তৃণমূল-ডিএমকেদের সঙ্গে না নিয়েই রাষ্ট্রপতির কাছে সনিয়া, কেন কৌশল বদল কংগ্রেস সভানেত্রীর

আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলি যেমন নির্ভরশীল নয়, তেমনই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতারও অভাব রয়েছে। মুখে বিপ্লবের কথা বলেও তলে তলে অনেকেই আপস করে নেয়। তাতে বিজেপিরই সুবিধা হচ্ছে। যেমন, জানুয়ারি মাসে সনিয়া গান্ধীর ডাকা ওই বৈঠকে যখন তৃণমূল বা ডিএমকে এল না—তখন তা নিয়েই সমস্ত আলোচনা হল সংবাদমাধ্যমে। আসল বিষয় হারিয়ে গেল। সনিয়া গান্ধী এবার তা আর চাননি।

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিল্লিতে হিংসা রুখতে সরকারের বিরুদ্ধে অপদার্থতার অভিযোগ নিয়ে বিষ্যুদবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করলেন সনিয়া গান্ধী। সেই প্রতিনিধি দল জুড়ে থাকলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ, রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি আজাদ, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী সহ কংগ্রেস নেতা-নেত্রীরা। কিন্তু অনেক দিন পর এই প্রথন রাইসিনা অভিযানে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবেই তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে, শরদ পাওয়ারদের ডাকলেন না কংগ্রেস সভানেত্রী।

দিল্লিতে হিংসার ঘটনা ক্ষুদ্র বিষয় নয়। এমনও নয় যে তা নিয়ে রাজনৈতিক তর্ক, সাধারণ মানুষের উদ্বেগ শুধু দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বরং সম্প্রীতির পরিবেশ যেভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, এখনও পর্যন্ত ৩৪ জনের প্রাণ গিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগে গোটা দেশই। অর্থাৎ তা রাজনৈতিক ভাবে সর্বভারতীয় ইস্যু। সাম্প্রতিক অতীতে এ ধরনের সমস্ত বিষয়ে মোদী সরকারের বিরোধিতায় একত্রেই চলতে চেয়েছিলেন সনিয়া। যেমন, নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরোধিতায় ঐক্যবদ্ধ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে সমস্ত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলকে নিয়ে জানুয়ারি মাসে বৈঠকে বসতে চেয়েছিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী। কিন্তু এ বার দেখা গেল, সেই পথ পরিত্যাগ করেছেন সনিয়া। বরং মনমোহন সিংহের মতো একটি বিশ্বাসযোগ্য মুখকে পাশে নিয়ে সনিয়া তথা কংগ্রেস একলা হেঁটেছে রাইসিনা পাহাড়ের পথে।

প্রশ্ন হল কেন?

সর্বভারতীয় কংগ্রেসের এক বর্ষীয়াণ নেতার কথায়, কারণ পরিষ্কার। জানুয়ারি মাসে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরোধিতায় সনিয়া গান্ধী যে বৈঠক ডেকেছিলেন, তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিএমকে নেতা স্ট্যালিন, মায়াবতী প্রমুখ যোগ দেননি। মমতা বলেছিলেন, বাংলায় বনধের দিন সিপিএম-কংগ্রেসের উৎপাতের কারণেই তিনি ওই বৈঠকে যোগ দিতে আসেননি। বৈঠকের বিষয়ের গুরুত্বের বিচারে ওই ‘অজুহাত’ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। বরং কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মমতার বৈঠকের পর অনেকেই কারণটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। একই ভাবে ডিএমকে-ও যে অজুহাত দিচ্ছে তা স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল।

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির ওই সদস্যের কথায়, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলি যেমন নির্ভরশীল নয়, তেমনই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতারও অভাব রয়েছে। মুখে বিপ্লবের কথা বলেও তলে তলে অনেকেই আপস করে নেয়। তাতে বিজেপিরই সুবিধা হচ্ছে। যেমন, জানুয়ারি মাসে সনিয়া গান্ধীর ডাকা ওই বৈঠকে যখন তৃণমূল বা ডিএমকে এল না—তখন তা নিয়েই সমস্ত আলোচনা হল সংবাদমাধ্যমে। আসল বিষয় হারিয়ে গেল। সনিয়া গান্ধী এবার তা আর চাননি।

কংগ্রেসের একাধিক শীর্ষ সারির নেতার মতে, দিল্লিতে হিংসার ঘটনা রুখতে আম আদমি পার্টি তথা মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালেরও ভূমিকা সদর্থক ছিল না। হিংসার ঘটনা পুরোমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তিনি মাঠে নামেননি। পরে ছুতো দেখিয়েছেন, দিল্লি পুলিশ তাঁর অধীনে নয়। কিন্তু যে রাজনৈতিক দল কোনও রাজ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে, বুঝে নিতে হবে তাদের নিচুতলায় সংগঠন পোক্ত। প্রশ্ন হল, অশান্তির আঁচ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন আপের নেতা, মন্ত্রী, বিধায়করা এলাকায় এলাকায় ঘুরে শান্তিু কায়েম রাখার চেষ্টা করেননি। আসলে কেজরিওয়ালও দেখাতে চেয়েছিল যে হিংসা রুখতে দিল্লি পুলিশ ব্যর্থ।

কংগ্রেস নেতৃত্বের মতে, গোটা দেশে যে সাম্প্রয়িক টেনশন তথা বিভাজনের বাতাবরণ গড়ে তুলতে চাইছে গেরুয়া শিবির তা রুখতে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতেও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রয়োজন। ওপরে মোদী বিরোধিতা, তলে তলে আপস দিয়ে তা রোখা যাবে না। ফলে সর্বভারতীয় স্তরে ধর্মনিরপেক্ষ, উদার দল হিসাবে ফের মাথা তোলার সুযোগ কংগ্রেসের সামনে রয়েছে।

তবে হ্যাঁ, কংগ্রেস নেতারা এও স্বীকার করছেন রাহুল গান্ধীকে সামনে রেখে সেই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়তো সম্ভব নয়। বরং যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারেন সনিয়া গান্ধীই। দেড় দশক আগে ঠিক যেভাবে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে বিজেপি সরকারের পতন ঘটিয়েছিলেন, সেই পথই একমাত্র বিকল্প।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More