ডোকলাম সংঘাতের পর থেকে ভারতের সীমান্তে এয়ার ডিফেন্স বাড়িয়েছে চিন, ভুটানের সীমায় তৈরি হয়েছে হেলিপোর্ট

ভারতের সেনা সূত্র জানাচ্ছে, গালওয়ানে সংঘাতের আগে থেকেই ডোকলাম নজরে ছিল চিনের বাহিনীর। চিন-ভুটান সীমান্তের মধ্য ও পশ্চিম সেক্টরে বহুদিন ধরেই তৎপর লাল ফৌজ। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুটানকে চাপে রাখতেই চিনের এই কৌশল।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৭ সালে ডোকলাম সংঘাতের পর থেকেই ত্রিদেশীয় সীমান্তে সামরিক কাঠামো তৈরি শুরু করে চিন। গত তিন বছরে ডোকলাম ও ভুটান সীমান্তে এয়ার বেস, হেলিপোর্টের সংখ্যা দ্বিগুণ করেছে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি। সেনা মোতায়েনের জন্য রাস্তাও তৈরি করেছে। প্রতিরক্ষা সূত্রে জানা গিয়েছে এমনটাই।

ভুটান ও চিনের সীমান্তে অবস্থিত ডোকলাম। ২০১৭ সালে চিন ও ভারতীয় বাহিনীর বিবাদের জেরে এই ডোকলাম সীমান্তই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। ১৬ জুন থেকে ২৮ অগস্ট ডোকলামে সীমান্ত বিবাদের জেরে দু’‌দেশের সেনাবাহিনী রীতিমতো রণসজ্জায় সেজে ৭৪ দিন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। নতুন উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, ডোকলামের যে জায়গায় চিন ও ভারতের বাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে নতুন সামরিক কাঠামো তৈরি করেছে চিনের সেনা। সিকিম-চিন সীমান্তে নাকু লা-তে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন করেছে লাল সেনা। নতুন স্যাটেলাইট ইমেজ দেখাচ্ছে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা তথা এলএসি শুধু নয় চিন ও ভুটান সীমান্তে ডোকলামেও সেনার সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে চিন।

ভারতের সেনা সূত্র জানাচ্ছে, গালওয়ানে সংঘাতের আগে থেকেই ডোকলাম নজরে ছিল চিনের বাহিনীর। চিন-ভুটান সীমান্তের মধ্য ও পশ্চিম সেক্টরে বহুদিন ধরেই তৎপর লাল ফৌজ। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুটানকে চাপে রাখতেই চিনের এই কৌশল। পূর্ব লাদাখের একটা বড় অংশ চিন যেমন নিজেদের বলে দাবি করে, তেমনি চিন-ভুটান সীমান্তের পশ্চিম সেক্টরে ৩১৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ও মধ্য সেক্টরের ৪৯৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় চিন নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া। ওই এলাকায় নিয়মিত টহলদারির পাশাপাশি সেনা মোতায়েনের জন্য পরিকাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে বলে খবর।

ভারতীয় সেনা সূত্র জানাচ্ছে, ভুটান সীমান্তে এখনও সামরিক বিন্যাসের কাজ চলছে। ডোকলামের মুখোমুখি সংঘর্ষের পর থেকে পশ্চিম সেক্টরের বেশ কয়েকটি এলাকা চিনা ফৌজের অনুপ্রবেশেরও খবর মিলেছিল। সূত্র জানাচ্ছে, পূর্ব ভুটানের প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে চুম্বি উপত্যকা বরাবর রাস্তা, হেলিপোর্ট ও এয়ার বেস তৈরি শুরু করেছে চিনের বাহিনী। অন্যদিকে, ডোলং চু পার হয়ে দক্ষিণ ডোকলামের কাছেও লাল সেনা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

ডোকলামের পাশাপাশি সিকিম-চিন সীমান্তে নাকু লা-তেও সক্রিয় চিনের বাহিনী। পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে সংঘর্ষের আগে উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চিনা ও ভারতীয় সেনার মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় নাকু লা-য়।  ভারতীয় সেনা জানায়, নাকু লা সেক্টরে সীমান্ত চুক্তি লঙ্ঘন করে এগোচ্ছিল চিন। বিষয়টি চোখে পড়ার পরেই ভারতীয় সেনা রুখে দাঁড়ায়। দুই দেশের সেনাবাহিনীর জওয়ানদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। নাকু লা-তে দু’দেশের প্রায় দেড়শ সেনা মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তাতে দু’পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। নতুন উপগ্রহ চিত্র দেখাচ্ছে, এই নাকু লা-তেই এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম মোতায়েন করছে লাল সেনা।

গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষই শুধু নয়, গত মে থেকে জুন মাসের মধ্যে একাধিকবার চিনের বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছে ভারতীয় সেনা। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর টহলদারির সময় লাদাখে আকছার চিনা সেনা নিয়্ন্ত্রণ রেখা টপকে ভারতের দিকে চলে আসে। তা সিকিম সেক্টরেও মাঝে মধ্যে হয়। কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়, দুই পক্ষের মিলিটারি কমান্ডার স্তরে বৈঠকের পর বিরোধ মীমাংসা স্থানীয় ভাবেই হয়ে যায়। তাতে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু মে মাসের গোড়া থেকে শুধু সীমান্ত উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না চিনের ফৌজ, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারতীয় নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ঢুকে আসার চেষ্টাও করছে। চিন্তা বাড়িয়েছে আকসাই চিন ও লাগোয়া দৌল বেগ ওল্ডি এলাকা। কারণ আকসাই চিনেও সামরিক কাঠামো, হেলিপ্যাড তৈরি করছে চিনের বাহিনী। ভারতীয় সেনা সূত্র জানাচ্ছে, দৌল বেগ ওল্ডির কাছে চিনের যুদ্ধবিমানের ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। আকসাই চিনে অন্তত পাঁচ হাজার সেনা মোতায়েনের মতো পরিকাঠামো তৈরি করছে চিন। সেনা ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে, বানানো হচ্ছে হেলিপ্যাড। উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়েছে এমনটাই। অনুমান করা হচ্ছে, ট্যাঙ্ক, প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র-সহ মোটর রাইফেল ডিভিশন মোতায়েন করার কাজ চলছে কয়েকটি এলাকায়।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More