইনসুলিন তৈরির প্রক্রিয়াকে বাড়িয়ে দেয়।

রোগের উপর মলম দেবে যোগাসন


কারপ্যাল টানেল সিনড্রোম
হাত, কব্জির ব্যথা, শিরায় টান এই সিনড্রোমের উপসর্গ। সেখানে সহজ যোগাসনেই ব্যথা গায়েব হতে পারে।

হাঁপানি—শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি দূর হবে সহজ প্রাণায়ামে। ব্রিদিং এক্সারসাইজেই কাজ হবে ম্যাজিকের মতো।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো জটিল স্নায়বিক রোগ দূর করতে যোগাসনের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। মানসিক সমস্যারও সহজ সমাধান যোগাসন।

ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যোগাসন কাজে দেয়। রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ বাড়ে, কেমোথেরাপির পরে নানারকম সমস্যা কিছুটা হলেও কমে।

মাইগ্রেন বা মাথা ধরার ক্রনিক রোগ সারাতেও যোগাসন তুলনাহীন।

ফুসফুসের রোগ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস দূর করতে নিয়মিত যোগাসন প্রয়োজন।

মৃগীরোগ সারাতেও যোগাসনের ভূমিকা রয়েছে। মানসিক উদ্বেগ কমে, শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে।

অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারের মতো চিন্তার বাতিক বা মানসিক সমস্যাকে দূর করতেও যোগাসন গুরুত্বপূর্ণ। মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে।

কোষ্ঠকাঠিন্য সারায় যোগাসন। আইবিএসএর (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম) মতো কিছু পেটের রোগ আছে, যাদের স্বভাবটাই বড্ড ঘ্যানঘেনে। এমন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ডাক্তাররাও পরামর্শ দেন যোগাসনের দিকে ঝোঁকার।

অ্যালার্জি বা যে কোনও ধরনের সংক্রামক রোগকে দূরে রাখে যোগাসন।

মেনোপজের পরবর্তী সমস্যাগুলোর জন্য নিয়মিত যোগাসনেরই নিদান দেন বিশেষজ্ঞরা। হরমোনের মাত্রা সঠিক থাকে, নানারকম স্ত্রীরোগের ঝুঁকি কমে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More