যৌন নিগ্রহ নিয়ে বিতর্কিত রায় দেওয়া বম্বে হাইকোর্টের সেই বিচারপতির স্থায়ীকরণের সুপারিশ ফিরিয়ে নিল সুপ্রিম কোর্ট

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সম্প্রতি বম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি পুষ্প গনেদিওয়ালার দুটি রায় ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রথম ঘটনায় তিনি বলছেন, পোশাক না সরিয়ে নাবালক বা নাবালিকার শরীরে অন্যায় স্পর্শ করলে তা যৌন নির্যাতন নয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তাঁর রায়, প্যান্টের চেন খুলে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন যৌন নির্যাতন নয়। প্রথম রায়টির উপর ইতিমধ্যেই স্থগিতাদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এবার বম্বে হাইকোর্টে তাঁর স্থায়ীকরণের সুপারিশও তুলে নিল সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম। তাঁর আরও প্রশিক্ষণের দরকার বলেই মনে হয়েছে দেশের শীর্ষ আদালতের।

সূত্রের খবর, সুপ্রিম কোর্টের তরফে জানানো হয়েছে, “ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তিগত রাগ নেই। কিন্তু তাঁর এখনও অনেক কিছু শেখার প্রয়োজন। যখন তিনি আইনজীবী ছিলেন তখন হয়তো এই ধরনের মামলা তিনি বিশেষ দেখেননি। তাই তাঁর আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।”

সাধারণত কোনও বিচারপতির স্থায়ীকরণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়ামের সুপারিশ লাগে। কলেজিয়াম কেন্দ্রের কাছে সেই সুপারিশ পাঠিয়ে দেয়। সরকার সেই সুপারিশে সিলমোহর দেয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সুপারিশ ফিরিয়ে নেওয়ারও ক্ষমতা রয়েছে কলেজিয়ামের। এক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে।

গত ২০ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম বম্বে হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চে স্থায়ী বিচারপতির পদের জন্য পুষ্প গনেদিওয়ালার নাম সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তারপরেই এমন দুটি রায় তিনি দিয়েছেন যা গোটা দেশে আলোড়ন তুলেছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন আইনজীবীদের একটা বড় অংশ।

১৯ জানুয়ারি বম্বে হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চে পকসো আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলার রায়ে বিচারপতি পুষ্প গনেদিওয়ালা জানান, পকসো আইন মতে যৌন নির্যাতন হওয়ার জন্য অভিযুক্ত ও আক্রান্তের ত্বকের সঙ্গে ত্বকের স্পর্শ ঘটতে হবে। জামা খুলে বা জামা সরিয়ে আপত্তিজনক কাজ করলে তবেই তা যৌন নির্যাতন বলে গণ্য হবে। পোশাকের ওপর দিয়ে স্পর্শ করলে তা যৌন নিগ্রহ নয়।

১২ বছরের একটি মেয়েকে যৌন নিগ্রহের অভিযোগে চলছিল মামলা। অভিযোগ, মেয়েটির বুকে অন্যায় স্পর্শ করেছিল ৩৯ বছরের এক যুবক। সেখানেই বিচারপতি পুষ্প গনেদিওয়ালা এই রায় দেন, যেহেতু অভিযুক্ত মেয়েটির পোশাক খোলেনি বা সরায়নি, তাই এটি যৌন নির্যাতন নয়।

এর দিন কয়েক পরেই ফের আর একটি মামলার শুনানি করছিলেন ওই বিচারপতিই। সেখানেও তিনি রায় দেন, পাঁচ বছরের শিশুর হাত ধরা এবং নিজের প্যান্টের চেন খোলা যৌন নির্যাতনের সমকক্ষ অপরাধ নয় পকসো আইনে। এই রায়ের ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তি, ৫০ বছরের লিবনুস কুজুরের পাঁচ বছরের কারাবাসের সাজা কমে হয়ে যায় পাঁচ মাস। সেই পাঁচ মাসের সাজা খাটা হয়ে গেছিল বলে ছাড়াও পেয়ে যায় লোকটি।

এই দুটি রায়ের বিরোধিতা করে হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি প্রদীপ নন্দরাজক বলেন, “এই ধরনের মামলায় আদালতের দায়িত্ব হল, অভিযুক্তের উদ্দেশ্যটি কী ছিল তা চিহ্নিত করা। যে কোনও অন্যায় স্পর্শ বা আচরণ যদি যৌন হেনস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়, তবে তা পকসোর আওতায় অপরাধ বলেই বিবেচিত হয়। এখানে ত্বকের সঙ্গে স্পর্শ হয়েছে কিনা, প্যান্টের জিপ খোলার পরে কি হয়েছে– এসব ধর্তব্যের মধ্যেই আসবে না যদি অভিযুক্তের উদ্দেশ্য হয় যৌন নিগ্রহ।”

তিনি আরও বলেন, “আরও সমস্যার বিষয় হল, এই রায় দিয়েছেন একজন মহিলা বিচারপতি। আমরা আইনি ক্ষেত্রে মহিলা বিচারক, অফিসার, কর্মী নিয়োগ রি এই ভেবে, যে মহিলাদের বা শিশুদের উপর হওয়া এই ধরনের অপরাধগুলি আরও সঠিক এবং সংবেদী বিচার পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এখানে তেমনটা ঘটেনি।”

বম্বে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অভয় থিপসেও এই দুই রায়কে ‘ভুল’ বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথায়, “যদি দু’ক্ষেত্রেই ‘যৌন নির্যাতন না হওয়ার’ সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হন বিচারপতি, তবে তার পেছনে অবশ্যই যথাযথ ও অখণ্ড যুক্তি থাকা প্রয়োজন। নয়তো ভবিষ্যতের প্রতিটি মামলায় এই রায় কুপ্রভাব ফেলবে। যদি এমন হয়, অভিযুক্ত হাতে গ্লাভস পরে কুকর্ম করেছে, সেক্ষেত্রে তো সে যুক্তি দেবে, ত্বকের সঙ্গে সংস্পর্শ হয়নি বলে এটি যৌন নির্যাতন নয়।”

স্পেশ্যাল প্রসিকিউটর উজ্জ্বল নিকমের মত, “মূলত নাবালিকাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পকসো আইন আনা হয়। ফলে এই আইনে যে অভিযোগ উঠেছে, তাতে অভিযুক্তর উদ্দেশ্য ভাল করে খতিয়ে দেখাই মূল বিষয় হওয়া উচিত। অপরাধ কোন পদ্ধতিতে হয়েছে তা নিয়ে কাটাছেঁড়া অযৌক্তিক। এসব করলে আইনের নজরকে বিভ্রান্ত করা হবে।”

এই বিতর্কের মাঝেই এবার পদক্ষেপ নিল সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম। পুষ্পর স্থায়ীকরণের সুপারিশ ফিরিয়ে নিল তারা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More