কৃষ্ণাঙ্গদের চোখে ঘষে দিত যৌনরোগের জীবাণু, ইতিহাসের নৃশংস কিছু ‘সিক্রেট এক্সপেরিমেন্ট’

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু’বছর আগের কথা। কোচির এক বিজ্ঞানীর আত্মহত্যার খবর গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞানীর নাম ছিল এমপি প্রসাদ। তাঁকে কোচির ‘গোল্ডস্মিথ’ বলা হয় এখন। সেই বিজ্ঞানীর সুইসাইড নোটে লেখা ছিল তিনি পটাসিয়াম সায়ানাইড নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। এই বিষ একবার জিভে ঠেকালেই নিশ্চিত মৃত্যু। সায়ানাইডের স্বাদ কেমন তা জানতেই এই পরীক্ষা করেন। বিষ খান নিজেই, মৃত্যুর আগের মুহূর্তে কয়েকটি শব্দে লিখে যান– পটাসিয়াম সায়ানাইডের স্বাদ অ্যাসিডের মতো। জিভ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

মানুষের শরীরকে ব্যবহার করে (হিউম্যান সাবজেক্ট) বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার উদাহরণ অজস্র। বিজ্ঞানীরা নতুন আবিষ্কারের নেশায় নিজেকেই ‘সাবজেক্ট’ হিসেবে ব্যবহার করেন, আবার কখনও এই ধরনের পরীক্ষা চালানোর জন্য অন্য মানুষের শরীর ব্যবহার করেন। হিউম্যান সাবজেক্ট নিয়ে পরীক্ষা চালানো নীতি আইনের বিরুদ্ধে। তবুও সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় মানুষের শরীরকে ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। গরিব, পিছিয়ে পড়া, কৃষ্ণাঙ্গদের এই গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হত বেশি। জেলবন্দি আসামিরাও ছিল তালিকায়। যৌনরোগ বা মারণ রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি বের করতে অনেক গোপন পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হত। বেশিরভাগক্ষেত্রেই মৃত্যু হত ‘সাবজেক্ট’-এর, বা তাঁরাও কোনও প্রাণঘাতী রোগের শিকার হয়ে পড়ত। বাদ যেত না মহিলা ও শিশুরাও।

Human Radiation Experiments | Atomic Heritage Foundation

আজকের লেখা তেমনই কিছু ‘সিক্রেট এক্সপেরিমেন্ট’ নিয়ে। সংক্রামক যৌন রোগ ও মারণ রোগের ওষুধ বা টিকা আবিষ্কারের আগে এমন নৃশংস এক্সপেরিমেন্ট হয়েছিল কিছু দেশে। মৃত্যু হয়েছিল হাজার হাজার নিরপরাধ, অসহায় মানুষের।

electronicsquid: Unspecified medical experiment... - | Medical university,  Medical school, Medical

প্রজেক্ট এমকে-আলট্রা—জেলবন্দি আসামিদের শরীর নিয়ে ভয়ঙ্কর পরীক্ষা

১৯৫৩ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জেলবন্দি আসামিদের ওপর নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। আমেরিকার ‘সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি’ (সিআইএ) এই পরীক্ষাগুলো চালিয়েছিল। বেশিরভাগই ছিল নিয়মবিরুদ্ধ, বেআইনি। শুরুটা হয়েছিল হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগ দিয়ে। আসামিদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক বদল জানতে ও তাদের মনের গোপন খবরের হদিশ পেতে এই পরীক্ষা করা হত। এই ধরনের সাইকোঅ্যাকটিভ অ্যাজেন্ট শরীরে ঢোকায় অনেকের মৃত্যু হয় বা জটিল স্নায়ুর রোগ দেখা দেয়।

29-Prison-Inmates-as-Test-Subjects

টুথপেস্ট, নাইট ক্রিম, জীবনদায়ী ওষুধ, বিষাক্ত রাসায়নিক সব কিছুর পরীক্ষাই হত আসামিদের শরীরে। হাই-রিস্ক ক্যানসারের ওষুধ পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হত কৃষ্ণাঙ্গদের। শোনা যায়, চেস্টার এম.সাউথামস্ট নামে আমেরিকার এক অনকোলজিস্ট আসামিদের শরীরে হেলা কোষ ইনজেক্ট করেছিলেন গোপনে। মানুষের শরীরে ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে কিনা তার জন্য ছিল সেই পরীক্ষা। ম্যালেরিয়া ওষুধের পরীক্ষা আইন করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ‘স্টেটভিলে পেনিটেনশিয়ারি ম্যালারিয়া স্টাডি’ অনেকের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। তাছাড়া ছিল যৌন রোগের থেরাপি। তারজন্য গোপন ওষুধ খাওয়ানো হত আসামিদের। অনেকেই সিফিলিস বা ওই জাতীয় রোগের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতেন।

 

কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর সিফিলিসের ভয়ঙ্কর পরীক্ষা, ইতিহাস আজও মনে রেখেছে

১৯৩২ সাল। আমেরিকার টাস্কেজি ইউনিভার্সিটিতে একটি গোপন পরীক্ষা শুরু করেন আমেরিকার গবেষক, ডাক্তাররা। মার্কিন পাবলিক হেলথ সার্ভিস ও সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এই এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিল অ্যাফ্রো-আমেরিকানদের ওপরে। এসটিডি (সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিস)  নিয়ে সেই পরীক্ষার পদ্ধতি দেখে নিন্দায় সরব হয়েছিল বিশ্ব।

Tuskegee Syphilis Study - Wikipedia

কৃষ্ণাঙ্গদের বলা হয়েছিল, ফ্রি-তে তাদের মেডিক্যাল চেকআপ হবে। কোনও অসুখবিসুখ থাকলে তা সারিয়ে দেওয়া হবে। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রায় ৪০ বছর সিফিলিস রোগের জীবাণু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের শরীরে। ভ্যাকসিন পরীক্ষার মতো হয়েছিল সে এক্সপেরিমেন্ট। ৩৯৯ জনকে প্রাথমিকভাবে সাবজেক্ট বেছে নেওয়া হয়েছিল। দিনের পর দিন রোগের জীবাণু ইনজেক্ট করিয়ে পর্যবেক্ষমে রাখা হত। এই পরীক্ষায় মৃত্যু হয়েছিল ১২৮ জনের। বাকিরা যৌনরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠায় ১৯৭২ সালে এই পরীক্ষা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল সিডিসি। তবে ততদিনে সাঙ্ঘাতিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল বহু মানুষের মধ্যে। অনেক শিশু এই রোগ নিয়েই জন্মেছিল।

Tuskegee Experiment: The Infamous Syphilis Study - HISTORY

যৌনকর্মীরা যখন ‘সাবজেক্ট’–গুয়াতেমালায় সিফিলিস এক্সপেরিমেন্ট

এই বর্বরোচিত এক্সপেরিমেন্টের গল্প আজও ইতিহাস মনে রেখেছে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে মার্কিন বিজ্ঞানীরা গুয়াতেমালায় এই ভয়ানক পরীক্ষা চালিয়েছিল। সাবজেক্ট ছিলেন যৌনকর্মী, মানসিক রোগী, প্রতিবন্ধীরা। এই গবেষণার উদ্যোক্তা ছিলেন জন চার্লস কাটলার। তিনিও বেআইনিভাবে মানুষের শরীর বেছে নিয়েছিলেন তাঁর গোপন এক্সপেরিমেন্টের জন্য। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় লক্ষাধিক সেনা এই সিফিলিসে আক্রান্ত হয়েছিল। সেনা, নাবিকরা এই রোগে আক্রান্ত হত বেশি। তাদের চিকিৎসার জন্যই এমন অনেক সিক্রেট এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিল আমেরিকা।

গুয়াতেমালার যৌনকর্মীদের টাকার লোভ দেখিয়ে ডেকে আনতেন বিজ্ঞানী জন চার্লস কাটলার। সেই যৌনকর্মীদের সংস্পর্শে এসেছেন যাঁরা তাঁরাও হতেন সাবজেক্ট। মানসিক রোগী, জেলবন্দি আসামি ও প্রতিবন্ধীরাও ছিলেন তালিকায়। বিজ্ঞানী গোপনে সিফিলিস, গনোরিয়া রোগের জীবাণু ঢুকিয়ে দিতেন শরীরে। জীবাণুর প্রতিরোধে শরীর কতটা সাড়া দেয় সেটা দেখাই ছিল গবেষণার উদ্দেশ্য। আর সেটা করতে গিয়েই সাবজেক্টদের সারা শরীরে, যৌনাঙ্গে দগদগে ক্ষত তৈরি হত। ত্বকে জমাট বেঁধে যেত রক্ত, র‍্যাশ বের হত সারা শরীরে। দু‘বছরের মধ্যে অন্তত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল এই পরীক্ষায়। বাকিরা যৌনবাহিত নানা রোগের শিকার হয়েছিলেন। স্নায়বিক রোগও দেখা দিয়েছিল অনেকের। পরবর্তীকালে আমেরিকা এই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছিল, বলা হয়েছিল এই পরীক্ষা মানবতার বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর এক অপরাধ। নিরাপরাধ বহু মানুষের মৃত্যু ঘটানো হয়েছিল, ইচ্ছা করেই মারণ রোগের বীজ পুঁতে দেওয়া হয়েছিল শরীরে।

First Do (No) Harm”: Unethical Human Experimentation and Ethics – Health &  Medicine in American History

রোগের জীবাণু চোখে ঘষে দিতেন ডাক্তার

আরও এক নৃশংস এক্সপেরিমেন্ট। গনোরিয়া রোগের জীবাণু সাবজেক্টদের চোখে ঘষে দিতেন গবেষক হেনরি হেইম্যান। গনোরিয়া হল সেক্সুয়াল ট্রান্সমিটেড ডিজিজ। নাইসেরিয়া গনোরিয়া নামে জীবাণু বাহিত রোগ। এই যৌনাঙ্গ, মুখ, পায়ুতে এই রোগ হতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা মহিলার এই রোগ হলে তা সন্তানের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ডাক্তার হেনরি হেইম্যান গনোরিয়া নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী ও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্তদের সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নিতেন। কাঠির আগায় রোগের জীবাণু লাগিয়ে তা ঘষে দিতেন চোখে। সারা মুখে দগদগে ঘা হয়ে যেত সাবজেক্টদের। চলে যেত দৃষ্টি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ত সারা শরীরে। শোনা যায়, ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল এই এক্সপেরিমেন্টে। ডাক্তার হেনরি হেইম্যানের কী শাস্তি হয়েছিল তা অবশ্য জানা যায়নি।

Tuskegee Study Deters Some Black People From COVID-19 Vaccine : NPR

গোপন পরীক্ষা করতে গিয়ে নিজেই অসুখে পড়েন বিজ্ঞানী—ডাক্তার নগুচিকে কে না চেনে

ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে চর্চা করেন যাঁরা, তাদের কাছে জাপানি বিজ্ঞানী হিদেও নগুচি বিখ্যাত নাম। ব্যাকটেরিওলজিস্ট যিনি ১৯১১ সালে সিফিলিস রোগের কারণ এবং এই রোগ থেকে কীভাবে একজন রোগী পঙ্গু হয়ে যেতে পারে তার খোঁজ পেয়েছিলেন। নোবেলের জন্য মনোনীতও হয়েছিলেন। তবে নগুচিকে নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। সুনামের সঙ্গে বদনামও আছে বিজ্ঞানীর।

Who is Dr. Hideyo Noguchi? : Hideyo Noguchi Africa Prize - Cabinet Office  Home Page
বাঁ দিকে, ডাক্তার হিদেও নগুচি

নিউইয়র্কের রকফেলার ইনস্টিটিউটে তিনি সিফিলিসের পরীক্ষা করেন শিশুদের শরীরেও। রোগ আছে এমন তিনশো জন সাবজেক্ট বেছে নিয়েছিলেন বিজ্ঞানী। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে তুলে আনা হয়েছিল রোগীদের। সেই সঙ্গে শিশুদেরও ধরে এনেছিলেন। রোগের জীবাণু শরীরে ঢুকিয়ে তার প্রভাব ত্বকে কেমন পড়ছে সে পরীক্ষা করতেন নগুচি। এই খবর জানাজানি হয়ে গেলে তোলপাড় শুরু হয় বিশ্বজুড়ে। এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চাপ আসে বিজ্ঞানীর ওপরে। নানা হাঙ্গামার পরে বিজ্ঞানী শেষে নিজের শরীরেই জীবাণু ঢুকিয়েছিলেন। সিফিলিসে আক্রান্তও হয়েছিলেন। বিজ্ঞানী দেখেছিলেন, এই রোগ শরীরে থাকলে ধীরে ধীরে রোগী প্যারালাইসিসের দিকে যেতে থাকে। সিফিলিসের কারণ ট্রিপোনেমা প্যালিডাম ব্যাকটেরিয়ার কথাও বলেছিলেন বিজ্ঞানী। তিনি নিজেও পঙ্গুত্বের শিকার হতে বসেছিলেন। সাই হোক শেষপর্যন্ত সিফিলিস নিয়ে অজানা তথ্য দেওয়ায় তাঁর নাম মনোনীত করেছিল নোবেল কমিটি।

10 Disturbing Cases Of Unethical STI Experiments - Listverse
গর্ভবতীদের শরীরে এইডসের পরীক্ষা, রোগ নিয়ে জন্মেছিল কত শিশু

এই গবেষণাও চালিয়েছিল আমেরিকা। এইডস রোগ যাতে মায়ের শরীর থেকে সন্তানের মধ্যে না ছড়ায় তার জন্য ছিল এই পরীক্ষা। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন গর্ভবতী মহিলাদের ওপরে গোপনে এই পরীক্ষা চালিয়েছিল। আফ্রিকা, থাইল্যান্ডে এই সিক্রেট এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ১২ হাজার অম্তঃসত্ত্বা মহিলার ওপর গবেষণা চলেছিল। একদলকে ওষুধ, অন্যদলকে প্ল্যাসেবো ট্রায়ালে রাখা হয়েছিল। দেখা গিয়েছিল দুই দলেই গর্ভবতী মহিলারা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন হাসপাতালে এই গবেষণা চলেছিল কযেক বছর। হাজারের বেশি সদ্যোজাত শিশু রোগ নিয়ে জন্মেছিল। পরে সরকারের তরফে আইন করে গর্ভবতী মহিলাদের শরীরে যে কোনও রকম বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More