গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে জেরা চলেছিল ৯ ঘণ্টা, এক কাপ চাও খাননি মোদী: আত্মজীবনীতে প্রাক্তন সিবিআই প্রধান

সামান্যতম বিচলিত হতেও দেখা যায়নি তাঁকে। ঠাণ্ডা মাথায় প্রায় একশো রকম প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন। এড়িয়ে যাননি একটিও। নিজের আত্মজীবনী  ‘আ রোড ওয়েল ট্রাভেলড’-এ এমনটাই লিখেছেন সিবিআইয়ের প্রাক্তন প্রধান আর কে রাঘবন।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সিটের অফিসে গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। তখন তিনি ছিলেন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। ৯ ঘণ্টা ধরে চলেছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। এই দীর্ঘ সময় এক কাপ চাও খাননি মোদী। সামান্যতম বিচলিত হতেও দেখা যায়নি তাঁকে। ঠাণ্ডা মাথায় প্রায় একশো রকম প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন। এড়িয়ে যাননি একটিও। নিজের আত্মজীবনী  ‘আ রোড ওয়েল ট্রাভেলড’-এ এমনটাই লিখেছেন সিবিআইয়ের প্রাক্তন প্রধান আর কে রাঘবন।

১৯৯৯ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সিবিআইয়ের ডিরেক্টর থাকাকালীন একাধিক হাই প্রোফাইল তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন রাঘবন। বফর্স কাণ্ড থেকে গুজরাত দাঙ্গা, দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্রিকেট ম্যাচ ফিক্সিং, পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি সহ বিভিন্ন মামলার তদন্তভার সামলেছেন রাঘবন। এইসব তদন্ত চলাকালীন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন নিজের আত্মজীবনীতে। সেখানেই উঠে এসেছে ২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গার প্রসঙ্গ।

২০০২ সালের  ২৭ ফেব্রুয়ারি গুজরাতের গোধরায় সবরমতি এক্সপ্রেসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ওই ট্রেনে অযোধ্যা থেকে ফিরছিলেন করসেবকরা। জলন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান ৫৮ জন করসেবক। সেই ঘটনার পর থেকেই গোটা গুজরাত জুড়ে শুরু হয় হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ। প্রায় তিন মাস ধরে গুজরাতের নানা জায়গায় চলে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, হত্যালীলা। সরকারি হিসেবেই মৃত্যু হয়েছিল ১০৪৪ জনের, নিখোঁজ ছিলেন ২২৩ জন। আহত আড়াই হাজারের বেশি। নিহতদের মধ্যে ৭৯০ জন ছিলেন মুসলিম। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ২৫৪ জন।

সে সময়  গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। অভিযোগ উঠেছিল, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে তিনি উপযুক্ত ব্যবস্থা নেননি। অভিযোগ আরও ছিল যে, ওই দাঙ্গায় নাকি প্রচ্ছন্ন মদত ছিল তাঁর। পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাদের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়নি। সেই অভিযোগের তদন্তে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট) গঠন করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। গান্ধীনগরে সিটের অফিসে ডেকে পাঠানো হয়েছিল নরেন্দ্র মোদীকে। সেই তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন রাঘবন।

প্রাক্তন সিবিআই প্রধান বলেছেন, তদন্তের গুরুত্ব খুব ভালভাবেই বুঝেছিলেন মোদী। শুরু থেকেই সহযোগিতা করেছিলেন তিনি। গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সিটের সদস্য অশোক মালহোত্রাকে। রাঘবন বলেছেন, সিটের অফিসে তাঁরই চেম্বারে টানা ৯ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল মোদীকে। ১০০ রকম প্রশ্ন করা হয়েছিল তাঁকে। এর মধ্যে অনেক অপ্রীতিকর প্রশ্নও ছিল। কিন্তু একটিও প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি নরেন্দ্র মোদী। একই রকম উত্তর দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও করেননি তদন্তকারীদের। কোনওরকম চাঞ্চল্য দেখা যায়নি তাঁর মধ্যে। একবারের জন্য উত্তেজিত হননি। এমন ঠাণ্ডা মাথায় সিটের জেরার মুখোমুখি হতে আগে কাওকে দেখা যায়নি, বলেছেন রাঘবন।

এই দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে মোদীকে লাঞ্চ সেরে নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। এক কাপ চাও খাননি সিটের অফিসে। সঙ্গে করে জলের বোতল নিয়ে এসেছিলেন। সেই জলই খাচ্ছিলেন মাঝে মাঝে। প্রায় রাত অবধি চলেছিল সেই প্রশ্নোত্তর পর্ব। রাঘবন বলেছেন, “নানাভাবে বোঝানোর পরে ছোট্ট বিরতি নিতে রাজি করানো গিয়েছিল মোদীকে। তাও মনে হয় সেটা নিজের জন্য নয়, প্রশ্নকারী মালহোত্রার জন্যই। সিটের অফিসারই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে কোনও ক্লান্তি বা বিরক্তির ছাপ দেখা যায়নি। এমনই আশ্চর্য শক্তি ছিল মানুষটার।”

২০১২ সালে সিটের রিপোর্টে ক্লিনচিট দেওয়া হয় মোদীকে। পুলিশ-প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগও খারিজ করে দেয় সিট। গুজরাত দাঙ্গার সমস্ত অভিযোগ থেকে রেহাই পান নরেন্দ্র মোদী।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More