ভারতের সীমান্ত বরাবর ছ’শোর বেশি গ্রাম তৈরির ছক আছে চিনের, দুশ্চিন্তা ‘চিকেন’স নেক’ নিয়েও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সম্মুখ সমরে ভারতীয় সেনাকে হারানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই এবার উল্টো চাল খেলছে চিন। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, একদিকে সীমান্তে অশান্তি জিইয়ে রেখেছে, অন্যদিকে ভারত-চিন-ভুটান সীমান্ত বরাবর একের পর এক জনপদ তৈরির কাজে নেমেছে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি। এ কাজে প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে শি জিনপিং সরকারের। ভারতের সীমান্ত বরাবর ৬০০-র বেশি গ্রাম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে চিনের, গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে এমনটাই। সিকিম, অরুণাচলে ইতিমধ্যেই সে কাজ শুরু হয়ে গেছে। চারদিক দিয়ে ভারতের নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় ফাটল ঘরাতে আটঘাট বেঁধেই নেমেছে লাল ফৌজ।

চিনের স্ট্র্যাটেজি ‘বর্ডার ডিফেন্স ভিলেজ’

ভুটানের ভেতরে গ্রাম তৈরির খবর আগেই মিলেছে। যদিও ভুটান সরকার চিনা জনপদের কথা অস্বীকার করেছে। অরুণাচল সীমান্তের খুব কাছে তিনটি গ্রাম তৈরি করে ফেলেছে চিন। ভারত-চিন সীমান্ত সংঘাতের আবহে অরুণাচলের গুরুত্ব কতটা তা আলাদা করে বলার কিছু নেই। অরুণাচল সীমান্তেও বরাবরই চিনের বাহিনীর নজর। ভারত-ভুটান-চিন এই ত্রিদেশীয় সীমান্ত খুবই স্পর্শকাতর। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, এই ত্রিদেশীয় সীমান্তের বুম লা বরাবর গত এক বছর ধরে তিনটি জনপদ গড়ে ফেলেছে চিনের সরকার। এই গিরিপথ ভারতের সীমানা থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটারের মধ্যেই। আর চিন্তার ব্যাপার হল, গ্রামগুলি থেকে বিতর্কিত ডোকলাম সীমান্ত মাত্র ৭ কিলোমিটারের মধ্যেই।

India China border: What's it like to live in villages along the India-China border? - The Economic Times

প্রতিরক্ষা সূত্র বলছেন, আন্তর্জাতিক সীমান্ত চুক্তি মাফিক কোনও দেশের সেনাই বেআইনিভাবে সীমান্ত পার হতে পারে না। আঞ্চলিক সীমান্তগুলির সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য চুক্তিবদ্ধ দুই দেশই। কিন্তু চিনের বাহিনী সে চুক্তি বারে বারেই লঙ্ঘণ করেছে। গালওয়ানের সংঘাত তার অন্যতম বড় প্রমাণ। সেনা ঢুকিয়ে জোরজবরদস্তি আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা সম্ভব নয় বুঝেই চিন ঘুরপথে একটু একটু করে সীমান্তে তাদের শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। এই গ্রামগুলি সেজন্যই তৈরি বলে মনে করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, চিনের স্ট্র্যাটেজি হল ‘বর্ডার ডিফেন্স ভিলেজ।’ এই সব গ্রামগুলিতে সেনা বাঙ্কার তৈরি হবে। অস্ত্রশস্ত্র মজুত করে রাখা হবে। সীমান্তের হালহকিকতের খবর যাবে পিপলস লিবারেশন আর্মির কাছে। সীমান্তে ভারতের সেনা বিন্যাস কেমন, তার গোপন খবরও চলে যাবে চিনের কাছে।

ভুটান, অরুণাচলে চিনের গ্রাম, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্তেই নজর চিনের

ভারত-ভুটান সীমান্তে ডোকলাম মালভূমির যে জায়গা নিয়ে অশান্তি বেঁধেছিল নতুন গ্রাম তৈরি হয়েছে তার কিছু দূরেই। চিন ও ভারতীয় বাহিনী যেখানে ৭৩ দিন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল তার থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে চিনের তৈরি ‘পাংদা’ গ্রাম। ইয়াদং কাউন্টি থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এই গ্রামে বসবাসও শুরু করেছেন লোকজন, সে ছবিও দেখা গেছে উপগ্রহ চিত্রে।

অরুণাচলের বুম লা বরাবর তিনটি এনক্লেভ তৈরি হয়েছে। গত বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ নভেম্বর অবধি, তিনটি জনপদ তৈরি হয়েছে। উপগ্রহ চিত্র পরপর সাজিয়ে দেখা গেছে, যেখানে আগে একটি জনপদ ছিল, পরে সেখানেই তিনটি জনপদ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি জনপদে ৫০টি করে কাঠামো রয়েছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট সবই তৈরি হয়েছে। গ্রামগুলিকে সংযুক্ত করে পাকা পিচের রাস্তাও তৈরি হয়েছে। ওই গ্রামগুলিতে সেনাদের থাকার ব্যবস্থাও করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের সেনা সূত্র জানাচ্ছে, গালওয়ানে সংঘাতের আগে থেকেই ডোকলাম নজরে ছিল চিনের বাহিনীর। চিন-ভুটান সীমান্তের মধ্য ও পশ্চিম সেক্টরে বহুদিন ধরেই তৎপর লাল ফৌজ। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুটানকে চাপে রাখতেই চিনের এই কৌশল। পূর্ব লাদাখের একটা বড় অংশ চিন যেমন নিজেদের বলে দাবি করে, তেমনি চিন-ভুটান সীমান্তের পশ্চিম সেক্টরে ৩১৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ও মধ্য সেক্টরের ৪৯৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় চিন নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া। ওই এলাকায় নিয়মিত টহলদারির পাশাপাশি সেনা মোতায়েনের জন্য পরিকাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে বলে খবর।

ডোকলামের ঘটনার পরে পশ্চিম সেক্টরে ভুটানের পাঁচটি এলাকায় চিনা ফৌজের অনুপ্রবেশের খবরের মিলেছিল। চুম্বি উপত্যকায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে চিন রাস্তা তৈরি করেছে বলে অভিযোগ। তোর্সা নদীর ধারে যা চিন-ভুটান সীমান্ত থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে সেখানে চিনা বাহিনী নতুন করে রাস্তা বানাচ্ছে বলে খবর মিলেছে। উপগ্রহ চিত্র আরও দেখিয়েছে, ডোকলামের কাছে টানেল তৈরি করছে চিনের বাহিনী। ডোকলাম সীমান্তে যে রাস্তা তৈরি নিয়ে বিতর্কের শুরু হয়েছিল, সেই রাস্তা লাগোয়াই টানেল বানাচ্ছে চিন। মেরুগ লা-র কাছে অন্তত ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য সেই টানেলের। শীতে সেনাদের আশ্রয় নেওয়ার জন্যই ওই টানেল তৈরি হচ্ছে বলে অনুমান।

টার্গেট শিলিগুড়ি করিডর

চিকেন’স নেক বা শিলিগুড়ি করিডর নিয়ে বরাবরই চিন্তা ভারতের। এই চিকেন’স নেকের অবস্থান বিচিত্র। পূর্বে নেপাল, পশ্চিমে রয়েছে বাংলাদেশ, মাঝের একটা সরু ফালির মতো অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে। এতটাই সরু ও সঙ্কীর্ণ ওই এলাকা যে তাকে কল্পনায় মুরগির ঘাড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তাই ওই নাম। এই চিকেন’স নেক আসলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগসূত্র তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি, ফাঁসিদেওয়া, মাটিগাড়া, ইসলামপুর, নকশালবাড়ির কিছু এলাকা চিকেন’স নেকের মধ্যে পড়েছে। যেহেতু শিলিগুড়ি ছুঁয়ে গেছে, তাই একে শিলিগুড়ি করিডরও বলে।

chickens neck - Times of India

এই শিলিগুড়ি করিডরের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আছে। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিশ্বের নানা দেশের যোগাযোগ রাখতে এই শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্ব রয়েছে। আবার উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ রাখতেও এই করিডর গুরুত্বপূর্ণ। চিন বরাবরই এই এলাকাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া। তাই সিকিম, অরুণাচল, ভুটান সীমান্তে সর্বদাই সক্রিয় থাকে লাল সেনা। কোনওভাবে এই এলাকা ভারতের হাতছাড়া হয়ে গেলে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির সঙ্গে সংযোগই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে দেশের বাকি অংশের। তাই এই এলাকায় নিরাপত্তা সবসময়েই বাড়িয়ে রাখে ভারত।

ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলিতে চিনের এই গ্রাম তৈরির কৌশল চিকেন’স নেককে আয়ত্তে নেওয়ারও একটা উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। কারণ নাথু লা, জেলেপ লা, দংচু লা, বাতাং লা এবং ডোকা লা—এই গিরিপথগুলি দিয়ে চুম্বি উপত্যকা হয়ে চিকেন’স নেকে আসা যায়। আর চুম্বি উপত্যকার ভেতরে ঢুকে চিন রাস্তা ও পরিকাঠামো তৈরি শুরু করে দিয়েছে এটা আগেই বলা হয়েছে। কাজেই চিন্তার কারণ রয়েছে। যদিও ভারতের সেনা সূত্র জানিয়েছে, চিন কোনওভাবেই ফায়দা নিতে পারবে না। কারণ, ভারতের সঙ্গে ভুটানের সম্পর্ক ভাল। তাই চুম্বি উপত্যকা থেকে ভুটান হয়ে ভারতে ঢুকতে পারবে না চিনের বাহিনী। গিরিপথগুলির কাছেও নিরাপত্তা অত্যন্ত কড়া। কাজেই ভারতে ঢোকার অনেক আগেই আটকে দেওয়া হবে চিনের বাহিনীকে। আর শিলিগুড়ি করিডরে ঢুকতে গেলে ভারতের বিমানঘাঁটি পেরতে হবে চিনের সেনাকে, যা তাদের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More