লিখতে-পড়তে জানেন না, ৫০ হাজারের বেশি গান রচনা করে পদ্মশ্রী পেয়েছেন এই আদিবাসী মহিলা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁর গানে শুধু ঈশ্বরের আরাধনা নয়, নারীশক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও ধ্বনিত হয়। প্রথাগত স্কুল শিক্ষা নেই। আদিবাসী গরিব ঘরের গৃহবধূ ছিলেন। লিখতে পড়তেও জানেন না। কিন্তু তাঁর প্রতিটি গান সমাজের অনেক গূঢ় তত্ত্ব তুলে ধরে। নারীদের সম্মানের কথা বলে। ওড়িশার আধ্যাত্মিক গুরু পূর্ণমাসি জানিকে এ বছর পদ্মশ্রী সম্মান দেওয়া হয়েছে।

কন্ধমল জেলার আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই মহিলাকে আধ্যাত্মিক গুরুই মানেন সেখানকার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের কাছে তাঁর পরিচিতি তাদিসারু বাই নামে। প্রথাগত শিক্ষা নেই, কিন্তু তিনটি ভাষায় পারদর্শী পূর্ণমাসি। আদিবাসী কুই ভাষা, ওড়িয়া ও সংস্কৃত। লিখতে পড়তে না পারলেও সংস্কৃতে তাঁর জ্ঞান নাকি অপার। ৫০ হাজারের বেশি গান বানিয়েছেন পূর্ণমাসি। তিনটি ভাষাতেই গান বাঁধতে পারেন তিনি। মুখে মুখে গান বাঁধেন, আর তা লিখে রাখেন তাঁর শিষ্যরা। হাজারের বেশি শিষ্য আছে পূর্ণমাসি জানির। বহু দূর থেকেও তাঁকে দেখতে নাকি অনেক লোকজন আসেন। কন্ধমলে আশ্রম আছে তাঁর।

পূর্ণমাসি জানির নাম অনেকেরই অজানা। প্রচারের আড়ালে থাকতেই ভালবাসেন। তাঁর জীবনের অনেক ঘটনাই নাকি বেশ রহস্যময়। ডালাপাড়া গ্রামের আদিবাসী ঘরে জন্ম ১৯৪৪ সালে। খুব কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল পূর্ণমাসির। ছোট থেকেই অপুষ্টিতে ভুগতেন। বাল্যবিবাহ ও কম বয়সে সন্তান ধারণের কারণে শরীর ভেঙে পড়েছিল তাঁর। একের পর এক সন্তানের মৃত্যু হয়েছিল। মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন পূর্ণমাসি। সংসার ছেড়ে স্বামীকে নিয়ে আধ্যাত্মিক পথেই পা বাড়িয়েছিলেন।

শোনা যায়, ১৯৬৯ সালে তাদিসারু নামে একটি পাহাড়ের ওপর দীর্ঘসময় ধরে তপস্যা করেছিলেন পূর্ণমাসি। সে সময় কিছু শক্তিও নাকি পেয়েছিলেন তিনি। এরপরেই জীবন পাল্টে যায় তাঁর। লোকমুখে শোনা যায়, পূর্ণমাসি কুই ভাষা ছাড়া কিছু বলতে পারতেন না। লেখাপড়া তো দূরের কথা। কিন্তু তপস্যা সেরে ফেরার পরে ওড়িয়া, সংস্কৃতে ভাষাতেও তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে চমকে যান সকলে। কীভাবে সমাজ ও সংসারের গূড় তত্ত্বকথা নিয়ে সংস্কৃতেও গান বাঁধেন পূর্ণমাসি সে রহস্য এখনও অজানা। তবে ভক্তির আড়ালে তাঁর গান নাকি সমাজের অন্যায় অবিচারের কথা তুলে ধরে। নারী ও শিশু সুরক্ষার কথা বলে। বলি প্রধার বিরুদ্ধেও গান বেঁধেছেন পূর্ণমাসি। হত্যা, ঘৃণা, লোভ-লালসা থেকে মুক্তির পথ দেখায় তাঁর প্রতিটি গান।

২০০৬ সালে ওড়িয়া সাহিত্য আকাদেমি থেকে পুরষ্কার পান পূর্ণমাসি। ২০০৮ সালে দক্ষিণ ওড়িয়া সাহিত্য পুরষ্কার দেওয়া হয় তাঁকে। পূর্ণমাসির শিষ্য বানোজ কুমার রায় বলেছেন, আদিবাসী সমাজে পূর্ণমাসি জানির প্রভাব বিরাট। তাঁকে একরকম ভগবানের দূত বলেই মানে এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও সোচ্চার পূর্ণমাসি। স্থানীয় আদিবাসী এলাকায় মুসলিম, খ্রিস্টানদের মধ্যে বিভেদ মেটাতে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। নারী ও শিশু শিক্ষা নিয়ে প্রচার করেন তিনি। ৯৮ বছরের পূর্ণমাসি গত সাত দশক ধরে এলাকার গরিব ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন। মেয়েদের ওপর অত্যাচারের খবর পেলেও ছুটে যান তিনি। কন্ধমলে সমাজ সংস্কারের এক গুরুদায়িত্ব পালন করছেন পূর্ণমাসি জানি।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More