ফাস্ট ফুড-ওবেসিটি বাড়ায় ১২ রকম ক্যানসারের ঝুঁকি, মেদের জুজু তাড়ান বিশেষজ্ঞের ম্যাজিক-টোটকায়

সেডেন্টারি লাইফস্টাইলেও সুস্থ, চনমনে থাকতে ফাস্ট ফুডকে যেমন বলতে হবে গুডবাই, তেমনি দৈনন্দিন জীবনেও কিছু বদল আনা প্রয়োজন। কী কী করণীয় জানালেন বিশেষজ্ঞ।

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

বাঙালি স্বাদে খুচড়ো খিদে মেটাতে দই-চিঁড়ের স্বাদ এখন ফিকে। রসনা জুড়ে শুধুই পিৎজা, বার্গার, সসেজ-সালামি। ভাতের পাতেও একগাদা ভাজাভুজি, তেল-মশলার চটক। খিদে পেলেই ফাস্ট ফুডে পেট ভরানো আজকাল প্রায় সকলের কাছেই সহজ সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই চটজলদি সমাধানেই ওঁত পেতে রয়েছে বিপদ। গাদা গাদা ফ্যাট, মাখন-মেয়োনিজ-চিজ চপচপে খাবার, প্রিজারভেটিভ ও অতিরিক্ত চিনি মেশানো সফট ড্রিঙ্কস থেকেই চড়চড়িয়ে বাড়ছে মেদ। হার্টের অসুখ, ওবেসিটি থেকে ডায়াবেটিস, রোগ হানা দিচ্ছে বয়ঃসন্ধিতেও। অল্প বয়সেই জমছে পেটে ও কোমরের অবাঞ্ছিত মেদ।

সেডেন্টারি লাইফস্টাইলেও সুস্থ, চনমনে থাকতে ফাস্ট ফুডকে যেমন বলতে হবে গুডবাই, তেমনি দৈনন্দিন জীবনেও কিছু বদল আনা প্রয়োজন। নিয়মিত শরীরচর্চা, সঙ্গে হালকা ডায়েট আর অবশ্যই কিছু রুটিন মেডিক্যাল চেকআপ, তাহলেই যে কোনও উটকো রোগ থেকে শত হাত দূরে থাকা যাবে।

এখন দেখে নেওয়া যাক সুস্থ শরীরকে বিগড়ে দিতে পারে যে যে রিস্ক ফ্যাক্টর—

• তালিকায় প্রথমেই আছে রেড মিট এবং প্রসেসড মিট। রেড মিট মানেই হাই কোলেস্টেরল। মেপে না খেলেই কোলেস্টেরল–ট্রাইগ্লিসারাইড, ফ্যাটি লিভার বাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে। প্রসেসড মিট বেশি খেলে পাকস্থলিতে কিছু ক্ষতিকারক ব্যাকটিরিয়া দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করে৷ যা মাংসের কারনিটিন নামের উপাদান ভেঙে গিয়ে ট্রাইমিথাইল্যামিন যৌগে পরিণত হয়। রক্তে শোষিত হয়ে, লিভারের বিপাক ক্রিয়ায় ভেঙে ট্রাইমিথাইল্যামিন-এন-অক্সাইডে পরিণত হয় যা হার্টের সূক্ষ্ম রক্তনালিতে চর্বি জমিয়ে ইসকিমিক হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

• ফাস্ট ফুডের প্যাকেজিং এবং সংরক্ষণের জন্য যে প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয় তা এককথায় ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই সব খাবারের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহার করা হয় গ্রিজ প্রুফ পেপার। যার মধ্যে থাকা ফ্লোরিনেটেড যৌগ বাড়িয়ে দেয় ক্যানসারের ঝুঁকি।

• অতিরিক্ত চিনি দেওয়া সফট ড্রিঙ্কস এবং অবশ্যই বেশি মাত্রায় অ্যালকোহল বিপাকের হার কমায়, শরীরে মেদ জমতে শুরু করে হুহু করে।


• আজকালকার বাচ্চাদের টিফিনবাক্সের ছবিটাও বদলে গেছে। হাতে গড়া রুটি, মুড়ি, পাঁউরুটি বা ফলের বদলে টিফিন বাক্সে ঠাসা দোকান থেকে কেনা স্যান্ডউইচ, বার্গার, পেস্ট্রি বা ক্যান্ডি। এতে যেমন জাঙ্ক ফুডে রুচি জন্মাচ্ছে বাচ্চাদের, তেমনি শরীরে জমছে ফ্যাট।

• শরীরচর্চার অভাব রোগব্যধির তালিকাকে আরও দীর্ঘ করছে। আজকালকার ব্যস্ত লাইফস্টাইলে আধঘণ্টা সময়ও শরীরের দিকে নজর দেওয়ার সময় নেই। কাজেই একদিকে যেমন বাড়ছে স্থূলত্ব তেমনি কম বয়সেই নানান রোগ হানা দিচ্ছে শরীরে।

• মেদ ঝরানো এবং সুস্থতা—এই দুই অস্ত্রেই মজবুত হয় শরীর। ওবেসিটি নানা ধরনের অসুখ ডেকে আনে, তাই বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ফেলার পরামর্শই দেন চিকিৎসকরা। তবে শুধু মেদ ঝরালেই শরীরের প্রতি দায়িত্ব শেষ হয় না, সার্বিক সুস্থতার জন্য ঠিকঠাক ডায়েট ও শারীরিক কসরত করাটাও জরুরি।

ফাস্ট ফুড ও ওবেসিটি বাড়ায় ১২ রকম ক্যানসারের ঝুঁকি

ভাজাভুজি ও তৈলাক্ত খাবার, ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট, অ্যালকোহল, তামাক এবং শরীরচর্চার ঘাটতি—এই রিস্ক ফ্যাক্টরগুলোই বাড়িয়ে দেয় মারণ রোগ ক্যানসারের ঝুঁকি। ওয়ার্ল্ড ক্যানসার রিসার্চ ফান্ড ইন্টারন্যাশনাল এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ এমন ১২ রকমের ক্যানসারের কথা বলেছে, যাদের মূল কারণই হল এইসব রিস্ক ফ্যাক্টর।
১) মুখের ক্যানসার ( Mouth, Pharynx and Larynx), ২) পাকস্থলীর ক্যানসার, (Stomach) ৩) ইসোফেগাল বা অ্যাডেনোকার্সিনোমা, (Oesophagus) ৪) অগ্নাশয়ের ক্যানসার,(Pancreas) ৫) গলব্লাডার, (Gallbladder) ৬)লিভার ক্যানসার, (Liver) ৭)কলোরেকটাম,(Colorectum) 8) স্তন ক্যানসার, (Breast-Postmenopause) ৯) জরায়ুর ক্যানসার,(Ovary) ১০) এন্ডোমেট্রিয়াম, (Endometrum) ১১) প্রস্টেট ক্যানসার,(Prostate) ১২) কিডনি ক্যানসার (Kidney)।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছে যে, পুরুষদের মধ্যে মুখগহ্বরের ক্যানসারের ঝুঁকি মেয়েদের তুলনায় দ্বিগুণ। পান, সুপুরি, জর্দা, দোক্তা, পানপরাগ, গুটখা ও মদ্যপান ওরাল ক্যানসারের প্রধান কারণ। বিশেষ করে অনেকে গালের পাশে জর্দা পান বা সুপুরি ঠুসে রেখে দেন। ডাক্তারি পরিভাষায় এই অংশের নাম কফিন কর্নার। যাদের এই বদ অভ্যাস আছে তাঁদের ক্যানসারের সূত্রপাত কিন্তু এখান থেকেই হয়।

অতিরিক্ত ভাজাভুজি, তেল-মশলাদার খাবার থেকেইসোফেগাল বা খাদ্যনালীর ক্যানসার বিপদ বাড়িয়ে দিচ্ছে অনেক। মহিলাদের ক্ষেত্রে বাড়ছে স্তন, ডিম্বাশয় ও জরায়ুর ক্যানসারের ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাড়তি ওজন ও অতিরিক্ত জাঙ্গ ফুড, স্তন ও কোলন ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ। অল্প বয়সে মেনার্কি অর্থাৎ পিরিয়ড শুরু হওয়া এবং বেশি বয়সে মেনোপজ হলে দীর্ঘ দিন ইস্ট্রোজেনের সঙ্গে সহবাস করতে হয়। ইস্ট্রোজেন ক্যানসারের রিস্ক বাড়ায়। সন্তানকে ব্রেস্ট ফিডিং না করালেও ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে।

সুস্থ শরীরের চাবিকাঠি

• প্রচণ্ড খিদের মুখে হাই ক্যালোরি ভাজা বা প্রসেসড ফুডের আসক্তি বাড়ে৷ ভাজাভুজি না খেয়ে মন শক্ত করে ডায়েটে রাখুন পুষ্টিকর খাবার। খাবারের মোট ক্যালোরির ২৫ শতাংশ প্রোটিন থেকে এলে ভুলভাল খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। শাকসবজি, ফল, ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার রাখুন রোজকার ডায়েটে।

• রেড মিট বা প্রসেসড মিটের বদলে ভরসা থাক লিন মিটে। প্রায় সব ধরনের হোয়াইট মিট পড়ে লিন মিটের পর্যায়ে। এর মধ্যে রয়েছে পোলট্রি ও মাছও। চিকেন ছাড়াও লিন প্রোটিনের অন্যতম উৎস মাছ। প্রোটিনের পাশাপাশি মাছে রয়েছে ভিটামিন ডি ও ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যা মস্তিষ্ককে তরতাজা রাখতে সাহায্য করে। লিন মিটে কোলেস্টেরল ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণও অনেক কম।

•নিয়মিত শরীরচর্চা অনেক রোগব্যধিকে দূরে রাখে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্ট্রেস বাড়লে গ্লুকোজসমৃদ্ধ কমফর্ট ফুড খেয়ে ফেলা চান্স বেড়ে যায়। বিপদ এড়াতে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা তাই জরুরি।

• সফট ড্রিঙ্কস, অ্যালকোহল থেকে অবশ্যই দূরে থাকা উচিত। ড্রিঙ্ক করলেও ধীরে ধীরে করুন। সঙ্গে রোস্টেড বাদাম, স্যালাড, চিজ–পাইন্যাপেল রাখা উচিত। স্যালাড–ফলের গ্লুকোজ ক্রেভিং কম রাখতে সাহায্য করে৷

•গাদা গাদা সাপ্লিমেন্ট একেবারেই নয়। এতে হিতে বিপরীত হয়।

• স্তন ক্যানসার এড়াতে সন্তানকে ব্রেস্ট ফিড করানো জরুরি।

ক্যানসারের ঝুঁকি এড়াতে জরুরি কিছু রুটিন ব্লাড-টেস্ট

কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (Complete Blood Count-CBC)-রক্তে মারণ রোগ বাসা বেঁধেছে কিনা জানার অন্যতম রাস্তা সিবিসি। রক্তে হিমাটোক্রিট, হিমোগ্লোবিন, শ্বেত রক্তকণিকা (হোয়াইট ব্লাড সেল্‌স বা ডব্লিউবিসি), লোহিত রক্তকণিকা (রেড ব্লাড সেল্‌স বা আরবিসি) ও অণুচক্রিকার (প্লেটলেট্‌স) সংখ্যা, তাদের বাড়া-কমা ধরা পড়ে এই পরীক্ষায়। ওই রক্তকণিকাগুলির পরিমাণে কমা-বাড়া বুঝেই জ্বর থেকে ক্যানসার সব ক্ষেত্রেই পরবর্তী পদক্ষেপ করেন চিকিৎসকরা।

সেরাম প্রোটিন টেস্টিং (Serum Protein Testing)-একধরনের ইলেকট্রোফোরেসিস টেস্ট যা রক্তে (সেরাম) বিভিন্ন প্রোটিনের পরিমাণ পরীক্ষা করে। রক্তে কোনও অবৈধ প্রোটিন গজিয়ে উঠল কিনা সেটাও ধরা পড়ে এই পরীক্ষায়। তাছাড়া অস্থিমজ্জার টেস্ট বা bone marrow biopsy থেকেও ক্যানসারের আগাম খবর পাওয়া যায়।

টিউমার মার্কার টেস্ট (Tumor Marker Test)-শরীরে টিউমার কোষগুলিতে চিহ্নিত করার জন্য টিউমার মার্কার টেস্ট খুব জরুরি। যেমন টিউমার মার্কার প্রোটিন-স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন (PSA) চিহ্নিত করে প্রোস্টেট ক্যানসারবাহী কোষকে, ক্যানসার অ্যান্টিজেন ১২৫ (CA 125) খোঁজ দেয় জরায়ু ক্যানসারের, ক্যালসিটোনিন মার্কার থাইরয়েড ক্যানসারকে চিহ্নিত করে, লিভার ক্যানসারের মার্কার আলফা-ফেটোপ্রোটিন (AFP)এবং জার্ম সেল টিউমার যেমন টেস্টিকুলার ও জরায়ু ক্যানসারের জন্য বিশেষ মার্কার হল হিউম্যান ক্রনিক গোনাডোট্রপিন (Beta HCG)।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More