রাজস্থানে এই স্কুল বানিয়েছেন নিউ ইয়র্কের দম্পতি, লোকে বলে ডায়নার সোনার কেল্লা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পড়ন্ত রোদ হলুদ বেলেপাথরে চুঁইয়ে ঠিক সোনার রঙেই রেঙে ওঠে। দেওয়াল বেয়ে সোনার আলো ঠিকরে বেরোয়। এক ঝলক দেখলে মনে হয় সোনার কেল্লা!

সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লায় ছিল রাজারাজরাদের বাস। এই কেল্লার দেওয়ালে কান পাতলে বাচ্চাদের খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ ভেসে আসবে। অথবা একটানা নামতার সুর। কেল্লা নয় স্কুল। ডিম্বাকার বিশাল বাড়িটার চারপাশে কেল্লার মতোই পরিখা দেওয়া। হলুদ বেলেপাথরে তৈরি এক অসামান্য ভাস্কর্য কোনও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের কথাই মনে করাবে। থর মরুর মাঝে এমন আশ্চর্য স্কুল তৈরি করেছেন নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ডায়ানা কেল্লগ আর্কিটেক্টের স্থপতিরা। ডায়ানা নিজে এই স্কুলবাড়ির নকশা বানিয়েছেন।

An AD100 excellence award-winning project, a school in Jaisalmer | Architectural Digest India

সোনার শহর জয়সলমীর। জয়পুর বা জোধপুরের মত রঙ করা নয়। বাড়িঘর, অফিস, কাছা্রি থেকে মন্দির, দুর্গ — সবকিছুই স্থানীয় স্যান্ডস্টোন দিয়ে তৈরি। হালকা সোনালী-হলুদ বেলেপাথরের কারুকাজ আস্ত একটা শহরকে সোনার রঙ ধরিয়ে দিয়েছে। এই জয়সলমীরের কানোই গ্রামে হলুদ বেলেপাথর দিয়েই স্কুলটা বানিয়েছেন মার্কিন স্থপতিরা। আমেরিকার কোম্পানি সিআইটিটিএ-র অর্থ সাহায্যে তৈরি হয়েছে স্কুলটা। নাম রাজকুমারী রত্নাবতী গার্লস স্কুল। থর মরুর বুকে যেখানে দিনের বেলা তাপমাত্রার পারদ চড়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে হানা দেয় ভয়ঙ্কর বালির ঝড়, সেখানে এমন একটা স্কুল তৈরির কথা ভাবাই যায়না। তাও গোটা স্কুলটাই ঝলসানো রোদ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষিত।

This School Made of Sandstone in the Middle of The Thar Desert Needs no ACs | Indian Politics
স্কুলের নির্মাণকাজের সময় মাইকেল ও ডায়ানা

মেয়েদের স্কুল। রাজস্থানের গরিব ও পিছিয়ে পড়া প্রত্যন্ত গ্রামগুলির মেয়েদের এখানে বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়া হয়। রাজকুমারী রত্নাবতীতে ছোট ছোট রাজকুমারীরাই আসে পড়তে। নার্সারি থেকে দশম শ্রেণি অবধি পাঠ্যক্রম চালু হয়েছে স্কুলে। একটি দুটি করে এখন জনা ৪০০ মেয়ে স্কুলে আসে। করোনার জন্য আপাতত স্কুল বন্ধ। জুলাই থেকে ফের চালু হওয়ার কথা আছে। রাজস্থানের নানা গ্রাম থেকে আসে মেয়েরা। স্কুলে থাকার ব্যবস্থাও আছে। পড়ুয়াদের স্কুল পোশাকও বিশেষ ভাবে ডিজাইন করা। বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় নিজে বাচ্চাদের স্কুল ইউনিফর্ম ডিজাইন করেছেন। তাঁর হাতে সেলাই করা পোশাক পরেই স্কুলে যায় বাচ্চারা।

Rajkumari Ratnavati School, Jaisalmer: Monumental school that promotes literacy for girls - Local Samosa

Rajkumari Ratnavati Girls School and Women's Center

রাজকুমারী রত্নাবতী শুধু স্কুল নয়, এক অসামান্য ভাস্কর্য যার প্রতিটা পাথরে পাথরে গরিব, পরিশ্রমী মানুষগুলোর ভালবাসা গেঁথে আছে। মার্কিন স্থপতিদের নকশা ঠিকই তবে স্থানীয় ভাস্করদেরই পরিশ্রম মিশে আছে। সিআইটিটিএ-র কর্ণধার মাইকেল ডৌবে বলেছেন, এখানে যে গরিব ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে আসে তাদের অনেকেরই বাবা বা আত্মীয়রা পাথরের কাজ করেন। তাঁরাই হলুদ বেলেপাথরের জোগান দিয়েছেন। পাথরের পর পাথর গেঁথে ৯ হাজার বর্গফুটের বিশাল স্কুলবাড়ি তৈরি করেছেন তাঁরাই। স্কুলের দেওয়ালের প্রতিটি কারুকাজ স্থানীয়দের তৈরি।

Architecture that nurtures, heals, protects: the Gyaan Center in Jaisalmer

Sabyasachi designs block print uniforms for a Jaisalmer girls' school; see pics | Lifestyle News,The Indian Express

২০১৪ সালে রাজস্থানে ঘুরতে এসে এখানকার স্থাপত্য-ভাস্কর্য আকর্ষণ করে ডায়ানাকে। তিনি তাঁর ব্লগে লিখেছেন, রাজস্থানের জয়সলমীরের প্রতিটা বাড়ি, দূর্গ, মন্দিরের কারুকাজ তাঁকে মুগ্ধ করে দিয়েছিল। একই সঙ্গে এখানকার মেয়েদের অশিক্ষা, কুসংস্কার তাঁকে বিচলিত করে। তিনি মনে করেছিলেন, বিশাল মরুভূমির মাঝে এমনই একটা স্কুল তৈরি করতে হবে যার সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে বিশ্বকে, আবার যে স্কুলের মাধ্যমেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে গরিব, পিছিয়ে পড়াদের মধ্যে। ডায়ানা বলেছেন, ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তিনি পাশ্চাত্যকে মেলাতে চাননি। তাই রাজস্থানের নিজস্ব ভাবধারাকেই বজায় রেখেছেন। এই স্কুলের ভাস্কর্য রাজপুতদের সংস্কৃতির সঙ্গেই খাপ খায়। জয়সলমীরের প্রাচীন দূর্গগুলির মতোই এর নকশা।

vinay_panjwani_DSC_2203-Edit.jpg

অন্তহীন বালির সমুদ্রের মাঝে এই স্কুল তৈরি হলেও হলুদ বেলেপাথরের কারণে স্কুলবাড়ির ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে। বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে, যেখান থেকে সৌরবিদ্যুতে আলো, পাখা সব চলে। ডায়ানা বলেছেন, জিওথার্মাল এার্জি সিস্টেমে দিনের বেলা স্কুলের ভেতরটা ঠান্ডা থাকে, রাতের বেলা যখন বালির রাজ্যে হিমশীতল ঠান্ডা নামে স্কুলের ভেতরের পরিবেশ আরামদায়ক থাকে।

Jaisalmer — ACT

Exclusive: Interview with Diana Kellogg, New York's best interior designer, she's designed a womb-shaped girls' school for India | Eat News

স্কুলের ভেতরে জল সংরক্ষণ করে রাখার ব্যবস্থাও আছে। স্কুলবাড়ির নির্মাণের দায়িত্বে থাকা করিম খান বলেছেন, ৩.৫ লক্ষ লিটার জল স্কুল বাড়ির ভেতরেই সংরক্ষণ করে রাখা আছে। তাছাড়া বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থাও আছে। স্কুলের প্রতিটা ঘরে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা আছে। দিনের বেলা প্রখর রোদেও বাচ্চাদের গরমে কষ্ট পেতে হয় না।

Rajkumari Ratnavati Girls School and Women's Center

স্কুলের ভেতরে অডিটোরিয়াম, মিউজিয়ামও আছে। জ্ঞান সেন্টার নামে বিশাল একটা কমপ্লেক্স আছে, যেখানে পড়ুয়া ও রাজস্থানের মহিলাদের হাতের কাজের নানা জিনিস প্রদর্শন করা হয়।

Diana Kellogg and ovals in the sand - The Hindu

২০১৮ সালের অক্টোবরে এই স্কুল তৈরির কাজ শুরু হয়। এক বছরের মধ্যেই স্কুলের নির্মাণ শেষ হয়। এর পরেও নানা বাধা পেরোতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডায়ানা। স্কুলের জন্য অনুমোদন পাওয়া, মেয়েদের ঘরে ঘরে গিয়ে বোঝানো, স্কুলে পড়াশোনার জন্য উৎসাহ দেওয়া, সবটাই খুব কঠিন ছিল। রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রাম যেখানে নারীশিক্ষার হার তলানিতে, কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের পর্দা টাঙানো প্রতিটা ঘরে, সেখানে মেয়েদের পড়াশোনার জন্য রাজি করানো সহজ ব্যাপার ছিল না। তবে এখন নাকি বাচ্চারা নিজেরাই উৎসাহী হয়ে স্কুলে আসতে চায়। ডায়ানার সোনার কেল্লা কোনও যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে নয়, শিক্ষার মশাল জ্বেলে দাঁড়িয়ে আছে ধূ ধূ মরুর বুকে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More