BREAKING: উন্নাও ধর্ষণ-কাণ্ডে কুলদীপ সেঙ্গারের যাবজ্জীবন কারাবাস, জরিমানা ২৫ লাখ টাকা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: উন্নাও ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত বহিষ্কৃত বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারের যাবজ্জীবনের সাজা শোনাল দিল্লির তিস হাজারি আদালত। একই সঙ্গে ২৫ লক্ষ টাকা জরিমানা হয়েছে তার। তার মধ্যে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে নির্যাতিতাকে। দু’বছর আগে এক নাবালিকাকে অপহরণ ও ধর্ষণ করার অভিযোগে গত ১৬ ডিসেম্বর উন্নাও ধর্ষণ কাণ্ডে বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল দিল্লির তিস হাজারি আদালত। তার চার দিন পরে সাজা শোনালেন বিচারক।

২০১৭ সালের জুন মাসে এক নাবালিকা কিশোরীকে প্রথম ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ের বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারের বিরুদ্ধে। কিন্তু বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতায় এত দিন সময় লেগে গেল সাজা ঘোষণা হতে। তার মাঝে বয়ে গেছে বহু ঘটনাপ্রবাহ। নিজের বাবাকে হারিয়েছেন ধর্ষিতা। হারিয়েছেন কাকিমা ও বোনকে। নিজে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছেন কেবল ধর্ষিতা হওয়ার অপরাধে।

আরও পড়ুন: উন্নাও কাণ্ডে দোষী কুলদীপ ঠিক কে? অনেক পরিচয়ের ধর্ষককে জানুন ১০ তথ্যে

এত কিছুর পরেও কুলদীপের আইনজীবী তনভীর আহমেদ মীর আদালতে আবেদন করেন, কুলদীপের সর্বোচ্চ ১০ বছরের সাজা হোক। তাঁর বক্তব্য ছিল, “রাজনৈতিক কেরিয়ারে কোনও দাগ নেই সেঙ্গারের। ২০০২ থেকে আজ পর্যন্ত বিধায়ক হিসাবে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। কুলদীপের দু’টি নাবালিকা কন্যাসন্তানও রয়েছে।”

আরও পড়ুন: উন্নাও-কাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত কুলদীপ সেঙ্গার! দিল্লির আদালতে স্বস্তির রায়

তবে এই আর্জি কানে তোলেনি আদালত। আজকের রায়ে আদালত সিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছে, নির্যাতিতার প্রাণ সংশয় রয়েছে কিনা তা ভাল করে খতিয়ে দেখার। এছাড়া নির্যাতিতা এবং তাঁর পরিবারকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও নিরাপদ স্থানে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিচারপতি সাজা ঘোষণার সময়ে বলেন, “সেঙ্গার জনগণের কর্মচারী ছিলেন। তিনি মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। নির্যাতিতাকে ভয় দেখিয়েছেন সেঙ্গার।”

অভিযোগকারিণী তরুণীর দাবি, ২০১৭ সালের জুন মাসের চার তারিখে একটি চাকরির জন্য স্থানীয় এক মহিলার সঙ্গে উন্নাওয়ে ওই বিধায়কের বাড়িতে গেলে ধর্ষিত হন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৬ বছর। তরুণীর পরিবারের অভিযোগ, এই ঘটনার এক সপ্তাহ পরে, ১১ জুন গ্রামের দুই যুবক ওই কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাকে গণধর্ষণ করে সেঙ্গারের ঘনিষ্ঠরা। ২০ জুন থানায় অভিযোগ দায়ের হলে, কিশোরীর বয়ানের ভিত্তিতে শুভম সিং, নরেশ তিওয়ারি এবং ব্রিজেশ যাদব নামে তিন জনকে গণধর্ষণ ও পকসো আইনে গ্রেফতার করা হয়। পরে জানা যায়, চার তারিখে অভিযুক্ত শুভম সিংয়ের মা শশী সিংই সেই প্রথম দিন ওই কিশোরীকে সেঙ্গারের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন সব জেনেশুনে।

গত ৩ অক্টোবর সিবিআই এই ধর্ষণ মামলার চার্জশিট পেশ করেছে। সেখানে জানা গিয়েছে, নির্যাতিতাকে ২০১৭ সালে অপহরণ করে টানা ন’দিন ধরে ধর্ষণ করা হয়। তিন জন অভিযুক্ত তার উপরে নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল। শশী সিংকেও দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত।

২০১৭ সালের ঘটনার পরে বহুবার সেঙ্গারের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করতে গেলেও পুলিশ সে অভিযোগ নেয়নি বলে দাবি তরুণীর পরিবারের। শেষমেশ অভিযোগ নিলেও, অগ্রগতি হয়নি তদন্তের। পরিবারের দাবি, ফের অভিযোগ করতে গেলে, উল্টে কুলদীপ সেঙ্গারের দায়ের করা মিথ্যে এফআইআরের ভিত্তিতে তরুণীর বাবাকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির অস্ত্র আইনে ভুয়ো অভিযোগ আনা হয়েছিল বলে অভিযোগ পরিবারের। ৩ এপ্রিল তাঁকে গ্রেফতার করে বন্দি করা হয় উন্নাও জেলে। অভিযোগ, সেখানে লাগাতার অত্যাচার চলতে থাকে তাঁর উপর! বিচার পাওয়া দূরের কথা, বিচার চাওয়ার অপরাধেই যেন মার খেতে হল ধর্ষিতার বাবাকে!

আরও পড়ুন: লড়াই থামল উন্নাওয়ের দগ্ধ ধর্ষিতার, শুক্রবার রাতে মৃত্যু হল দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে

কোনও ভাবেই প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পেরে, প্রায় এক বছর পরে, ২০১৮ সালের ৮ এপ্রিল নিগৃহীতা কিশোরী ও তার মা মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ যোগীর বাড়িতে গিয়ে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তখনই আসলে সংবাদমাধ্যমের সামনে আসে ঘটনাটি। শেষমেশ ২০১৮ সালের ১৩ এপ্রিল গ্রেফতার হয় উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার অভিযুক্ত বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার। সঙ্গে গ্রেফতার হয় অভিযুক্ত আরও চার। তিহাড় জেলে ঠাঁই হয় তাদের। কুলদীপকে বহিষ্কৃত করা হয় দল থেকে।

কাকতালীয় ভাবে পরের দিনেই খবর মেলে, উন্নাও জেলের মধ্যেই মারা গিয়েছেন ধর্ষিতা কিশোরীর বাবা! ময়নাতদন্তের রিপোর্টে তাঁর শরীর জুড়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলেও, মৃত্যুর কারণ হিসেবে দেখানো হয় সেপ্টিসেমিয়া অথবা রক্তে বিষক্রিয়া।

আরও পড়ুন: কী হয়েছিল উন্নাও-তে? কতটা কঠিন লড়াইয়ের পরে বিচার পেলেন ধর্ষিতা?

বিনীত, বাউয়া, শৈলু এবং সোনু নামের চার জনের বিরুদ্ধে ধর্ষিতার বাবাকে খুন করার অভিযোগ দায়ের করা হয় এর পরে। চার জনই সেঙ্গারের ঘোষিত সমর্থক বলে স্থানীয় সূত্রের খবর। ইলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশে এ মামলা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেঙ্গারের বিরুদ্ধে পকসো আইনে ধর্ষণ, অপহরণ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, অস্ত্র আইন লঙ্ঘন-সহ একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে চার্জ গঠন করা হয় দ্রুত।

শুধু তাই নয়, এর পরেও কুলদীপের অনুগামীরা উন্নাওতে মিছিল বার করে দাবি করেন, তাঁদের বিধায়ক নির্দোষ। সে মিছিলের ছবি ভাইরাল হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিন্দায় ফেটে পড়েন নেটিজেনরা।

আরও পড়ুন: উন্নাও: একের পর এক ধর্ষণের বিভীষিকা, গায়ে আগুন, মৃত্যু, বিচার চাইছে গোটা দেশ

এখানেই শেষ নয়। নির্যাতিতা তরুণীকে পথ দুর্ঘটনায় মেরে ফেলার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে কুলদীপের বিরুদ্ধে। নির্যাতিতা কোনও ভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও, তাঁর কাকিমা ও বোন মারা যান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় নির্যাতিতা ও তাঁর আইনজীবীকে। পরে এইমসে উড়িয়ে আনা হয় তাঁদের। পরে মামলাটি উত্তরপ্রদেশ থেকে দিল্লির আদালতে সরিয়ে আনার নির্দেশ দেন বিচারপতি।

১ সেপ্টেম্বর ধর্ষিতার বিপদ কেটেছে বলে জানান চিকিৎসকেরা।

আরও পড়ুন: আদালতে প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারা হয়েছিল আক্কু যাদবকে, কেটে নেওয়া হয়েছিল পুরুষাঙ্গ! ধর্ষণের বিচারের দাবিতে সেই স্মৃতি ফিরে আসছে সোশ্যাল মিডিয়ায়

এর পরেই মামলা উঠে আসে দিল্লির তিস হাজারি আদালতে। একের পর এক সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখতে শুরু করেন বিচারক। ধর্ষিতার পরিবার সাক্ষ্য দেন আদালতে। দোষী সাব্যস্ত হল প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার। এবার তাকে যাবজ্জীবনের সাজা শোনাল দিল্লির আদালত।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More