সংঘাতের আবহেও মানবিকতার নজির, সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে পড়া চিনের সেনাকে ফেরাল ভারত

দ্য ওয়াল ব্যুরো: লাদাখ সীমান্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় চিন ও ভারতীয় বাহিনীর মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ এখনও চলছে। দুই দেশের সেনা কম্যান্ডার পর্যায়ের বৈঠকের পরেও সীমান্ত সংঘাতের পরিস্থিতি জিইয়ে আছে। এর মাঝেই গত ৮ জনুয়ারি ভারতীয় নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ঢুকে পড়া পিপলস লিবারেশন আর্মির এক সেনাকে আটক করেছিল ভারতীয় বাহিনী। সূত্রের খবর, চিনের ওই সেনাকে ফিরিয়ে দিয়েছে ভারতীয় বাহিনী। চুশুল-মলডো এলাকায় পিএলএ-র হাতে তুলে দেওয়া হয় ওই চিনা জওয়ানকে।

পূর্ব লাদাখের প্যাঙ্গং সো রেঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের বাহিনীর সংঘাত চরমে উঠেছে। প্যাঙ্গং লেকের উত্তর ও দক্ষিণের পাহাড়ি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া চিনের লাল ফৌজ। পাহাড় চূড়োয় ভারতের স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স মোতায়েন থাকায়, পাহাড়ি উপত্যকাগুলোতে এখনও ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছে চিনা বাহিনী। সেনা সরানো বা সেনা পিছনোর কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না তাদের মধ্যে।

এই প্যাঙ্গং রেঞ্জেই যেখানে ভারতীয় বাহিনী টহল দেয় সেখানে ঢুকে পড়েছিল চিনের ওই জওয়ান। ভারতের সেনা সূত্র জানিয়েছে, কী কারণে সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়েছিল সে, কী উদ্দেশ্য ছিল তা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ওই জওয়ানকে। সংঘাতের এই পরিস্থিতিতেই মানবিকতার নজির রাখে ভারতীয় সেনাবাহিনী। ওই জওয়ানকে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মির হাতে তুলে দেওয়া হয়।

গত বছর ১৯ অক্টোবর পূর্ব লাদাখের দেমচক সেক্টরে ভারতীয় সেনার হাতে আটক হন পিপলস লিবারেশন আর্মির করপোরাল ওয়াং ইয়া লং। পরের দিনই অবশ্য চুশুল-মলডো মিটিং পয়েন্ট দিয়ে তাকে চিনের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময় সেনার তরফে জানানো হয়েছিল, ওই চিনা সৈনিক সীমান্তের ওপারেই একটি এলাকা থেকে আর একটি এলাকায় যাওয়ার সময় সম্ভবত পথ ভুলে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে একটি স্লিপিং ব্যাগ, স্টোরেক ডিভাইস, তার আইডেন্টিটি কার্ড এবং মোবাইল ও চার্জার ছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরে ও দরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

গত চার মাস ধরে লাদাখের মুখপারি, রেচিন লা ও মগর হিল ভারতীয় সেনার নিয়ন্ত্রণে। কালা পাহাড় সহ স্পর্শকাতর এলাকাগুলোয় নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ভারতের পার্বত্য বাহিনী। প্যাঙ্গং লেকে চিনের বাহিনীর ইন্টারসেপটর বোটগুলিকে পিছ হটাতে হাই-স্পিড বোট নামাচ্ছে ভারত। শীতের আগে থেকেই অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনও করা হয়েছে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে।

জুন মাসে গালওয়ানের সংঘাতের পরে উত্তর প্যাঙ্গং লেক সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাগুলিতেও ঢুকে পড়ে চিনের লাল ফৌজ। তাদের ঠেকাতে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পাওয়া পার্বত্য বাহিনী মোতায়েন করা হয়। উত্তর ও দক্ষিণ প্যাঙ্গং লেকের একাধিক উঁচু পাহাড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় ভারত। ফলে কালা পাহাড় সহ বেশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পাহাড় চূড়া হাতছাড়া হয়ে যায় চিনের। প্যাঙ্গং লেকের পাহাড়ি খাঁজ ফিঙ্গার পয়েন্ট ১ থেকে ফিঙ্গার পয়েন্ট ৮ অবধি এলাকার দখল নিতে এখন মরিয়া চিন। আর সেটা কিছুতেই হতে দেবে না ভারত। এই মুহূর্তে ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪ এর কাছে মুখোমুখি অস্ত্র তাক করে বসে আছে দুই দেশের বাহিনী। ফিঙ্গার পয়েন্ট ৮ এর কাছে নতুন করে সামরিক কাঠামো বানাচ্ছে চিনের সেনা। ফলে ওই এলাকায় টহল দিতে পারছে না ভারতীয় বাহিনী।

সেনার এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, গত ৩০ বছর ধরে সবধরনের চুক্তি ভেঙে চলেছে তারা। সীমান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তিও লঙ্ঘন করেছে। লিদাখের ফিঙ্গার পয়েন্টগুলি থেকে যে মুহূর্তে ভারত তার সেনা সরাবে, সেই মুহূর্তেই আক্রমণ করবে চিন। এটাই তাদের স্ট্র্যাটেজি। ভারত খুব ভাল করে এই কৌশলের সঙ্গে পরিচিত।

ভারতীয় সেনা সূত্র জানাচ্ছে, চিন যতই কৌশল করুক না কেন, ভারত তার স্ট্র্যাটেজি সাজিয়েই রেখেছে। পাহাড়ি এলাকায় আরও বেশি সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের ১০ হাজার জওয়ানকে পাঠানো হয়েছে। এখন সীমান্তে ভারতীয় সেনার সংখ্যা ৯০ হাজার। আইটিবিপির ফোর্স মোতায়েন হলে সংখ্যা লাখে পৌঁছবে। ভারতের যুদ্ধট্যাঙ্ক ও একাধিক মিসাইল তৈরি আছে লাদাখে। আকাশে চক্কর কেটে সর্বক্ষণ নজর রাখছে বায়ুসেনার কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট। কাজেই কোনওদিক দিয়েই সুবিধা করতে পারবে না চিন।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More