ডাক্তার থেকে জিম ইনস্ট্রাকটর, ইসলামিক স্টেটের যে জঙ্গিদের ধরেছিল ভারতের গোয়েন্দারা

আল-কায়দা, ইসলামিক স্টেট তথা আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির ভারতে নাশকতা চালানোর প্রচেষ্টা দিন দিন বেড়েই চলেছে। দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে তো বটেই, বাংলা, বিহার, উত্তরপ্রদেশেও নতুন করে আল-কায়দা, আইসিসের মতো সংগঠনগুলির উপদ্রব বেড়েছে।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নয়াদিল্লিতে বড়সড় নাশকতার ছক বানচাল করে দেওয়া গেছে। মুর্শিদাবাদ থেকে আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দার ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। কেরলের  এর্নাকুলম থেকেও ধরা পড়েছে ওই সংগঠনের ৩ জন। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ‘লোন উলফ’ কায়দায় হামলার পরিকল্পনা করেছিল তারা। বাংলা থেকে আল-কায়দার জঙ্গিদের অস্ত্রশস্ত্র সমেত পাকড়াও করা যেমন নিঃসন্দেহে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার বড় জয়, তেমনি আরও একটা চিন্তার মেঘও ঘনিয়ে উঠেছে এরই পাশাপাশি।

আল-কায়দা, ইসলামিক স্টেট তথা আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির ভারতে নাশকতা চালানোর প্রচেষ্টা দিন দিন বেড়েই চলেছে। দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে তো বটেই, বাংলা, বিহার, উত্তরপ্রদেশেও নতুন করে আল-কায়দা, আইসিসের মতো সংগঠনগুলির উপদ্রব বেড়েছে। গত বছরই বাংলা হরফে লেখা আইসিসের পোস্টার  ‘শীঘ্রই আসছে, ইনশাল্লাহ’ , চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছিল গোয়েন্দাদের। বস্তুত, গোয়েন্দাদের অনুমান আইএসের স্লিপার সেল ভারতেও তাদের শাখা প্রশাখা বিস্তার করার চেষ্টায় আছে। এই মুহূর্তে কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানার মতো রাজ্যগুলিতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় আইএস। ওই রাজ্যগুলি থেকে ১২২ জনকে আইএস জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। তবে, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও জম্মু-কাশ্মীরেও আইএস প্রভাব বাড়াচ্ছে।

এখন দেখে নেওয়া যাক, গত কয়েক বছরে দেশের কোন রাজ্য থেকে কতজন আইএস জঙ্গিকে পাকড়াও করেছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। কীভাবে হামলার ছক সাজিয়েছিল তারা।

উত্তরপ্রদেশের আজমগড়, ৯ অক্টোবর, ২০১৫—আত্মসমর্পণ করে ভারত থেকে ইরাকের আইসিস দলে নাম লেখানো কুড়ি বছরের এক তরুণ। উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ের বাসিন্দা ওই তরুণ নিজের ব্যবসা ছেড়ে ইসলামিক স্টেটে যোগ দেয় এবং পরিবার ছেড়ে ইরাকে পালিয়ে যায়। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার গোয়েন্দারা জানিয়েছিলেন, আইসিসে নাম লেখানোর আগে কোনও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল না ওই তরুণ। অথচ কীভাবে তার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল আইএস সেটাই রহস্য। সিরিয়াতে আইসিসের হয়ে নাশকতামূলক কাজে জড়িয়ে গিয়েছিল সে। গোয়েন্দারা জানান, ওই তরুণের মতোই মুম্বই, তেলঙ্গানা, কর্নাটক থেকে আরও অনেক তরুণই ইসলামিক স্টেটে নাম লিখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।

উত্তরপ্রদেশ, ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর— স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছিল, আইএস জঙ্গিদের প্রভাব বাড়ছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে। আইএস স্লিপার সেল, মডিউলার, অস্ত্রশস্ত্রের জোগাড়েদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তরপ্রদেশে। ডিসেম্বরে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ১০৩ জন ইসলামিক স্টেটের সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা যার মধ্যে ১৭ জনই ছিল উত্তরপ্রদেশের, ১৬ জন মহারাষ্ট্রে, তেলঙ্গানা থেকে ৬ জন, কেরলের ১৪ জন, কর্নাটকের ৮, মধ্যপ্রদেশের ৬, তামিলনাড়ুর ৫, পশ্চিমবঙ্গের ৫, উত্তরাখণ্ডের ৪, রাজস্থানের ৪, গুজরাটের ৪, বিহার, দিল্লি ও জম্মু থেকে মোট ৪ জনকে পাকড়াও করে এনআইএ।

আরও পড়ুন: ধৃত আল-কায়দা জঙ্গিদের ন’জনই মুর্শিদাবাদের, মূল ষড়যন্ত্র চলছিল এখানে বসেই

 

Murder of TN cop was part of plan to wage violent jihad by ISIS
স্পেশাল সব-ইনস্পেকটর উইলসন

তামিলনাড়ু, কন্যাকুমারী, ১১ জুলাই, ২০২০—তামিলনাড়ুর কালিয়াক্কাভিলাই থানার স্পেশাল সব-ইনস্পেকটর উইলসনকে গুলি করে, কুপিয়ে খুন করার ঘটনায় জঙ্গি যোগের খোঁজ পায় পুলিশ ও জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। জানা যায়, পুলিশ অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যার পিছনে আইসিস জঙ্গি সংগঠনের হাত রয়েছে। ওই খুনের অভিযোগে আইসিসের সক্রিয় হ্যান্ডলার আবদুল শামিন সহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে তদন্তকারীরা। জানুয়ারিতে কালিয়াক্কাভিলাই বাজারের কাছে চেক পোস্টে কর্তব্যরত ছিলেন এই অফিসার। সেখানেই তাঁকে গুলি করে ছুরি দিয়ে কোপায় শামিন ও তৌফিক নামে আইসিসের দুই হ্যান্ডলার। তামিলনাড়ু পুলিশ প্রথম তদন্ত শুরু করলেও পরে এনআইএ ওই ঘটনার তদন্তভার তুলে নেয়। জানা যায়, আইসিসের জঙ্গিরাই রয়েছে ওই হত্যাকাণ্ডের পিছনে।

পুণে, ১৩ জুলাই, ২০২০—পুণে থেকে ধরা পড়ে ইসলামিক স্টেটের দুই জঙ্গি নাম নাবিল খাত্রি ও সাদ্যিয়া আনওয়ার। পুণেতে একটি জিম চালাত নাবিল, ও সাদ্যিয়া ছিল মাস কমিউনিকেশনের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। গোয়েন্দারা জানান, এই দু’জনের সঙ্গেই ঘনিষ্ট যোগ ছিল আইসিসের সক্রিয় সদস্য জাহানজইব সামি ওয়ানি ও তার স্ত্রী হিনা বাসির বেগের। দিল্লির জামিয়া নগর থেকে এদের পাকড়াও করেছিল দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। এদের প্রত্যেকের সঙ্গে যোগসাজশ ছিল আবদুল্লা বাসিথের। আইসিসের এই সক্রিয় হ্যান্ডলারকে গ্রেফতার করেছিল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। আবু ধাবির মডিউলার আবদুল্লা এখন তিহার জেলে বন্দি।

 

কেরল, ৫ অগস্ট ২০২০—কাবুলে গুরুদ্বার হামলা, জালালাবাদের নাশকতায় নাম জড়ায় কেরলের যুবকের। কাসারগড়ের বাসিন্দা ওই যুবকের নাম কাল্লুকেট্টিয়া পুরাইল ইজাস। পেশায় চিকিৎসক। ২০১৬ সালে সপরিবারে কেরল ছেড়ে আফগাসিন্তানে বসতি শুরু করেছিল কাল্লুকেট্টিয়া। পরে ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের দলে ভিড়ে যায়। গুরুদ্বার হামলা থেকে একাধিক জঙ্গি নাশকতায় এই যুবকের নাম সামনে এসেছিল। ভারতের গোয়েন্দারা জানিয়েছিলেন, খুরশান প্রদেশের ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য হয়ে উঠেছিল এই যুবক। দক্ষিণ ভারতে একাধিক নাশকতার পিছনেও এর মাথা ছিল বলেই মনে করা হয়েছে।

আব্দুর রহমান


বেঙ্গালুরু, ১৯ অগস্ট, ২০২০—
আইএস জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সূত্রে আব্দুর রহমান নামে ২৮ বছরের এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করেছিল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে বেঙ্গালুরুর এমএস রামাইয়া কলেজে কর্মরত ছিল রহমান। গোয়েন্দারা জানিয়েছিলেন, অসুস্থ, আহত আইসিস জঙ্গিদের চিকিৎসা করত সে।  তাঁর বাড়ি ও ক্লিনিক মিলিয়ে তিন জায়গায় অভিযান চালিয়ে নানা রকম ডিডিটাল সরঞ্জাম, মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে জেরা করে জানা যায়, ২০১৪ সালে সিরিয়া গিয়ে আইএস-এর মেডিক্যাল ক্যাম্পে  যোগ দিয়েছিল সে। কাশ্মীর থেকে গ্রেফতার হওয়া জাহানজইব সামি ওয়ানি এবং সিরিয়ায় আইএসের সদস্যদের সঙ্গে যোগসাজশও ছিল তার। সংঘর্ষে আহত আইএস জঙ্গিদের জন্য অ্যাপও তৈরি করছিল রহমান। বেঙ্গালুরুর ক্লিনিকে বসেও নাশকতায় মদত দিয়ে গিয়েছিল এই চিকিৎসক।

দিল্লি, ২০২০ সালের ২২ অগস্ট—রাজধানীর বুকে ইসলামিক স্টেটের নাশকতার ছক ভেস্তে দেয় দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। প্রচুর পরিমাণে আইইডি সহ দিল্লি থেকে ধরা পড়ে আফগানিস্তানের খুরশান প্রদেশের ইসলামিক সংগঠনের (আইএসকেপি)সক্রিয় সদস্য  মুস্তাকিম খান ওরফে আবু ইউসুফ। তার বাড়ি উত্তরপ্রদেশে। পুলিশ জানায়, লোন উলফ (একক হামলাকারী) কায়দায় দিল্লিতে নাশকতার উদ্দেশ্য ছিল তার। প্রেসার কুকারের মধ্যে আইইডি লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আবু ইউসুফ। আধুনিক পিস্তলও উদ্ধার হয় তার কাছ থেকে। এই জঙ্গি ধরা পড়ার পরে উত্তরপ্রদেশেও হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়।

উত্তরপ্রদেশ, ২৩ আগস্ট, ২০২০—উত্তরপ্রদেশের বলরামপুর থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, ফিঁদায়ে এক্সপ্লোসিভ জ্যাকেট উদ্ধার করে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ও জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, এইসব বিস্ফোরক ও জ্যাকেট মহম্মদ মুস্তাকিম খানের। বলরামপুরে ঘাঁটি গেড়ে ছিল মুস্তাকিম। তারই অন্য নাম আবু ইউসুফ। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল টিমের হাতে ধরা পড়ার পরে মুস্তাকিম জানিয়েছিল, ফিদায়েঁ বা আত্মঘাতী হামলার চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিল সে। বিস্ফোরক ঠাসা জ্যাকেটও ছিল তার কাছে। আইসিস কম্যান্ডারদের কাছ থেকে সঙ্কেত পেলে দিল্লি বা উত্তরপ্রদেশে ফিদায়েঁ হামলা চালানোর পরিকল্পনাও ছিল তার। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আবুর সঙ্গে আগে যোগ ছিল আইএস জঙ্গি নেতা ইউসুফ আল হিন্দির। সিরিয়ায় তার মৃত্যুর পরে আবুর সঙ্গে যোগাযোগ হয় পাকিস্তানি জঙ্গি আবু হুজাইফা আল বাকিস্তানির। আফগানিস্তানে হুজাইফার মৃত্যু হলে অন্য জঙ্গি নেতার প্ররোচনায় দিল্লি, উত্তরপ্রদেশে হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয় তাকে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More