১৬ কোটি টাকা দামের ওষুধের ডোজ পড়ার পর, এখন পা নাড়াচ্ছে ১৪ মাসের মেয়ে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত হয়েছিল ১৪ মাসের ফুটফুটে মেয়েটা। পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল হাত-পা। চিকিৎসা সঠিক সময় না হলে প্রাণ বাঁচানোও সম্ভব হত না। চিকিৎসার খরচও কোটি কোটি টাকা। ভারতে হয় না। জিন থেরাপির একটি ওষুধের দামই ১৬ কোটি টাকার কাছাকাছি। মেয়েকে বাঁচানোর সব আশাই যখন ছেড়ে দিয়েছিলেন বাবা, তখনই ঘটল চমৎকার। লটারিতে বিশাল অঙ্কের টাকা জিতে গেলেন। প্রাণও বাঁচল একরত্তির।

কোনও সিনেমার গল্প নয়। বাস্তবেই ঘটেছে এমনটা। হয়তো একেই বলে রাখে হরি মারে কে!

বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা মহম্মদ বাসিল কর্মসূত্রে ছিলেন দুবাইতে। পেশায় একটি সংস্থার অডিটর। তাঁর ১৪ মাসের মেয়ে ফতিমা জটিল স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। এই রোগের নাম ‘স্পাইনাল মাসকিউলার অ্যাট্রফি’ (এসএমএ)। স্নায়ুর রোগ যা জিনগত ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে। বংশপরম্পরায় এই রোগ ছড়াতে পারে বাবা-মায়ের থেকে সন্তানের শরীরে। ফতিমার ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছিল। বাসিলের প্রথম সন্তানের মৃত্যুও হয় এই রোগে। দ্বিতীয় সন্তান ফতিমার জন্মের পরেই রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন বাসিল। রক্তের পরীক্ষা, পেশির বায়োপসি, সিটি স্ক্যান সবই করিয়ে ফেলেছিলেন। যা ভয় পেয়েছিলেন তাই সত্যি হয়ে দেখা দেয়। ফতিমাও জন্মের পরেই আক্রান্ত হয়েছিল স্পাইনাল মাসকিউলার অ্যাট্রফি রোগে।

১৪ মাস বয়সের পর থেকে মেয়ের হাত-পা অবশ হয়ে আসতে থাকে, বলেছেন ফতিমার বাবা। স্নায়ুর রোগের সব উপসর্গই ছিল। ডাক্তাররা বলেন, এসএমএ জিনের মাধ্যমে বাহিত হয়। যদি বাবা-মায়ের শরীরে একটি স্বাভাবিক জিন ও অন্যটি পরিবর্তিত মা মিউটেটেড জিন থাকে তাহলে তাঁরা রোগে আক্রান্ত হন না, পরিবর্তে বাহক হয়ে যান। কিন্তু সন্তানের শরীরে দুটি জিনই আসে ত্রুটিযুক্ত হয়ে। তখন রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে।

Image result for spinal muscular atrophy

Image result for spinal muscular atrophy symptoms

কী হয় এই রোগে?  আমরা জানি, মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ুর মাধ্যমে ইলেকট্রিক সিগন্যাল বা বার্তা বা সঙ্কেত চলে আসে পেশিতে। ঐচ্ছিক পেশির সঞ্চালন এই সঙ্কেতের ওপরেই নির্ভর করে। এখন যদি কোনওভাবে মস্তিষ্ক থেকে বার্তা স্নায়ু আর বয়ে নিয়ে যেতে না পারে, তাহলে পেশিও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। পেশির সমস্ত সঞ্চালন তথা নড়াচড়া বন্ধ হতে থাকে। ফলে মানুষ আর হাত-পা, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ চালনা করতে পারে না। ডাক্তাররা বলেন, শিশুদের স্পাইনাল মাসকিউলার অ্যাট্রফির টাইপ-১ ও টাইপ-২ রোগ বেশি মারাত্মক। ঘাড় নরম হয়ে ব্যালান্স হারিয়ে যায়, হাত-পা অবস হতে থাকে, হাঁটাচলা করতে পারে না শিশু। উঠে বসতেও সমস্যা হয়। খাবার গিলতে, কথা বলতে সমস্যা হয়, শ্বাসযন্ত্রের রোগও দেখা যায়। এসএমএ হলে দু’বছরের বেশি বাঁচতে পারে না শিশু। প্রতি দশ হাজার শিশুর মধ্যে একজন এই বিরল স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত হয় প্রতি বছর।

ফতিমার টাইপ-১ এসএমএ দেখা গিয়েছিল। পরীক্ষায় ধরা পড়ার পরই ইন্টারনেট সার্চে বেঙ্গালুরুর ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতালের খোঁজ পান বাসিল। এই হাসপাতালে ডাক্তার অ্যান অ্যাগনেস ম্যাথিউ এই রোগের থেরাপি করেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে বেঙ্গালুরুতে চলে আসেন বাসিল ও তাঁর পরিবার। ফতিমাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। কিন্তু ওষুধের খরচের কী হবে? ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতাল জানায়, এই রোগের থেরাপি ভারতে হয় না। বিদেশ থেকে ওষুধ আনাতে হয়। সেই ওষুধের নাম জ়োলজেন্সমা।  নোভার্টিস নামে একটি কোম্পানি এই ওষুধ তৈরি করে। নোভার্টিসের জিন থেরাপিতেই এই ওষুধের প্রয়োগ হয় যা মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের স্বীকৃতি পেয়েছে। এই ওষুধের দাম কম করেও ১৬ কোটি টাকা, তাছাড়া আমদানি করতে বড় অঙ্কের টাকা শুল্কও লাগে।

বাসিল বলেছেন, সারা জীবনেও তিনি এত টাকা রোজগার করতে পারতেন কিনা জানা নেই, তবে চমৎকার একটা হয়ে যায়। নোভার্টিস কোম্পানি তাদের দামি ও দুরারোগ্য রোগের ওষুধগুলির জন্য একটা লটারির আয়োজন করে। বেঙ্গালুরুর ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতালের সহযোগিতায় সে লটারিতে নাম লেখান বাসিল। তাঁর মেয়ের রক্তের নমুনাও পাঠিয়ে দেন। সেই লটারিতেই নাম ওটে ফতিমার। বাসিল যখন সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখন জানতে পারেন তিনি লটারি জিতে গিয়েছেন। ওই দামি ওষুধ ফতিমার জিন থেরাপির জন্য বেঙ্গালুরুর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয় নোভার্টিস।

৪০ মিলিগ্রাম ওষুধের ডোজ দেওয়া হয়েছে ফতিমাকে। একটা ডোজেই হাত-পা নাড়াতে পারছে ছোট্ট মেয়েটা। ডাক্তাররা বলেছেন, সম্পূর্ণ থেরাপির পরে সুস্থ হয়ে উঠবে শিশুটি। তবে বাসিল ও তাঁর স্ত্রীয়ের জিনগত ত্রুটির কারণে পরবর্তী সন্তান হলেও এই রোগ ধরার সম্ভাবনা থেকেই যাবে। তাই বাসিল দম্পতিকেও জেনেটিক কাউন্সেলিং করাতে হবে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More